free hit counter
আদার ভেষজ গুণ, কার্যকারিতা ও ব্যবহার
স্বাস্থ্য

আদার ভেষজ গুণ, কার্যকারিতা ও ব্যবহার

আদা যে শুধু একটা মশলার উপাদান নয়, তা তো আপনারা সবাই জানেন। আদার ভেষজ গুণ অসীম। এমনিতে তো আদা চা আমরা সবাই খেয়ে থাকি সর্দি-কাশি হলে বা মাথা ধরলে। উপকারও পাই। কিন্তু জানেন কি, আদা শরীরের জন্য খুব উপকারী। এতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট, যা শরীরের রোগ-জীবাণুকে ধ্বংস করে। জ্বর জ্বর ভাব, গলা ব্যথা ও মাথাব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। তবে রান্না করার চেয়ে কাঁচা আদার পুষ্টিগুণ বেশি। মাইগ্রেনের ব্যথা ও ডায়াবেটিস জনিত কিডনির জটিলতা দূর করে আদা।

আসুন জেনে নিই আদার ভেষজ গুণ সম্পর্কে –

১. জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, ব্যথায় আদা উপকারী। কারণ আদায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা বডি টেম্পারেচারে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। শীতকালে ঠাণ্ডার সময় তাই আদা চা খেতে পারেন।

২. ঋতু পরিবর্তনের সময় অ্যাজমা, মাইগ্রেনের মতো সমস্যা প্রায়শই দেখা যায়। এই সময়ে ডায়েটে আদা রাখুন। সর্দি-কাশির প্রকোপের সময় মুখে আদা রাখলে, আরাম পাবেন।

৩. গা গোলানো ও বমিভাব থেকে রেহাই পেতে কয়েক কুচি আদা চিবিয়ে খেয়ে দেখুন। সমস্যা অনেকটা কমবে।

৪. আর্টারি ওয়ালে ব্যাড কোলেস্টেরল ও ফ্যাটি অ্যাসিড জমে করোনারি হার্ট ডিজিজের সমস্যা দেখা যায়। ফলে রক্ত চলাচলে অসুবিধে দেখা যায়। আদা রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। লিভার ও ব্লাডে কোলেস্টেরল অ্যাবজর্বশন কম রাখতে আদা সাহায্য করে।

৫. অতিরিক্ত ওজন ঝরাতেও আদা সাহায্য করে। টিস্যু বেশি এনার্জি ব্যবহার করায়, বেশি ক্যালরি বার্ন হয়।

৬. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর আদা ক্যান্সার ও হার্টের সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ওভারিয়ান ক্যান্সার প্রতিরোধে আদা উপকারী।

রোগের প্রতিষেধক হিসেবে আদা–

রোগের প্রতিষেধক হিসেবে প্রকৃতির ভান্ডারে যে যে অস্ত্র আছে, তার বেশির ভাগই উপস্থিত রয়েছে আদার মধ্যে।তাই তো শুধু আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরাই নয়, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যারা চর্চা করেন, তারাও নিয়মিত আদা খাওয়া পরামর্শ দিচ্ছেন।

১. যে কোনও ধরনের যন্ত্রণা কমায়:

একেবারেই ঠিক শুনেছেন বন্ধু! বাস্তবিকই ব্যথা কমাতে আদার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। আসলে এই প্রকৃতিক উপাদানটির অন্দরে উপস্থিত একাধিক ইনফ্লেমেটরি উপাদান, শরীরে প্রবেশ করার পর এমন খেল দেখায় যে শরীরের মধ্যে ইনফ্লেমেশন হ্রাস পায়। আর এমনটা হলে ব্যথার প্রকোপ কমতেও সময় লাগে না।

২. হেয়ার ফলের মাত্রা কমে:

মাত্রারিক্ত চুল পড়ছে নাকি? তাহলে বন্ধু চুলের পরিচর্যায় আজ থেকেই কাজে লাগাতে শুরু করুন আদাকে। দেখবেন হেয়ার ফলের মাত্রা তো কমবেই, সেই সঙ্গে চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে চোখে পড়ার মতো। আসলে আদার মধ্যে উপস্থিত ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস এবং আরও নানাবিধ উপকারি উপাদান হেয়ার ফলিকেলের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি দূর করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চুল এতটাই শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে যে হেয়ার ফলের আশঙ্কা কমে। প্রসঙ্গত, এক্ষেত্রে ১ চামচ আদার পেস্ট নিয়ে তার সঙ্গে ১ চামচ অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল মিশিয়ে সেই মিশ্রনটি স্কাল্পে লাগিয়ে ধীরে ধীরে মাসাজ করতে হবে। এরপর ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে ভাল করে ধুয়ে ফেলতে হবে চুলটা। প্রসঙ্গত, সপ্তাহে দুবার এইভাবে চুলের পরিচর্যা করলেই সুফল মিলবে।

৩. ডায়াবেটিসের মতো মারণ রোগ দূরে থাকে:

নিয়মিত অল্প পরিমাণ আদা, পরিমাণ মতো লেবুর রসের সঙ্গে মিশিয়ে পান করার অভ্যাস করলে একদিকে যেমন কিডনির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি দূর হতে শুরু করে। এই খনিজটি ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা এত মাত্রায় বাড়িয়ে দেয় যে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে সময় লাগে না।

৪. খুশকির প্রকোপ কমে:

আদায় রয়েছে প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রপাটিজ, যা স্কাল্পে সংক্রমণের মাত্রা কমানের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া আদ্রতাকেও ফিরিয়ে আনে। ফলে খুশকির সমস্যা কমতে সময় লাগে না। সেই সঙ্গে স্কাল্পে কোনও ধরনের সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কাও হ্রাস পায়। এখন প্রশ্ন হল এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে আদাকে? এক্ষেত্রে ২ চামচ আদার পেস্ট নিয়ে তাতে ৩ চামচ তিল তেল এবং হাফ চামচ লেবুর রস মিশিয়ে একটা পেস্ট বানিয়ে নিতে হবে তারপর সেই পেস্টটি ভার করে স্কাল্পে এবং চুলে লাগিয়ে ৩০ অপেক্ষা করতে হবে। সময় হয়ে গেলে ধুয়ে ফলতে হবে চুলটা। সপ্তাহে কম করে দুবার এই পেস্টটিকে কাজে লাগালে দেখবেন খুশিকর মতো ত্বকের রোগ ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না।

৫. ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে:

অতিরিক্ত ওজনের কারণে যদি চিন্তায় থাকেন, তাহলে উপদেশ দেব আজ থেকেই আদা খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন দারুন উপকার মিলবে! আসলে আদার মধ্যে থাকা ডায়াটারি পাইবার অনেকক্ষণ পেটকে ভরিয়ে রাখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই খিদে কমিয়ে দেয়। আর এমনটা হলে খাবার পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে অতিরিক্তি মেদ ঝরে যেতে সময় লাগে না। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

৬. চুলের হারিয়ে যাওয়া আদ্রতা ফিরে আসে:

সম্প্রতি হওয়া একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে কলকাতা শহর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ার কারণে সিংহভাগেরই চুলের বারোটা বেজে গেছে। বিশেষত চুলের অন্দরে আদ্রতা কমে যাওয়ার কারণে চুল হয়ে যাচ্ছে রুক্ষ। আর একথা তো সবারই জানা আছে রুক্ষ চুলের আয়ু বেশি দিন হয় না। ফলে মাথা ফাঁকা হয়ে যেতে সময় লাগে না। প্রসঙ্গত, এমন পরিস্থিতির শিকার কি আপনিও হয়েছেন? তাহলে সপ্তাহে কম করে ২-৩ তিন আদার পেস্ট চুলে লাগাতে শুরু করুন। এমনটা করলে দেখবেন স্কাল্প এবং চুলের মধ্যে আদ্রতা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে চুল পড়ার হার তো কমবেই, সেই সঙ্গে চুলের সৌন্দর্যতাও বৃদ্ধি পাবে চোখে পরার মতো।

৭. হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে:

বেশ কিছু কেস স্টাডি করে দেখা গেছে নিয়মিত সকাল বেলা এক কোয়া করে আদা, সঙ্গে অল্প পরিমাণে মধু খাওয়া শুরু করলে পাকস্থলির কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। সেই সঙ্গে পাচক রসের ক্ষরণ বেড়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বদ-হজম এবং গ্যাস-অম্বলের মতো সমস্যা কমতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, গর্ভাবস্থায় সকাল সকাল যদি এই পানীয়টি খাওয়া যায়, তাহলে মর্নিং সিকনেসের মতো সমস্যা কমে নিমেষে।

৮. ব্রেন পাওয়ার বৃদ্ধি পায়:

একাধিক গবেষণায় একথা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে আদায় উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং উপকারি ভিটামিন, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যাতে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্মৃতিশক্তি বাড়তে শুরু করে। সেই সঙ্গে বুদ্ধিরও বিকাশ ঘটে চোখে পরার মতো। এবার বুঝতে পরেছেন তো নিয়মিত আদা খাওয়ার প্রয়োজন কতটা!

৯. চুলের সৌন্দর্য বাড়ে:

বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে আদার অন্দরে থাকা জিঞ্জেরল নামক উপাদানটি স্কাল্পের অন্দরে প্রবেশ করার পর চুলের গোড়ায় রক্তের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটতে সময় লাগে না। আর এমনটা হলে চুল সুন্দর হয়ে উঠতে যে সময় লাগে না, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে! প্রসঙ্গত, সপ্তাহে কম করে ৩-৪ দিন আদার পেস্ট চুলের গোড়ায় লাগাতে হবে, তাহলেই দেখবেন উপকার মিলবে একেবারে হাতে-নাতে!

১০. পেশীর কর্মক্ষমতা বাড়ে:

সারা সপ্তাহ দৌড়-ঝাঁপ করে কাজ করতে করতে সপ্তাহান্তে আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি পেশীই বেশ ক্লান্ত হয়ে পরে। এই সময় তাদের চাঙ্গা করার জন্য কি করা যেতে পারে? কিছুই নয়, এমন পরিস্থিতিতে এক গ্লাস আদা জল পান করে ফেলুন। এমনটা করলে দেখবেন নিমেষে শরীর চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

সতর্কতা –

১. গলস্টোনের সমস্যা থাকলে কত পরিমাণ আদা খাবেন, ডাক্তারের থেকে জেনে নিন।
২.গর্ভাবস্থায় সারা দিনে ২৫০ গ্রামের বেশি আদা খাবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়।

কিভাবে আদা খাবেন –

১. আদায় সামান্য পানি দিয়ে থেতলে নিন। আদার রস ও আদা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। চা বানানোর জন্যে এই পানি ব্যবহার করুন।
২. আদা ছিলে , সামান্য লেবুর রস মেশান। হজমে এই মিশ্রণ খুব ভালো কাজ করে।
৩. সারা দিনে ৫০ গ্রাম আদা খেতে পারেন। পাউডারড জিঞ্জার আধা চামচ করে দিনে ৩ বার খেতে পারেন। আদা সরু লম্বা করে চিকন করে কেটে নিন। সামান্য লবণ, গোলমরিচ মেশান।
৪. পানি ফুটিয়ে নিন। এবারে দুধ, মসলা, আদার রস, চা পাতা দিয়ে আরো একবার ফুটিয়ে নিন। কাপে চিনি দিয়ে পরিবেশন করুন। ওপরে সামান্য এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে পারেন।
৫. হজমে সাহায্য করার জন্যে আদা দিয়ে সিরাপ বানিয়ে নিন। জিরে গুঁড়ো, বিট নুন, আদার রস, লেবুর রস, ঠাণ্ডা জল একসাথে মিশিয়ে ব্লেন্ড করুন। তৈরি আদার সিরাপ। দুপুরে বা রাতের খাবারের পরে এই সিরাট খেতে পারেন।
৬. ভিনিগারে আদার টুকরো, লবণ, মরিচ দিয়ে কিছু দিন রাখুন। খাওয়ার সময় আচার হিসেবে খেতে পারেন।