free hit counter
জানা অজানা

সিদ্ধ করলে কাঁচের মতো স্বচ্ছ দেখায় যে প্রাণীর ডিম!

ডিম সিদ্ধ করলে কেমন দেখায় নিশ্চয় জানেন? ডিমের ভেতরের অংশ মানে কুসুমের রঙ হলুদ আর বাইরের অংশের রঙ সাদা হয়ে থাকে। হাঁস, মুরগি কিংবা যে কোনো পাখির ডিমই সিদ্ধ করলে একই রকম রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু জানেন কি, এমন এক অদ্ভুত ডিম আছে যা সিদ্ধ করলে ভেতরে কুসুমের রঙ হলুদ থাকলেও, স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে যায় এর বাইরের অংশ। অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ, এটাই সত্যি। এই অদ্ভুত ডিমটি পাড়ে পেঙ্গুইন!

ডিমে তা দিচ্ছে পেঙ্গুইন ; ছবি : YouTube

হিমজগতের পাখিদের মধ্যে পেঙ্গুইন অন্যতম। উড়তে না জানলেও আদিকাল থেকেই পেঙ্গুইনরা পাখির খেতাব পেয়ে আসছে। আদি পাখি পেঙ্গুইনের আবির্ভাব পাঁচ কোটি বছর আগে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। পৃথিবীর সর্বত্র এই পাখির বিচরণ নেই বলে অনেকেরই কেবল ছবিতেই এ পাখি দেখে শখ মেটাতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ পেঙ্গুইনদের বসবাস বরফ আচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকাতে।

পেঙ্গুইনের দেহের উপরিভাগটা কালো বা ধূসর এবং নিচের দিকটা ফকফকে সাদা। দাঁড়িয়ে থাকা একটি পেঙ্গুইনকে হঠাৎ কোটপরা কোন ভদ্রলোকের মত দেখায়। দক্ষিণ মেরুর তীব্র শীতল পানি অথবা ঠান্ডা বাতাস থেকে নিজেদের রক্ষার করার জন্য এদের দেহে ছোট ছোট উজ্জ্বল পালকের মত তাপরোধক এবং তাপ পরিবাহী আবরণ থাকে। তাছাড়াও এদের গায়ের চামড়ার নিচে দুই ইঞ্চির মতো পুরু চর্বির স্তর থাকে।

পেঙ্গুইনের সিদ্ধ ডিম ; ছবি : Facebook

মজার ব্যাপার হল, পাখি হলেও এরা এদের ডানা পাখির মতো ভাঁজ করতে পারে না। বিবর্তনের ধারায় মূলত সাননের পা রূপান্তরিত হয়ে সামনের শক্ত পাখায় পরিণত হয়েছে। যেটি সাঁতার কাটার সময় পেঙ্গুইনকে শক্তির যোগান দেয়। সাঁতার কাটায় পেঙ্গুইনরা বেশ পটু। প্রতি ঘন্টায় এরা প্রায় ৩০ মাইল পর্যন্ত যেতে পারে। আবার সাঁতারের পাশাপাশি এরা ভাল ড্রাইভও দিতে পারে। সাঁতারের সময় সামনের পা দুইটি ব্যবহার করে এবং পা দুইটা দিয়ে দিক পরিবর্তন করে থাকে। একটানা ২০ মিনিট পানিতে ডুব দিয়ে থাকা এদের কাছে তেমন কঠিন কোন কিছু নয়।

মানুষের মতই পেঙ্গুইন সামাজিক জীব। এরা একা থাকতে পারে না, দলবদ্ব হয়ে থাকতে পছন্দ করে। এমনকি পানিতে নামার সময়ও এরা একা না নেমে দলবদ্ব হয়ে থাকতে পছন্দ করে। অনেক সময় সুযোগ সন্ধানী লেপার্ড সীর এদের আক্রমণ করে। এ কারণে এরা সর্বদা সতকর্তা অবলম্বন করে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, পানিতে ঝাঁপ দেয়ার আগে পেঙ্গুইনরা সবাই মিলে পরামর্শ করে। একজনকে সবার আগে ঝাঁপ দেয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়। সম্ভবত সমূহ বিপদ থেকে দলকে বাঁচানোর জন্য একজনকে ঝুঁকি নিয়ে পরিক্ষামূলকভাবে ঝাঁপ দিতে হয়। পরে বাকিরা একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

দলবদ্ধভাবে থাকে পেঙ্গুইন ; ছবি : Polarjournal

অ্যান্টার্কটিকাতে পেঙ্গুইনের বেশ কয়েকটি প্রজাতি দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রজাতির নাম “এম্পেরর পেঙ্গুইন”। জেম্স কুক-এর সমুদ্র অভিজানে তার সঙ্গে ‘ফস্টার’ নামে এক নাবিক ছিল। ‘ফস্টারের’ নামে “এম্পেরর পেঙ্গুইন” এর নামকরণ করা হয়।

সর্ববৃহৎ প্রজাতির এম্পেরর পেঙ্গুইন উচ্চতায় ৪ ফুট। ওজনে প্রায় ৪৫ কিলোগ্রাম হতে পারে। ‘অ্যাডেলি’ নামক আরেক ধরণের পেঙ্গুইন আছে। এরা সংখ্যায় বেশি এবং অ্যান্টার্কটিকার মূল মহাদেশে থাকে। ‘অ্যাডেলি’ পেঙ্গুইন আকারে ছোট-প্রায় ২ ফুট।

ডিম পাড়ার সময় পেঙ্গুইনদের মধ্যে একটা উৎসব ভাব হয়। শীতকালে যখন তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির চেয়েও ৩০ বা ৪০ ডিগ্রি নেমে যায়, তখনই এম্পেরর পেঙ্গুইন ডিম পাড়ে। অ্যান্টার্কটিকা সংলগ্ন বিশাল এলাকা তখন জমে বরফ হয়ে যায়। দলে দলে স্ত্রী পেঙ্গুইন বরফের উপর একটি করে ডিম পাড়ে। স্ত্রী পাখটি ডিম পাড়লেও ডিম তা দেয়ার দায়িত্ব ছিল পুরুষ পাখিটির। ডিম যাতে বরফে জমে না যায়, তার প্রতিরোধ হিসেবে পুরুষ পেঙ্গুইন ডিমটিকে পায়ের উপর রেখে পেটের চামড়া দিয়ে ঢেকে তা দেয়।

পেঙ্গুইন দম্পতি ; ছবি : News18 Bengali

এ দু’মাস পুরুষ পেঙ্গুইন উপবাস করে এবং শুকিয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। প্রায় আধা কেজি ওজন ব্যয় হয় ডিমটি তা দিতে যেয়ে। আর এসময় স্ত্রী পেঙ্গুইন খাদ্য সন্ধানে চলে যায় সমুদ্রে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার সময় স্ত্রী পেঙ্গুইন ডিমের কাছে চলে আসে। এমন সময় বাবা তার মুখের নির্যাস বাচ্চাকে খাওয়ায়। এ নির্যাস চর্বি সমৃদ্ব, মা এলে বাবার ছুটি। তখন বাবা চলে যায় সমুদ্রে খাদ্যের সন্ধানে। মা পাখিটি তার পেটের অর্ধভুক্ত ক্রিল জাতীয় চিংড়ি বাচ্চাকে খাওয়ায়। বাচ্চার বয়স দুই মাস হলে বাবা মা বাচ্চাকে রেখে চলে যায় সমুদ্রে।

মায়ের আশ্রয়ে বাচ্চা পেঙ্গুইনরা ; ছবি : আওয়ার নিউজ

অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রে এম্পেরর পেঙ্গুইনের চেয়ে কিছুতা ভিন্নতা দেখা যায়। অ্যাডেলি পেঙ্গুইন একই সঙ্গে দুইটা ডিম পাড়ে। তবে তীব্র শীতে এরা বরফের উপর ডিম পাড়ে না। মানুষের মতই এদের সন্তানপ্রীতি প্রবল। প্রবল তুষারপাত শুরু পেঙ্গুইনদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ সময় পেঙ্গুইনরা কাছাকাছি জড়ো হয়ে থাকে এবং পরপস্পরের শরীরের উত্তাপে প্রচণ্ড শীত অনুভূত হয় না। যখন অসহ্য ঠাণ্ডা নেমে আসে, তখন বাইরের পাখিরা ভেতরে এসে সমঝোতার মাধ্যমে জায়গা বদল করে নেয়। এতে কেউ একনাগাড়ে শীতে কাবু হয় না। শান্তিপ্রিয় এ পেঙ্গুইনের জীবনযাত্রা মানুষকে আজো বিস্মিত করে।

সূত্র : কুষ্টিয়ারবার্তা, ডেইলি বাংলাদেশ