free hit counter
খেলা

লেসলি হিলটন, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার

ক্রিকেট ইতিহাসে হরহামেশাই কত বিচিত্র ধরনের ঘটনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেটাররা। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্রিকেট মাঠে ঘটলেও কিছু কিছু ক্রিকেটার মাঠের বাইরের ঘটনার জন্যেও অনন্তকাল ধরে স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। তাদেরই একজন উইন্ডিজ ক্রিকেটার লেসলি হিলটন। ছয় টেস্টের ক্যারিয়ারে তার উইকেট সংখ্যা মাত্র ১৬টি।

খুবই সাদামাটা পারফরম্যান্স। বর্তমান সময়ের তুলনায় আহামরি কিছু নয়। তবুও লেসলি হিলটন ক্রিকেট ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম। ঘন নীল আটলান্টিক সমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা সবুজে ঘেরা দ্বীপমালা জ্যামাইকার এক গরিব পরিবারে জন্ম লেসলি হিলটনের। তার জন্মের অনেক আগে বাবা মারা যায় এবং বয়স যখন তিন তখন তিনি মাকেও হারান। লেসলি হিলটন বড় হতে থাকেন বড় বোনকে অবলম্বন করে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সেই বোনকেও হারান। পরবর্তীতে তার দেখভালোর দায়িত্ব নেন এক খালা। তিনিও মারা যান।

লেসলি হিলটন তখন পড়াশোনা ছেড়ে দরজির দোকানে কাজ শুরু করেন। এরপর ক্রিকেটে তার আগমন কিভাবে তা আর জানা যায়নি। ১৯২৭ সাল থেকে জ্যামাইকা ক্রিকেট দলের নিয়মিত ফাস্ট বোলার, দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে সবার নজরে আসেন। ১৯৩৫ সালে ইংল্যান্ড সফরের জন্যে প্রথমবার উইন্ডিজ জাতীয় দলে ডাক পান। সেই সময় সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি ছিল। আজকালের মতো এতো বেশি ম্যাচও খেলার সুযোগ ছিল না কোনো দলের। ফলে মাত্র ছয় টেস্টে ১৬ উইকেট শিকারের মাধ্যমে ১৯৩৯ সালেই শেষ হয়ে যায় তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

খেলা ছাড়ার পর পড়ালেখা না জেনেও শুধুমাত্র সাবেক ক্রিকেটার হওয়ার সুবাদে চাকরি পেয়ে যান লেসলি। যোগ দেন জ্যামাইকার সিভিল সার্ভিসের পুনর্বাসন বিভাগে। সবার জীবনে নাকি প্রেম আসে। তেমনি হিলটনের জীবনেও প্রেমের বসন্ত হয়ে এসেছিল দারোগার মেয়ে লার্লিন রোজ। ১৯৪০ সালে সেখানে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় রোজের সঙ্গে। এক সময় তা রূপ নেয় প্রেমে। এরপর সম্পর্ক বিয়েতে গড়ায় ১৯৪২ সালে। যদিও দারোগা বাবা প্রথমে রাজি ছিলেন না। আর্থ- সামাজিক কিংবা বংশমর্যাদা, সবদিক দিয়েই রোজের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল লেসলি। রোজও গভীর প্রেমে ডুবে জানিয়ে দিয়েছিলেন বিয়ে করলে তিনি লেসলিকেই করবেন।



পরবর্তীতে, ১২ বছরের দাম্পত্য জীবনে এক সন্তানের বাবা-মা ও হয়েছিলেন তারা। ১৯৫১ সালে নিজের ছোটবেলার ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে লার্লিন রোজ ছেলে ও মাকে নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে৷ দিগন্ত ছোঁয়া আকাশের নীল ছায়ায় থাকা শান্ত সমুদ্রটাও মেঘে মেঘে হতে পারে প্রলয়ঙ্কারী। মিসেস হিলটন বরাবরই ছিলেন উচ্চাভিলাষী। সেটাই তৈরি করে সম্পর্কের দুর্যোগ। নিউইয়র্কে ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করার সময় রয় ফ্রান্সিস নামের এক অভিজাত ঘরের ছেলের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন রোজ। লেসলি নিউইয়র্কে থাকা তার এক বন্ধুর নিকট হতে পাঠানো একটি টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন। ১৯৫৪ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সেই চিঠি পাওয়ার পর মেজাজ হারিয়ে ফেলেন লেসলি। লার্লিনকে সঙ্গে সঙ্গেই নিউ ইয়র্ক থেকে জ্যামাইকায় ফিরে আসতে বলেন।

লেসলির কথামতো মে মাসে জামাইকায় ফিরে আসেন রোজ। এরপর লেসলি তার কাছে নিউ ইয়র্কে প্রেমের সত্যতার কথা জানতে চান। প্রথমে অস্বীকার করেন এবং পরে শুধু পরিচয় থাকার কথা বলেন রোজ। তবে বেশিক্ষণ সেই মিথ্যা টিকতে পারেনি। এক পর্যায়ে বলেই ফেলেন প্রেম তো বটেই, নিজের গর্ভে রয় ফ্রান্সিসের সন্তানও আছে। সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য। জীবন দিয়ে ভালোবেসেছেন যাকে তার অন্ধকার দিকটা শোনার পরে নিজেকে আর শান্ত রাখতে পারেননি লেসলি। নিজের কাছে থাকা রিভলবার দিয়ে সাতটি গুলি করেন প্রিয়তমা স্ত্রীর বুকে। সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান রোজ। পরে লেসলি নিজে থেকেই ফোন করে ডেকে আনেন পুলিশকে।

প্রথম অবস্থায় পুলিশকে বলেন তিনি নিজেই আত্নহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভুলবশত তার স্ত্রী গায়ে গুলি লেগে যায়। পরবর্তীতে, তদন্ত শেষে যানা যায় তার কথা মিথ্যা ছিল। সে নিজেই তার স্ত্রীকে হত্যা করেন। আদালত লেসলি হিলটনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ঠিক পরের বছর, ১৯৫৫ সালের ১৭ মে লেসলির ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়। এভাবেই মৃত্যুদণ্ড পাওয়া একমাত্র ক্রিকেটারের খেতাব পেয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান লেসলি হিলটন।

Source link