Image default
হিন্দু

দূর হোক শিবলিঙ্গ নিয়ে মানুষের ভুল ধারনা

শিবলিঙ্গ:

শিব কথার অর্থ, সত্য, সুন্দর ও মঙ্গল। আর লিঙ্গ কথার অর্থ, প্রতীক। এ হলো হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি সত্যে ও মঙ্গলের প্রতীক চিহ্ন। শিবকে এই প্রতীকের সাহায্যেই প্রকাশ করা হয়। শিব থাকেন ব্রহ্মের ধ্যানে লীন, আর সব মানুষকেও ব্রহ্মের প্রতি ধ্যানমগ্ন হতে উপদেশ দেন। শিব লিঙ্গের উপরে ৩টি সাদা দাগ থাকে যা শিবের কপালে থাকে। তাই শিবলিঙ্গ যদি কোন যৌনইন্দ্রিয় বুঝাত, তা হলে শিবলিঙ্গের উপরে ঐ ৩টি সাদা তিলক রেখা থাকত না। এখানেও অনেকের অনেককিছু বোঝাবার প্রয়োজন বলে মনে করি।

শিবরাত্রি বা শিবলিঙ্গের পূজা হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। যেসব শিব মন্দিরে শিবলিঙ্গের মূর্তি তৈরি করা আছে, সেসব মন্দিরে পূজা হয়। এই পূজাটির প্রচলন বহু প্রাচীন যুগ থেকেই ভারত-সহ বাংলাদেশেও প্রচলিত রয়েছে। আর এই শিবলিঙ্গ পূজার রীতি সম্পর্কেও রয়েছে অনেক ভুল ধারণা। অনেক মানুষ সোজা কথায় বলে ফেলে লিঙ্গ পুজা। আসলে এটি লিঙ্গ পূজা নয়, এটি দেবতা শিবের প্রতীকী পূজা বা শিবরাত্রি পূজা। এই শিবরাত্রিতে শিবলিঙ্গে জল, দুধ, ঢালা হয় বলে অনেকে ভুল বুজে নানা কুৎসা রটায়।

গুণীজনরা শিবলিঙ্গকে মোট তিনভাগে ভাগ করে এর আলাদা আলাদা নামও দিয়েছে।

১। সবচেয়ে নীচের চারমুখী অংশটি থাকে মাটির নীচে।
২। মাঝখানের অংশটি আটমুখী, যা বেদীমূল হিসেবে কাজ করে।
৩। উপরের অর্ধবৃত্তাকার অংশটি পূজিত হয়।

এই তিনটি অংশের সবচেয়ে নীচের অংশটি ব্রহ্মা, তার উপরের অংশটি বিষ্ণু ও একেবারে উপরের অংশটি শিবের প্রতীকী চিহ্ন। বেদীমূলে একটি লম্বাকৃতি অংশ রাখা হয়, যা শিবলিঙ্গের মাথায় ঢালা জল বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। এই অংশের নাম গৌরীপট্ট, যা মূলত যোনিপ্রতীক। যেই পথ অনুসরণ করে পৃথিবীতে আসেছি আমরা সবাই। আসেছে মুনি মহামুনিগণ, আসেছে রাজা বাদশা আর ফকির সাধু গুরু মহাগুরুও। শিবলিঙ্গ পূজার মধ্যে কোনও অশ্লীলতা নেই। শিবলিঙ্গ একই সঙ্গে শিবের সৃজনাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রূপের প্রতীক। শিবলিঙ্গ ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক আর সত্যের প্রতীক। শিবলিঙ্গ যেহেতু ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক, সেহেতু ‘লিঙ্গ’ শব্দটির অর্থ কিন্তু পুরুষাঙ্গ নয়, বরং একটা প্রতীকী চিহ্ন মাত্র।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রচলিত বিশ্বাস হল এই যে, এই শিব লিঙ্গ পূজা শুধু অবিবাহিত মেয়েরাই করে থাকে। কিন্তু না, অবিবাহিত আর বিবাহিত মেয়েরা শিবলিঙ্গের কাছে যাওয়াও অনুচিত। কারণ, মেয়েদের শরীর সবসময় পবিত্র থাকে না, তাই। আবার নারীই পুরুষের ধ্যানভঙ্গের প্রধান কারণ বলে বিবেচিত। কুমারী নারীর সান্নিধ্যে পুরুষের চিত্তবিচলন ঘটার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেই পুরুষ সাধু হলেও নিয়ম অন্যরকম নয়। কাজেই শিবের কাছাকাছি যাওয়ার ব্যাপারে কুমারী মেয়েদের কিছু বিধিনিষেধ আছে।

আর যেসব জায়গায় বসে দেবতা শিব ধ্যান জপতেন, সেই জায়গাগুলি ছিল অত্যন্ত পবিত্র। শিবের ধ্যানক্ষেত্রের আশেপাশে স্বয়ং দেবতাদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, সকলকেই খেয়াল রাখতে হত, শিবের ধ্যানে যাতে কোনওভাবে বিঘ্ন না ঘটে। শিবের ধ্যানে কোনওরকম বাধা পড়লেই শিব অসন্তুষ্ট হবেন। আর শিব একবার অসন্তুষ্ট হলে মহাবিপদ। এমনিতেই শিব হলেন, ধ্বংসলীলার দেবতা, তিনি অসন্তুষ্ট হলে মুহূর্তেই ধ্বংসলীলায় পতিত হবে পৃথিবী।

তাই বলে কি মেয়েদের শিব পূজায় কোনও নিষেধাজ্ঞা আছে? না। এখনো ভারতসহ বাংলাদেশের বহু কু‌মারী মেয়েরা দেবতা শিবের পূজা করে। তারা শিবরাত্রি/শিবলিঙ্গকে অনুস্মরণ করে ১৬টি সোমবারে ব্রত করে থাকেন। ফাল্গুন মাসের শিবরাত্রি ছাড়াও এই শিবের পূজা মেয়েরা বারোমাসই করে। শিবের ব্রত করার সময় মেয়েরা উপবাস রাখেন। পণ্ডিতরা বলেছেন, শ্রাবণ মাসে এই ব্রত রাখলে নাকি বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। বিবাহিত মেয়েরা শিবরাত্রি বা শিবলিঙ্গ পূজা করে স্বামীর সুখ আর আয়ু বৃদ্ধির জন্য। আর অবিবাহিত মেয়েরা পূজা করে তার জীবনে একটা শক্তিমান ও আদর্শবান পুরুষ আসার কামনায়। পৃথিবীর সব ধর্মের অবিবাহিত মেয়েরাই চায়, তার জীবনে একজন সৎ এবং আদর্শবান পুরুষ আসুক। তাই সারা দুনিয়ার হিন্দু ধর্মের অবিবাহিত মেয়েরা শিবরাত্রি বা শিবলিঙ্গ ব্রত/পূজা করে। আগে এবং বর্তমানেও শিবলিঙ্গের পূজা সারা ভারত-সহ বাংলাদেশেও জনপ্রিয়। শুদ্ধ পঞ্জিকা মতে প্রতিবছর নির্ধারিত দিনে শিবরাত্রি / শিবলিঙ্গের পূজা করা হয়।

শিবলিঙ্গ পূজা
ছবি : bengali.news18.com (সংগৃহিত)

আমি ১৪০০ বাংলা সনের প্রথম দিকে একবার ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে অবস্থান করেছিলাম প্রায় বছর দেড়েকেরও বেশি। সেখানে থাকা অবস্থায় দেখেছি সেখানকার শিবরাত্রি উদযাপনের দৃশ্য। সেখানকার মানুষের মুখে শুনেছি, দিল্লি, চেন্নাই, হরিয়ানায় খুবই জাঁকজমকভাবে এই দিবসটি পালিত হয়। শিবের পূজার দিনে মেয়েরা পু‌রুষদের সাহায্যকারী হিসেবেও কাজ করেন‌। যেমন, ধোয়ামোছা, শঙ্খ বাজানো, উলুধ্বনি দেওয়া।
আবার আমাদের দেশেও দেখা যায়, মেয়েরা স্নানের পর, শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢেলে ভক্তি দেয়। মেয়েদের শিবভক্তির নানা উল্লেখ রয়েছে শিব পুরাণেও। শিবকে সন্তুষ্ট করতে পারলে নাকি মেয়েরা শিবের মতোই শক্তিমান ও আদর্শবান স্বামী লাভ করেন।

তথ্য সূত্র: ব্লগ বিডি নিউস ২৪, শব্দনীড়

Related posts

হিন্দুরা তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা করেন । এই বিষয়ে আপনার ভাবনা কি ?

News Desk

সাত পাকের মাহাত্ম্য, বিয়ের সময় সাত পাক ঘোরা অনিবার্য কেন ?

News Desk

গোত্র কী? সনাতন ধর্মে বর্ণপ্রথা

News Desk

Leave a Comment