free hit counter
খেলা

ফুটবলের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের ফুটবল

গত নব্বইয়ের দশকেও ফুটবল ছিল বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। বাংলাদেশের ফুটবলের রয়েছে একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছে। এর মাধ্যমে ব্শ্বি দরবারে স্বাধীনতার দাবী যৌক্তিক রুপ লাভ করেছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের ফুটবল তার সেই জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৯৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় খেলার জায়গাটি ক্রিকেটের দখলে চলে যায়। বিশেষ করে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই ক্রিকেটের যে জোয়ার আসে, তাতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে, ক্রিকেটেরে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পাশাপাশি ফুটবল ফেডারেশনের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ লোকের হাতে ফুটবল পরিচালনার দায়িত্ব, দুর্নীতি, কতিপয় ব্যবসায়ীর হাতে ফুটবল ক্লাবের নিয়ন্ত্রনসহ নানাবিধ কারনে ফুটবল এখন জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে।

ফুটবল যেভাবে শুরু

প্রাচীন গ্রিসের হারপাসটন নামক খেলা থেকেই মূলতঃ ফুটবল খেলার উৎপত্তি। ঐতিহাসিকদের মতে আধুনিক ফুটবলের প্রচলন ১২০০ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ বর্তমান ফুটবলের বয়স প্রায় ৮০০ বছর। ফুটবল খেলার মাঠের পরিসর সাধারণত ১২০/৬০ গজ অর্থাৎ ৭২০০ বর্গগজের। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ১৮০০ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে। স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ১৮৭২ সালে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৮৮৪ সালে শুরু হওয়া ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা। অলিম্পিকে প্রদর্শনী খেলা হিসেবে ফুটবল যুক্ত হয় ১৯০০ সালে এবং ১৯০৪ ও ১৯০৬ সালেও অলিম্পিকে ফুটবলকে প্রদর্শনী খেলা হিসেবে রাখা হয়। অবশেষে ১৯০৮ সালে অলিম্পিকের খেলা হিসেবে মর্যাদা পায় ফুটবল।

ফিফা(Federation of International Football Association) এবং আইওসি’র(International Olympic Committee) মতবিরোধের কারনে ১৯৩২ সালের অলিম্পিক থেকে ফুটবলকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে তৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে’র উদ্যোগে উরুগুয়েতে ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। নানা প্রতিকুলতা পেরিয়ে প্রথম বিশ্বকাপে ১৩টি দেশ অংশ অংশ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলছে বর্তমান সময়ের বিশ্বকাপ ফুটবল।

বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশে ফুটবলের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমল থেকেই। তবে ব্রিটিশরা এই খেলাকে নিজেদের খেলা বলে সবসময় ভারতীয়দেরকে দূরে সরিয়ে রাখতো। তা সত্তেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্রীড়ানুরাগীর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ফুটবল ধীরে ধীরে এগিয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসনামলে কোলকাতায় বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ব্রিটিশরা ফুটবল খেলার জন্য ভারতীয় সেনা সদস্যদেরকে বেছে নিত। ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাদের ছাউনীতে বন্দী থেকে সেকালে ফুটবল খুব ধীর গতিতে এগিয়েছে। যেহেতু শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও খেলাধুলার বেশিরভাগই ছিল হিন্দুদের দখলে, তাই মুসলিম সম্প্রদায় এটি উপলব্ধি করে এবং মুসলমানরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে অন্যান্য বিষয়ের মত ফুটবলেও এগিয়ে নিতে জোর প্রচেষ্টা চালায়। এভাবেই এই অঞ্চলে ফুটবল খেলা বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ফুটবল বাংলাদেশে নতুন যুগে প্রবেশ করে। দ্রুতই এটি কিশোর ও যুবকদের মাঝে দারুন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

 

ভারতীয় উপমহাদেশে ফুটবল

১৮৫৪ সালে ভারতের কোন এক রাজপুরুষ ও ব্রিটিশদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি খেলার মধ্যে দিয়ে মূলত: ব্রিটিশ শাসনামলে ফুটবল তার যাত্রা শুরু করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা পুনরায় এই খেলায় মনোযোগ দেয়। ১৮৬৮ সালে কোলকাতায় এসপ্লানেড ময়দানে আরেকটি প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৭৮ সালে শুধুমাত্র ফুটবল খেলার জন্য ‘ট্রেডস ক্লাব’ নামে একটি ক্লাব গড়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে কয়েক বছরেই ভারতবর্ষে ফুটবল তার যাত্রা বেশ ভালোভাবে শুরু করে। এরই মধ্যে সরকারী ও মিশনারী স্কুলগুলোতে ফুটবল খেলা চালু হয়। ধীরে ধীরে শিক্ষিত বাঙালীর আগ্রহে ও উদ্যোগে ১৮৭৯ সালে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্সির ছাত্রদেরকে কলেজের অধ্যাপক বি ভি স্ট্যাক ফুটবলের বিভিন্ন নিয়মকানুন শিখিয়ে দেন। ঐ সময়ে কোলকাতা হেয়ার স্কুলের ছাত্র নগেন্দ্র প্রসাদ বন্ধুদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে একটি ফুটবল কিনেছিলেন। আসলে সেই ফুটবলটি দিয়েই প্রেসিডেন্সিতে যাত্রা শুরু করেছিল আধুনিক ভারতের ফুটবল। এই নগেন্দ্র প্রসাদের চেষ্টাতেই ১৮৮৪ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়েলিংটন ক্লাব’ এবং ১৮৮৫ সালে ‘শোভাবাজার ক্লাব’। প্রায় ১০ বছর পর ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Indian Football Association (IFA) বা ভারতবর্ষ ফুটবল এসোসিয়েশন। মূলত ১৮৯৪ সাল থেকেই নিয়মানুযায়ী ফুটবল খেলার যাত্রা শুরু।

ইংরেজদের শাসন শোষণ ও ভারতীয়দের আধিপত্যের মুখে মুসলমানরা নিজেদের অসহায় অবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে লাগলো। নবাবজাদা আজিজুল ইসলাম ফুটবলের জনপ্রিয়তা দেখে মুসলিম সমাজকে ফুটবলে আগ্রহী করার চিন্তা করেন। তাই তার তত্ত্বাবধানে ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জুবিলী ক্লাব’। এটি ‘ক্রিসেন্ট ক্লাব’ ও ‘হামিদিয়া ক্লাব’ নামে দু’বার নাম পরিবর্তনের পর সর্বশেষ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব নাম ধারণ করে। এই ক্লাবটি মুসলিম শিবিরকে ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এই সময় থেকেই পূর্ব বাংলার ফুটবলের জাগরণ শুরু হয়। তবে পরবর্তী প্রায় তিন দশক ক্লাবটি নানা প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়েই পথ পাড়ি দিয়েছে।

গত শতাব্দীর বিশের দশক থেকেই নানা রাজনৈতিক আন্দোলন ও নিজ আবাসভূমির দাবিতে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় ব্যাপক সোচ্চার ছিল। তরুণ সমাজের মধ্যে অধিকারের দাবী তোলা এবং তা প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র বাসনা তৈরি হয়। ঠিক সেসময় কোলকাতার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব কোলকাতা ফুটবল লীগে অংশগ্রহন করে এবং চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়। এখান থেকেই শুরু হয় মোহামেডানের জয়ের ইতিহাস। ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু করে টানা পাঁচ বছর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এই বিজয় বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ফুটবলের নবজাগরণের সূচনা করে যা মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে অনেক বেশি বেগবান করে। মোহামেডানের ধারাবাহিক ও অভূতপূর্ব সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে মৌলবাদী হিন্দু সম্প্রদায় নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মোহামেডান ক্লাবটিকে ‘ইংরেজ বিরোধী ঘাটি’ হিসেবে প্রচার করে, যার ফলশ্রুতিতে ইংরেজরা এখানকার খেলোয়ার ও কর্মকর্তাদের উপর দমন পীড়ন অব্যাহত রাখে। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের ফুটবল জাগরণে মোহামেডান ক্লাবের অবদান একটি গৌরবময় ইতিহাস।

 

স্বাধীন বাংলাদেশে ফুটবল

স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবলেরও রয়েছে একটি সোনালী অতীত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ নামে একটি দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য সরাসরি কাজ করে। উল্লেখ্য পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই যুদ্ধকালীন প্রথম কোন ফুটবল দল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় Bangladesh Football Federation (BFA) যা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের ২৬ জুলাই স্বাধীন দেশের খেলোয়াড়’রা মালয়েশিয়ায় মারদেকা টুর্নামেন্টে প্রথম থাইল্যান্ডের মুখোমুখি হয়। এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ফুটবল দলের প্রথম কোন অফিসিয়াল সফর। বাংলাদেশ ফুটবল ১৯৭৩ সালে এশিয়া ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং ১৯৭৪ সালে ফিফার সদস্য পদ লাভ করে। সদস্য পদ লাভের পর বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল ১৯৮০ সালে এশিয়া কাপ এবং ১৯৮৬ সাল থেকে ফিফা বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে অংশগ্রহন করেছিল। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে বাংলাদেশ শুভসূচনা করলেও পরে তা ধরে রাখতে পারেনি। এশিয়া কাপেও বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়।

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল দল বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহন করলেও তারা আশানুরুপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ‘দক্ষিণ এশিয়া গেমসে’ প্রথমবারের মত কোন পদক অর্জন করে বাংলাদেশ ফুটবল দল। সেবার তারা সিলভার পদক অর্জন করেছিল। ১৯৯৯ সালে সাফ গোল্ডকাপে বাংলাদেশ ফাইনালে কোয়ালিফাই হয়েছিল, কিন্তু ভারতের কাছে পরাজিত হয়ে সিলভার পদকেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাংলাদেশকে। অবশেষে ১৯৯৯ সালের দক্ষিণ এশিয়া কাপে বাংলাদেশ প্রথম কোন টুর্নামেন্ট জয়ের ইতহিাস রচনা করে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব লাভ করে বাংলাদেশ ফুটবল দল। এরপর ২০০৩ সালে ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ’-এ বাংলাদেশ স্বাগতিক দেশ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়। পুনরায় স্বাগতিক দেশ হিসেবে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ফুটবলে তাদের দ্বিতীয় স্বর্ণপদক লাভ করে। তবে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ ফুটবল দলের মুকুটে নতুন কোন সাফল্যের পালক যুক্ত হয়নি। ২০১৫ সালে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টটি ফিফার অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়, যা বাংলাদেশের ফুটবলের এগিয়ে যাওয়ার পথে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

 

বর্তমান বাংলাদেশ ফুটবল

বাংলাদেশ এ পর্যন্ত সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ, দক্ষিণ এশিয়া গেমস, এএফসি প্রেসিডেন্ট কাপ, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত শেখ কামাল আর্ন্তজাতিক ক্লাব কাপ এ অংশগ্রহন করেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হিসেবে জেমি ডে কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে দেশের ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে। কাজী সালাহউদ্দিনের মত একজন কিংবদন্তী খেলোয়ার বাংলাদেশের ফুটবলকে পথ দেখিয়ে চলতে সাহায্য করছেন। তবে ২০১৬ সালের পর প্রায় দেড় বছর বাংলাদেশ ফুটবল দল কোন আর্ন্তজাতিক ম্যাচে অংশগ্রহন করেনি-যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তবে পূর্বের তুলনায় বাংলাদেশ ফুটবলের যেটি দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে সেটি হল খেলোয়ারদের ফিটনেস। আর একটি বিষয়ে ফুটবল উন্নতি করেছে সেটি হল পুরো নব্বই মিনিট কিছুটা ছন্দে খেলা। তবে এটাও ঠিক নব্বইয়ের দশকের তুলনায় ফিফা র‍্যা​ঙ্কিং-এ বাংলাদেশ ফুটবল দল অনেকটাই পিছিয়েছে। ২০১৯ সালের ফিফা র‍্যা​ঙ্কিং অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২০১ নম্বরে।

ফুটবল খেলার ক্রমশ নিম্নমান এবং ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নতি ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাটার অন্যতম কারন। পাশাপাশি ফুটবলে কার্যকরী বিনিযোগ হ্রাস, ফুটবলের সাথে জড়িত সকল বিষয়ের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা, ক্লাবগুলোর বাণিজ্যিক চিন্তা, সঠিক ও পেশাগত নেতৃত্বের অভাব, বিদেশী খেলোয়াড়দের প্রতি ক্লাবগুলোর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সহ নতুন খেলোয়ার তৈরি না হওয়া, দুর্নীতি ইত্যাদি নানা কারনে ফুটবল তার শক্ত অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছে। বাংলাদেশে ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে খেলার মাঠের উন্নতি থেকে শুরু করে খেলোয়ারদের আর্ন্তজাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ নানাবিধ সংস্কার বর্তমান ফুটবলের জন্য অত্যন্ত জরুরী। এই উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই নানাবিধ প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। গৃহীত উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ফুটবলের কাংখিত উন্নতি সম্ভব। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগগুলোর দৃশ্যমান উন্নতি দেশের জনগণ দেখতে পাবে -এটাই সকলের প্রত্যাশা।

 

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ

উপমহাদেশীয় অঞ্চলের দলগুলোর মধ্যে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের অন্যতম মাধ্যম হল সাফ গেমস এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল। এখন পর্যন্ত দুটি টুর্নামেন্টেই একবার করে শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এখন পর্যন্ত একমাত্র শিরোপার দেখা পেয়েছি আমরা। ঐ টুর্নামেন্ট জয়ের পথেই সেমিফাইনালে শিরোপার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। দিন শেষে বাংলাদেশ ভারতকে বাড়ী ফেরার টিকেট ধরিয়ে শিরোপার পথে এগিয়ে যায় আর এক ধাপ। এই ম্যাচটি যারা দেখেছেন তারা চোখ বুঁজে স্বীকার করেন এটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি ম্যাচ।

টুর্নামেন্টে নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিতে ওঠে বাংলাদেশ। অপরদিকে নিজ গ্রুপে রানার্স-আপ হয় ভারত। ফলে যে ম্যাচকে সম্ভাব্য ফাইনাল ধরে রেখেছিলেন ফুটবল বোদ্ধারা সেটির দেখা সেমিতেই পেয়ে যান তাঁরা। আর দু-দলের খেলোয়াড়েরাও হতাশ করেননি। চমৎকার ফুটবল নৈপূণ্যে দর্শকদের উপহার দিয়েছেন সারা জীবন বলে বেড়ানোর মত স্মৃতি।

১৮ জানুয়ারী ২০০৩। মাঠে গড়াল খেলা। কিক-অফের পর থেকেই দুই দলের আক্রমণ শুরু। তখনকার বাংলাদেশী কোচ জর্জ কোটান ভারতবধের উদ্দেশ্যে ৩-৫-২ কৌশলে “পাস অ্যান্ড রান” পদ্ধতিতে খেলা শুরু করেন। অর্থাৎ দুই উইংব্যাক হাসান-আল-মামুন এবং পারভেজ বাবু ক্রমাগত ওভারল্যাপ করে উঠে আক্রমনে সহায়তা দিতে লাগলেন। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে তিন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সুজন এবং অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মন। সেন্টার মিডফিল্ডে আরিফ খান জয় এবং মতিউর মুন্না। যার মধ্যে জয় খেলেন নীচে ডিফেন্ডারদের সামনে আস্থার দেওয়াল হয়ে আর মুন্না কিছুটা উপরে আক্রমণভাগের সাথে লিঙ্ক হিসেবে। আর প্লে-মেকার হিসেবে আরমান মিয়া। স্ট্রাইকার হিসেবে ৯৯ সাফ গেমসের ফাইনাল জেতানো দেশের ইতিহাসের সেরা আলফাজ আহমেদ এবং তৎকালীন সময়ের সেরা স্ট্রাইকার রোকনুজ্জামান কাঞ্চন। গোলকিপার ছিলেন আমিনুল হক।

পরিকল্পনা খুব দ্রুতই কাজে লাগাতে শুরু করলো বাংলাদেশ। শুরু থেকেই আক্রমণে তারা। মাত্র পাঁচ মিনিট বয়স যখন ম্যাচের তখনি কর্নার পায় বাংলাদেশ। আরমানের নেওয়া কর্নার লাফিয়ে উঠে চমৎকার হেড করেছিলেন বটে কাঞ্চন। তবে ঠিক যখন গোলে ঢুকতে যাবে বল,তখনি গোল লাইন থেকে ক্লিয়ার করেন ভারতের ক্লাইম্যাক্স লরেন্স। সুবর্ণ সুযোগ মিসে সবাই কিছুটা হতাশ হলেও খুব শীঘ্রই সেটা কাটিয়ে ওঠেন তারা। আবারো আক্রমণ চালাতে থাকেন একের পর এক। তবে ভারতের ডিফেন্সিভ ওয়ালে গিয়ে সেগুলো বাধা পেয়ে যাচ্ছিলো। এর মধ্যে ভারতও শুরুর হতবিহবল ভাব কাটিয়ে উঠে খেলায় ফিরতে শুরু করে। দুই দুইবার বেশ ভালো সুযোগও সৃষ্টি করে তারা। তবে দুইবারই পল আঞ্চেরির শট ফিরিয়ে দেন নির্ভরতার প্রতীক আমিনুল। এভাবেই শেষ হয় প্রথমার্ধ।

টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোতে দেখা গিয়েছিলো দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল পালটে ৫-৩-২ ফর্মেশনে চলে যেত বাংলাদেশ। অর্থাৎ হাসান-আল-মামুন ও পারভেজ বাবু তখন ডিফেন্সিভ খেলতেন বেশ কিছুটা আর মূল খেলাটা তৈরী হত মাঝমাঠে মুন্না ও আরমানের সহায়তায়। মূলত এদেশী খেলোয়াড়েরা পুরো সমানতালে ৯০ মিনিট হয়ত খেলতে পারবেনা এমন ধারনা থেকেই কোচের এই স্ট্র্যাটেজী। তবে এই ম্যাচে এই কৌশল পালটান কোচ। এর মূল কারণ ছিলো দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে ভারতের বল নিজেদের পায়ে রাখার চেষ্টা। কাজেই ডিফেন্সিভ না হয়ে বরং অ্যাটাকে গেলেন কোচ। লেফট-ব্যাক পারভেজ বাবুকে তুলে স্ট্রাইকার আরিফুল কবির ফরহাদকে নামালেন ৫৬ মিনিটের মাথায়। তবুও আক্রমণগুলো বাংলাদেশের বিপক্ষেই হচ্ছিলো বেশী। বল পজেশনেও এগিয়ে ছিলো ভারত।তবে তিন সেন্টার-ব্যাক আস্থার দারুণ প্রতিদান দিচ্ছিলেন। বাংলাদেশের যা আক্রমণ ছিলো তা প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ থার্ডে গিয়ে আর পূর্ণতা পাচ্ছিলো না।

৭৭ মিনিটে কর্ণার পায় বাংলাদেশ। বিশ্বস্ত আরমান এগিয়ে যান কর্নার নিতে। মাপা কর্নার সেকেন্ড পোস্টে। কাঞ্চন লাফিয়ে উঠে হেড করলেন। অনেকটা প্রথমার্ধের সেই গোল লাইন সেভের কার্বন কপি বলা যায়। তবে এবার আর হৃদয় ভাঙলো না খেলোয়াড়দের। মাঠ ও মাঠের বাইরে অসংখ্য দর্শককে আনন্দে ভাসিয়ে বল জালে। গোওওওল!!! খেলার ১৩ মিনিট বাকী থাকতে এমন গোল। ফাইনাল দেখতে শুরু করলো গোটা দেশ এবং ভুলটা করলো।

ফাইনাল প্রায় নিশ্চিত ভেবে খেলোয়াড়েরাও মনে হয় কিছুটা গাছাড়া মনোভাব দেখাতে শুরু করেন। আর এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে ভারত। এই গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই বাংলাদেশের ডি-বক্সের কিছুটা বাইরে বল পান ভারতের আলভিটো ডি চুনহা। আশেপাশে পাস দেবেন তেমন কেউ নেই। ডিফেন্ডার ট্যাকল করতে কিছুটা গড়িমসি করেন। গোলরক্ষক আমিনুলও কেন জানি পোস্ট থেকে কিছুটা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। আচমকা শট নেন আলভিটো। আমিনুলের মাথার উপর দিয়ে বল জালে। খেলায় সমতা। টুর্নামেন্টে সেই প্রথম বাংলাদেশের জালে বল। এর আগে ৩৫১ মিনিট নিজের পোস্ট অক্ষত রাখলেও ক্ষণিকের ভুলে গোল খেয়ে বসলেন আমিনুল। এই গোলে কিছুটা ভড়কে যায় বাংলাদেশ।

এই ভড়কে যাওয়ার সুযোগ নিতে ভারতও পিছপা নয়। কিছুক্ষণ পরেই বাম প্রান্ত থেকে ভারতের এক খেলোয়াড় ক্রস করেন। এক স্ট্রাইকার অভিষেক যাদব সেটা বুকে রিসিভ করার পর বাংলাদেশী ডিফেন্ডারদের এলোমেলো অবস্থার কারণে বল গিয়ে পড়ে ভারতের বিখ্যাত স্ট্রাইকার আই,এম, বিজয়নের পায়ে। ছোট ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে বিজয়নের শট চলে গেল ক্রসবারের ওপর দিয়ে। অল্পের জন্যে বেঁচে গেলো বাংলাদেশ। বাকী সময়টুকু টেনশনের! একদিকে হঠাত ভঙ্গুর হয়ে পড়া ডিফেন্স অপরদিকে আচমকা গোলে মনোবলে ফাটল। কোনোমতে কাটিয়ে খেলা অতিরিক্ত সময়ে নিলো বাংলাদেশ।

শুরু হয় অতিরিক্ত সময়ের খেলা। তখন পর্যন্ত গোল্ডেন গোল নিয়ম চালু ছিলো। অর্থাৎ এই ৩০ মিনিটে যে দল আগে গোল করবে তারাই জয়ী। একদল আক্রমণে উঠলেই অপর দলের সমর্থকদের বুক কাঁপে, এই বুঝি সব শেষ! অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই কোচ দুটি পরিবর্তন আনেন। দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হাসান-আল-মামুন আর আলফাজ আহমেদকে বসিয়ে মাঠে নামান ফিরোজ মাহমুদ হোসেন টিটু আর মেহেদী হাসান উজ্জ্বলকে। তবে তারা নিজেদের কোচের এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা প্রমাণের কোনো সুযোগ পাননি। কারণ গোল্ডেন গোলের টেনশনে যে এদেশের মানুষকে খুব বেশীক্ষণ থাকতে হয়নি!

ম্যাচের বয়স তখন অতিরিক্ত সময়ের আট মিনিট। মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে মতিউর মুন্নার দৌড় এবং কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে প্রায় বিশ মিটার দূর থেকে আচমকা জোরালো লং-রেঞ্জ শট। পুরো ভারতীয় দলকে হতবাক করে এবং এদেশের আপামর মানুষকে আনন্দে ভাসিয়ে বল গোল লাইন অতিক্রম করলো। গোল্ডেন গোল! এই নামটির একেবারে সার্থক উদাহরণ যেন গোলটি! সত্যিই এদেশের ফুটবলের শ্রেষ্ঠ সাফল্যের পেছনে এই গোলটির ভূমিকা স্বর্ণের চেয়েও দামী!

সাফ র‍্যাকিং এর শীর্ষে থাকা ভারতকে হারানোর পরে ফাইনালে বাকী থাকলো মালদ্বীপ। সেই মালদ্বীপকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নও হল বাংলাদেশ। কিন্তু নিঃসন্দেহে গুরুত্ব এবং খেলার মান বিবেচনা করলে এটিই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সেরা ম্যাচ ছিলো।

এরপরে এগারো বছর কেটে গেছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিটা তখন থেকে আজো অধরাই রয়ে গেছে। মনে সবার ঠিকই বিশ্বাস, আবার কোনো একদিন আমরা জিতবোই। হয়ত এমনি কোনো নখ কামড়ানো, শ্বাসরুদ্ধকর একটা ম্যাচ জিতেই হবে সেই ট্রফি উদযাপন।