Image default
বাংলাদেশ

৭৮ টাকার স্যালাইন ৪০০ টাকা, তিন মাস ধরে চলছে কারসাজি

লিবরা ফার্মাসিউটিক্যালস ও অপসো কোম্পানির উৎপাদিত নরমাল স্যালাইনের গায়ে মূল্য লেখা আছে ৮৭ টাকা। অথচ এই স্যালাইন চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে অন্যান্য স্যালাইন তিন-চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ফার্মেসিতে বেশি টাকা দিয়েও মিলছে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

ফার্মেসি মালিক, স্যালাইন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধি এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর গত তিন মাস ধরে সব ধরনের স্যালাইন সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় নিজেদের মতো করে দাম নিচ্ছে ফার্মেসিগুলো। 

রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, গত তিন মাস ধরে স্যালাইনের দাম নিয়ে অরাজকতা চলছে। ফার্মেসিগুলো বেশি দামে বিক্রি করলেও নেই তদারকি সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত অভিযান।

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ছোট ভাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। গত ছয় দিন ধরে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শে ডিএনএস (ডেক্সট্রোজ নরমাল স্যালাইন) স্যালাইন দিতে হয়। এটির দাম ৮৭ টাকা। এখন ফার্মেসিগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলোতে পাওয়া যায়, সেগুলো কখনও ৩৫০ আবার কখনও ৪০০ টাকা দাম নিচ্ছে।’

কেন সংকট?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনের ফাতেমা ফার্মেসির এক কর্মচারী বলেন, ‘যেসব ওষুধ কোম্পানি স্যালাইন উৎপাদন করে সেগুলো গত তিন মাস ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে রোগীদের চাহিদামতো দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস, লিবরা ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি ল্যাবরেটরিজ এবং অপসো কোম্পানি স্যালাইন সরবরাহ করে থাকে। গত তিন মাস ধরে তারা সরবরাহ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ডেঙ্গুর কারণে চাহিদা বেড়েছে। এ অবস্থায় চাহিদার তুলনায় খুব কম স্যালাইন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান একেবারেই সরবরাহ করছে না। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্যালাইন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ডলার সংকট এবং এলসি খুলতে না দেওয়ায় কাঁচামাল সংকটে পড়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। এ কারণে উৎপাদন কমেছে। সেইসঙ্গে সরবরাহ কমে গেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু, সার্জারি, ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন রোগীদের জন্য স্যালাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ গত তিন মাস ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। এই সংকটকে পুঁজি করে ফার্মেসিগুলো ৮৭ টাকার স্যালাইন সাড়ে তিনশ থেকে চারশ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে। এতে গত তিন মাসে শুধুমাত্র স্যালাইন বিক্রি করে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সুবিধাভোগী চক্র।

যা বলছেন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা

পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন কিছুটা কমেছে। কাঁচামাল সংকটসহ নানা কারণে সরবরাহ কম। হঠাৎ করে দেশে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় চাহিদাও বেড়েছে। হাসপাতালগুলোকে দেওয়ার পর ফার্মেসিগুলোতে তেমন একটা দেওয়া যাচ্ছে না। এককথায় চাহিদামতো স্যালাইন সরবরাহ করা যাচ্ছে না।’

চাহিদা বাড়লেও স্যালাইনের দাম কোম্পানি বাড়ায়নি উল্লেখ করে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আগে যে দামে ফার্মেসিগুলোতে আমরা স্যালাইন দিতাম এখনও একই দামে দিচ্ছি। ফার্মেসিগুলোকে ৬ শতাংশ এবং হাসপাতালগুলোকে ৭ শতাংশ কমিশনে স্যালাইন দিই আমরা। এরপরও সংকটকে পুঁজি করে অনেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি করছেন। এর দায় ফার্মেসিগুলোর।’

তবে ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. শাহীন ভূঁইয়ার দাবি, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন এবং সরবরাহ কমেনি। আগের মতোই আছে। তবে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে। যে হারে চাহিদা বেড়েছে, সেভাবে উৎপাদন বাড়েনি। যে কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।’

একমি ল্যাবরেটরিজের বিক্রয় প্রতিনিধি রাকিব উল হাসান বলেন, ‘কাঁচামাল সংকটসহ নানা কারণে উৎপাদন কমেছে। শুধু আমাদের কোম্পানির নয়, সব কোম্পানির কমেছে। অপরদিকে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে গেছে। যে কারণে চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। চাহিদা বাড়লেও দাম বাড়ানো হয়নি। ফার্মেসিগুলো সিন্ডিকেট করে দাম বেশি নিচ্ছে।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর বলছে সংকট আরও প্রকট হবে

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এসএম সুলতানুল আরেফিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হঠাৎ ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে গেছে। এ কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। দেশে পাঁচটি ওষুধ কোম্পানি, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস, লিবরা ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি ল্যাবরেটরিজ ও অপসো লিমিটেড স্যালাইন উৎপাদন করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছি। পপুলার তিন দিন পর এবং অপসো লিমিটেড দুই দিন পর স্যালাইন সরবরাহ করছে। অন্যান্য ওষুধ কোম্পানি আগের মতো স্যালাইন সরবরাহ করছে। তবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমান অবস্থার চেয়ে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে গেলে এই সংকট আরও প্রকট হবে।’  

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে স্যালাইন সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত আছে। রোগীদের প্রয়োজনীয় স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে স্যালাইনের সংকট নেই। আমরা চাহিদামতো রোগীদের সরবরাহ করছি। তবে বাইরে সংকট আছে কিনা, তা আমার জানা নেই। সংকট হলেও তা ফার্মেসি মালিকদের যোগসাজশে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। কেননা ডেঙ্গু রোগী বাড়ার কারণে স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে।’

ফার্মেসিগুলো স্যালাইন বেশি দামে বিক্রি করলেও নেই তদারকি সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত অভিযান

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত জেলায় সাত হাজার ২২৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৬২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে নগরীর বাসিন্দা চার হাজার ৯৮৪ জন এবং জেলার অন্যান্য এলাকার দুই হাজার ২৩৯ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ তিন হাজার ৩২২, নারী দুই হাজার ৩৮ জন এবং শিশু এক হাজার ৮৬৩ জন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষ ১৬, নারী ২৩ এবং শিশু ২৩ জন।’

স্যালাইন নিয়ে ফার্মেসি মালিকদের কারসাজি

কয়েক মাস ধরে স্যালাইনের দাম নিয়ে দোকানিরা কারসাজি করছেন বলে জানালেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ক্রেতা সেজে আমাদের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ফার্মেসিতে পাঠিয়েছি। সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে ফার্মেসিগুলোতে ৮৭ টাকার স্যালাইন ৩০০ টাকায় বিক্রির বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। এদিন চারটি ফার্মেসিকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি বেশি দামে স্যালাইন বিক্রি না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে তাদের।’

একই কথা বলেছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত। তিনি বলেন, ‘গত ৩০ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটের সামনের ফার্মেসিগুলোতে অভিযান চালানো হয়। অভিযান চালানোর আগে রোগী সেজে সেখানে যান জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারী। কোনও ওষুধের দোকানে তখন ডেঙ্গু রোগীর জন্য অতি জরুরি ডিএনএস স্যালাইন পাননি তারা। কিছুক্ষণ পর সেখানে অভিযান চালালে প্রত্যেক ফার্মেসিতে পর্যাপ্ত স্যালাইন পাওয়া যায়। মূলত কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে চাইছে একটি সিন্ডিকেট। ওই দিন চার ফার্মেসিকে জরিমানা করা হয়।’

Source link

Related posts

খুলনা বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৭ জনের মৃত্যু

News Desk

লাভ বুঝলেও স্বাস্থ্যের ক্ষতি বোঝেন না তামাক চাষিরা

News Desk

খুলনায় আরও ৩৫ চীনা নাগরিক করোনায় আক্রান্ত

News Desk

Leave a Comment