free hit counter
নিজেই নিজের চিকিৎসা করতে গিয়ে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না
স্বাস্থ্য

নিজেই নিজের চিকিৎসা করতে গিয়ে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না

কোভিড নাকি দূর হটছে গুটি গুটি পায়ে। ভ্যাকসিন পৌঁছে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা বা সেন্ট লুসিয়ায়। মাস্ক, কোভিড-নীতি বিসর্জন দিয়ে আমরা দৌড়তে শুরু করেছি। মাঝেমাঝে একটু থমকাচ্ছি ঠিকই, নতুন কোনও স্ট্রেনের কথা শুনে। কিন্তু ডোন্ট কেয়ার ভাবটা ঠিক মুখে লাগিয়ে রেখেছি।

কিন্তু বিশ্বের দুয়ারে যে দাঁড়িয়ে নতুন এক প্যান্ডেমিক! কেউ মনে করছেন, হয়তো বা শুরুও হয়ে গিয়েছে সেই অতিমারী। গেরিলা কায়দায় চোরাগোপ্তা হানা আসছে, লোক মরছে। আমরা কেবল টের পাচ্ছি না, ক্ষয়ক্ষতি এখনও বিপুল আকার নেয়নি বলে। কিন্তু সেই অতিমারী?

বিষয়টা আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে পাত্তা না দেওয়ার একটা প্রবল দেমাক কাজ করে। আমরা পেট খারাপ, গলায় ব্যথা হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতোই ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনি। অ্যান্টিবায়োটিক না বলে অ্যান্টিইনফেকটিভ বলাই ভালো। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিপ্রোটোজোয়াল—সব কিছুই অ্যান্টি ইনফেকটিভের আওতা ভুক্ত। এই ধরনের ওষুধের দুটো কি তিনটে ডোজ খাওয়ার পর যখন লক্ষণ কমতে শুরু করে, আমরাও ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিই। অনেক সময় দোকান থেকে কেনাই হয় অ্যান্টিবায়োটিকের দুটো বা তিনটে ট্যাবলেট।

এই ভাবে ইচ্ছে মতো অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে আমরা শুধু নিজেদের নয়, ক্ষতি করছি দেশের। সারা বিশ্বেরও। ফার্মে যে সব পশু-পাখি পালন করা হয় মানুষের খাওয়ার জন্য, তাদেরও যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সব কিছুই আসলে ক্ষতি করছে মানুষের। সঠিক ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক না ব্যবহার করায় জন্ম নিচ্ছে ব্যাকটিরিয়ার নতুন নতুন স্ট্রেন। তারাই আনতে চলেছে বিশ্বের নতুন অতিমারী– অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেসিস্ট্যান্স বা এএমআর।

দক্ষিণ এশিয়ায় সদ্যোজাত শিশুর এক ধরনের সেপসিস বা রক্তের সংক্রমণ হয়। যা ইদানীং অনেক বেড়ে গিয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া। বলা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক-রোধী ব্যাকটিরিয়ার স্ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। এই ধরনের ব্যাকটিরিয়াগুলোর কিন্তু কোনও অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে নেই। তাই সংক্রমণ হলে তা সারিয়ে তোলা খুব কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব।

উন্নত দেশগুলো এ ব্যাপারে এখনই সচেতন হতে শুরু করেছে। ব্রিটেনে এএমআর সংক্রান্ত বিশেষ এনভয় স্যালি ডেভিসের মন্তব্য, ‘কোভিডের ব্যাপারটা ছিল ফুটন্ত জলের মধ্যে জ্যান্ত লবস্টার ফেলার মতো। সঙ্গে সঙ্গে তা ছটফট করতে শুরু করে। আর এই এএমআর উল্টো। ঠান্ডা জলে লবস্টার দেওয়ার পর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। লাফালাফিটা কম।’

ব্যাপারটা কী রকম? ধরুন, কারও নিউমোনিয়া হয়েছে। তাঁকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে পুরো কোর্স না করে, আগেই থামিয়ে দেওয়া হল ওষুধ। নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী কিছু সংখ্যক ব্যাকটিরিয়া মরল। কিন্তু কিছু ব্যাকটিরিয়া যারা ওই অ্যান্টিবায়োটিকের অল্প কয়েকটা ডোজে মরে না কিন্তু পুরো কোর্স করলে মরত, তারা বেঁচে থাকল। এর পরেরবার ওই ব্যক্তির নিউমোনিয়া হলে তা ঘটবে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ওই দ্বিতীয় ব্যাকটিরিয়ার জন্য, যারা অনেক সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলেছে। ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়ার ক্ষেত্রে কোষের জেনেটিক ম্যাটিরিয়াল শুধু পরবর্তী প্রজন্মে নয়, অন্য প্রজাতির জীবাণুর মধ্যেও ট্রান্সফার হয়। ফলে নতুন স্ট্রেনের পাশাপাশি নতুন প্রজাতিও তৈরি হতে পারে যারা অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল। এই দ্বিতীয়বারের নিউমোনিয়া অনেক বেশি ভোগাবে। কারণ, আগের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে এরা লড়াই চালাতে সক্ষম।

এ ভাবেই জীবাণু-জগতে আমাদের শত্রু ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছি। অনেক মাইক্রোবায়োলজিস্ট মনে করেন, এ রকম চলতে থাকলে আমরা হয়তো উনবিংশ শতকে পৌঁছে যাব। পায়ে গ্যাংরিন হল, কোনও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করল না। সংক্রমণ রুখতে গ্যাংরিন-সহ পা কেটে বাদ দিতে হল।

এই ভয়াবহতা যাতে না ফেরে তার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন অনেকেই। ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে স্বাস্থ্য-আইন পড়ান প্রোফেসর কেভিন আউটারসন। তিনি এএমআরের প্রকোপ ঠেকাতে তৈরি করে ফেলেছেন কার্ব-এক্স নামের একটি সংস্থা। যে সংস্থায় বিনিয়োগ করেছে ব্রিটিশ ও জার্মান সরকার, ওয়েলকাম ট্রাস্ট, বিল অ্যন্ড মেলিন্দা গেটস ফাউন্ডেশন এবং আমেরিকান সরকারের কিছু দপ্তর। লক্ষ্য একটাই, অ্যান্টিবায়োটিকে রেসিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়া নতুন স্ট্রেনগুলোর বিরুদ্ধে আনকোরা অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এই নতুন ওষুধের ফেজ টু ও ফেজ থ্রি ট্রায়ালের জন্য।

এএমআর বা অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেসিস্ট্যান্ট স্ট্রেনের চোরাগোপ্তা হানা যেমন শুরু হয়েছে, উন্নত দেশ ব্যবস্থাও নিতে শুরু করেছে। কিন্তু বিভিন্ন স্ট্রেনের বিরুদ্ধে কার্যকরী নানা রকমের ওষুধ তৈরি সময় সাপেক্ষ। সেই সব অস্ত্র হাতে আসার আগেই এএমআর যদি অ্যাটাক করে, তা কিন্তু অনেক দ্রুত ছড়াবে।

তাই সাধু সাবধান। নিজে কেরামতি দেখিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের দুটো ট্যাবলেট খাওয়া বন্ধ করুন।