free hit counter
'মা-বোনেরা অস্ত্র ধরো, স্বাধীন বাংলা রক্ষা করো' মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্ব
মুক্তিযুদ্ধ

‘মা-বোনেরা অস্ত্র ধরো, স্বাধীন বাংলা রক্ষা করো’ মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্ব

মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়া, চিকিৎসক ও সেবিকা হিসেবে কাজ করা ছাড়াও অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন নারীরা ৷ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃত অর্থেই ছিল জনযুদ্ধ। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাই–ই সর্বাত্মক এই যুদ্ধে শামিল হয়েছিল সমানভাবে।

যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শহর, বন্দর, গ্রামগঞ্জের অনেক নারী মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্ব দিয়ে কাজ করে গেছেন। আশালতা বৈদ্য, তারামন বিবি, রাজিয়া খাতুন ও কাঁকন বিবির মতো অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধা আছেন; যারা অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে লড়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও যুদ্ধাহতদের সেবা দিয়েছেন।

২৫ মার্চের কালরাতের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন পুরো বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, সেই সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবাদী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিহত করতে সচেষ্ট থেকেছেন, করেছেনও। এই বাস্তবতায় খানসেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছে বিপন্ন নারী-শিশুর দল। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চষে বেড়িয়েছে পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নারীর ওপর নিপীড়ন, ধর্ষণ, লাঞ্ছনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বাছবিচারহীনভাবে। নারীরা ধর্ষণের শিকার বা অত্যাচারিত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটা যেমন বড় হয়ে উঠেছে, তার চেয়েও বড় সত্য এই যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীসমাজ লড়াই করেছে, দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, রক্ষা করেছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, এই সংগ্রাম পরিণতি অর্জন করেছে ধাপে ধাপে, যেখানে নারীর বলিষ্ঠ ভূমিকা বিদ্যমান। ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন ও অভ্যুত্থানে নারীরা ও ছাত্রীসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। ১৯৬৯-এর ১৯ জানুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর লাঠিপেটা করে সামরিক জান্তার সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আসাদুজ্জামান। এরপর শিবপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে আসাদের মা ছাত্রনেতাদের কাছে বাণী পাঠালেন, ‘আমার আসাদের মৃত্যু হয়নি। আমার আসাদ বলত, “মা, আগামী দশ বছরের মধ্যে এই মাতৃভূমি নতুন জীবন পাবে।” আমার আসাদের এই স্বপ্ন তোমরা সার্থক করো।’ (দৈনিক আজাদ, ২৬ জানুয়ারি ১৯৭০)। আসাদের মায়ের এই বাণীর মধ্য দিয়ে তাঁর যে পরিচয় আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়, তা অবশ্যই একজন মুক্তিযোদ্ধার।

সেই সময় ছাত্রীরা সব মিছিল-আন্দোলনে সোচ্চার থেকেছেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে নারীসমাজ রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলনে, গণ-আন্দোলনে, মিছিলে প্রতিদিনই যোগ দিয়েছে। ১৯৬৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এই মহীয়সীর নেতৃত্বে সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আড়াই হাজার নারী সমাবেশ করেন, মিছিল করে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত যান। ২৪ মার্চ ১৯৬৯-এ প্রকাশিত আজাদ-এর তথ্য অনুযায়ী, বোরকা পরা হাজার হাজার পর্দানশিন নারীও যোগ দেন সেই মিছিলে।

একাত্তরের উত্তাল মার্চের ৭ তারিখে তৎকালীন রেসকোর্স, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঘোষণা দিলেন, ‘…আর যদি একটি গুলি চলে… প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’, সেই সময়েও ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র কাজে উদ্ধুদ্ধ হয়েছিলেন নারীরা। ফলে দেখা যাবে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা, ঈশ্বরদী, পাবনা, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ—সব জেলায় নারীসমাজের প্রতিবাদী সভা ও মিছিল হয়েছে। এ সময় তারা জেলায়, শহরে-শহরে, এলাকায়-এলাকায় সংগঠিত হয়ে কুচকাওয়াজ ও অস্ত্র চালনার ট্রেনিংও শুরু করে। ৯ মার্চ বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা উড়তে দেখা যায়। এই কাজে নারীসমাজ ও ছাত্রসমাজ প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। (জহিরুল ইসলাম, একাত্তরের গেরিলা, ঢাকা, প্রকাশক মিলন নাথ, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা.২০)।

পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বহুমাত্রিকভাবে নারীরা সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—সব ধর্মের নারীই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কেবল বাঙালি নয়, সর্বাত্মকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন আদিবাসী নারীরাও। যুদ্ধের সময় যদিও বাংলাদেশ সরকারের নীতিতে নারীদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া, গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা এবং প্রশাসনিক কাজের নেতৃত্বে নারী সাংসদদের দায়িত্ব দেওয়া ইত্যাদির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তারপরও এ ক্ষেত্রে নারীরা ছিলেন অনড়।

তাঁরা সম্মুখসমরে অংশ নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। কলকাতায় রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রতিনিধি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর পরিচালনায় গোবরা ক্যাম্পের ৩০০ তরুণীকে গোবরা ও ‘বিএলএফ’ ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এঁদের মধ্যে গীতা মজুমদার, গীতা কর, শিরিন বানু মিতিল, ডা. লাইলী পারভীন অস্ত্রচালনা শেখার পরও তাঁদের সম্মুখসমরে যেতে দেওয়া হয়নি। নারীদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশ্নে সেই সময় যুদ্ধকালীন সরকারের ভেতরেই দ্বিধা ছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন যুবশিবিরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য অস্ত্রসংকটে অপেক্ষায় ছিলেন বিপুলসংখ্যক তরুণ। ছেলেরা যেখানে অস্ত্র পাচ্ছে না, যুদ্ধে যেতে পারছে না, প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না, সেখানে মেয়েদের মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়ার গুরুত্ব বাংলাদেশ সরকার ও রাজনীতিবিদদের প্রচলিত ধ্যানধারণায় ছিল না। নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সে সময় মোটেও ন্যায়সংগত হয়নি। তারপরও আলমতাজ বেগম ছবি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বরিশালের করুণা বেগম ছিলেন অকুতোভয় মুক্তিসেনা। পুরুষের পোশাকে এ যুদ্ধে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করেছিলেন শিরিন বানু মিতিল, আলেয়া বেগম।

এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের কথাও বলা দরকার। শহীদ রুমীর মা জাহানা ইমাম বা শহীদ আজাদের মা সাফিয়া বেগমের মতো সব মা–ই মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। তাঁদের এই ত্যাগও ইতিহাসের অংশ। মূলত, এভাবেই নারীরা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে অদম্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে কাজ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ক্যাম্পে রান্নার কাজ করেছেন যাঁরা, তাঁরা অস্ত্রশিক্ষা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহরী হিসেবেও কাজ করেছেন। আবার শত্রুদের বিষয়ে, খানসেনা ও রাজাকারদের অবস্থান সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবরও দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখা, অস্ত্র এগিয়ে দেওয়া অথবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা ও চিকিৎসা করা, তাঁদের জন্য ওষুধ, খাবার ও কাপড় সংগ্রহ করা—রক্ত ঝরা একাত্তরে নারীদের এই সক্রিয় কর্মকাণ্ডই ছিল তাঁদের মুক্তিযুদ্ধ।

কেউ আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে ও ছদ্মবেশে করেছেন তথ্য সরবরাহ এবং অস্ত্র আনা-নেওয়া।

তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা স্বর্ণলতা ফলিয়া। বাবা নিশিকা ফলিয়া ছিলেন কৃষক এবং মা মারিয়া ফলিয়া ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। মুক্তিযুদ্ধের সময় নবম শ্রেণিতে পড়তেন তখন বয়স মাত্র ১৫ বছর। একদিন স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিলেন স্বর্ণলতা। হঠাৎ আশালতা বৈদ্য এসে তাকে বলেন, ‘দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বসে থাকা যাবে না। আমি যুদ্ধে যাব। তোরা কে কে যাবি?’ আশালতার এ কথায় কোনো কিছু চিন্তা না করেই তিনি রাজি হয়ে যান যুদ্ধে যাওয়ার। আশালতা বৈদ্য মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩৫০ জন নারীকে নিয়ে গঠিত একটি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন। স্বর্ণলতা ৮ নম্বর সেক্টরে কোটালীপাড়া সীমানা সাব-সেক্টর কমান্ডার হেমায়েত বাহিনীর অধীনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে স্বর্ণলতা বন্ধুদের নিয়ে এলাকায় ঘুরে নারী মুক্তিযোদ্ধা জোগাড় করতেন। আর স্লোগান দিতেন, ‘মা-বোনেরা অস্ত্র ধরো, স্বাধীন বাংলা রক্ষা করো’। কিছুদিন পর গ্রামের বেশ কিছু স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। নারিকেলবাড়ি ক্যাম্প থেকে স্বর্ণলতা প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ চলাকালে গ্রামের হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মালপত্র সংরক্ষণে সাহায্যও করতেন তিনি।

তারামান বিবি:

তারামান বিবি
ছবি: jugantor.com

তারামান বেগম নামের এই সাহসী নারীর নাম তারামন বিবি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সম্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে লড়েছেন তিনি। বীরত্বের জন্য ১৯৭৩ সালে পেয়েছেন বীর প্রতীক খেতাব। বাংলাদেশের খেতাবপ্রাপ্ত দুজন নারী বীর প্রতীকের একজন তারামন বিবি। একাত্তরে দেশমাতাকে শত্রুমুক্ত করতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তখন তিনি অনেক ছোট। বয়স হবে ১৪-১৫। ছোট থাকতেই বাবা মারা যান। মা তখনো বেঁচে ছিলেন। সাত ভাই-বোনকে নিয়ে কষ্টের সংসার ছিল তাদের। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর ইউনিয়নে বাস করতেন তারামন বিবি ও তার পরিবার। দেশে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়িঘর। আতঙ্ক চারদিকে।

যুদ্ধের সময় যখন মানুষ এক জায়গা থেকে পালিয়ে আরেক জায়গাতে যাচ্ছে, তখন তারাও একদিন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে পাশের ইউনিয়ন কোদালকাঠিতে আশ্রয় নেয়। সেখানে ছিল বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা তাদের মতো অনেক মানুষ। সবাই উপোস। নেই কারো জন্য খাবার।

এমনই এক সময় তারামন বিবিকে মুক্তিযোদ্ধারের জন্য রান্নার প্রস্তাব দেন হাবিলদার নামের এক ব্যক্তি। তারামন বিবির মাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে মুহিব হাবিলদার ধর্ম মেয়ে করে নেন তাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়তা করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজ মাস্টার। এরপর তারামন বিবি চলে যান কোদালকাঠির দশঘরিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেখানে রান্না করা, পাতিল ধোয়া আর অস্ত্র পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন।

এটি ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি যুদ্ধ ক্যাম্প। শুরু হয় তার যুদ্ধের জীবন। তার ধর্ম বাবা মুহিব হাবিলদারই তাকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। রাইফেল চালানো কিছুটা কষ্টের হওয়ায় স্টেনগান চালানোর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তারপর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ নিতে শুরু করেন প্রতিটি অপারেশনে। সফল হন যুদ্ধক্ষেত্রে।

গোয়েন্দা তথ্য আনতে বেরোলে মাথায় গোবর লাগিয়ে, মুখে কালি দিয়ে উপুড় হয়ে গড়াতে গড়াতে শত্রুর কাছাকাছি চলে যেতেন তারামন বিবি। কোথায় শুত্রুর অস্ত্র আছে, কোথায় অপারেশন চালাতে হবে, এসব তথ্য এনে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। তারপর শুরু করতেন পরিকল্পনামাফিক অপারেশন।

সিতারা বেগম:

সিতারা বেগম
ছবি:
northamerica.prothomalo.com

স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বীরপ্রতীক’ প্রাপ্ত আরেকজন নারী সিতারা বেগম। স্বাধীনতাযুদ্ধে আহত বা অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সেক্টরে চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’ নামে ২ নম্বর সেক্টরে এমন একটি হাসপাতাল ছিল। যা প্রথমে স্থাপিত হয় সীমান্তসংলগ্ন ভারতের সোনামুড়ায়। পরে স্থানান্তর করা হয় আগরতলার বিশ্রামগঞ্জে। জুলাই মাসে সিতারা বেগম বাংলাদেশ হাসপাতালে যোগ দেন। পরে হাসপাতালের সিও (কমান্ডিং অফিসার) কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন।

যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ওই হাসপাতালে পাঠানো হতো। যাদের কেউ শেলের স্প্লিন্টারে আঘাতপ্রাপ্ত, কেউ গুলিবিদ্ধ। ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামের স্বল্পতা সত্ত্বেও সেবার কোনো ত্রুটি ছিল না। আর এ ক্ষেত্রে সিতারা বেগম তার মেধা, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বিশেষ অবদান রাখেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সিতারা বেগম রেডিওতে বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ শুনে ঢাকা আসেন। ১৯৭৫ সালে ভাই মেজর হায়দার খুন হলে সিতারা ও তার পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও তিনি বিশেষ অবদান রাখেন স্বাধীনতাযুদ্ধে। এ অবদানের জন্য তৎকালীন সরকার সিতারা বেগমকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে।

৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশের কোনো যোদ্ধাকে আলাদা করে মূল্যায়ন করা কঠিন। মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতার জন্য নারীরাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন স্বাধীনতাযুদ্ধে। পুরুষদের পাশাপাশি অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে শত্রুর মোকাবিলা করেছেন কখনও গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখ যুদ্ধে কখনও বা বার্তাবাহক হিসেবে।