free hit counter
শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি
মুক্তিযুদ্ধ

শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি

“স্বাধীনতা তুমি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি”

জেমসের এই গান শুনে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়নি কিংবা রক্তে আগুন ধরে যায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। আবেগী বাঙালির জন্য আবেগপূর্ণ এই গান। এই গানে বাংলাদেশের অসংখ্য মহাপ্রাণ মানুষের কথা বলা হয়েছে।ওপরের লাইনটিতে বলা হয়েছে জাহানারা ইমামের কথা। আমাদের আজকের গল্প, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাফী ইমাম রুমীকে নিয়ে।

জাহানারা ইমামের করা দুটি প্রশ্নের জবাবে সেদিন হয়তো অজিত নিয়োগী মিথ্যা বলেছিলেন অথবা তার করা ভবিষ্যৎ বাণী ভুল হয়েছিল। বলছি ১৯৭১ সালের ১৭ ই মার্চের কথা। অজিত নিয়োগী ছিলেন একজন এস্ট্রোলজার। সেদিন জাহানারা ইমামের বাসায় গেলে জাহানারা ইমাম তাকে দুটি প্রশ্ন করেছিল। এক নম্বর প্রশ্ন-দেশের রক্তস্রোত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে কিনা? দুই নম্বর প্রশ্ন- তার কপালে পুত্রশোক আছে কিনা? জাহানারা ইমামের করা দুটি প্রশ্নেই বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন অজিত নিয়োগী। তিনি এটি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাহানারা ইমামের জোরের মুখে অজিত নিয়োগী বললেন রক্তস্রোতের সম্ভাবনা খুবই ছিল। অল্পের জন্য ভয়াবহ রক্তস্রোতের সম্ভাবনা এড়ানো গেছে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে বললেন “না আপনার কপালে পুত্রশোক নেই। তবু রুমীকে একটু সাবধানে রাখবেন।” সেদিন হয়তো অজিত নিয়োগী ভবিষ্যদ্বাবাণী করার ক্ষেত্রে ভুল করেছিলেন অথবা জেনেও মিথ্যে বলেছিলেন। কেননা পরবর্তীতে জাহানারা ইমামকে পুত্রশোকে কাতর হতে হয়েছিল। ১৯৭১ এর ২৯ আগস্ট পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে রুমী। পরবর্তীতে শহীদ হন রুমী। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার মৃত্যুর জন্য জাহানারা ইমাম শহীদ জননী উপাধি পান।

শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি
ছবি: newsviews.media

প্রারম্ভিক জীবন

শাফী ইমাম রুমী ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠপুত্র। ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ রুমীর জন্ম। দীর্ঘ ১৪ ঘন্টা গর্ভধারিনী মাকে কষ্ট দিয়ে বেলা বারোটার দিকে পৃথিবীর আলো দেখেন তিনি। রুমীর জন্ম হয় তার বাবা শরিফ ইমামের বন্ধু ডা. এ. কে খানের তত্ত্বাবধায়নে। বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিল বলে সদ্যভূমিষ্ঠ রুমী সম্পর্কে ডাক্তার তার মাকে বলেছিল, “এটি ১৯৫১ সাল। ২০ বছর পরে ১৯৭১ সালে এই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে।” পিতা শরীফ ইমাম ও মাতা জাহানারা ইমাম প্রিয় কবি জালালউদ্দিন রুমীর মত জ্ঞানী ও দার্শনিক হবে ভেবে ছেলের নাম রেখেছিল রুমী। আজিমপুরের একটি কিন্ডারগার্টেন এ পড়াশোনার মাধ্যমে রুমীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৬৮ সালে আদমজী পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ হতে মেট্রিকুলেশন পাশ করে রুমী। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ডের তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে স্টারমার্ক নিয়ে আই এস সি পাশ করেন রুমী। ১৯৭০ এর অক্টোবরে ভর্তি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তথা বুয়েটে। কিন্তু সেখানে ক্লাস শুরুর কথা ছিল মার্চ থেকে। তাই অবসর সময় কাজে লাগাতে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিক্স বিভাগের প্রধানের অনুমতি নিয়ে সেখানে ক্লাসও করেন রুমী। আর এর মাঝেই সুযোগ পান আই.আই.টি তে। সেখানে ক্লাস শুরুর কথা ছিল ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বরে।

শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি
ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন

রুমী ছিলেন বেশ অদ্ভুত ধরনের। তার সাথে কথায় কেউ পারত না। কখনও বাংলা, কখনও ইংরেজি কবিতা কিংবা উপন্যাসের যুক্তি দিয়ে মা-বাবাকে কথায় হারিয়ে দিতেন, কখনো বা হৃদয়-গলানো হাসি। বেঁচে থাকলে উদ্দাম এই তরুণ হয়তো বিশ্বজয় করতে পারতেন। পিতা-মাতার মতোই রুমী ছিল রাজনীতি সচেতন। তবে রুমী কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিল না। সদস্য না থাকা সত্ত্বেও একাত্তরের উত্তাল সময়ে প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল তার। মা জাহানারা ইমাম যখন জানতে চায়, “তুইতো কোন দলের মেম্বার নস। তোর এত সব মিটিংয়ে যাওয়া কেন?” জবাবে রুমী বলেন, “এখন কি আর ব্যাপার দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে নাকি আম্মা? এখনতো এ আগুন ছড়িয়ে গেছে সবখানে।” মা অন্তঃপ্রাণ ছেলে রুমী। একদিন তার যুদ্ধে যাবার সুযোগ এসে গেল। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে রুমী হয়তো পারতেন বিদেশে গিয়ে নিজের জন্য কিছু করতে। আর দশজন বাঙালি যুবকের মতো সদ্য তারুণ্যে পা রাখা রুমী ইমামের মনে নাড়া দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে যাবার আহ্বান । বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ,

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”

যারা দেশকে ভালোবাসে, এ ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না তাদের। রুমীও পারেননি সেই ডাককে অবহেলা করতে। ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ এর রাতে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার সাক্ষী হয়ে যারা সেই রাত্রেই দেশকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করেছিলেন তাদের মধ্যে রুমীও ছিলেন একজন। এপ্রিল থেকেই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মাকে রাজি করানোর চেষ্টায় থাকে রুমী। কিন্তু মা জাহানারা ইমাম চেয়েছিলেন তাকে আমেরিকা পাঠিয়ে দিতে। কেননা সেপ্টেম্বর থেকে তার আই.আই.টিতে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। তখন কাতরভাবে রুমী বলেছিল, “আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রী নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব, কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিন ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। তুমি কি তা চাও আম্মা?” ছেলের এমন অটল দেশপ্রেম দায়িত্ববোধ দেখে মা জাহানারা ইমাম তাকে আর না করতে পারেননি। তিনি বলে উঠলেন, “না তা চাইনে। ঠিক আছে তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।”

শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি
ছবি: সংগৃহীত

২১ এপ্রিল মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ৭ ই মে রুমী সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালায়। কিন্তু রুমীসহ তার দল যে পথ দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিবে ঠিক করে তা ততদিনে পাক বাহিনীর দখলে চলে যায়। ১১ই মে পুনরায় ঢাকা ফিরে আসেন রুমী। ১৪ই জুন দৃঢ়চেতা রুমী আবার চেষ্টা চালান। এবার মেলাঘরের উদ্দেশ্যে। সফল হন তারা। ভারতে রুমী ২ নং সেক্টরে যোগ দেয়। সেখানে প্রায় দুই মাসের মত গেরিলা ট্রেনিং সহ সুপার এক্সপ্লোসিভ বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন রুমী। আগষ্টের ৮ তারিখে রুমী অন্য গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে ঢাকায় ফিরে আসেন। কাজী কামাল উদ্দিন ছিলেন সেই দলের প্রধান। তাদের দায়িত্ব ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ধ্বংস করে দেয়া। কিন্তু সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এ হেভি সিকিউরিটির কারণে তাদের অ্যাকশনে যেতে সময় লাগছিল। এরমধ্যে রুমীদের দল বেশ কয়েকটি অপারেশন করে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ধানমন্ডিতে দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন। ২৫ শে আগস্ট রুমী সহ আরো পাঁচজন গেরিলা যোদ্ধা ধানমন্ডিতে তিনটি অপারেশন করে। প্রথমটি ছিল ১৮ নম্বর রোডে। দ্বিতীয় টি ছিল ৫ নম্বর রোডে। প্রথম দুটি অপারেশন সফল ভাবে সম্পন্ন করার পর রুমীদের গাড়ি যখন গ্রীনরোড দিয়ে এগোচ্ছিল তখন রুমী লক্ষ করে পাকিস্তানি আর্মির একটি জীপ তাদের অনুসরণ করছে। জিপ দেখামাত্রই রুমী তার হাতের স্টেনগানের বাট দিয়ে গাড়ির পেছনের কাঁচ ভেঙ্গে ফেলে ফায়ার শুরু করে। এতে গাড়ির চালক গুলিবিদ্ধ হয়। জিপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোড়ে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খায় এবং সঙ্গে সঙ্গে উল্টে যায়। এই অপারেশনের পর রুমী তার সহযোদ্ধাদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা গ্রেফতার ও পরিণতি

এই অপারেশনের পর ২৯ আগস্ট আনুমানিক রাত বারোটার দিকে রুমীসহ তার বাবা, ভাই জামি, বন্ধু হাফিজ ও চাচাতো ভাই মাসুমকে তাদের বাসভবন কনিকা থেকে গ্রেফতার করে পাক হানাদার বাহিনী। সেই দিন কোনো এক অজ্ঞাতনামা উৎস থেকে হানাদার বাহিনী আরো বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধাদের আটক করে। তাদের মধ্যে ছিলেন বদি, চুল্লু, সামাদ, জুয়েল, বাশার, আজাদ, আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারক সহ আরো অনেকে। এমপি হোস্টেলের টর্চার সেলে নেওয়ার পর রুমী তার বাবা ভাই কে বলেছিল, “তোমরা কেউ কিছু স্বীকার করবে না, তোমরা কেউ কিছু জানো না, আমি তোমাদের কিছু বলিনি।” ভয়ঙ্কর অত্যাচারেও একটি তথ্য ও রুমী থেকে বের করা যায় নি। অনিবার্য পরিণতির কথা জেনেও অন্য সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষার জন্য সহ্য করে যান অমানুষিক নির্যাতন। একই সময় ধরা পড়া রুমীর সহযোদ্ধা মাসুদ সাদেক জানান, “চরম অত্যাচার সহ্য করেও রুমী কারো নাম প্রকাশ করেনি।” দুদিন অমানুষিক নির্যাতন চালানোর পর রুমীর পরিবারের বাকিদের ছেড়ে দেয়া হলেও রুমীকে ছাড়া হয়নি। ফিরে আসার সময় বাবা শরীফ ইমাম রুমীর কথা জিজ্ঞেস করলে পাকিস্তানি কর্নেল জানায়, রুমী যাবে এক দিন পরে, ওর জবানবন্দি নেওয়া শেষ হয়নি। পরের সেই দিনটি আর আসেনি। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোগী বদিকে আর কখনো দেখা যায়নি। ৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, সেটা পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেরই পছন্দ ছিল না। তাই এর আগের রাতে অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বর তাড়াহুড়ো করে শ খানেক বন্দীকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ধারণা করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর রুমী শহীদ হন।

শাফী ইমাম রুমী: আর ফিরে আসেনি
ছবি: সংগৃহীত

ধরা পড়ার আগে ২৮ আগস্ট মা জাহানারা ইমাম রুমী কে বলেছিলেন, “রুমী, রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই দেখলিনা। জীবনের কিছুই তো জানলি না।” জবাবে এক বেদনা হাসি হেসে রুমী বলেছিল, “যদি চলেও যাই কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না। হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মত জানিনা, তবু জীবনের যত রস, মাধুর্য, তিক্ততা, বিষ সব কিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যে পেয়েছি।” সেদিন সেই বিষণ্ণ বিকেলে রুমী তার মাকে বলেছিল তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম-বিরহ-মিলন-বিচ্ছেদের এক অনুক্ত কাহিনী। একটি পরমা সুন্দরী মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তারচেয়ে দু ক্লাস সিনিয়র ছিল। সেই মেয়ে তাকে হাতে ধরে প্রেমের আনন্দ বেদনার রাজ্যে প্রবেশ করিয়েছিল। শেষে মেয়েটি ছলনার শিকার হয়েছিলেন তিনি, রুমী তাতে প্রচন্ড দুঃখও পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে মেয়েটির ওপর তার কোন রাগ ছিল না। কারণ মেয়েটি তার কাছে তখন আর কোন রক্তমাংসের মানবী ছিল না। তখন সে তার মনের মধ্যে হয়ে উঠেছিল বিশুদ্ধ প্রেমের প্রতীক স্বরূপিনী।