free hit counter
খেলা

এবার নজর ফুটবলে

ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য এসেছে কয়েক দশকের চেষ্টার ফলে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলপ্রেমী হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ খাতটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মাঝেমধ্যে একটু আধটু সাফল্য আসলেও ফুটবলে দীর্ঘদিন খরা চলে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সময়কে বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালি দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়। সে সময় ফুটবল বাংলাদেশের অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিল। তখল স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক ছিল। 

নব্বইয়ের দশকের পর হতে বিভিন্ন কারণে ফুটবলের ঐতিহ্য ম্লান হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে বাংলাদেশের র্যাংকিং ২১১ এর মধ্যে ১৯২ এ ঠেকেছে। এ অবস্হা থেকে উত্তরণে এখন সরকার উদ্যোগী হয়েছে। বিশ্ব মানচিত্রে একটি বিশেষ জায়গা করে নিতে এবার সরকার উদ্যোগী হয়েছে। সংগঠকদের নানা প্রচেষ্টায় সরকার ফুটবল খাতের উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ফুটবল মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। ফুটবল সংগঠকরা জানিয়েছেন, সরকারের পাশাপাশি ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্হা ফিফাও বাংলাদেশকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক মাসের তোড়জোড়ে দেখা যাচ্ছে—সরকার প্রধান এখন ফুটবলের বিষয়ে সিরিয়াস।

ফুটবলের জন্য এলিট একাডেমি

ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য প্রশিক্ষণ একটি বড় বিষয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের জন্য যে ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রয়োজন তা এতদিন ছিল না। এ তাড়না থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এলিট একাডেমি তৈরি করার কথা মাথায় আসে। 



বাফুফের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক এর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এই এলিট একাডেমি গঠন করা হয়। ইত্তেফাককে তিনি জানান, রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়ামে এ একাডেমিতে ৪২ জন ফুটবলারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এদের সবার বয়স ১৭ বছরের নিচে। সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধা সংবলিত এ একাডেমিতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সারা দেশের ৬৪ জেলা থেকে খেলোয়াড় নির্বাচন করেন কোচরা। এখানে এলে তাদের খাওয়া দাওয়াসহ সবকিছু একাডেমি বহন করে। 

আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ফল পেতে শুরু করেছি। ফুটবলারদের দক্ষতা বাড়ছে। ভারতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বছরের টুর্নামেন্টের জন্য ৩৭ জন ফুটবলার ডাক পেয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জন ফুটবলার এলিট একাডেমির। আশা করা যাচ্ছে মূল দলে একাডেমির সাত আট জন খেলোয়াড় থাকবেন। তিনি আরো জানান, একাডেমির খেলোয়াড়রা শুধু জাতীয় দল নয়, বিভিন্ন লিগের খেলায়ও অংশ নেবেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের নামকরা দলগুলো তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে নেবে। ইতিমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

জাতীয় দল বনাম লিগ

ফুটবল খেলার মান উন্নয়নে জাতীয় এবং লিগের খেলার মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ রয়েছে। জাতীয় দলে ভালো করলে সেটা দেশের জন্য গর্ব—এমন বোধে এখনো খেলোয়াড়দের মাঝে তৈরি হয়নি বলে একজন সংগঠন জানিয়েছেন। তিনি জানান, খেলোয়াড়দের কথায় যুক্তি আছে। জাতীয় দলে খেললে তারা খুব বেশি পয়সা পায় না। কিন্তু লিগের খেলায় তাদের পয়সা আসে। 

এ বিষয়ে জিগ্যেস করা হলে বাফুফের একজন কর্মকর্তা বলেন, ক্রিকেটারা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মাসিক বেতন পান। কিন্তু ফুটবলে সেটা নেই। যে কারণে ফুটবলাররা জাতীয় দলে মনপ্রাণ দিয়ে খেলেন না। তারা ভাবেন জাতীয় দলে খেলতে গিয়ে যদি তারা ইনজুরিতে পড়েন তাহলে তার আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য অনেকেই সিরিয়াসলি খেলতে চান না। দুই একটি ক্লাব ছাড়া বাকিরা আর্থিক অনটনের মধ্যে রয়েছে। বাফুফে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয় নাই। এখন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এ পরিস্হিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি ফুটবলারদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে মাসিক বেতন নির্ধারণের ওপর জোর দেন। এক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পাঁচ বছরের প্রকল্প কাজে দেবে বলে তিনি জানান।

সংগঠকদের ইচ্ছা অনিচ্ছা

সরকার ফুটবলের উন্নয়নের জন্য আন্তরিক। এ খাতের উন্নয়নের জন্য সবকিছু করার ইচ্ছে আছে সরকারের। কিন্তু বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অতীতে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এবার বাফুফে থেকে প্রস্তাব যাবার পর সেটিই গ্রহণ করেছে সরকার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সংগঠক জানান, বাফুফের কমিটিতে অনেকে আসেন তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। বাফুফের কমিটিতে থেকে অনেকে মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। কিন্তু ফুটবলের জন্য তারা কিছু্ই করেননি। 



আরেকজন সংগঠন বলেন, ফুটবলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন কাজ করবেন—এমন লোক নেই। যারা এখানে কর্মকর্তা হন তারা ব্যবসা বাণিজ্য এবং রাজনীতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে ফুটবলকে সময় দেওয়ার মতো অবস্হায় তারা যেতে পারেন না। তারা যদি জায়গা ছেড়ে দিয়ে অন্যদের জায়গা করে দেয় তাহলে ফুটবল এগিয়ে যাবে।

৪৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প: সোজা হবে ফুটবলের মেরুদণ্ড

নানান সময়ে ফুটবলের উন্নয়নের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি শক্তিশালী প্রকল্প গ্রহণ করে দীর্ঘ মেয়াদে ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি হয়নি। এবার সে কাজটি হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ ফুটবলের পুনর্জাগরণসহ শক্তিশালী জাতীয় ফুটবল দল গঠনের লক্ষ্যে বছরব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতাসমূহ আয়োজন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং বাফুফে শক্তিশালীকরণ’। 

পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের পুরো অর্থই ব্যয় করবে সরকার। ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ফুটবল অনন্য উচ্চতায় যাবে। তিনি জানান, এ প্রকল্পের আওতায় বাফুফে প্রতি বছর ১১টি পেশাদার ফুটবল লিগ আয়োজন করবে। বাংলাদেশ ফুটবল দলের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্পসহ ১৫টি বিদেশি প্র্যাকটিস ম্যাচ আয়োজন করা হবে। প্রকল্পের অর্থ দিয়ে দেশের তিনটি জনপ্রিয় স্হানে তিনটি ফুটবল একাডেমি নির্মাণের কথাও জানান তিনি। 

মানিক জানান, নতুন প্রকল্পে নারী ফুটবলের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবলের প্রশিক্ষণে একটি ক্যাম্প স্হাপন করা হবে। বিদেশে প্রতি বছর নারী ফুটবলারদের জন্য পাঁচটি প্রাকটিস ম্যাচ আয়োজন করা ছাড়াও প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরির উদ্দেশ্যে তিনটি নারী ফুটবল লিগের আয়োজন করা হবে। এছাড়া এ প্রকল্পে ৮টি বিভাগে ৬৪টি জেলাভিত্তিক ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং বিভাগ ও জেলাভিত্তিক প্রতিভা অন্বেষণ ও তিনটি বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজন করা হবে। আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক জানান, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ফিফা র‍্যাংকিং-এ বাংলাদেশ উন্নতি করবে। 

Source link