free hit counter
খেলা

মুছে ফেলা হলো মাসুরার ঘরের লাল ক্রস

মাসুরার জন্য থেমে গেলো সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজ। সাফজয়ী নারী ফুটবলার মাসুরার বাড়ি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলায়। সাতক্ষীরা শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলা বেতনা নদীর তীরে বিনেরপোতা এলাকায় মাসুরার ওই বাড়ি থাকা না থাকা নিয়েই দেখা দিয়েছিলো সংশয়। সাফজয়ী এই বাঘিনীর বাড়ির জমিটি নাকি সওজের কাজের নির্ধারিত জায়গায়।

সওজের কাজের জন্য মাসুরাদের বাড়িটি ভাঙ্গার প্রয়োজন ছিলো কর্তৃপক্ষের। এর জন্য তার বাড়ির দেয়ালে লাল ক্রস চিহ্নও দিয়ে রাখা হয়েছিলো। তবে দেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এনে দেওয়ার অন্যতম কারিগর মাসুরার পরিবারের মাথা গোজার ঠাই অক্ষত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক। 

হিমালয় চূড়ায় গিয়েই দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। দেশে ফিরে সোনারে মেয়েরা পেয়েছেন বীরোচিত সংবর্ধনাও। সাফজয়ী বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ও ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের বাড়ি সাতক্ষীরায় বইছে আনন্দের জোয়ার। 



সাতক্ষীরার আলোচিত দুই ফুটবলার সাবিনা ও মাসুরা পারভীনের বাড়িতে গেলেন জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির। তার সামনেই মুছে ফেলা হলো মাসুরার বাড়ির আঙিনায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের দেওয়া লাল রঙের ক্রস চিহ্ন।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এর নির্দেশনায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বেলা দশটার দিকে সওজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া ওই লাল ক্রস
চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। এসময় জেলা প্রশাসক সাবিনার ও মাসুরার পরিবারকে মিষ্টি মুখ করান। 

এসময় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক হুমাযুন কবির বলেন, ‘যতদিন না পর্যন্ত মাসুরার পরিবার নিজেদের বাড়ি বাংলাদেশ সড়ক বিভাগের নির্ধারিত জায়গা থেকে সরিয়ে নতুন বাড়ি করবেন ততদিন পর্যন্ত তাদের (সওজ) কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এছাড়া সাবিনা-মাসুরারা বাড়ি ফিরলে তাদের বর্ণাঢ্য সম্বর্ধনা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এসময় সাতক্ষীরা সদর ১৩ নং লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম বলেন, ‘মাসুরা পারভীন শুধু সাতক্ষীরার গর্ব না, মাসুরা আমাদের লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের অহংকার। আমি নিজে হাতে সওজের দেওয়া লাল ক্রস চিহ্ন মুছে ফেলেছি। তার জন্য আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে অবশ্যই সুনজর রাখব।’


সাতক্ষীরার এই বাড়িতেই থাকেন মাসুরা। ছবি- ইত্তেফাক

সাতক্ষীরা শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলা বেতনা নদীর তীরে বিনেরপোতা এলাকায় মাসুরাদের বাড়ি। সেখানে তার মা-বাবা ও দুই বোন বসবাস করেন। 

বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকালে তাদের বাড়ি গিয়ে মাসুরার বাবা রজব আলী ও মা ফাতেমা
বেগমের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় দেখা যায় তাদের ঘরের পেছনের দেয়ালে তিনটি ক্রস চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। 

ওই ক্রস চিহ্ন সম্পর্কে মাসুরার বাবা রজব আলী বলেন, ‘২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে আমার মেয়ের একমাত্র গোলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। আমাদের থাকার জায়গা না থাকার বিষয়টি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর নজরে আসে। তখন তিনি আমাদের মাথা গোজার ঠাঁই করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু আমাকে যে জমি দেওয়া হয় সেখানে ১৫ ফুট পানি জমে ছিল। বিভিন্ন দপ্তরে বহুদিন ছোটাছুটির পরও সহায়তা পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, বাধ্য হয়ে বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ থেকে মাসুরার প্রাপ্ত তিন লাখ টাকা দিয়ে মাটি ভরাট করি। সেই সময় মাসুরা ২৮ দিন বাড়িতে ছিল। তার ইচ্ছা ছিল দুই দিন বাড়িতে থেকে ঢাকায় যাবে। ২৬ দিনের মাথায় মেয়ের খেলার পুরস্কারের টাকা দিয়ে বাড়ি তৈরি করি। এরপর মাত্র দুই দিন নতুন ঘরে থেকে ঢাকায় খেলতে চলে যায় মাসুরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে সাতক্ষীরা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইটাগাছা পূর্বপাড়ায় একটি জরাজীর্ণ ভাঙাচোরা দোচালা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। চাল ও দেয়াল খসে পড়ছিলো। মাসুরা বাধ্য হয়ে তার সঞ্চিত টাকা দিয়ে এই ঘর করেছে। আগে ভ্যানে করে এলাকায় ফল-মূল বিক্রি করে সংসার চালাতাম। অসুস্থতার কারণে এখন আর সেটাও করতে পারি না।’

রজব আলী বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে বাড়ি বানিয়ে এখন আমরা প্রায় নিঃস্ব। এদিকে আমার শরীরটাও ভালো না। কাজ করতে পারি না। মেয়ের খেলার টাকায় সংসার চলে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবে। সেই হিসেবে আমাদের বাড়িতে ক্রস চিহ্ন দিয়ে গেছে। সরকারিভাবে পাওয়া আট শতক জমিতে ঘর করেছি। এটা ভেঙে দিলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় থাকবো?’

তিনি জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে দুই বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিসে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইউএনওর দেখা পাননি। পরে ইউএনওর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন মাসুরা।

তখন ইউএনও বলেন, ‘সড়ক বিভাগের সীমানার মধ্যে আপনার বাড়ি পড়লে আমাদের করার কিছু নেই’।

মাসুরার মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরবে। দেশের মানুষ আনন্দ করছে। কিন্তু আমরা তো দুশ্চিন্তাই আছি। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সরকারি জায়গায় থাকায় সকল স্থাপনা উচ্ছেদ করবে। আমাদের ঘরের পেছনে ক্রস চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। ঘর ভেঙে দিলে থাকবো কোথায়?’


মাসুরাদের এমন জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক। ছবি- সংগৃহীত

এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, ‌‘মাসুরাদের ঘরে ক্রস চিহ্ন দেয়ার বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি।’

সাতক্ষীরা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সরকারিভাবে জমি পাওয়ার প্রমাণপত্র নিয়ে উচ্ছেদের দিন উপস্থিত থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত নেবেন। ভুল করেও ক্রস দিতে পারে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই।’

এদিকে জয়ের প্রতিক্রিয়ায় ভিডিও কলে মাসুরা পারভীন বলেন, এই জয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। এই জয় একা আমার বা আমাদের জয় নয়, এ জয় পুরো বাংলাদেশের।

সামাজিক বাঁধা পেরিয়ে খেলাধুলা করা আর এখন দক্ষিণ এশিয়া জয় করলেন মাসুরা। সমাজের অন্য মেয়েদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে কিনা এমন প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘আগে অনেক মেয়েরা খেলাধুলা জানতো না। আমরা যে জয় পেয়েছি সেটি পুরো বাংলাদেশ দেখেছে। মেয়েরাও দেখেছে। এখন আমাদের বলা লাগবে না। এখন তারা নিজেরাই আসবে। খেলাধুলা লেখাপড়া একসাথে থাকা ভালো দিক।’

মাসুরা বলেন, ‘আজ যদি আমি খেলাধুলা না করতাম, তবে কোথায় থাকতাম আমি নিজেও জানি না। এই পর্যন্ত আসা সম্ভব ছিল না। আমি বলবো আমার মতো যারা আছে, তারা যেন খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।’

Source link