free hit counter
ইসলাম

জেনে নিন ইসলামের মৌলিক পাঁচ ভিত্তি

ইসলামের মূল পাঁচটি ভিত্তি রয়েছে। প্রতিটি মুসলমানের ওপর সামর্থ্যরে ভিত্তিতে এ পাঁচটি কাজ করা ফরজ।

প্রিয়নবী সা. বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি : আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই, হজরত মুহম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, সালাত (নামাজ) কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, বায়তুল্লাহর হজ করা এবং মাহে রমজানে রোযা রাখা (বোখারী ও মুসলিম)।

 

ইসলামের প্রথম স্তম্ভ কালেমা:

কালেমা শাহাদাত বলতে মূলত: এখানে বুঝানো হয়েছে কালেমায়ে শাহাদাত মুখে বলা (সাক্ষ্য দেওয়া) ও অন্তরে বিশ্বাস করা (বিশ্বাস)৷ এই বিশ্বাসকে বলা হয় “ঈমান”৷কালেমা শাহাদত হলো

اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَه’ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه’ وَرَسُوْلُه’

উচ্চারণ: “আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।”

অনুবাদ: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই । আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং তার প্রেরিত রাসূল।”

 

ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ ” সালাত (নামাজ) “

এ পাঁচ ভিত্তির দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে সালাত তথা নামাজ। রাসুলে করীম সা. বলেছেন যে, সালাত হলো দীনের স্তম্ভ। কুরআন মজীদে একশতেরও বেশি জায়গায় নামাজ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এবং বিভিন্ন স্থানে নামাজের বিভিন্ন নামকরণও করা হয়েছে। যেমন, দু’আ, যিকির, তাসবিহ, ইনাবাহ। দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের হুকুম রয়েছে। দুনিয়ার বুকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য।

প্রতি ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে কয়েক মিনিট সময়ের দরকার হয়। এ সময়ে নিজেকে যাবতীয় স্বার্থাদির চিন্তা থেকে বিরত রেখে একাগ্র চিত্তে আল্লাহর দিকে গভীর মনোনিবেশ করতে হয়। তাকে সালাত আদায় করতে হয় স্রষ্টা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নজির হিসাবে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নর ও নারীর জন্য সালাত আদায় করা ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার যোহরের সালাতের স্থলে জুম’আর নামাজ মসজিদে জামাতবদ্ধ হয়ে আদায় করতে হয়। সাপ্তাহিক এই সমাবেশে অত্যন্ত ভাবগম্ভীরতার সঙ্গে সালাত আদায় করা হয়, সালাতের পূর্বে স্থানীয় ইমাম খুৎবা (ভাষণ) দেন।

সালাতের তিনটি মৌলিক বিষয় রয়েছে : ১। আল্লাহর মহিমা ও কুদরতের কথা মনে রেখে একাগ্রচিত্তে তাকে হাজির-নাজির জানা। ২। বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা এবং উপযুক্ত শব্দে নিজের বিনম্রতা প্রকাশ করা। যেমন কারো প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াই। তাঁর দিকে মুখ ফিরাই এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ মাত্রায় মনোনিবেশ করি। কিন্তু যখন পরম শ্রদ্ধা সহকারে রুকুতে বা সিজদা করে তখন সেটা হয় আরো বড় ধরনের সম্মান প্রদর্শন। ৩। এই বিম্রতাকে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যথাযথ সুনির্দিষ্ট ভঙ্গিমার মাধ্যমে স্থাপন করা এবং ভয় ও শ্রদ্ধায় অবণত হওয়া।

সকল সৃষ্টিরাজির ইবাদত-বন্দেগীর একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে। এসব কিছুরই সমন্বয় ঘটেছে সালাতের মধ্যে। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র নিয়মিত উদয় হয়, অস্ত যায়। এ যেন সালাতের এক রাকআতের পর আরেক রাকআত আদায় করার অনুরূপ। পাহাড় পবর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সালাতের শুরুতে মু’মিন-মুসলমানদেরও ঠিক এমনিভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পশু-পাখিরা বশ্যতা স্বীকারের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে নত হয়। এর সঙ্গে সঙ্গতি রয়েছে সালাতের রুকুর। বৃক্ষরাজিকে আমরা মূলের সাহায্যে মাটি থেকে খাদ্য খাবার সংগ্রহ করতে দেখতে পাই।

 

ইসলামের তৃতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ” রোযা “

পবিত্র মাহে রমজান আমাদের দেরগোরায়।জীবনের সব গোনাহ থেকে পরিত্রাণ ও পবিত্র হওয়ার সুবর্ণ সময়। রহমত-বরকতের বারিধারা নিয়ে আবারো হাজির হয়েছে পবিত্র মাহে রমজান। গোনাহমুক্ত জীবন অর্জন করে নিজেকে জান্নাত উপযুক্ত করার আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত মাস রমজান। রমজানের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমান (কালেমা), নামাজের পরই রোযার স্থান। এটি ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। রোযার আরবি শব্দ সাওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা।ইসলামী পরিভাষায় সাওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয।

রোযা সর্ম্পকে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার”।(সূরা বাকারা,আয়াত – ১৮৩)।এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,” সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে”।(সূরা বাকারা,আয়াত – ১৮৫)

উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস এবং এ বিষয়ক অন্যান্য দলীলের আলোকে প্রমাণিত যে, রমযান মাসের রোযা রাখা ফরয, ইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা ও বিশ্বাস করাও ফরয।তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী ও জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী ও ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী ও ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

রোযা কাকে বলে – সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ,যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।

রোযার উৎপত্তি – রোজা শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বিরত থাকা’। আর আরবিতে এর নাম সাওম, বহুবচনে সিয়াম। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,কামাচার, পাপাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস ও অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকার নাম রোজা।

রোযার প্রকারভেদ – রোজা পাঁচ প্রকার।

১। ফরজ রোযা।
২। ওয়াজিব রোযা।
৩। সুন্নত রোযা
৪। মোস্তাহাব রোযা
৫। নফল রোযা

১।ফরজ রোযা – ফরজ রোযা হলো রমজান মাসের পুরো এক মাস রোজা পালন করা।

ফরজ রোজা আবার চার প্রকার –

১.১। রমযান মাসের রোযা – মাহে রমজানে আল্লাহতাআলা অধিক রহমত-বরকত নাজিল করেন এতে বান্দার কৃত গুনাহ ও পাপ জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ নিয়ামতপূর্ণ মোবারকময় মাসে পরম করুণাময়ের অপার রহমতের দরজা তাঁর নেক বান্দাদের জন্য খুলে যায়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের সামনে রমজান মাস উপস্থিত। এটা অতিশয় রহমত-বরকতপূর্ণ মাস। এ মাসের রোজা আল্লাহ তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এ মাসে বড় বড় শয়তানকে আটক করে রাখা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে লোক এ রাতের মহাকল্যাণ লাভ থেকে বঞ্চিত থাকল, সে প্রকৃতই সবকিছু থেকে বঞ্চিত।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রোযা সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন – “যখন তোমরা (রমযানের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং – ১৯০৯ এবং সহীহ মুসলিম, হাদীস নং – ১০৮০) ।

নবী করিম (সাঃ) মাহে রমজানকে রহমত, বরকত ও কল্যাণের মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর বিশেষ রহমতে পরিপূর্ণ। ঝরনাধারার মতো আল্লাহর রহমত রোজাদারদের জন্য অলক্ষে তাদের উপর বর্ষিত হতে থাকে। রমজান মাস এমন একটি মাস, যার প্রথম ১০ দিন রহমতে পরিপূর্ণ, দ্বিতীয় ১০ দিন ক্ষমা ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নামের শাস্তি থেকে নাজাত ও মুক্তির জন্য নির্ধারিত। মহানবী (সা.) বলেছেন, “এটি এমন একটি মাস, যার প্রথম ভাগে আল্লাহর রহমত, মধ্যভাগে গুনাহের মাগফিরাত এবং শেষ ভাগে দোজখের আগুন থেকে মুক্তিলাভ রয়েছে”।

রোযার নিয়ত

“নাওয়াইতু আন আছুম্মা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম”।
বাংলা অর্থ – হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ (নিয়্যত) করলাম। অতএব, তুমি আমার পক্ষ থেকে (আমার রোযা তথা পানাহার থেকে বিরত থাকাকে) কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

১.২।কাযা রোযা – কোন কারণ বশত রমজানের রোজা ভঙ্গ হয়ে গেলে তার কাযা আদায়ে রোজা।প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ প্রত্যেক মুসলমানের ওপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ। ইচ্ছাকৃত রমজানের রোজা ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ বা জঘন্য পাপ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো (গ্রহণযোগ্য) কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভাঙে, তার ওই রোজার বিপরীতে সারা জীবনের রোজাও রমজানের একটি রোজার সমমর্যাদাসম্পন্ন ও তার স্থলাভিষিক্ত হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং – ৭২৩)।

তবে অসুস্থতা বা ইসলামী শরিয়ত অনুমোদিত অন্য কোনো কারণে রোজা রাখতে না পারলে তার প্রতিবিধান রয়েছে। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পাবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে, সে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তা চান না”। (সুরা বাকারা, আয়াত – ১৮৫)।

কাজা রোযা আদায়ের বিধান –

রোজা ফরজ এমন ব্যক্তি যদি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অথবা কোনো অসুস্থতা, সফর ও ঋতুবতী হওয়ার মতো কারণে রোজা ভঙ্গ করে তার জন্য ছুটে যাওয়া রোজার সমপরিমাণ রোজা কাজা করা আবশ্যক। এই ব্যাপারে সব ইমাম একমত। কেননা আল্লাহ পরবর্তীতে সংখ্যা পূরণ করতে বলেছেন।কাজা রোজা একটির পরিবর্তে একটি অর্থাৎ রোজার কাজা হিসেবে শুধু একটি রোজাই যথেষ্ট।

এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন, “রোজা নির্দিষ্ট কিছু দিন। তাই তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ থাকে, বা সফরে থাকে, তাহলে পরে একই সংখ্যক দিন পূরণ করবে। আর যাদের জন্য রোজা রাখা ভীষণ কষ্টের, তাদের জন্য উপায় রয়েছে – তারা একই সংখ্যক দিন একজন গরিব মানুষকে খাওয়াবে। আর যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাড়তি ভালো কাজ করে, সেটা তার জন্যই কল্যাণ হবে। রোজা রাখাটাই তোমাদের জন্যই ভালো, যদি তোমরা জানতে।রমজান মাস, যখন নাজিল হয়েছিল কুর’আন —মানুষের জন্য পথনির্দেশ, পরিস্কার বাণী যা পথ দেখায় এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। তাই তোমাদের মধ্যে যে সেই মাসটি পাবে, সে যেন রোজা রাখে। আর কেউ যদি অসুস্থ থাকে, বা সফরে থাকে, তাহলে সে যেন পরে একই সংখ্যক দিন রোজা রেখে পূরণ করে নেয়। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠিনটা চান না। তিনি চান তোমরা যেন নির্ধারিত সময় পূরণ করো, তোমাদেরকে পথ দেখানোর জন্য তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো, আর যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। (সুরা বাক্বারাহ,আয়াত – ১৮৪-১৮৫) ।
এছাড়াও হাদিসে এসেছে, এক নারী আয়েশা (রা.)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করল, ঋতুমতী নারী যখন ঋতু থেকে পবিত্র হয়, তখন কি সে নামাজ কাজা করবে? তিনি বললেন, তুমি কি হারুরি গোত্রের নারী? আমরা তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ঋতুমতী হতাম এবং যখন পবিত্র হতাম, তখন আমাদের রোজা কাজা করার নির্দেশ দেওয়া হতো কিন্তু সালাত কাজা করার নির্দেশ দেওয়া হতো না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং – ২৩১৮)।পরবর্তী রমজান মাস আসার আগে যতটা দ্রুত রমজানের রোজার কাজা আদায় করতে হবে। বিনা কারণে কাজা আদায়ে বিলম্ব করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।

১.৩। কাফফারা রোযা – প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান ইচ্ছাকৃত রমজানের রোজা না রাখা মারাত্মক অপরাধ ও গুনাহের কাজ। শরিয়তের কঠোর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিনা কারণে কেউ রোজা ভঙ্গ করলে তার অবশ্যই কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব।শরিয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা সহবাসের মাধ্যমে রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে তার কাফফারা অর্থাৎ লাগাতার ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে।কাফ্ফারা রোজা আদায় করার তিনটি বিধান রয়েছে। ১. একটি রোজা ভঙ্গের জন্য একাধারে ৬০টি রোজা রাখতে হবে। কাফ্ফারা ধারাবাহিকভাবে ৬০টি রোজার মাঝে কোনো একটি ভঙ্গ হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। ২. যদি কারও জন্য ৬০টি রোজা পালন সম্ভব না হয় তাহলে সে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা খানা খাওয়াবে। অপর দিকে কেউ অসুস্থতার কারণে রোজা রাখার ক্ষমতা না থাকলে ৬০ জন ফকির, মিসকিন, গরিব বা অসহায়কে প্রতিদিন দুই বেলা করে পেটভরে খানা খাওয়াবে। ৩. একজন গোলাম বা দাসী আজাদ করে দিতে হবে।

১.৪।মান্নতের রোযা – কোনো মানত সহিহ হওয়ার জন্য এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে তা মানত হিসেবে ধর্তব্য হওয়ার জন্য কয়েকটি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। মানতকৃত বিষয়টি মৌলিক ইবাদত হতে হবে, অন্য কোনো ইবাদতের ভূমিকা বা সহায়ক নয়। যেমন – নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি মৌলিক ইবাদত। রোজার মান্নত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব।কেউ যদি আল্লাহর নামে রোযা রাখার মান্নত করে তাহলে সেই রোযা রাখা ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে কোন শর্তের ভিত্তিতে মান্নত মানলে সেই শর্ত পূরণ হওয়ার পূর্বে ওয়াজিব হয় না- শর্ত পূরণ হলেই ওয়াজিব হয়।

২। ওয়াজিব রোযা – নফল রোজা রেখে ভঙ্গ করলে পরবর্তীতে তা আদায় করা ওয়াজিব।

৩। সুন্নত রোযা – শাওয়াল মাসের ছয় রোজা ।এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম বলেছেন,”যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর এর পেছনে শাওয়াল মাসে ছয়দিন রোজা রাখল সে যেন সারা বছর রোজা রাখল”।(বর্ণনায় মুসলিম )শাওয়ালের ছয় রোজা একসাথেও রাখা যায় আবার ভিন্ন ভিন্ন ভাবেও রাখা যায়।

মহরম মাসের নয় এবং দশ তারিখে রোযা রাখা।আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা।’(বর্ণনায় তিরমিযী)।

যিলহজ্বের শুরুতে নয়দিন রোযা রাখা – হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘এই দশদিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আমলের অন্যকোনো দিবস নেই। অর্থাৎ যিলহজ্বের দশদিন। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করে বললেন, ‘এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও না? হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন,‘এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও না, কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে বের হয়ে যায় আর কোনো কিছু নিয়ে ফিরে না আসে, তবে তার কথা ভিন্ন।’(বর্ণনায় বুখারী) তবে এ দশদিনের মধ্যে, যে ব্যক্তি হজ্বরত অবস্থায় নয়, তার ক্ষেত্রে আরাফা দিবসের রোজা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আরাফা দিবস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘আরাফা দিবসের রোজা তার একবছর পূর্বের ও পরের গুনাহের কাফফারা বলে আল্লাহর কাছে আশা করি।’ (বর্ণনায় মুসলিম)

৪। মোস্তাহাব রোযা – প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩,১৫ ও ১৫ তারিখকে আইয়ামুল বিয বলে। এ তিনদিনের রাতগুলো চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত থাকে বলে এ দিনগুলোকে আইয়ামুল বিয বা শুভ্রদিন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখে, প্রতি সাপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবারে এবং কোন কোন ইমামের মতে শাওয়াল মাসে পৃথক পৃথক প্রতি সপ্তাহে দুটো করে ছয়টি রোজা রাখা মোস্তাহাব। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এক সাথে হোক কিংবা পৃথক পৃথক হোক শাওয়ালের ছয়টি রোজা মুস্তাহাব।আবদুল মালিক ইবনে মিনহাল তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আইয়ামুল বিয এর রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং বলতেন,‘এটাই হলো বছরব্যাপী রোজা রাখা।’(বর্ণনায় বুখারী)

৫। নফল রোযা – নফল রোজা দুই প্রকার; প্রথম প্রকার হলো নির্ধারিত বা নবী করিম (সা.) কর্তৃক পালনকৃত, এই প্রকার রোজা সুন্নত; দ্বিতীয় প্রকার হলো অনির্ধারিত, এগুলো মুস্তাহাব। এই উভয় প্রকার রোজাকে সাধারণভাবে নফল রোজা বলা হয়ে থাকে। মোস্তাহাব আর নফল খুব কাছাকাছির ইবাদত। সহজ অর্থে নফল হলো যা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নয় এমন ইবাদত পূণ্যের নিয়তে করা। রোজার ক্ষেত্রেও তাই। প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা -আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল উপস্থাপন করা হয়, অতএব আমি পছন্দ করি যে, আমার আমল এ অবস্থায় উপস্থাপন করা হোক যে আমি রোজাদার।’(বর্ণনায় মুসলিম)তাছাড়া – প্রতি চান্দ্রমাসের ১০, ২০ ও ৩০ তারিখ রোজা রাখলে পূর্ণ মাসের রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যাবে।

রোযা ভংগের কারন সমুহ –

১। ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে।
২। স্ত্রী সহবাস করলে ।
৩। কুলি করার সময় হলকের নিচে পানি চলে গেলে (অবশ্য রোজার কথা স্মরণ না থাকলে রোজা ভাঙ্গবে না)।
৪। ইচ্ছকৃত মুখভরে বমি করলে।
৫। নস্য গ্রহণ করা, নাকে বা কানে ওষধ বা তৈল প্রবেশ করালে।
৬। জবরদস্তি করে কেহ রোজা ভাঙ্গালে ।
৭। রাত্রি আছে মনে করে সোবহে সাদিকের পর পানাহার করলে।

আর যদি রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামী-স্ত্রী সহবাস অথবা পানাহার করে তবে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে। কাফফারার মাসআলা অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জেনে নিবেন।

যেসব কারণে রোযা না রাখার বিধান আছে তবে কাযা আদায় করতে হবে –

১। কোনো অসুখের কারণে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেললে অথবা অসুখ বৃদ্ধির ভয় হলে। তবে পরে তা কাযা করতে হবে।
২। গর্ভবতী স্ত্রী লোকের সন্তান বা নিজের প্রাণ নাশের আশঙ্কা হলে রোজা ভঙ্গ করা বৈধ তবে কাযা করে আদায় করতে হবে।
৩। যেসব স্ত্রী লোক নিজের বা অপরের সন্তানকে দুধ পান করান রোজা রাখার ফলে যদি দুধ না আসে তবে রোজা না রাখার অনুমতি আছে কিন্তু পরে কাযা আদায় করতে হবে।
৪। শরিয়তসম্মত মুসাফির অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে। তবে রাখাই উত্তম।
৫।কোনো রোগীর ক্ষুধা বা পিপাসা এমন পর্যায়ে চলে গেল এবং কোনো দ্বীনদার মুসলিম চিকিৎসকের মতে রোজা ভঙ্গ না করলে তখন মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। তবে রোযা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। পরে তা কাযা করতে হবে।
৬। হায়েজ-নেফাসগ্রস্ত (বিশেষ সময়ে) নারীদের জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। পরবর্তীতে কাযা করতে হবে।
৭। কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে।

রোযার মাকরুহগুলো –

১। অনাবশ্যক কোনো জিনিস চিবানো বা চাখা ।
২। কোনো দ্রব্য মুখে দিয়ে রাখা ।
৩। গড়গড় করা বা নাকের ভেতর পানি টেনে নেয়া কিন্তু পানি যদি নাক দিয়ে গলায় পৌঁছে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে।
৪। ইচ্ছাকৃত মুখে থুথু জমা করে গলাধঃকরণ করা।
৫। গীবত, গালা-গালি ও ঝগড়া-ফাসাদ করা। কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া-ফাসাদ করতে এলে বলবে, আমি রোজাদার তোমাকে প্রত্যুত্তর দিতে অক্ষম ।
৬। সাড়া দিন নাপাক অবস্থায় থাকা। এটি অত্যন্ত গুনাহের কাজ ।
৭। অস্থিরতা ও কাতরতা প্রকাশ করা ।
৮।কয়লা চিবিয়ে অথবা পাউডার, পেস্ট ও মাজন ইত্যাদি দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা।

বছরের যে সব দিনে রোযা রাখা হারাম –

বছরের পাঁচদিন যে কোন ধরণের নফল রোযা রাখা সম্পূর্ণ হারাম। ঐ পাঁচদিন হল –
১। ঈদুল ফিতর (রামাযানের ঈদ) এর দিন।
২। ঈদুল আযহা (কুরবানী) এর দিন।
৩। ঈদুল আযহার পরের তিন দিন। অর্থাৎ, ১১ই, ১২ই, ১৩ই যিলহজ্ব। এই পাঁচ দিন যে কোন রোযা রাখা হারাম।

রোযার ফযীলত ও বৈশিষ্ট্য হলো –

১ । রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন – প্রত্যেক নেক আমলের জন্য নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,” মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে”।( মুসলিম শরীফ, হাদীস নং – ১১৫১)।

অন্য বর্ণনায় আছে- হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন, বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে, রোযা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর (অন্যান্য) নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ”।( বুখারী শরীফ, হাদীস নং – ১৮৯৪)।

রোযা বিষয়ে-অন্য বর্ণনায়-আললাহ তাআলা বলেন, ‘‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব”। (সহীহ বুখারী হাদীস-১৯০৪)

এ কথার তাৎপর্য হল, যদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্য, তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হল-অন্যান্য সকল ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপ, আকার-আকৃতি ও নিয়ম পদ্ধতি এমন যে, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ বিদ্যমান থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে। তার অনুভূতির অন্তরালে এ ধরনের ভাব লুকিয়ে থাকে। তা সে অনুভব করতে না পারলেও তার ভিতরে অবচেতনভাবে বিদ্যমান থাকে। ফলে সেখানে নফসের প্রভাব এসে যায়। পক্ষান্তরে রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদত, তার-আকার-আকৃতি এরূপ যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মত নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা ও অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান।

রোযার এত বড় ফযীলতের কারণ এটাও হতে পারে যে, রোযা ধৈর্য্যের ফলস্বরূপ। আর ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ হল-“ধৈর্য্যধারণকারীগণই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে”।(সূরা যুমার ,আয়াত – ১০)।

সব মাখলুকের স্রষ্টা, বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আল্লাহ তাআলা নিজেই যখন এর পুরস্কার দিবেন, তখন কী পরিমাণ দিবেন? ইমাম আওযায়ী রাহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন- আল্লাহ যে রোযাদারকে প্রতিদান দিবেন, তা মাপা হবে না, ওজন করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দিবেন।

২ ।আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে কেয়ামতের দিন পানি পান করাবেন

হযরত আবু মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, “আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার সন্তুষ্টির জণ্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণে) পিপাসার্ত থেকেছে, তিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিন) পানি পান করাবেন”।(মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং – ১০৩৯)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”আল্লাহ তাআলা বলেন, রোযা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। কেয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ থাকবে, যেখানে রোযাদার ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না”।(মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং – ৮১১৫)।

৩। রোযা হল জান্নাত লাভের পথ

হযরত হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, “আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলাম। তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোযা রাখবে, পরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো দান-সদকা করে তারপর তার মৃত্যু হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং: ২৩৩২৪)।

হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমন করে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তিনি বলেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় তার নিকট এসে একই কথা বললাম। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ২২১৪৯ এবং সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং – ২৫৩০)।

৪ । রোযাদারগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে ‘রাইয়ান’ নামক বিশেষ দরজা দিয়ে

হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবে- কোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোযাদারগণ? তখন তারা উঠে দাড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অতঃপর রোযাদারগণ যখন প্রবেশ করবে, তখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং – ১৮৯৬ এবং সহীহ মুসলিম, হাদীস নং – ১১৫২)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”প্রত্যেক প্রকারের নেক আমলকারীর জন্য জান্নাতে একটি করে বিশেষ দরজা থাকবে, যার যে আমলের প্রতি অধিক অনুরাগ ছিল তাকে সে দরজা দিয়ে আহবান করা হবে। রোযাদারদের জন্যও একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যা দিয়ে তাদেরকে ডাকা হবে, তার নাম হবে ‘রাইয়ান’। আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন কেউ কি হবেন, যাকে সকল দরজা থেকে আহবান করা হবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি আশা রাখি তুমিও তাদের একজন হবে”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ৯৮০০)।

৫ । রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দুর্গ

হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,”আমাদের মহান রব ইরশাদ করেছেন- রোযা হল ঢাল। বান্দা এর দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। রোযা আমার জন্য আর আমিই এর পুরস্কার দিব।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ১৪৬৬৯)।

উসমান ইবনে আবিল আস (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,”রোযা হল জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের (শত্রুর আঘাত হতে রক্ষাকারী) ঢালের মত।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ১৬২৭৮এবং সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং – ১৬৩৯)।

৬. রোযা কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-“রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, (অর্থাৎ না ঘুমিয়ে সে তেলাওয়াত করেছে) অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ৬৬২৬)।

৭ । রোযাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে”।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং – ৩৮ এবং সহীহ মুসলিম হাদীস নং -৭৬০)।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর রমযানের রোযা ফরয করেছেন, আর আমি কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীহ’র নামাযকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম ও কিয়াম আদায় করবে, সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যেদিন সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্যভূমিষ্ঠ হয়েছিল”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-১৬৬০)।

৮ । রোযাদারের মুখের গন্ধ মিশকের চেয়েও সুগন্ধিযুক্ত

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়”।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং – ১৯০৪)।

৯। রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে, যখন সে আনন্দিত হবে। এক. যখন সে ইফতার** করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দ পায়। দুই. যখন সে তার রবের সাথে মিলিত হবে তখন তার রোযার কারণে আনন্দিত হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন সে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, আর তিনি তাকে পুরস্কার দিবেন, তখন সে আনন্দিত হবে”।( বুখারী শরীফ , হাদীস নং -১৯০৪)।

**ইফতারের দোয়া – আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।
বাংলা অর্থ – হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিযিক্ব দ্বারা ইফতার করছি।

১০। রোযাদার পরকালে সিদ্দীকীন ও শহীদগণের দলভুক্ত থাকবে

হযরত আমর ইবনে মুররা আলজুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত,”এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি একথার সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসূল, আর আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, রমযান মাসের সিয়াম ও কিয়াম (তারাবীহসহ অন্যান্য নফল) আদায় করি তাহলে আমি কাদের দলভুক্ত হব? তিনি বললেন, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের দলভুক্ত হবে”।(মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং ২৫)।

১১। রোযাদারের দুআ কবুল হয়

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-“ইফতারের সময় রোযাদার যখন দুআ করে, তখন তার দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (অর্থাৎ তার দুআ কবুল হয়)”।(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং – ১৭৫৩)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তাদের দুআ কবুল করা হয়) ন্যায়পরায়ন শাসকের দুআ, রোযাদার ব্যক্তির দুআ ইফতারের সময় পর্যন্ত ও মজলুমের দুআ। তাদের দুআ মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এর জন্য সব আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আমার ইয্যতের কসম! বিলম্বে হলেও অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করব”।(সুনানে তিরমিযী, হাদীসনং – ৩৫৯৮)।

১২। রোযা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়

হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সবরের মাসের (রমযান মাস) রোযা এবং প্রতি মাসের তিন দিনের (আইয়্যামে বীয) রোযা অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়”।(মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং – ১০৫৭)।

১৩। আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

হযরত আবু উমামা (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো আমলের আদেশ করুন। তিনি বললেন, “তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো নেক আমলের কথা বলুন, তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর কোনো সমতুল্য কিছু নেই”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ২২১৪০)।

হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এমন কোনো আমলের আদেশ করুন, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাকে উপকৃত করবেন। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা তার তুলনা হয় না”।(মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং – ২২১৪১)।

 

ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত:

জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি ও আধিক্য ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে জাকাত বলতে ধনীদের ধন-সম্পদে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত অংশকে বোঝায়। জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে। বিত্তশালীদের পরিশুদ্ধ করে। দারিদ্র্য মোচন করে ও উৎপাদন বৃদ্ধি করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে এবং সমাজে শান্তি আনে।

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়টি হচ্ছে জাকাত। ঈমানের পর নামাজ ও তার পরই জাকাতের স্থান। কোরআন মজিদের ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও জাকাতের কথা একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআন মজিদে আল্লাহ তালা তার অনুগত বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন, ‘আর তারা যা কিছু দান করে এভাবে দান করে যে, তাদের হৃদয় ভীতকম্পিত থাকে (একথা ভেবে) যে, তারা তাদের রবের নিকটে ফিরে যাবে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৬০)

অন্য এক আয়াতে ঈমানদারদের সতর্ক করা হয়েছে, তারা যেন অসংযত আচরণের মাধ্যমে তাদের দান-সদকাকে ব্যর্থ না করে দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহ ফলিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-সদকাকে বিনষ্ট করো না। ওই লোকের মতো যে লোক দেখানোর জন্য সম্পদ ব্যয় করে আর ঈমান রাখে না আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের উপর।’ (সুরা বাকারা, হাদিস : ২৬৪)

কোরআন মজিদের উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, বিনয়, খোদাভীতি, ইখলাস-নিষ্ঠা ও উত্তম চরিত্র হলো- দান-সদকা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার অভ্যন্তরীণ শর্ত। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়মতো জাকাত আদায় করে দেয়া কর্তব্য।

যেভাবে জাকাত দিতে হয়

১. বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর জাকাত আদায়ে বিলম্ব করা যায় না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে- তোমাদের কারও মৃত্যু আসার পূর্বে। অন্যথায় মৃত্যু এলে সে বলবে- হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরও কিছু কালের অবকাশ কেন দিলে না! তাহলে আমি সদাকা করতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ১০)

এক্ষেত্রে করণীয় হল, নিসাবের মালিক হওয়ার সময়টি সামনে রাখা এবং ঠিক তার এক বছর পর সেই সময়েই জাকাত আদায় করা। নির্দিষ্ট সময়টি জানা থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো মাসের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়।

২. যে দিন এক বছর পূর্ণ হবে সেদিনই জাকাত আদায় করা ফরজ হয়। এরপর যখনই জাকাত আদায় করুক সে পরিমাণই আদায় করতে হবে যা সেই দিন ফরজ হয়েছিল। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস : ১০৫৫৯)

৩. বছর পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষের হিসাব ধর্তব্য, সৌরবর্ষের নয়।

জাকাত আদায়ে নিয়ত করা

জাকাত আদায় হওয়ার জন্য জাকাত প্রদানের নিয়ত করা জরুরি। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৫৮)

৪. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই জাকাত প্রদান করতে হবে। জনসমর্থন অর্জনের জন্য, লোকের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য কিংবা অন্য কোনো জাগতিক উদ্দেশ্যে জাকাত দেওয়া হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

জাকাতের উপযুক্ত খাতে- যেমন ফকির-মিসকিনকে দেওয়ার সময় যাকাতের নিয়ত করতে হবে। এটাই মূল নিয়ম। তবে নিজের সম্পদ থেকে জাকাতের টাকা পৃথক করে রাখলে, পৃথক করার সময়ের নিয়তই যথেষ্ট হবে। এখান থেকে ফকির-মিসকিনকে দেওয়ার সময় নতুন নিয়ত না করলেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার, আয়াত: ২/২৬৮)

৫. জাকাতের উদ্দেশ্যে টাকা পৃথক করে রাখলেও মালিক তা প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে। তবে পরে জাকাত আদায়ের সময় জাকাতের নিয়ত করতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ১০৩৯১, ১০৩৯২)

৬. জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিকে কিছু টাকা দান করা হয়েছে, কিন্তু দান করার সময় দানকারীর মনে জাকাতের নিয়ত ছিল না- তো গ্রহীতার কাছে সেই টাকা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় জাকাতের নিয়ত করলে- জাকাত আদায় হবে। তদ্রূপ জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিকে কোনো খাদ্যদ্রব্য দেয়া হলে- গ্রহীতা তা খেয়ে ফেলার বা বিক্রি করে দেয়ার আগে জাকাতের নিয়ত করলেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। এরপরে জাকাতের নিয়ত করলে- জাকাত হিসেবে আদায় হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/২৬৮; রদ্দুল মুহতার: ২/২৬৮-২৬৯)

৭. জাকাতের টাকা আলাদা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু ফকির-মিসকিনকে দেওয়ার আগেই তা চুরি হয়ে গেল বা অন্য কোনোভাবে নষ্ট হয়ে গেল- তাহলে জাকাত আদায় হব না। পুনরায় জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৬৯৩৬-৬৯৩৮; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৬/৫৩১-৫৩২; রদ্দুল মুহতার: ২/২৭০)

৮. যে সম্পদের উপর জাকাত ফরজ হয়েছে, তার চল্লিশ ভাগের একভাগ (২.৫০%) জাকাত দেওয়া ফরজ। সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করে শতকরা আড়াই টাকা হারে নগদ টাকা কিংবা ওই পরিমাণ টাকার কাপড়-চোপড় বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিলেও জাকাত আদায় হবে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২২৩০-২২৩৩; সুনানে আবি দাউদ, হাদিস: ১৫৭০-১৫৭২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬২৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮০৩; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭১৩৩-৭১৩৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ১০৫৩৯-১০৫৮১)

৯. যে পরিমাণ জাকাত ফরজ হয় স্বেচ্ছায় তার চেয়ে বেশি দিয়ে দিলেও অসুবিধা নেই। এতে জাকাত আদায় এবং বাড়তি দান দু’টোরই ছওয়াব পাওয়া যাবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২০৭৭; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৬৯০৭)

১০. জাকাত গ্রহণকারীকে একথা জানানোর প্রয়োজন নেই যে, তাকে জাকাত দেওয়া হচ্ছে। যেকোনোভাবে দরিদ্র ব্যক্তিকে জাকাতের মাল দেওয়া হলে— মালিক যদি মনে মনে জাকাতের নিয়ত করে, তাহলে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৬৮)

১১. অন্যের পক্ষ থেকে জাকাত আদায় করতে হলে- তার অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় সে ব্যক্তির পক্ষ থেকে জাকাত আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৬৯)

১২. গৃহকর্তা যদি ঘরের লোকদেরকে জাকাত দেওয়ার অনুমতি দিয়ে রাখেন, তাহলে তারা জাকাতের নিয়তে কাউকে কিছু দিলে- তা জাকাত হিসেবে আদায় হবে। আর যদি আগে অনুমতি দেওয়া না থাকে, আর ঘরের লোকেরা জাকাত হিসেবে কিছু দান করে; তাহলে যাকে দান করা হলো- সে সেই অর্থ খরচ করার আগেই যদি গৃহকর্তা অনুমতি পাওয়া যায়, তাহলেও তা জাকাত হিসেবে আদায় হবে। অন্যথায় জাকাত আদায় হবে না। পুনরায় আদায় করতে হবে।

১৩. কোনো দরিদ্র ব্যক্তির কাছে কারো কিছু টাকা পাওনা আছে। এখন সে যদি যাকাতের নিয়তে পাওনা মাফ করে দেয়, তাহলে জাকাত আদায় হবে না। তাকে জাকাত দিতে হলে- নিয়ম হলো- প্রথমে তাকে জাকাত দেয়া। এরপর সেখান থেকে ঋণ উসুল করে নেয়া। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/২৭০; রদ্দুল মুহতার: ২/২৭১)

ঋণগ্রস্তকেই জাকাতের টাকা দেয়া উত্তম। কেননা এতে তাকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করা হয়। আর কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তি যদি জাকাত গণ্য করার নিয়ত করা ছাড়াই ঋণগ্রহীতার ঋণ ক্ষমা করে দেয়- তবে তো কথাই নেই। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৭১)

 

পঞ্চম স্তম্ভ হচ্ছে হজ্জ:

হজ্ব শব্দের আভিধানিক অর্থ “ইচ্ছা” বা “সঙ্কল্প” করা, আরবিতে: حج । ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কাবা শরীফ যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের ইচ্ছা বা সংকল্প করা।এটি মুসলমানদের জন্য একটি আবশ্যকীয় ইবাদত।শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জীবনে একবার হজ্ব সম্পাদন করা ফরয‌ বা আবশ্যিক। আরবি জ্বিলহজ্জ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ হজ্বের জন্য নির্ধরিত সময়। হজ্জ পালনের জন্য বর্তমান সৌদী আরবের মক্কা নগরীতে ক্বাবা শরীফের তাওয়াফ এবং সন্নিহিত মিনা, আরাফাত, মুযদালফা, পশু কোরবানী, কংকর নিক্ষেপ,সাফা-মারওয়া টিলাদ্বয়ের মধ্যে হাঁটা। প্রভৃতি স্থানে গমন এবং অবস্থান আবশ্যক। হজ্ব মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ মিলন উৎসব।
এটি ইসলামের ৫টি মূল ফরজ বিষয়ের অন্যতম।আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে বাক্কা তথা বর্তমান মক্কা নগরীতে আবুল আম্বিয়া একত্ববাদের নবী হজরত ইব্রাহীম আলাইহে ওয়াছাল্লাম নির্মান করেছিলেন পবিত্র কাবা ঘর।পরে সেই ঘরের জিয়ারতের জন্য সমগ্র মানবজাতিকে আহবান করেছিলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে।

মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

মানুষের মধ্যে যারা কাবা শরীফ পৌঁছুতে সক্ষম তাদের ওপর আল্লাহর ঘর জিয়ারত করা ফরজ (সূরা আলে ইমরান ৯৭)

#আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আরো বলেন- وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। (সূরা হাজ্জ্ব আয়াত ২৬)

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ

এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। (সূরা হাজ্জ্ব আয়াত ২৭)

#আরো বলেন- ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ

রপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে।(সূরা হাজ্জ্ব আয়াত ২৯)

#আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আরো বলেন-إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ

নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।(সূরা আল ইমরান ৯৬)

#মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি وَالْحَجِّ এবং আল্লাহর ঘরের হজ্জ করা। (মুত্তাফাক আলাইহি)
হজরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াজূজ ও মাজূজ বের হওয়ার পরও বায়তুল্লাহর হাজ্জ (হজ্জ)ও ‘উমরা পালিত হবে।(সহীহ বুখারি)
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে পৌঁছুতে সম্পদ ও সওয়ারির মালিক হলো,তা সত্ত্বেও সে হজ করল না, সে ইহুদি বা খ্রিষ্টান হয়ে মরুক তাতে কিছু যায় আসে না(তিরমিজি)।

হজ্বের ঐতিহাসিক পটভূমি:

হিজরি সনের ১২তম মাস হলো জিলহজ্জ মাস। এই মাস হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্মৃতিবিজরিত এক অনন্য মাস। যখন হজরত ইব্রাহিম (আঃ) কে হজ্জ ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণ করার আদেশ দেয়া হয়, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, এখানে তো জনমানবহীন বন্য প্রান্তর; ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই। যেখানে জনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ কীভাবে পৌঁছবে? আল্লাহতায়ালা বললেন, তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষনা করা।বিশ্বের কাছে তা পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার।আজ সেই আহবানের সাড়া দিতে গিয়ে বিশ্বের ২০ লক্ষাধিকেরও বেশি আল্লাহ ওয়ালা মানুষ পবিত্র হজ্জ পালনে সমেবেত হচ্ছেন।

#আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَتِمُّواْ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।(সূরা আল বাক্বারাহ ১৯৬)

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُوْلِي الأَلْبَابِ

হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তো জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানগন! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই। (সূরা আল বাক্বারাহ ১৯৭)

হজ্জের প্রকার:

হজ তিন প্রকার,এগুলো হলো তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ।
➮ হজে তামাত্তু হজের মাসসমূহে (শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ) উমরাহর নিয়তে ইহরাম করে, উমরাহ পালন করে,পরে হজের নিয়ত করে হজ পালন করাকে ‘হজে তামাত্তু বলে।
➮ হজে কিরান হজের মাসসমূহে একই সঙ্গে হজ ও উমরাহ পালনের নিয়তে ইহরাম করে উমরাহ ও হজ করাকে ‘হজে কিরান’ বলে।
➮ হজে ইফরাদ শুধু হজ পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে হজ সম্পাদনকে ‘হজে ইফরাদ’ বলে।

হজ্ব ফরয হওয়ার শর্ত

(১) মুসলমান হওয়া (২) আর্থিক সামর্থ্য থাকা অর্থাৎ হজ্বে গমনের সৌদি আরবে যাওয়া-আসার খরচ, সেখানে থাকাকালীন ব্যয়নির্বাহ এবং হজ্ব সম্পাদকালীন সময়ে পরিবার পরিজনের ভরণ পোষণের সংগতি থাকা (৩) শারীরিক সুস্থ ও সক্ষম হওয়া (৪) আক্কেল বা বালেগ তথা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাপ্ত বয়স্ব ও সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া (৫) যাতায়াতের রাস্তা নিরাপদ থাকা এবং (৬) মহিলাদের সাথে মহরাম থাকা।

হজ্জের তালবিয়াহ/দোয়া পাঠ করা

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ، وَالنِّعْمَةَ، لَكَ وَالْمُلْكَ، لاَ شَرِيكَ لَكَ

‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা,লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইকা। ইন্নাল হামদা ওয়ান নেয়ামাতা লাকা ওয়াল মুলকা লা-শারীকা লাকা। এর অর্থ হলো, হে আল্লাহ, আমি হাজির আছি, আমি হাজির আছি। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির আছি। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নেয়ামত আপনারই এবং সমগ্র বিশ্বজাহান আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই।(সহীহ বুখারি)
(ইহরামের কাপড় পরার পর যখনই নিয়ত করা শেষ করবেন তখন থেকে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন৷ দাড়িয়ে,বসে, শুয়ে, চলন্ত অবস্থায় সর্বাবস্থায় পড়া যায়৷

হজ্জ্ব এ করনীয়
ইহরাম (ফরয)

ইহরাম এর আভিধানিক অর্থ হারাম বা নিষিদ্ধ করা৷হজ্জকালীন সার্বিক অবস্থাকে বলা হয় ইহরাম যার প্রধান চিহ্ন হলো দুই খণ্ড সিলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান। ইহরাম-এর নির্দ্দিষ্ট স্থানকে বলা হয় মীক্বাত। প্রয়োজন মোতাবেক অযু বা গোছল শেষে, ইহরামের কাপড় পরে নিয়ে, দুই রাকাত নফল নামায পড়ে ইহরামের নিয়ত করতে হয়। মহিলাদের ইহরাম পুরুষদের ইহরামেরই অনুরুপ৷ শুধু পার্থক্য এইযে, মহিলাদের জন্য মাথা ঢেকে রাখা ওয়াজিব এবং কাপড় দ্বারা মুখ আবৃত করা নিষিদ্ধ, আর সেলাই যুক্ত কাপড় পরিধান করা জায়েয৷

হজরত ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মদিনাবাসীগণ যুল-হুলায়ফা থেকে, সিরিয়াবাসী গণ আল-জুহ্ফা থেকে এবং নাজদবাসীগণ কারন থেকে ইহরাম বাধবে। আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমার কাছে খবর পৌছেছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়েমেনবাসীগণ ইয়ালামলাম থেকে ইহরাম বাঁধবে। (সহীহ মুসলিম)

উকুফ
হজ্জ সম্পাদনক্রমে মক্কার অদূরবর্তী বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকে বলা হয় অকুফ।যে ৩টি স্থানে উকুফ করতে হয় সে গুলো হলো মিনা,
আরাফাত (আরাফা-ফরয) এবং মুযদালীফা।

শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ
মিনার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত জামরাহ্ নামক স্থানে তিনটি খুঁটিতে কংকর নিক্ষেপ করা হজ্জের আবশ্যকীয় অঙ্গ।

পশু কুরবানী
পশু কুরবানী হজ্জ্বের একটি অপরিহার্য করণীয়।

কেশ মুণ্ডন
তাওয়াফের পূর্বে কেশ মুণ্ডন আবশ্যক। তবে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক যে যেন কেশ মুণ্ডনের পূর্বেই পশু কোরবানী সম্পন্ন হয়ে যায়। বিকল্পে মাথায় যথেষ্ট চুল থাকলে কিছু অংশ ছেঁটে ফেলা যায়। তবে মেয়েরা মাথা চাঁছবে না

তাওয়াফ (ফরয)
কাবার চুতুর্দিক হচ্ছে তাওয়াফ করার দিক ক্বাবা শরীফের দক্ষিণ-পূর্ব থেকে শুরু করে একাদিক্রমে ৭বার ক্বাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করাকে বলে ‌তাওয়াফ।এটি হজ্জের একটি অপরিহার্য আঙ্গিক।তাওয়াফ শুরুর আগে নিয়ত করতে হয়। প্রথম ৩ চক্করে একটু দ্রুত চলতে হয় – এক বলে ‘রমল’। এ সময় ইহরামের কাপড় ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতে হয়। প্রতি চক্কর শেষে হযরে আসওয়াদ নামক বেহেশ্‌তী পাথরে চুম্বন করতে হয় বা ভীড়ের জন্য হাত ঠেকিয়ে হাতে চুম্বন করা সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারায় চুম্বন করতে হয়।

সাফা-মারওয়া
ক্ববা শরীফের অদূরে অবস্থিত দুটি টিলার নাম যথাক্রমে সাফা ও মারওয়া। এ দুটির মধ্যে দ্রুত গতিতে হেঁটে একাদিক্রমে সাত বার যাতায়াত করতে হয়। কার্যতঃ সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত ৪বার এবং মারওয়া ৩বার যেতে হয়। অর্থাৎ সাফায় শুরু হয়ে এই হাঁটা মারওয়ায় শেষ হয়। নিয়ত করে সাফা থেকে হাঁটা শুরু করতে হয়। মাঝামাঝি স্থানে যেখান থেকে ক্বাবা দৃষ্টিগোচর হয় সেখানে দ্রুত গতিতে চলতে হয়।

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَا وَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ اللّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ

নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন।(সূরা আল বাক্বারাহ ১৫৮)

হজ্জের গুরুত্ব ওফযীলত

হজ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। শুধু ইবাদতই নয় ইহা বিশ্ব মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার অন্যতম ও প্রধান পন্থাও বটে। তাই হজ্জকে বলা যায় মুসলিম উম্মাহর মহা ঐক্যের মহা সম্মেলন বা মহা ঐক্যের মহামিলন কেন্দ্র।

উম্মুল মু’মিনীন হজরত ‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু তালা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আমল হল, হাজ্জে (হজ্জ) মাবরূর।
(সহীহ বুখারি)

হজরত আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যাক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হাজ্জ (হজ্জ) করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত রইল, সে নবজাতক শিশু, যাকে তাঁর মা এ মুহূর্তেই প্রসব করেছে, তার ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরবে। (সহীহ বুখারি)
#মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- মহান আল্লাহ আরাফাতের দিন যত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন অন্য কোন দিনে এত লোককে মুক্তি দেন না। (মুসলিম)

ওমরা কি?

ওমরা আরবী শব্দ, অর্থ যিয়ারত করা, ভ্রমণ করা, হজ্বের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তথা ৮ই জিলহজ্ব থেকে ১৩ই জিলহজ্ব ব্যতিত শরিয়ত নির্ধারিত পন্থায় কাবা শরীফ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সায়ী করাকে ওমরা বলা হয়।
اللهم ارزقنا زيارة بيتك الحرام

ইসলামকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর মনোনীত একমাত্র দীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং সেই দীনে আমাদেরকে পুরোপুরিভাবে দাখিল হওয়ার তৌফিক দিন।

আমরা যেন ইসলামের বা কুরআন হাদীসের সঠিক জ্ঞানে ও পথে চলতে পারি।