Image default
মুক্তিযুদ্ধ

মেজর জলিল : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার

১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার উজিরপুরে জোনাব আলি চৌধুরী ও রাবেয়া খাতুনের ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্র শিশু। নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। আব্দুল জলিল উজিরপুর থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে আইএ পড়তে ভর্তি হন পাকিস্তানের মারি ইয়ং ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন এ। আইএ পাশ করে ১৯৬২ সালে পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন ট্রেইনি অফিসার হিসেবে। ১৯৬৫ সালে কমিশন লাভ করে অংশ নেন ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান –ভারত যুদ্ধে। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। পরবর্তীতে যার নামের সাথে স্থায়ীভাবে লেগে যায় এই মেজর শব্দ। মানুষ মোহাম্মদ আব্দুল জলিল কে এক নামে চিনে মেজর জলিল নামে। মেজর জলিল হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন বহুল আলোচিত চরিত্র।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অসুস্থ মাকে দেখতে পাকিস্তান থেকে ছুটি নিয়ে নিজের বাড়িতে আসেন মেজর জলিল। ছুটি শেষ হয়ে গেল, কিন্তু সারাদেশ তখন উত্তপ্ত। তাই মেজর সাহেব ফিরতে বিলম্ব করছিলেন। এর মাঝে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আক্রমন করে বসে নিরীহ বাংলাদেশিদের উপর। একদিন পর রেডিওতে শোনা যায় আরেকজন মেজরের কণ্ঠ – “I am major zia, hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh……”. (“আমি মেজর জিয়া, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি……”) । স্বাধীনতার এই আহবানে দেশকে মুক্ত করতে পাকিস্তান বাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন মেজর জলিল। একজন মেজরকে পেয়ে বরিশাল অঞ্চলের ইপিআর, পুলিশ, আনসার সহ তরুনরা আশাবাদী হয়ে ওঠে। মেজর জলিলের ভাষণে উদ্দীপিত হয়ে যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। মুজিব নগর সরকার গঠনের পর মেজর জলিলকে বানানো হয় খুলনা, বরিশাল অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক।

মেজর জলিলঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার
মেজর জলিল ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার ; ছবি : barisalpedia

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অনেক ত্যাগ আর কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া গেল স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ! ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা জাতি বিজয় পেল ১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীন দেশে বিজয় অর্জনের ২ সপ্তাহ পরে খুলনা থেকে যশোর হয়ে একটি প্রাইভেট কার ও একটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকা যাচ্ছেন ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা। যাদের মধ্যে ছিলেন ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা কমান্ডার মেজর জলিল। এবং বাকি সকলেই ৯ নম্বর সেক্টরের শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা যারা দেশকে মুক্ত করতে বীরত্বের সাথে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে লড়েছেন। এবং বাধ্য করেছেন খুলনার পাক বাহিনীকে আত্নসমর্পন করতে (১৭ ডিসেম্বর)। ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার।

সকাল ১০টার দিকে তাদের বহন করা প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস যখন যশোর শহরে প্রবেশ করবে তখনই কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নং সেক্টরের আরেকদল সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা পথরোধ করলো তাদের। যাদের সাথে ছিল অস্ত্র তাঁক করে পজিশন নিয়ে থাকা প্রায় ২০জন মেশিনগানধারী মুক্তিযোদ্ধা। মেজর জলিলের সঙ্গীরাও ছিল সশস্ত্র। তারা বন্দুক তাক করতে গেলে মেজর জলিল “ডোন্ট ফায়ার” বলে থামিয়ে দেন তাদের।

যে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করলেন সেই দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের মাত্র ২ সপ্তাহের মাঝে ৯ নং সেক্টরের অধিনায়কসহ ১৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করা হলো! আটক করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় যশোর সার্কিট হাউজে। মেজর জলিল কে আলাদা করে বাকিদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে মেজর মঞ্জুর আসলে মঞ্জুর ও মেজর জলিলের মাঝে তুমুল কথা কাটাকাটি হয়। আমাকে গ্রেফতার করার সাহস হলো কিভাবে , কে নির্দেশ দিয়েছে- মেজর জলিলের এমন প্রশ্নের উত্তরে মেজর মঞ্জুর জানান- জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে গ্রেফতার করা হয়েছে। হাই কমান্ডের নির্দেশ অমান্য, খুলনা জয়ের পর লুটতরাজ করা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তার বিভিন্ন বক্তব্য ও পদক্ষেপের কারনে কোর্ট মার্শালে তার বিচার করা হবে।

কিন্তু তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখা হয়। এদিকে সন্তানের কোন খবর না পেয়ে মেজর জলিলের মা রাবেয়া খাতুন ২ সপ্তাহ পর প্রধানমন্ত্রী  বরাবর একটা স্মারকলিপি প্রেরণ করেন। কিন্তু এর কোন জবাব না পেয়ে ১ মাস পর ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী সমীপে এক দুঃখিনী মায়ের ফরিয়াদ’ – শিরোনামে একটি খোলাচিঠি বরিশাল, খুলনা ও ঢাকায় বিলি করেন। তাতে তিনি তার সন্তানের খোঁজ জানতে চেয়ে ও সন্তানকে ফেরত পাওয়ার ফরিয়াদ জানিয়ে লিখেছিলেন- “জলিলের মা হওয়ার অপরাধে হানাদার বাহিনীর অকথ্য জিজ্ঞাসাবাদ এমন কি আমার ও আমার একমাত্র ভাইয়ের উপর শারীরিক নির্যাতন তথা পাক সেনাদের ভারি বুটের কাল দাগ আমাদের ততটা দুঃখ ও বেদনা দিতে পারেনি, যতটা দুঃখ আর প্রবঞ্চনা পাচ্ছি দিনের পর দিন বৈধব্য জীবনে আমার আদরের দুলালকে হারিয়ে।“

মজলুম নেতা মওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক হককথা পত্রিকায় ‘মেজর জলিল সমাচার শ্বেতপত্র চাই’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন লিখা হয়। সেখানে বলা হয়- ‘বাংলাদেশ সরকার মেজর এম.এ. জলিলের অন্তরীণ সম্পর্কিত নানা প্রশ্নকে চেপে যাচ্ছেন। কিন্তু কি করে সম্ভব একজন দুর্বার স্বাধীনতা সংগ্রামীর ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে ঢেকে রাখা? “

এভাবে কোন খোঁজ না পেয়ে জনমনে মেজর জলিল বিষয়ে সরকারের উপর নেতিবাচক ধারনা জন্ম নিতে থাকে। মেজর জলিলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকতে। বরিশাল ও খুলনায় মেজর জলিলের সমর্থনে বিক্ষোভ হয়। বরিশালে তার গ্রেফতারের প্রতিবাদে ধর্মঘটও পালিত হয়। ঢাকায় বিভিন্ন দেয়ালে মেজর জলিলের গ্রেফতার নিয়ে দেয়াল লিখন হয়।

জনগণের ক্ষোভের কারনে অবশেষে সরকার মেজর জলিলকে গ্রেফতারের কথা প্রকাশ করে। হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারনে সেনাবাহিনীর ট্রাইবুনালে তার বিচারের ঘোষণা দেয়। ঘোষণা মত ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইবুনালের প্রধান করা হয় আরেক সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল তাহের বীর উত্তম কে।সেনাবাহিনীতে জনপ্রিয়তা ও কর্ণেল তাহেরের জোরালো ভূমিকার কারনে বিচারে জলিলকে চাকরিচ্যুতির চেয়ে বেশী শাস্তি দেয়া যায়নি। ১৯৭২ সনের ৪ জুলাই তিনি মুক্তি লাভ করেন।

সেই বিচারে পুরো অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অত্যন্ত কলঙ্কজনক একটি ঘটনা। আর শুধু ভারতীয় বাহিনীকে এতে জুড়ে দেওয়া আসলে নেপথ্যের সত্যটুকু থেকে নজর সরানোর জঘন্য একটি প্রয়াস মাত্র। আবার জলিলের স্মৃতিকথায় দেখা গেছে তাদেরকেই দুষতে, এই অবস্থানের পেছনে তার পরবর্তীকালের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাব কতখানি সেটাও বিবেচ্য। প্রসঙ্গতই বলতে হয় দূরত্বগত নৈকট্যে আর সব সেক্টর কমান্ডারের চেয়ে জলিলই ছিলেন ভারতীয় বাহিনীর সবচেয়ে কাছাকাছি। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি বাড়তি সুবিধাদি পেয়েছেন। এমনকি মে মাসের শুরুতে সুন্দরবনের বুড়ি গোয়ালিনী রেঞ্জে পাক বাহিনীর এমবুশে দু লঞ্চ বোঝাই অস্ত্র খোয়ানোর পর কলকাতায় ভারতীয় সেনা সদর ফোর্ট উইলিয়ামে মেজর জলিলকে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সে দায় থেকে তিনি মুক্তি পান। এবং পরবর্তী সময়ে জেনারেল অরোরার আস্থাভাজনদের একজন ছিলেন খুলনা মুক্ত হওয়া পর্যন্ত।

কিন্তু কেন গ্রেফতার কর হলো মেজর জলিল কে? কেন স্বাধীন দেশের প্রথম রাজবন্দী করা হলো একজন সেক্টর কমান্ডারকে! কেন এরকম অভিযোগ আনা হলো!

এ নিয়ে খুব সরল উত্তর দেয়া হয়- বিজয়ের পর ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া অস্ত্রসস্ত্র সব লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু জলিল এর জোড়ালো প্রতিবাদ করে, এর ফলেই ভারতীয় বাহিনী ক্ষুব্দ হয় । কিন্তু উত্তর টা কি আসলেই এত সরল? এটি একটি কারন কিন্তু একমাত্র কারন হয়ত নয়। ভারতীয় বাহিনী ক্ষুব্ধ হলেও কিন্তু কেন একজন সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর যে নিজেও চরম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে, আরেকজন সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে গ্রেফতারে নেতৃত্ব দিবে! ভারতীয় বাহিনীর লুটতরাজ এর প্রতিবাদ করলে তো মেজর মঞ্জুর ও জেনারেল ওসমানীর খুশি থাকার কথা! তা না হয়ে গ্রেফতার! আবার কেন একজন সেক্টর কমান্ডার হয়েও কোন খেতাব পেলেন না মেজর জলিল? যেখানে অন্যসকল সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন। কতজন বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক হয়েছেন। দু একজন তো যুদ্ধ না করেও পেয়েছেন।

মেজর জলিলঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার
মেজর জলিল ও এম. এ. জি. ওসমানী যুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন ; ছবি : somoyekhon

তাহলে জলিল কার রোষের শিকার? দুঃখজনক উত্তরটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি খোদ কর্ণেল ওসমানীর বিরাগভাজন ছিলেন তিনি। ওসমানী জলিলের ওপর বিতৃষ্ণা প্রকাশে ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন মেজর জয়নাল আবেদীন ও কর্ণেল মঞ্জুরকে (প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সেনাসদস্যদের হাতে নিহত)। জলিলের গ্রেপ্তারের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন মঞ্জুর তার অধীনস্থদের দিয়ে এবং বন্দী করে নিয়ে যান যশোর সার্কিট হাউজে। আর ওসমানীর রোষের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে নয় নম্বর সেক্টরের অগণিত দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধার পদকবঞ্চিত থাকা, যেখানে মুক্তিযুদ্ধে একটিও গুলি না ছুড়ে কলকাতার সদর দপ্তরে ফাইলপত্র নাড়াচাড়ার দায়িত্বে থাকা মেজর নুরও (বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামী) বীরত্বের খেতাব পেয়েছেন স্রেফ সেনাপতির আস্থাভাজন হওয়ার কার‌ণে।

খুলনা স্বাধীন হল ১৭ ডিসেম্বর, ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের কথা আসলে সেটা ১৭ ডিসেম্বরের পরেই হওয়ার কথা। কিন্তু এর আগের কিছু ঘটনা আমাদের ব্যাপারটিতে অন্য ইঙ্গিতও দেয়। পুরোপুরি সফলতার পরিচয় দেয়ার পরও কেন জয়নাল আবেদিন নামে অন্য একজন মেজরকে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে ৯ নং সেক্টরে নিয়ে এসে মেজর জলিলের সাথে সেকটরের কাজ ভাগাভাগি করতে বলা হল? পরে মেজর জলিলকে সরিয়ে এই মেজর জয়নাল আবেদিনকে ৯ নং সেক্টরের অধিনায়ক করা হয়। কেন ৮ নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর কে ৮ নং সেকটরের পাশাপাশি ৯ নং সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়।

৯ নম্বর সেক্টরের স্টাফ অফিসার ওবায়দুর রহমান মোস্তফার লেখা –‘মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর ও আমার যুদ্ধকথা’ বইয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়া যায়।

তাহলে মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি এমএজি ওসমানীর সাথে মেজর জলিলের কি এমন দ্বন্ধ ছিল যেটার কারণে তার এমন পরিণতি?

বৃটিশ আর্মির সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল আতাউল গনি ওসমানির প্রথাগত যুদ্ধ পদ্ধতির সাথে তখনকার তরুন সেক্টর কমান্ডার দের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে কয়েকবার মতবিরোধ হয়। মেজর জিয়া, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জলিলসহ সেক্টর কমান্ডাররা তো একবার জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর ফলে ওসমানী তখন পদত্যাগও করেছিলেন। যদিও পরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের অনুরোধে আবারও সেনাপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু আবারো মেজর জলিলের গেরিলা যুদ্ধকৌশল নিয়ে দুজনের দন্দ্ব দেখা দেয়। জলিলের ‘হিট & রান’ (আঘাত করেই পলায়ন) পদ্ধতি পছন্দ ছিল না জেনারেল ওসমানীর। কলকাতায় ডেকে জলিলকে এরকম ছোটখাটো গেরিলা আক্রমণ এর বদলে জোড়ালো সম্মুখ আক্রমণ এর নির্দেশ দেন ওসমানী। কিন্তু জলিল সে নির্দেশ না মেনে গেরিলা আক্রমণই অব্যহত রাখেন। এবং ওসমানীকে টপকিয়ে ভারতীয় বাহিনীর সম্মতি আদায় করে নেন। কিছুদিন পরে মেজর জলিলের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পারুলিয়া ব্রিজ ধ্বংস করে মুক্তিযোদ্ধারা। নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্রিজ ধ্বংসে ক্ষুব্ধ হয়ে জেনারেল ওসমানী সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল, সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হুদা এবং অপারেশনের নেতৃত্বে থাকা ক্যাপ্টেন বেগকে সকলের সামনে তিরস্কার করেন। ব্রিজ ধ্বংসের কারন বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেও জেনারেল ওসমানী কোন কথা শোনেন নি।

মেজর জলিলঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার
পারুলিয়া ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডারকে নির্দেশনা দিচ্ছেন মেজর জলিল ও সর্বাধিনায়ক এম. এ. জি. ওসমানী

এর কিছুদিন পরেই মেজর মঞ্জুরকে যশোর সদর দপ্তর থেকে ৮ নং সেক্টরের পাশাপাশি ৯ নং সেক্টরও দেখতে বলা হয়। মেজর জলিল তার গেরিয়া যুদ্ধ কৌশল ও সাহসিকতার জন্য ভারতীয় বাহিনীর কাছে বেশ আস্থাভাজন ছিলেন। এমনকি ১৯৭১ সালের মে মাসে সুন্দরবনে পাকিস্তানি বাহিনীর হঠাৎ আক্রমনে দুই লঞ্চ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ নষ্ট হয়ে যায় মুক্তিবাহিনীর। এতে প্রাথমিকভাবে কেউ কেউ মেজর জলিলকে সন্দেহ করলেও জেনারেল অরোরা ও দলবীর সিং এর আস্থা ও আশ্বাসে কোন অভিযোগ আনা হয় নি। বরং দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ মেজর জলিলকে পাকিস্তান বাহিনীর আত্নসমর্পন পর্যন্ত কলকাতা থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী ৯নং সেক্টর মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে রাখা হয় যেখানে বেশ কিছু সেক্টরে অধিনায়কে রদবদল হয়েছে। হয়ত এ কারনেই জলিলকে সরাসরি অপসারণ না করে মেজর মঞ্জুরকে ব্যবহার করলেন জেনারেল ওসমানী।

কিন্তু কিছু ভুল বুঝাবুঝিতে এই বদলের পরিনাম ভালো হয়নি। যশোরে পরাজিত পাক বাহিনী খুলনায় এসে প্রতিরোধ গড়ে তুললে মেজর মঞ্জুর তার বাহিনী নিয়ে খুলনা আসে এবং দুই সেক্টর মিলে শিরোমণির ভয়াবহ ট্যাংক যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সাথে লড়ে পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করে।

খুলনা জয়ের পর মেজর জলিল তার ৯ নং সেক্টরের বাহিনী নিয়ে খুলনা শহীদ হাদিস পার্কের উত্তরে ইউনাইটেড ক্লাবে অবস্থান নেন। মেজর মঞ্জুর খুলনা সার্কিট হাউজে আসেন। মেজর মঞ্জুর মেজর জলিলকে ডেকে পাঠান। সেসময় মেজর জলিল একটি পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিচ্ছিলেন। ফলে তিনি জানান পরে আসবেন তিনি। এতে মেজর মঞ্জুরের অহংবোধে আঘাত লাগে। ক্ষিপ্ত মঞ্জুর মেজর জলিলকে হুমকি দিয়ে যান এর পরিনাম ভাল হবে না।

পরদিন মেজর জলিল খুলনা থেকে বরিশাল যান। সেখানে হেমায়েতউদ্দিন মাঠে তাকে গণসংবর্ধনা দেয়া হলো। যাওয়ার আগে ক্যাপ্টেন নুরুল হুদাকে ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে যান। ২ দিন পর বরিশাল থেকে খুলনা ফিরে এসে দেখেন তাকে সেক্টর কমান্ডার এর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মেজর জয়নাল আবেদিনকে কমান্ডার এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জলিল তার সহযোদ্ধাদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব না আসা পর্যন্ত চুপচাপ থাকবেন তারা। এদিকে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানিদের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্র নিয়ে যেতে চাইলে জলিল বাধা দেন। তিনি বলেন সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর মতামত না পাওয়া পর্যন্ত কোন অস্ত্র কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। এ নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর সাথে কথা কাটাকাটি হয় ।

কিছুক্ষণ পর মেজর মঞ্জুর ফোন করে জানান জেনারেল ওসমানী সকল সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে জরুরী মিটিং করবেন ঢাকায়। যশোর থেকে মেজর মঞ্জুরের জন্য একটা বিমান যাবে, মেজর জলিলও যেন একসাথে সেই বিমানে যায়। কিন্তু মেজর জলিল জানিয়ে দেন সে তার সঙ্গীদের নিয়ে সড়ক পথে যাবে। এবারো মেজর জলিলের এই সিদ্ধান্তে চরম অপমানিত হলেন মেজর মঞ্জুর।

এরপর মেজর মঞ্জুর ও জেনারেল ওসমানীর কি কথা হয়েছিল সেটা জানা যায়নি। শুধু আমরা জানতে পারি মেজর জলিল সহ তার সঙ্গীদের রাস্তায় গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে আটক করে নিয়ে আসা হয়।

এর পিছনে জেনারেল ওসমানী ও মেজর মঞ্জুরের ইগো বা অহংবোধই মূল কারন নাকি অন্য কোন বড় কারন আছে সেটাও পরিষ্কার জানা যায় না।

মেজর জলিলঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার

তবে দুঃখের বিষয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুলোর মধ্যে একটা অভিযোগ ছিল লুটতরাজের। একজন সেক্টর কমান্ডারের বিরুদ্ধে আনা এরকম অভিযোগ আমাদের জন্য সত্যি লজ্জার।

মেজর জলিলের ও তার সঙ্গীদের ব্যাগ ও ট্র্যাংক একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভাঙা হয়। কিন্তু আফসোস তাদের ব্যাগে কোন টাকা পয়সা , স্বর্ণালঙ্কার কিছুই ছিল না। মেজর জলিলের ব্যাগে পাওয়া গেল শুধু গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন বই! পরে ম্যাজিস্ট্রেট বলেছিলেন- আমাকে বলা হয়েছিল এসব ব্যাগে লুট করা টাকা পয়সা ও সোনার অলংকার আছে! এরা খুলনা থেকে লুট করে ঢাকা নিয়ে যাচ্ছিল!

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরলেন। মেজর জলিলকে ঢাকায় আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো। বাকি সঙ্গীদের ছেড়ে দেয়া হলো। বঙ্গবন্ধুর সামনে জেনারেল ওসমানী সকল সেক্টর কমান্ডারদের নামের তালিকা জমা দিলেন। কিন্তু সে তালিকায় ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডারের নামের স্থানে ছিল মেজর জয়নাল আবেদিনের নাম। একজন বীর সৈনিকের বীরত্ব, নিবেদনের কথা পুরোটা জানা হলো না বঙ্গবন্ধুর!

মেজর জলিল হয়ে রইলেন একমাত্র খেতাব বিহীন সেক্টর কমান্ডার! স্বাধীন দেশের প্রথম রাজবন্ধী হতে হলো পাকিস্তান বাহিনীর মেজর পদের চাকুরীতে ফিরে না গিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা বীর সৈনিককে!

মেজর জলিলঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ‘খেতাবহীন’ সেক্টর কমান্ডার
“আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী” কারাবন্দি জীবনের পরবর্তী সময় ; ছবি : somoyekhon

এ বিষয়ে তিনি এক আত্মকথায় বলেন,“আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী। ২১ ডিসেম্বর বেলা ১০টা সাড়ে দশটায় আক্রমণকারী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল রূপের প্রথম দৃশ্য দেখলাম আমি। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মদদে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অর্থ এবং তাৎপর্য বুঝে উঠতে আমার তখন আর এক মিনিটও বিলম্ব হয়নি।“

এখানেই শেষ নয়, মেজর জলিলের জীবনের এর পরেও রয়েছে কয়েকবার জেলে যাওয়া, ফাঁসির হুকুম শোনার মত ট্র্যাজেডি। আছে জাসদকে প্রতিষ্ঠা করা, নির্বাচন করা, জাসদের সভাপতি থেকে সরে এসে ইসলামী রাজনীতি শুরু করার মত ঘটনা।

সূত্র : নিউজ ইনসাইড 24

Related posts

তৃতীয় তালিকায় স্থান পেলেন ১২ হাজার ১১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা

News Desk

বর্তমান পাকিস্তানের নতুন প্রজন্ম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কী জানে এবং কতটা জানে?

News Desk

অকুতোভয় সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ

News Desk

Leave a Comment