free hit counter
বিনোদন

কারাগারে আটকে আছে কে?

শুরুটা বেশ নাটকীয়, তবে শান্ত। বড় জল্লাদের ভরাট কণ্ঠে খুনের হিসাবের পাশাপাশি পাওয়া যায় লটকানো ফাঁসির দড়িও। সেই দড়ি ভাঁজ করতে করতেই আঁচ করা যায় মানুষের জীবনে স্থান পূরণের অমোঘ প্রতিযোগিতা। তা হোক সে জল্লাদ, বা প্রতিশোধ। আর শুরুর শেষে জল্লাদ জানিয়ে দেন, তুফান আসছে!

পুরো সিরিজ দেখার নিখুঁত আহ্বান বলা চলে। তাতে সাড়া দিতে গিয়েই প্রায় তিনটি ঘণ্টা চলে গেল। একেবারে জলে কি গেল সময়? না। হোঁচট খেতে খেতেও পপাত ধরণিতল না হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারলে যেমন বোধ হয়, ঠিক তেমনটাই অনুভূতি এখন। সেই সঙ্গে আছে ‘পার্ট টু’ দেখার উদগ্র আগ্রহ। ‘কামিং সুন’ শব্দদুটো যত দ্রুত উঠে গিয়ে ‘এসে গেছে’ হয়, ততই যেন স্বস্তি! অজানা প্রশ্নের উত্তর পেতে কার না ভালো লাগে, বলুন?

বাংলাদেশে ওয়েব সিরিজের জগতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে বেশ। পরিবর্তন সব সময় ধীরে-সুস্থেই আসে। তবে হাওয়াটা টের পাওয়া যায়। বোঝা যায় পরিণত হওয়ার রেশ। সৈয়দ আহমেদ শাওকীর ‘কারাগার’ ওয়েব সিরিজটিতে সেই পরিবর্তিত হাওয়ার গন্ধ মেলে। ঠিক যেমনটা পাওয়া গিয়েছিল ‘সাবরিনা’ বা ‘কাইজার’-এও।

সৈয়দ আহমেদ শাওকীর তৈরি নতুন ওয়েব সিরিজ ‘কারাগার’। ১৯ আগস্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তে মুক্তি পেয়েছে এই সিরিজের পার্ট ওয়ান। সাতটি পর্বে সাজানো এই প্রথম অধ্যায়। এর আগে ‘তাকদীর’ দিয়ে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন পরিচালক শাওকী। সুতরাং এবারের সিরিজ নিয়ে কিছুটা আগ্রহ আগে থেকেই মনে পোষা ছিল।

‘কারাগার’-এর গল্পটা নিয়ে হইচই লিখেছে, ‘আকাশনগর সেন্ট্রাল জেলের সেল নাম্বার ১৪৫ গত পাঁচ দশক ধরে বন্ধ। অথচ সেই সেলেই উদয় হয়েছে এক অচেনা, অজানা, রহস্যময় কয়েদির। কে এই আগন্তুক আর সে এখানে কি করে পৌঁছাল?’

রহস্যের এই শুরুতে আসতে বেশি দেরি করেনি ‘কারাগার’। প্রথম পর্বেই আবির্ভাব ঘটে আগন্তুকের। এর পর থেকেই সেই রহস্যের জাল আরও জটিল হয়েছে ধীরে ধীরে। কখনো তাতে নবাব সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা মীরজাফর এসেছে, কখনো এসেছে আন্দামানের সেই বিখ্যাত কারাগারের কথা। আবার কখনো আগন্তুকের আধিভৌতিক আচরণ ও অজানা জানার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দর্শকের কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে। তুলেছে অনেকগুলো প্রশ্ন, যার উত্তর পেতেই আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে পার্ট টু-এর জন্য।

রহস্যকে অবলম্বন করে যত ওয়েব সিরিজ হয়, তাতে এই রহস্যাবৃত আবহকে টিকিয়ে রাখাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ওটিটির দুনিয়ায় এই চ্যালেঞ্জ আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। অন্তত কারাগার-এর মুক্তি পাওয়া প্রথম অধ্যায়ের সাত নম্বর পর্বটি দেখার পর বলাই যায় যে, সেই চ্যালেঞ্জে পরিচালক উতরে গেছেন ভালোভাবেই। হ্যাঁ, চার নম্বর পর্ব থেকে মনে হতেই পারে, ‘এত আজগুবি বিষয়-আশয় টেনে আনা হচ্ছে কেন?’ কিন্তু পার্ট ওয়ানের শেষটায় এসে ঠিকই আগের সব ঘটনার কার্যকারণ স্পষ্ট রূপ পেতে শুরু করে। আর এখানটাতেই গল্প-চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অকুণ্ঠ বাহবা পাওয়ার যোগ্য।

সাধারণভাবেই ওটিটির দুনিয়ায় ওয়েব সিরিজের এক সিজনে দুটি অধ্যায়ের সূচনা করা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, দর্শককে আটকে রাখতে হয় লম্বা সময় ধরে। শুধু গল্পে চমক আর অগণিত প্রশ্নের উদ্রেক করেই সেই কৌতূহল টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সেটা এতটাই ঠাস-বুনটে করতে হয়, যাতে করে দর্শককুল ‘পার্ট টু, কামিং সুন’ দেখে উত্তর পাওয়ার বিষয়ে মানসিকভাবে আশ্বস্ত হতে পারেন এবং অপেক্ষার প্রহর গুনতে গররাজি হওয়ার সুযোগ না পান। এই কাজটি ‘কারাগার’ বেশ ভালোভাবেই করতে পেরেছে, তবে আপাতত। পার্ট টু-ই হয়তো সেই ‘আপাতত’-কে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কারণ তাতেই বোঝা যাবে, চকচক করা বস্তুটি আসলেই সোনা কিনা!

সৈয়দ আহমেদ শাওকীর তৈরি নতুন ওয়েব সিরিজ ‘কারাগার’। ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে ‘কারাগার’-এ অভিনয় করেছেন দক্ষ শিল্পীরা। পারিবারিক সমস্যার অস্থিরতায় আক্রান্ত জেলখানার হর্তাকর্তার ভূমিকায় ইন্তেখাব দিনার দুর্দান্ত। প্রথম থেকে সপ্তম পর্ব পর্যন্ত একজন রহস্যে ঘেরা জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ আফজাল হোসেনের অভিনয় বলে দেয়, আসছে পর্বে তাঁর ভূমিকা হবে গল্পের মোড় ঘোরানো। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় কি সত্যিই বিড়ালকে দুধ খাওয়ানো ‘নির্ভেজাল’ কয়েদি হয়ে থাকবেন? মন মানে না! আর চঞ্চল চৌধুরী যেন প্রতি আয়োজনেই পর্দায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্রত নিয়েছেন। হাওয়া থেকে কারাগারের শতবর্ষী সেলে আবির্ভূত হওয়া আগন্তুকের চরিত্রে তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য। বধির ও বোবার চরিত্রেও অবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ দেননি। ঠিক যে সময়টায় গল্পের স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে আমাদের চমকে দিলেন, তা এতটাই পেলব কিন্তু প্রভাববিস্তারী ছিল যে, মনেই হয়নি এর অন্যথাও হতে পারত!

তবে রহস্যের জাল নিশ্ছিদ্র করতে গিয়ে অন্যদিকে কিছু তালগোল পাকিয়েছে। জেলার আর তার ডিবি কর্মকর্তা বন্ধুটির বয়স বা সার্বিক পরিস্থিতি কি মিলেছে বাস্তবতা অনুযায়ী? শুধু পাকা চুলেই কি বয়স নির্ধারিত হয় সব সময়? আর সেটি হলে কতটা হয়? ইন্তেখাব দিনার বা বিজরী বরকতউল্লাহর সঙ্গে এফ এস নাঈম এবং তৎসংশ্লিষ্ট তাসনিয়া ফারিণের চরিত্রটি কি বয়সের মাপকাঠিতে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে? খটকা কিন্তু থেকেই যায়। আরও খটকা লাগে একজন জেলারের ছেলেকে পুলিশের ইনফরমার হওয়ার দরুন প্রাণ বাঁচাতে বন্দীজীবন বেছে নেওয়ার কাহিনিতে। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের (তা সীমান্তের এপার হোক বা ওপার) বাস্তবতা অনুযায়ী এমন কাহিনিতে আস্থা রাখতে একটু কষ্টই হয় বটে। আবার সিরিজটির কিছু কিছু দৃশ্যে বুঝতে কষ্ট হয় ডায়লগও। হয়তো দৃশ্যের প্রয়োজনেই তেমনটা করা হয়েছে, কিন্তু দর্শকের কান পর্যন্ত না পৌঁছালে লাভটা কী?

ক্যামেরার চোখে ‘কারাগার’ সুন্দর। পর্দায় দেখানো এক রহস্যময় নারীর একজোড়া চোখও আকর্ষণীয়। কালো বোরকা পরিহিত সেই নারীর দু চোখেই পাওয়া যায় আরও রহস্যের আভাস। দুই চোখের চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীর নাম চোখ পড়ে বলাই যায়। কিন্তু থাক না কিছু না বলা। পাঠক, বরং নিজেই দেখে নিতে পারেন। পুরো ওয়েব সিরিজ দেখতে সময় নেবে কয়েক ঘণ্টাই তো। ‘সময়টা নষ্ট হলো’—এই কথাটা ভাবার অবকাশ পাবেন না, সেটি আশ্বস্ত করতে পারি।

প্রথম সিজনের পার্ট টু দেখার আকাঙ্ক্ষা তৈরিতে ‘কারাগার’ সফল। সার্থকতার মাপকাঠিতে এই সৃষ্টিকর্মটি কত নম্বর পাবে, সেটি ঠিক করতে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, মূল পরীক্ষা যে হবে পার্ট টু-তে। বরং আস্থা রাখ যাক ‘কামিং সুন’ বলা ঘোষণাটিতেই!

Source link