free hit counter
ইসলাম

খলিফা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের: আমৃত্যু নিঃসঙ্গ জীবনী

আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) ( 624-692) ইসলামের পঞ্চম খলীফা ছিলেন। ওনার বাবা ছিলেন সাহাবি যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ) ও মা ছিলেন প্রথম খলিফা আবু বকরের কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) ছিলেন তার খালা। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে ইসলামের পঞ্চম ধার্মিক খলিফা হিসাবে গণ্য করা হয়, যিনি ৬৮৩ থেকে ৬৯২ সাল পর্যন্ত খলিফা হিসাবে মক্কা-মদিনা সহ ইরাক, দক্ষিণ আরব এবং সিরিয়ার বৃহত অংশ এবং মিশরের কিছু অংশের খলিফা ছিলেন।

কিন্তু গ্রেটার আরবে তখন চলছে উম্মাইয়াদের শাসনামল। উমাইয়াদের রাজতন্ত্রের (খেলাফতের) কেন্দ্র ছিল সিরিয়ার দামাস্কাস। রাজতন্ত্র এই কারনে যে উমিয়ারাই প্রথমে বাবা থেকে ছেলেতে শাসন ক্ষমতা উত্তারাধিকার সুত্রে ট্রান্সফার করা শুরু করে, যা হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর চার খলিফা যেভাবে খলীফা নির্ধারণ করেছিলেন তার পরিপন্থী। উল্লেখ্য হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত আলি(রাঃ) এর পরিবার উম্মাইয়াদের শাসনকে বা খেলাফতকে সহজে মেনে নেয় নাই। যখন ইয়াজিদ উম্মাইয়া খলিফা হিসাবে ক্ষমতায় বসে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ইয়াজিদকে তার আনুগত্য জানাতে অস্বীকার করেন । মক্কাবাসীরা তাকেই খলীফা হতে অনুরোধ করলে তিনি তা গ্রহন করেন। হিজাজ, ফিলিস্তিন, ইরাকের অধিকাংশ লোকই তার প্রতি আনুগত্য (বায়াত) জানায়।

উমাইয়া খলিফা তখন আব্দুল মালিক, যিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের কে ক্ষম্মতাচ্যুত করার জন্য তার সেনাপতি আল হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফকে মক্কায় পাঠান। মক্কায় পৌঁছে ইবনে ইউসুফ ৫ মাস ১৭ দিন মক্কা অবরোধ করে রাখে। এতে করে আব্দুল্লাহর বাহিনী ক্রমশ দুর্বল হয়ে পরে। তখন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আব্দুল্লাহকে চিঠি দিয়ে তিনটি বিকল্প পথ দিয়ে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেনঃ ১) বন্দি অবস্থায় দামেস্কে উমাইয়া খলিফার কাছে যাওয়া; ২) স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে যেখানে খুশি চলে যাওয়া ৩) আমরণ যুদ্ধ করা। এই চিঠি পাওয়ার পর এক দিনে ১০ হাজার লোক আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরকে ছেড়ে চলে যায়।
সেইসময় বিবি আসমার বয়স প্রায় ১০০, এবং তিনি অন্ধ। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের সেই চিঠি পাওয়ার পর ওনার আম্মা আসমা (রাঃ) কে বলেনঃ মৃত্যুর মাঝেই আমি শান্তি পাব। আমার লোকরা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, এমনকি আমার পরিবার পর্যন্ত। আমার সাথে আছে গুটি কয়েক মানুষ। প্রতিপক্ষ আমাকে এই দুনিয়ায় যা চাই তা দিবে। আপনার কি অভিমত?

আসমা (রাঃ) প্রতি উত্তরে বলেনঃ তুমি আমার থেকে তোমার পরিস্থিতিতে ভাল জান। কিন্তু যদি মনে করো তুমি সত্যের পথে আছো, তাহলে এগিয়ে যাও আর তোমার সাথীদের মত যুদ্ধ করে মরো। কিন্তু যদি এই দুনিয়াদারীর পিছনে ঘুরো, তাহলে তুমি একজন হতভাগ্য পুরুষ। সেক্ষেত্রে তোমার আর তোমার সাথীদের জীবন বৃথা। এই জীবনে তুমি কতকালই বা বাঁচবে? কিন্তু যদি সত্যের পথে থাকো যদিও তোমার অনেক সাথি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তুমি দুর্বল হয়ে গেছো, কিন্তু এভাবে বেচে থাকা একজন মুক্ত ইমানদার মানুষের কাজ নয়।
আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরঃ আমার ভয় শামের (সিরিয়ার) মানুষ আমাকে ছিন্নবিছিন্ন করে দিবে।

আসমা (রাঃ)ঃ পুত্র, জবাই হয়ে যাওয়ার পর মেষশাবক ব্যাথা অনুভব করে না।
বিবি আসমার কপালে চুমু দিয়ে আবদুল্লাহ বলেনঃ আল্লাহর নাম নিয়ে বলছি এই দুনিয়ায় বাস করার ইচ্ছা আমার নাই। আমার আশা পরকালের জীবন। সারা জীবন আমি সত্যের পথে থেকেছি। কিন্তু আমি আপনার মতামত জানতে চেয়েছিলাম যাতে আপনার মতামত আমার মতামতকে শক্তিশালী করে!

বিবি আসমা (রাঃ) নিজের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ” সাহসের সাথে যুদ্ধ কর, তুমি যুবায়েরের ছেলে, আবু বকর আর সাফিয়ার নাতি।”
সেদিন অত্যন্ত সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের শহীদ হন। আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর উমাইয়া সেনাপতি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বিবি আসমাকে (রাঃ) জিজ্ঞাসা করেনঃ ” আল্লাহ তার শত্রুর কি অবস্থা করেন?”

প্রতি উত্তরে বিবি আসমা বলেনঃ তুমি তার জীবন শেষ করেছ, কিন্তু সে তোমার পরকাল নিঃশেষ করে দিয়েছে।
তথ্যসুত্রঃ লেকচার অফ শেখ জহির মাহমুদ, ‘দ্যা মারটিরডম অফ আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের”।