free hit counter
খেলা

আফতাব আহমেদ – বাংলাদেশের প্রথম মারকুটে ব্যাটসম্যান

যদি প্রশ্ন করা হয় ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম সুপারস্টার কে?

তাহলে অবশ্যই উত্তর হবে মোহাম্মদ আশরাফুল।

ঠিক এভাবে যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে আমাদের জেনারেশনের কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন কোন ক্রিকেটার?

এক্ষেত্রে অবশ্যই উত্তরটি হবে আফতাব… আফতাব আহমেদ চৌধুরী।

২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের মহানায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল! কিন্তু সেই জয় ছিনিয়ে আনতে শেষের দিকে বাংলাদেশের আরেকজন নায়কের বড্ড প্রয়োজন ছিলো, আফতাব আহমেদই সেদিন হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সেই নায়ক। লাস্ট ওভারে জেসন গিলেস্পির বলে সেই ছক্কা বা উইনিং রান, চোখ বন্ধ করলেই সেখানে ভেসে উঠে ১৯ বছর বয়সী আফতাব আহমেদকে।

মারকুটে এ ব্যাটসম্যানের জন্ম ১০ নভেম্বর ১৯৮৫ চট্টগ্রামে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পড়েছেন সেন্ট ম্যারি’স স্কুলে। ছোটবেলায় ক্রিকেটকে কিন্তু তিনি এতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। এমনকি বন্ধুবান্ধব ছেড়ে যেতে হবে বলে আসতে চাননি বিকেএসপিতেও। কিন্তু বাবা ছিলেন কট্টর ক্রীড়াসমর্থক। শেষমেশ বাবার জোরাজুরিতেই তার সিরিয়াসলি ক্রিকেটের জগতে পদার্পণ। যদিও বাবা তার জাতীয় দলে যোগদান দেখে যেতে পারেননি। বাবাকে হারান ‘৯৯ বিশ্বকাপের সময়।

ক্যারিয়ারের গৌরবোজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত

অল্পতেই নির্বাচকদের নজরে আসেন তিনি, খেলেন ২০০২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। আত্মবিশ্বাসী মারকুটে ব্যাটিং-এ নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি। ২০০৪ এই ডাক পান টেস্ট স্কোয়াডে। প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে অভিষেক ঘটে তার। চট্টগ্রাম এম. এ. আজিজ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে যায় ইনিংস ও ১০১ রানে। আফতাবের ব্যাট থেকে ম্যাচে তার একমাত্র ইনিংসে আসে ৩৯ বলে ২০ রান।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ প্রথম ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলতে যায়। তার ব্যাটে ক্যারিয়ারের প্রথম ও একমাত্র টেস্ট হাফ সেঞ্চুরিটি আসে দলের জন্য হতাশাজনক এই সিরিজেই। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তার অপরাজিত ৮২ রানে ভর করে বাংলাদেশ ইনিংসে সংগ্রহ করে ৩১৬ রান।

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার অভিষেক ২০০৪ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। ৪ মার্চ ইংল্যান্ডের মাটিতে অভিষেক ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শন পোলকের বলে পেছনে মার্ক বাউচারের হাতে ক্যাচ দিয়ে শুন্য রানে সাজঘরে ফিরে যান তিনি। ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরে যায় ৯ উইকেটে।

আফতাব আহমেদের মেইডেন ওডিআই হাফ সেঞ্চুরিটা “ঐতিহাসিক”ই বলতে হয়। কারণ বাংলাদেশও যে সেদিন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে শততম ম্যাচ খেলতে নেমেছিল! দিনটি ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪। প্রতিপক্ষ ভারত, ভেনু বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকা। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। ব্যাট হাতে তিনি করেন ১২৪ বলে ৬৭ রান।

উল্লেখ্য, খালেদ মাসুদ পাইলটের নেতৃত্বে এই ম্যাচেই বাংলাদেশ প্রথম ভারতের বিপক্ষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে! বাংলাদেশ জিতে যায় ১৫ রানে!

২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ প্রথম জয় পায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেখানে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিটির কথা কার না মনে আছে? আফতাব আহমেদের ব্যাটও কিন্তু সেদিন জ্বলে উঠেছিল। জেসন গিলেস্পির করা শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে আফতাব আহমেদই তুলে নেন উইনিং রানটি। ব্যাট হাতে তিনি সেদিন করেন ২৮ বলে ২১ রান। জয়ের মুহূর্তে অন্য প্রান্তে স্ট্রাইক আগলে ছিলেন আরেক কিংবদন্তী স্পিনার মোহাম্মদ রফিক। বাংলাদেশ তুলে নেয় ৫ উইকেটের জয়।
এমনি বাংলাদেশ দলের বেশ কয়েকটি জয়ের সাক্ষী ছিলেন এই খেলোয়াড়।

বল হাতেও তার পারদর্শিতা নেহায়েতই কম নয়! কনিষ্ঠতম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় কিন্তু তাসকিন আহমেদ বা মুস্তাফিজুর রহমান নন, আফতাব আহমেদই উপরে!

ঘটনা ২০০৪ এর ৫ নভেম্বরের। ভেনু ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আফতাব ব্যাট হাতে দ্রুত ফিরে গেলেও বল হাতে ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রান দিয়ে তুলে নেন ৫ উইকেট। তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৬১ দিন! দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৩২ বল হাতে রেখে ম্যাচটি ৭ উইকেটে জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড।

ক্যারিয়ারের ইতিকথা

সব গল্পের শেষটা ভাল হয়না। এ গল্পের নায়ক আফতাব আহমেদেরও ক্যারিয়ারের শেষাংশটা বিশেষ সুখকর নয়। ২০০৮ সালে বিতর্কিত ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) -এ পাড়ি জমান বাংলাদেশের ১৪ ক্রিকেটার। হাবিবুল বাশার, শাহরিয়ার নাফিস, অলোক কাপালি, মোহাম্মদ রফিক, তাপস বৈশ্য, প্রমুখ তারকা ক্রিকেটারের সাথে যোগ দেন আফতাব আহমেদও। অনুমতি ছাড়া সেখানে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে।

আইসিএলে ঢাকা ওয়ারিয়রস দলের হয়ে একটি মৌসুম খেলার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বিসিবি তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফিরে এসে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ডাক পান। তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ২, ৪, ৪৬। ৮০ বলে ৪৬ রানের ইনিংসটিই ছিল লাল-সবুজের জার্সি গায়ে তার সর্বশেষ ওডিআই ইনিংস। সর্বশেষ টেস্টও খেলেন এই ইংল্যান্ড সিরিজেই। এরপর ২০১০ সালের ৫ মে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে শেষবার মাঠে নামেন এই অলরাউন্ডার।

অনেক দিন দলের বাইরে থাকায় ব্যাটে মরচে ধরে গিয়েছিল। ঠিক আগের মত মারকুটে ফর্মটা ফিরে পাচ্ছিলেন না, নতুন নতুন ট্যালেন্টের ভিরে জাতীয় দলের একাদশেও জায়গা মিলছিল না। ২০১৪ এর আগস্টে তিনি ২০১৪-১৫ মৌসুম শেষে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেবার ঘোষণা দেন। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে খেলে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
স্বল্পদৈর্ঘ্যের ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আফতাব আহমেদ খেলেছেন ৮৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ, খেলেছেন ১৬টি টেস্ট ও ১১টি টি২০।

পেশাদার ক্রিকেটারের পাঠ চুকিয়ে আফতাব আহমেদ আছেন এখন কোচের ভূমিকায়। খুলেছেন আফতাব আহমেদ ক্রিকেট একাডেমী, সেখানে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোরদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

ঘরোয়া লীগে ৩ বছর ছিলেন মোহামেডানের সহকারী কোচ। তারপর ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে লেজেন্ডস অব রূপগঞ্জের হেড কোচের দায়িত্ব নিয়ে প্রথমবারেই পেয়েছেন চমকপ্রদ সাফল্য! নেট রান রেটে পিছিয়ে পড়ে রূপগঞ্জ লীগে রানার্সআপ হয়। জাতীয় ক্রিকেট লীগে পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব।

দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত টি১০ লীগে বাংলা টাইগার্স টিমের হেড কোচের দায়িত্ব পেয়ে ক্রিকেটমহলে সারা ফেলে দেন।

৯৭ নাম্বার জার্সিধারী সেই ক্রিকেটার, হেলমেট খুললেই যার মাথায় দেখা যেতো দেশের জাতীয় পতাকা বাঁধা, আমাদের সেই আফতাব আহমেদের জন্য রইলো শুভকামনা…