free hit counter
জানা অজানা

কবিতা লেখার নিয়ম নীতি

“যারা ছড়া,কবিতা বা গান লিখতে চান, তাদের জন্যে এই আয়োজন।”

স্বরবৃত্ত ছন্দের সহজ টিপস

ছড়ার ছন্দ,গানের ছন্দ স্বরবৃত্ত ছন্দ। বহুকাল পূর্ব থেকেই প্রাকৃত সহজ ছন্দ হিসেবে স্বরবৃত্ত ছন্দ প্রচলিত। লেখালেখির হাতেখড়ি মূলত স্বরবৃত্তের মাধ্যমেই অধিকাংশ মানুষের বেলা হয়ে থাকে।

স্বরবৃত্ত ছন্দের নাম নিয়ে বেশ কথা রয়েছে, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- তার বৈশিষ্ট্যগুলো জানা। যারা ছন্দ মাত্রার প্রকরণ মেনে গান,ছড়া,কবিতা লিখতে চান তাদেরকে নিবেদন করেই স্বরবৃত্ত ছন্দের কয়েকটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য এখানে আজ তুলে ধরলাম।

#স্বরবৃত্ত ছন্দের মৌলিক বৈশিষ্ট্য:

★১। স্বরবৃত্ত ছন্দে মাত্রা গণনা পদ্ধতি সবচেয়ে সহজ। এখানে মুক্তাক্ষর-বদ্ধাক্ষর (মুক্তস্বর-বদ্ধস্বর) সব সময় একমাত্রা বিশিষ্ট হয়। শব্দের শুরু-মাঝ-শেষ বলে মাত্রা গণনায় কোন হেরফের হয় না।যেমন:

ক। মুক্তাক্ষরের মাত্রা:

কবিতা (ক+বি+তা:১+১+১=৩)

খ। বদ্ধাক্ষরের মাত্রা:

বন্ধন (বন্+ধন্: ১+১=২মাত্রা)

গ। মুক্তাক্ষর+বদ্ধাক্ষরের মাত্রা:

লিমেরিক (লি+মে+রিক্:১+১+১)।

★২। স্বরবৃত্ত ছন্দে সাধারণত ৪মাত্রার

চাল বা পূর্ণপর্ব হয়ে থাকে।যেমন:

ছন্দ নিয়ে/ দ্বন্দ্ব করা/ ঠিক নয়

২+২/২+২/১+১ (৪+৪+২)

মিথ্যে বলা/ ভাল কোন/ দিক নয়।

২+২/২+২/১+১ (৪+৪+২)

★৩। স্বরবৃত্ত ছন্দটা খুব দ্রুত লয়ের। এই ছন্দে রচিত গান কবিতা বা ছড়া দ্রুততার সাথেই পরিবেশন করতে হয়।যারা স্বরবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা রাখেন তারা এই গতিটা ধরতে পারেন।

★৪। স্বরবৃত্ত ছন্দ চটুল হওয়ায় তার শব্দ প্রয়োগও হবে বেশ সহজ সরল ও চটুল প্রকৃতির। এখানে বিদ্যাসাগরীয় বা বঙ্কিমীয় জটিল,কঠিন,গুরুগম্ভীর শব্দ একেবারেই অচল। তবে লেখকের লেখার কারিশমায় অনেক সময় জটিল ও কঠিন শব্দও ক্ষীপ্র গতি সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে।

★৫। স্বরবৃত্ত ছন্দ যেমন ছড়া ও গানের জন্যে আদর্শ ছন্দ, তেমনই সহজ সরল ভাব ও বিষয়ের প্রকাশের জন্যে স্বরবৃত্ত ছন্দই আদর্শ ছন্দ। জটিল ভাব ও ভাবনাযুক্ত বিষয় অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রূপ দেয়াই শ্রেয়।

★৬। স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত ছড়া,কবিতা ও গান সাধারণত অন্ত্যমিল বা প্রান্তমিল বিশিষ্ট হয়ে থাকে। খাসা অন্ত্যমিল স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রাণ অনেকটাই। যেমন:

“বুকে আমার পলে পলে

সব হারাবার আগুন জ্বলে।”

বা,

“প্রবাল দ্বীপের প্রবাল খুঁজে

তোমার মুঠোয় দিলাম গুঁজে।”

★৭। স্বরবৃত্ত ছন্দে সাধারণত সমমাত্রার চরণ, সমমাত্রার পূর্ণ পর্ব, সমমাত্রার অপূর্ণপর্ব, সমজাতীয় ধ্বনিরঅন্ত্যমিল (বদ্ধস্বর,মুক্তস্বর) হয়ে থাকে।

#স্বরবৃত্তের শব্দ প্রয়োগ ও পর্ব নির্মাণ:

স্বরবৃত্তের চার মাত্রার সমমাত্রিক পর্ব গঠনের সহজতম বুদ্ধি হচ্ছে দুমাত্রা বিশিষ্ট শব্দ পাশাপাশি বসানো। অথবা তিন মাত্রার শব্দের আগে বা পরে এক মাত্রার শব্দ বসানো। কখনও কখনও চারমাত্রার একক শব্দ দিয়েও স্বরবৃত্তের পূর্ণ পর্ব গঠন করে নেয়া যায়।

স্বরবৃত্তের স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্য বিহার হচ্ছে সমমাত্রিক ৪মাত্রার পূর্ণ পর্ব, অপূর্ণ পর্ব গঠিত হবে চার মাত্রার কম যেকোন ডিজিটের মাত্রা ১ থেকে ৩ পর্যন্ত। তবে এক এক স্তবকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার অপূর্ণ পর্ব না দিয়ে সমমাত্রার অপূর্ণ পর্ব ব্যবহার করা ভালো।

স্বরবৃত্তের জন্যে সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে: সব অক্ষরই ১মাত্রা লাভ করে। স্বরবৃত্তে মধ্যখণ্ডনের ব্যবহার বেশ মজাদার, সেটা যদি আবার চরণের শেষ প্রান্তে হয়, আরও টেকসই হয়। চরণের শুরু বা মাঝের পর্বে মধ্যখণ্ডন দম নিতে কম পারে। মধ্যখণ্ডন হচ্ছে পূর্ণ পর্ব গঠনের জন্যে কোন শব্দের মাত্রা খণ্ডিত করা, কেটে নেয়া, পূর্ববর্তী শব্দের মাত্রার সাথে কর্তিত মাত্রার যুক্ত করণ। যেমন:

“তোমায় পেতে হবো নিরুদ্দেশ”

এখানে পূর্ণ পর্ব ৪মাত্রার।

“তোমায় পেতে”-১ম পূর্ণপর্ব।”হবো”-তে দুমাত্রা রয়েছে। পরের শব্দ “নিরুদ্দেশ”-৩মাত্রার শব্দ। এই শব্দ থেকে ২মাত্রার শব্দাংশ “নিরুদ্” কেটে নিলাম পূর্ণ পর্ব গঠনের প্রয়োজনে। তাহলে এই চরণের ২য় পূর্ণপর্ব গঠিত হলো – “হবো নিরুদ্” এবং ১মাত্রার অপূর্ণপর্ব থেকে গেলো-“দেশ” শব্দাংশটি। মধ্যখণ্ডনসহ পর্ব বিভাজন করে দেখালে এমনটি দাঁড়ায়:

তোমায় পেতে/হবো নিরুদ্/দেশ:

২+২/২+২/১ টোটাল ৯মাত্রার চরণ।

#আরেকটা বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ:

অন্ত্যমিল যেমন দেয়া যায়,পর্বান্তিক/ মধ্যপ্রান্তমিলও দেয়া যায়, যা ছন্দের দোলাকে আরও চমৎকৃতি দান করে।

অামার লেখা কবিতা “মেঘনা আমার মেঘনা” থেকে সবমিলে একটা দৃষ্টান্ত দিই:

“রূপ ঝলোমল ঢেউ টলোমল

রোদের ঝিলিমিলি

যাই যতদূর গান সুমধুর আকাশ নিরিবিলি।”

এই কবিতাংশ থেকে আমাদের ওপরে বর্ণিত বৈশিষ্টগুলো খুঁজে নিতে পারি।

#এখানে ১ম ও ৩য় চরণে ২টি করে ৪মাত্রার পূর্ণ পর্ব (মোট ৮মাত্রা) আছে।

#২য় ও ৪র্থ চরণে ৪মাত্রার ১টি করে পূর্ণ পর্ব (মধ্যখণ্ডন সহযোগে) এবং ২মাত্রার একটি করে অপূর্ণ পর্ব চোখে পড়ছে।

#অন্ত্যমিল আছে ২য় ও ৪র্থ চরণে (ঝিলিমিলি+নিরিবিলি: সমস্বর ধ্বনিবাচক অন্ত্যমিল)

#পর্বান্তিক/ মধ্যপ্রান্তমিল দেখুন:

ক। ঝলোমল+টলোমল

খ। যতদূর+ সুমধুর।

#মধ্যখণ্ডণ:

ক। রোদের ঝিলি/মিলি

খ। আকাশ নিরি/বিলি।

মধ্যখণ্ডণ ছাড়াই পর্ব গঠন সম্পন্ন হলে বেশি ভালো। দেখুন তবে:

“আলসে মোরা/ নইতো কেহ

উঠি সকাল/ বেলা,

ভালো করে/ মুখ ধুয়ে নিই

কেউ করি না/ হেলা।

খেলার সময়/ খেলি এবং

পড়ার সময়/ পড়ি,

নিয়ম-নীতি/ পালন করে

জীবনটাকে /গড়ি।”

★চারমাত্রা বিশিষ্ট শব্দ দিয়ে পূর্ণ পর্ব গঠনের দৃষ্টান্ত দেখা যাক:

“অবারিত গন্ধ মাখা

সুরভিত ফুল,

পুলকিত ছন্দ আঁকা

মধুমতি কূল।”

এখানে:

অবারিত,সুরভিত,পুলকিতএবং মধুমতি শব্দগুলো চারমাত্রার শব্দ।

#সব শেষে বলি: যাই বললাম কোন কিছুই অপরিবর্তনীয়,অলঙ্ঘিত কিন্ত নয়। কালই নতুন চেতনাকে ধারণ করবে, লালন করবে। কিন্তু সেই নতুন বাঁক পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত আমাদের প্রচলিত রীতিপদ্ধতিকেই অনুসরণ করে চলতে হবে।