free hit counter
ইসলাম ও বিজ্ঞান – সংঘাত নাকি সমন্বয় ?
ইসলাম

ইসলাম ও বিজ্ঞান – সংঘাত নাকি সমন্বয় ?

ইসলাম এবং বিজ্ঞান বলতে বুঝানো হয় ইসলাম ধর্ম ও তার অনুগামী মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ককে মুসলিম পণ্ডিতেরা কোরআনে বর্ণিত বিষয়গুলির সাথে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি মতবাদ তৈরি করেছেন । কোরআন মুসলমানদের প্রকৃতি অধ্যয়নের এবং সত্যের তদন্ত করার জন্য উৎসাহ দেয়। মুসলিমরা প্রায়ই সূরা আল-বাকারা থেকে ২৩৫ আয়াত উদ্ধৃত করেন – “তিনি তোমাকে তাই শিখিয়েছেন যা তুমি জানতে না ।” তাদের মতামত এটাই সমর্থন করে যে কোরআন নতুন জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহ প্রদান করে । কিছু মুসলিম লেখকদের মতে, বিজ্ঞান অধ্যয়ন তওহীদ থেকে উৎপন্ন হয়েছে ।

ইউরোপের ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংকটটি সবার জানা। এ বিষয়ে অসংখ্য বইপুস্তক রয়েছে। ইউরোপে জ্ঞানের জাগরণ ও ধর্মের পশ্চাৎপদতার কারণে বহু বিদ্বজ্জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে অকথ্য নির্যাতন এবং আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাও তখন ঘটেছে। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই। মুসলিম ধর্ম বিশ্বাসে ‘দ্বিন জ্ঞানের অংশ আর জ্ঞান দ্বিনের অংশ।’ ইসলামে ‘জ্ঞান দ্বিনের অংশ’। কেননা দ্বিনের একটি ভিত্তি মানুষের আকল বা সুস্থ বিবেক। বিজ্ঞ আলেমরা বলেন, ‘আকল নকলের খুঁটি।’ সেটা কিভাবে? মুজিজা (নবীদের থেকে প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনা) নবুওয়তের প্রমাণ। আর তা হয় আকল তথা বিবেকের মাধ্যমে। মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল—এটা পবিত্র কোরআনে আছে। কিন্তু আপনি যখন কোনো অমুসলিমের সঙ্গে কথা বলবেন, তখন নকল (কোরআন ও হাদিস) চেয়ে আকলই বেশি কার্যকর; বরং ইসলাম মানুষের জ্ঞান ও জাগ্রত বিবেককে বিশেষ মূল্য দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন! তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে তোমাদের যুক্তি-প্রমাণ পেশ করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১১) সুতরাং ইসলামে আকল ও নকল, চিন্তা ও বিশ্বাস, শরিয়ত ও প্রজ্ঞা, ধর্ম ও জ্ঞানচর্চার সংকট নেই। যেমনটি ইবনে রুশদ ব্যাখ্যা করেছেন।

জ্ঞানচর্চা আমাদের কাছে ধর্মাচারের মতো। কেননা জ্ঞান মানুষকে আলোর পথ দেখায়। জ্ঞান মানুষকে ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণের পার্থক্য বোঝায়। জ্ঞান বলে দেয় কোন জিনিস তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উপকৃত করবে। অপরিহার্য জ্ঞান অর্জন করা মুসলমানের জন্য ফরজ (আবশ্যকীয় ধর্মীয় কর্তব্য)। আমি মনে করি, নিরক্ষরতা দূর করাও বর্তমান যুগের মুসলমানের জন্য ফরজ। আর কিছু জ্ঞান অর্জন করা মুসলমানের জন্য ফরজে কিফায়া (সামষ্টিক কর্তব্য)। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একদল চিকিৎসক, প্রকৃতিবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ ও প্রকৌশলী; আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিনিধিত্বকারী গবেষক ও পণ্ডিত ব্যক্তির উপস্থিতি আবশ্যক। এটা উম্মাহর সামষ্টিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব অবহেলা করলে সামগ্রিকভাবে সবাইকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

প্রশ্ন হতে পারে, সামগ্রিক এই দায়িত্ব কে পালন করবে? ‘উলুল আমর’ তথা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মুসলিম জাতির এই প্রয়োজন পূরণের উদ্যোগ নেবেন। তাঁদের বুঝতে হবে জাগতিক জ্ঞানে দক্ষতা অর্জনের ওপর উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্বার্থ জড়িত। ইমাম গাজালি (রহ.) এমন একটি গ্রামের সমালোচনা করেছেন, যেখানে ৫০ ব্যক্তি ইসলামী আইন (ফিকহ) চর্চা করেন, অথচ তাঁদের মধ্যে কোনো মুসলিম চিকিৎসক নেই। একজন অমুসলিমের কাছ থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। ইমাম গাজালি (রহ.)-এর ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, এই গ্রামের শিক্ষিত শ্রেণির উচিত ছিল চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় শাস্ত্রেও মনোযোগী হওয়া। যেসব জাগতিক বিষয় মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং যা উপেক্ষা করা যায় না, তা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজে কিফায়া বা সামষ্টিক দায়িত্ব। এ জন্য ইউরোপের মতো ইসলামের ইতিহাসে কখনো ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত দেখা যায় না; বরং আধুনিক ইউরোপ যে কয়েকজন মুসলিম মনীষীর অবদান স্বীকার করে নিয়েছে, তাঁদের সবার জ্ঞানচর্চায় ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের সমন্বয় ছিল।

গবেষণা ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয়, তাকে ইউরোপীয়রা ধর্মীয় জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করেন না এবং এসব জ্ঞানের ধর্মীয় কোনো পরিচয় নেই। এমনকি অতি প্রাকৃতিক কোনো কিছুই তাদের কাছে জ্ঞান বিবেচিত নয়। কিন্তু ইসলামে মানুষের চিন্তা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে অর্জিত জ্ঞান ‘জ্ঞান’ হিসেবে স্বীকৃত। মুসলিম সমাজে চিকিৎসা, প্রকৌশল, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা চর্চাকারীরা জ্ঞানী হিসেবে মর্যাদার অধিকারী। যেসব মুসলিম বিজ্ঞানী জাগতিক এসব জ্ঞানচর্চা করে খ্যাতিমান হয়েছেন, তাঁদের বিদ্যার্জন শুরু হয়েছিল ধর্মীয় জ্ঞানের মাধ্যমে। জ্ঞানের উভয় ধারায় তাঁদের অবগাহন ছিল। তাফসিরে কাবিরের লেখক আল্লামা ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) তাঁর যুগের একজন বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। ‘ফাসলুল মাকাল’ ও ‘আল কাশফ আন মানাহিজিল আদিল্লাহ’-এর লেখক দার্শনিক ইবনে রুশদ চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর ‘আল কুল্লিয়্যাত ফিত-তিব’-এর মতো কালজয়ী বই লিখেছেন। তাঁর বইটি লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তা ইউরোপে পাঠ ছিল। দার্শনিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে রুশদই সমকালী ইসলামী আইনের ওপর ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ’ বই লিখেছেন। শাফেয়ি মাজহাবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ইবনুন নাফিস ও ইবনে রুশদের মতো ধর্মীয় জ্ঞান ও জাগতিক জ্ঞান উভয় ধারায় সমান অবদান রাখেন। জ্ঞানচর্চায় ইসলাম কখনোই বাধা ছিল না। বরং বলা হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছিল ইসলামের বাহন। একই ছাদের নিচে উভয় ধারা সমান যত্নে প্রতিপালিত হয়েছে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাত ইউরোপে হয়েছে এবং তার ছায়া পরবর্তী সময়ে মুসলিম বিশ্বেও পড়েছে।

জাগতিক জ্ঞানচর্চা কিভাবে দ্বিনের অংশ হয়? যখন ব্যক্তি তার জ্ঞানচর্চায় নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতা বজায় রাখে, তখন জাগতিক বিষয়ে জ্ঞানচর্চাকারী (কখনো কখনো) ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকারীর চেয়ে বেশি মর্যাদাবান বিবেচিত হয়। যেমন—যেসব ডাক্তার, শারীরবিদ ও বিজ্ঞানী উম্মাহর কষ্ট দূর করতে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে জাগতিক জ্ঞানচর্চা করছেন, তাঁদের মর্যাদা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকারী অনেক আলেমের চেয়ে বেশি। দুঃখজনক! আজ মুসলিম জাতি পশ্চাৎপদ। অথচ আমরাই ছিলাম অগ্রগামী সোনালি কাফেলা। যুগ যুগ ধরে আমরা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভিড় লেগে থাকত, আমাদের বইগুলো ছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, আমাদের জ্ঞানীরা ছিলেন পৃথিবীর তারকাতুল্য। আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এখন যদি আমাদের মধ্যকার একদল জ্ঞানপিপাসু উম্মাহর সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে নিজেদের উৎসর্গ করে, আমার দৃষ্টিতে নিষ্ঠাবান এসব জ্ঞান-সাধকের মর্যাদা অনেক ধর্মীয় পণ্ডিতের চেয়ে ঊর্ধ্বে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে একনিষ্ঠ আমলকারীদের পছন্দ করেন।’ (সুনানে তিবরানি, হাদিস : ১১১৩)

উম্মাহর প্রয়োজন ও ব্যক্তির নিষ্ঠা জাগতিক জ্ঞানকে ধর্মীয় জ্ঞানের স্তরে উন্নীত করে।

কয়েক শতাব্দী ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নেতৃত্ব দেওয়ার পর আমরা ঘুমিয়ে গেলাম। অন্যরা জাগ্রত হলো। আমরা পিছিয়ে পড়লাম, অন্যরা এগিয়ে গেল। আমাদের থেকেই তারা গবেষণার পদ্ধতি শিখে নিল। এটা আমাদের দাবি নয়, তারাই স্বীকার করেছে। রবার্ট ব্রিফল্টের ‘দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটি’, গোস্টাব লি বনের ‘সিভিলাইজেশন অব দ্য আরব’, জর্জ শার্টনের ‘দ্য হিস্টোরি অব সায়েন্স অ্যান্ড দ্য নিউ হিউম্যানিজম’ এবং জন উইলিয়াম ড্রাপারের ‘হিস্টোরি অব দ্য কনফ্লিক্ট বিটুইন রিলিজিয়ন অ্যান্ড সায়েন্স’ বইয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানের অবদান স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের উদ্ভাবক ‘রজার বেকন’ ও ‘ফ্রান্সিস বেকন’ নন; বরং তার উদ্ভাবক মুসলিম আরবরা। তারা ছিল আরব ইসলামী সভ্যতার ইউরোপীয় প্রতিনিধি। মুসলিমদের কাছ থেকে তারা এই পদ্ধতি শিখে ইউরোপকে শিখিয়েছে। মুসলিমদের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছে। এখন তাদের বলা হয় ‘উন্নত বিশ্ব’ আর আমরা পশ্চাৎপদ। প্রকৃতপক্ষে আমরা পিছিয়েই। আজকের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব কিছুই তাদের হাতে। সমকালীন উদ্ভাবনে আমাদের অংশ নেই বললে চলে। আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমরা তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সন্তুষ্ট। নিজেরা উদ্ভাবনের চিন্তা করি না।

মুসলমান হতে হলে এ কথায় বিশ্বাসী হতে হয় আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, মালিক, প্রতিপালক ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী। সুতরাং তাঁর বান্দাদের জীবনযাত্রার নিয়ম-কানুন নির্ধারণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাও তাঁর। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তুমি কি জানো না, আসমান ও জমিনের সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহরই?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০৭)

কোনো মুসলমানের জন্য ইসলামকে কাটছাঁট করা কিংবা সহজায়ন করা সম্ভব নয়। কোরআন বলছে, ‘…তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিফল হতে পারে? আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠিন আজাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে আল্লাহ উদাসীন নন। ’ (সুরা: বাকারা, আয়াত: ৮৫)

ইসলামে কোনো রিজার্ভেশন বা সংরক্ষণ নেই। এতটুকু আমার, এতটুকু আপনার—এ বিভাজন ইসলামে নেই। এতটুকু দেশের, এতটুকু প্রদেশের—এই পার্থক্য ইসলাম করে না। এতটুকু রাষ্ট্রের, এতটুকু ধর্মের—এই দূরত্ব ইসলাম মেনে নেয় না। এতটুকু রাজনৈতিক সুবিধার, এতটুকু অসুবিধার—এই আপসকামিতা ইসলাম সমর্থন করে না।

সূত্র: আলজাজিরা ডটনেটে প্রকাশিত ড. ইউসুফ আল কারজির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার