free hit counter
স্বাস্থ্য

ফুসফুসে ক্যান্সারের (Lung cancer) লক্ষণ, করণীয় এবং চিকিৎসা

Lung cancer বা ফুসফুস ক্যান্সারে ফুসফুসের টিস্যুগুলিতে অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধি ঘটে। এই বৃদ্ধির ফলে মেটাস্টাসিস, প্রতিবেশী টিস্যু আক্রমণ এবং ফুসফুসের বাইরে সংক্রমণ ঘটতে পারে। প্রাথমিক ফুসফুসের ক্যান্সারের অধিকাংশই ফুসফুসের কার্সিনোমা, যা ফুসফুসের এপিথেলিয়াল কোষগুলিতে ধরা পড়ে। ফুসফুসের ক্যান্সার পুরুষদের ক্যান্সার-জনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ এবং মহিলাদের এরূপ মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ।

বর্তমানে ফুসফুসে ক্যানসার সবচেয়ে মারাত্মক ক্যানসারগুলোর একটি। প্রাথমিক স্তরে এটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ না করলে পরবর্তী সময়ে এটি মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো এখন বাংলাদেশেও এর উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। আর ক্যানসার নির্মূলে সবার আগে প্রয়োজন জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলা।

ফুসফুস ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষণগুলি সর্বদা দেখা যায় না। যতক্ষন না রোগটি পরবর্তী পর্যায় পৌছায়ে। তবে কিছু লোক লক্ষণগুলি লক্ষ্য করতে পারে যা তারা মনে করেন কম গুরুতর অসুস্থতার সাথে সম্পর্কিত। এটিতে নিম্নলিখিত কয়েকটি লক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

♦ খিদে কমে যাওয়া।
♦ কোনও ব্যক্তির স্বরে পরিবর্তন, আওয়াজ বসে যাওয়া।
♦ ঘন ঘন বুকে সংক্রমণ, যেমন ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া।
♦ নিস্তেজ কাশি।
♦ শ্বাসকষ্ট।
♦ অব্যক্ত মাথাব্যথা।
♦ ওজন কমে যাওয়া।
♦ বুকে কফ জমা হওয়া।
♦ একজন ব্যক্তির ফুসফুসের ক্যান্সারের সাথে সম্পর্কিত আরও গুরুতর লক্ষণগুলির অভিজ্ঞতা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বুকের তীব্র ব্যথা বা হাড়ের ব্যথা বা রক্ত ​​জমাট।

ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণ

এমন বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ রয়েছে যা ফুসফুসের ক্যান্সার বিকাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং লক্ষণগুলি দেখাতে শুরু করে। তামাক ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ, যা ফুসফুসের ক্যান্সারের 80% মৃত্যুর জন্য দায়ী।

অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে কিছু রয়েছে:

♦ রেডনের এক্সপোজার
♦ অ্যাসবেস্টস এক্সপোজার
♦ কর্মক্ষেত্রে অন্যান্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এজেন্টদের এক্সপোজার যা তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেমন ইউরেনিয়াম, আর্সেনিক এবং ডিজেল নিষ্কাশনের মতো রাসায়নিকগুলি সহ
♦ পানীয় জলে আর্সেনিক
♦ বায়ু দূষণ
♦ ফুসফুস ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস
♦ স্তন ক্যান্সারের মতো আগের ক্যান্সারের চিকিত্সার জন্য রেডিয়েশন থেরাপির এক্সপোজার।
♦ উত্তরাধিকারসূত্রে জেনেটিক পরিবর্তনগুলি যা ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে

ফুসফুস ক্যান্সার রোগ নির্ণয়

এক্স-রে : ফুসফুসের ক্যান্সার নির্ণয়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এক্স-রে। যেকোনো ব্যক্তির, বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব, ধূমপায়ীর দীর্ঘমেয়াদি কাশি হলে অবশ্যই এক্স-রে করা উচিত।

শ্লেষ্মার সাইটোলজি : রোগীর কফ বা শ্লেষ্মায় ক্যান্সার কোষ আছে কি না তা এই পরীক্ষায় জানা যায়।

বুকের সিটি স্ক্যান : এক্স-রের চেয়ে আরো সূক্ষ্মভাবে ফুসফুসের ক্ষত ধরা পড়ে সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে। ক্যান্সারটি কতটা বিস্তৃৃত, লিম্ফগ্ল্যান্ডে বিস্তৃত হয়েছে কি না—এ বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে জানা যায় এই পরীক্ষার সাহায্যে।

ব্রংকোসকপি : এই যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাসনালি ভেতরের ক্যান্সার টিস্যুর বায়োপসি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। আবার ব্রংকোসকপির সঙ্গে আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্র যুক্ত করে শ্বাসনালির কাছের লিম্ফনোড থেকে রস নেওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে বলে ইবাস (EBUS)।

সিটিচালিত এফএনএসি : যদি টিউমার ব্রংকোসকপিতে না পাওয়া যায়, তখন এই পরীক্ষার সাহায্যে ফুসফুসের ক্ষত থেকে রস নিয়ে ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়।

পেট স্ক্যান : পেট স্ক্যান পরীক্ষা সাধারণ সিটি স্ক্যানের চেয়ে আরো সূক্ষ্ম। তবে টিবি রোগের জন্য পেট পজিটিভ রিপোর্ট দিতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক থেকে পেট স্ক্যানের রিপোর্ট করতে হবে।

এ ছাড়া প্লুরাল ইফ্যুসান, লিম্ফনোড বায়োপসি ইত্যাদি নানা পরীক্ষায়ও ফুসফুসের ক্যান্সার নির্ণয় হয়।

ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসা

ফুসফুসে ক্যান্সার কোনো জীবাণুঘটিত রোগ নয়। বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি থাকলেও এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভের কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি এখনো আবিষ্কার হয়নি। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা গ্রহণ শুরু করলে মোটামুটি আরোগ্য লাভ করা সম্ভব।

সাধারণ ব্যবস্থা : প্রথম কাজ হলো, রোগীকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, ধূমপান বর্জনে যথাযথ চিকিৎসা প্রদানসহ অন্যান্য রোগের যথাযথ চিকিৎসা করা। সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি—সাধারণত ফুসফুস ক্যান্সারের এই তিন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। ক্যান্সারের হিস্টোপ্যাথোলজিক্যাল শ্রেণি ও পর্যায়ের ওপর চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে।

সার্জারি : স্কোয়ামাস ও অন্যান্য নন-স্মল সেল ক্যান্সারে প্রাথমিক পর্যায়ে সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়।

রেডিওথেরাপি : স্কোয়ামাস ও অন্যান্য নন-স্মল সেল ক্যান্সার যদি সার্জারির অযোগ্য হয়, তখন রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত রক্তকাশি, তীব্র হাড় ব্যথা, সুপিরিয়র ভেনা ক্যাভা শিরায় বাধা—এসবের উপশমে রেডিওথেরাপি বেশ কার্যকর।

কেমোথেরাপি : স্মল সেল ক্যান্সারের মূল চিকিৎসা কেমোথেরাপি। এর সঙ্গে রেডিওথেরাপি চিকিৎসাও যুক্ত হয়। এ ছাড়া নন-স্মল ক্যান্সারেও সার্জারির আগে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।

ফুসফুস ক্যান্সারের প্রতিরোধে করণীয়

♦ সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। খাবারের মেন্যুতে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি নিয়মিত রাখা।

♦ ফুসফুসের ক্যান্সার প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ধূমপান না করা।

♦ অধূমপায়ীরাও একেবারেই বিপদমুক্ত নয়। শিল্প-কারখানা ও গাড়ির নির্গত কালো ধোঁয়াও ফুসফুসে ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

♦ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যেমন—ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, অ্যাসবেস্টস ইত্যাদি এড়িয়ে চলা। ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টিতে অ্যাসবেস্টসের প্রভাব এত বেশি যে সমসাময়িককালে জাহাজশিল্পে অ্যাসবেস্টসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

♦ ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ যেমন—যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া ভালো হওয়ার পর ফুসফুসের আক্রান্ত স্থানে ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। তাই যথাসম্ভব সতর্ক থাকা।

♦ ৫০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি যদি ৩০ বছরের বেশি প্রতিদিন ২০টির বেশি সিগারেটের ধূমপান করে, তাদের ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য স্ক্রিনিং করা উচিত। এভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা পড়লে চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যুহার কমানো যায়।