free hit counter
বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প
মুক্তিযুদ্ধ

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প

১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চের রাতের ঘটনাবলির ধারাবাহিকতায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মুজিবনগর দিবসের প্রতি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ভালোবাসার ঘাটতি। ওই পর্যায়ে তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলাম যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার জন্য তাঁদের কাছে জাতির চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বেরও এ ব্যাপারে প্রস্তুতি ও পূর্বপরিকল্পনা ছিল। এই পরিকল্পনা মোতাবেক বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার কথা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে; বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে আক্রমণের জন্য সেনাবাহিনী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে রওনা হওয়ার খবর পেয়েই তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর বাসায় গেলেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেতে, পুরান ঢাকার একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল আত্মগোপনের জন্য। কিন্তু ইতিহাসের ওই যুগসন্ধিক্ষণে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধু কোথাও যেতে রাজি হলেন না। তাজউদ্দীনের আকুতি বিফলে গেল। বঙ্গবন্ধুর এক কথা, ‘তোমরা যা করার করো, আমি কোথাও যাব না।’

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাজউদ্দীন একটি স্বাধীনতার ঘোষণাও লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং টেপরেকর্ডারও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালেন। বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প
ছবি: featurebangla.com

তাজউদ্দীনকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেও স্বাধীনতা ঘোষণার বিকল্প ব্যবস্থা ছিল বঙ্গবন্ধুর, এটা এখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তিনি স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন নিয়েছিলেন সুচিন্তিতভাবে, তেমনি আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের অগোচরে ওয়্যারলেস ও অন্যান্য মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তাটিও জাতিকে জানানোর ব্যবস্থা।

২৫ মার্চের ভয়াবহ, দুর্বিষহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেন।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, দুর্গম যাত্রার সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করার সময় রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এক চিরকুটে তিনি তার স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে লিখেছিলেন– ‘লিলি, আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানি না… মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও।’

এসময়েই মূলত তিনি বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা, তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর কুষ্টিয়া হয়ে মেহেরপুরে চলে যান। এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুরের সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর বিএসএফ এর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাদের যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কেএফ রুস্তামজী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন এবং পূর্ববাংলার সার্বিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে জানতে চান। কিন্তু সীমান্তে পৌঁছে তাজউদ্দীন দেখলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু করার নেই।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প
ছবি: dhaka18.com

এরপর মুক্তিবাহিনী গঠনের ব্যপারে তাজউদ্দীন আহমদ বিএসএফ এর সাহায্য চাইলে বিএসএফ প্রধান তাকে বললেন মুক্তিসেনাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র দেওয়া সময়সাপেক্ষ কাজ। ট্রেনিংয়ের বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তারা মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না। এরপর কেএফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

দিল্লিতে পৌঁছানোর পর মূলত ভারত সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়, তাজউদ্দীন আহমদই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। এ সময় ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। তাজউদ্দীন আহমেদ পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা ও এবং এজন্য ভারতের সাহায্যের প্রয়োজনের কথা তাদের বলেছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন জানান যে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব- ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সব প্রবীণ সহকর্মীই মন্ত্রিসভার সদস্য। শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় সমবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লীর সেই সভায় তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন। বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। এভাবেই অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারণার সূচনা।

বৈঠক শেষ করে তাজউদ্দীন চলে এলেন কুষ্টিয়া সীমান্তে। সেখানে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে এক অধিবেশন আহ্বান করলেন। সে অধিবেশনে, সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হল।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সময় ইন্ধিরা গান্ধী মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র, ট্রেনিং, শরণার্থীদের সাময়িক আশ্রয়ের বিষয়ে রাজি হয়েছিলেন। সে আলোচনার পর তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিএদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশনে আহ্বান করলেন। এই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছিল। এই মন্ত্রিপরিষদ এবং এমএনএ ও এমপিএগণ আবার প্রত্যেকেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন।

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয়। এই সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপ্রধান এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করে। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র, আইন এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। চার জন মন্ত্রীকে ১২টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়। সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প
ছবি: jagonews24.com

পরে পাকিস্তানের নির্বাচিত জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি গোপন স্থানে মিলিত হয়ে প্রবাসী সরকার গঠন করেন। ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। একই সাথে প্রবাসী সরকারের এক অধ্যাদেশে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয়।

স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র ও এর পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য ঘোষিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি গোটা দেশব্যাপী সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সিদ্ধান্ত ও এর ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতোলায় মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী-

বিশিষ্ট আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম :

বিশিষ্ট আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম :
ছবি: prothomalo.com

আমরা একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উপলব্ধি করলাম। কেননা, ভারত সরকারের সঙ্গে একটি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কথা বলা উচিত। তাজউদ্দীন ভাই (তাজউদ্দীন আহমদ) জিজ্ঞাসা করেন, কাকে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে? আমি বললাম, যে পাঁচজন নিয়ে বঙ্গবন্ধু হাইকমান্ড গঠন করেছিলেন, এই পাঁচজনকে নিয়েই সরকার গঠন করা হবে। দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু, সাধারণ সম্পাদক ও তিনজন সহসভাপতি নিয়ে এই হাইকমান্ড আগেই গঠিত হয়েছিল।

তাজউদ্দীন ভাই পুনরায় প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? দ্বিধা না করে এবারও জবাব দিলাম, ২৫ মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি প্রধান দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তিনিই স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ের দায়িত্ব পালন করবেন। তাজউদ্দীন ভাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দল ও দেশের স্বার্থে কাজ করতেন। তাই আমি যখন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার নেওয়ার জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করি, তখন এই প্রস্তাব মেনে নিতে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল।

আমাদের আরও চিন্তা হলো, বঙ্গবন্ধুকে সরকারের প্রধান করা হলে আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া হবে। অথবা তাঁর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ দেখা দেবে কি না। তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তবে এই ব্যাপারে আমি স্থির নিশ্চিত, যেকোনো প্রকার ভয়ভীতি বা চাপের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কোনো বিবৃতি দিতে সমর্থ হবে না।’

তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করতে হবে, তিনি সমস্ত বক্তৃতা নিজেই হাতে লিখে নিলেন। পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। সিদ্ধান্ত হয়, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের পেছনের গল্প
ছবি: prothomalo.com

আমরা বিমানে করে আবার কলকাতা ফিরে এলাম। জানলাম, মনসুর ভাই (ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী) ও কামারুজ্জামান (এ এইচ এম কামারুজ্জামান) এসেছেন। তাঁদের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। খবর নিয়ে জানলাম, কলকাতায় গাজা পার্কের কাছে একটা বাড়িতে কামারুজ্জামান ভাই থাকেন। আমি ও তাজউদ্দীন ভাই কামারুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমরা তাঁর কাছে এ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করি। কামারুজ্জামান ভাইয়ের মনে একটা জিনিস ঢোকানো হয়েছে যে আমরা তাড়াহুড়ো করে দিল্লি গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছি। নেতাদের জন্য অপেক্ষা করা আমাদের উচিত ছিল।

কামারুজ্জামান ভাই খুবই সুবিবেচক মানুষ। তিনি ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বললেন। রাতে লর্ড সিনহা রোডে আমাদের বৈঠক বসল। উপস্থিত বিশিষ্ট নেতাদের মধ্যে ছিলেন কামারুজ্জামান, মিজান চৌধুরী, শেখ মনি (শেখ ফজলুল হক মনি), তোফায়েল আহমেদ ও আরও অনেকে। শেখ মনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দী, বাংলার যুবকেরা বুকের তাজা রক্ত দিচ্ছে। এখন কোনো মন্ত্রিসভা গঠন করা চলবে না। মন্ত্রী-মন্ত্রী খেলা এখন সাজে না। এখন যুদ্ধের সময়। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে।

তাজউদ্দীন ভাই ও আমি ছাড়া বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সবাই শেখ মনির বক্তব্য সমর্থন করেন। তাজউদ্দীন ভাই যেহেতু নিজে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, তাঁর পক্ষে পাল্টা জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শেষ পর্যন্ত আমাকেই উঠে দাঁড়াতে হলো। সভার শেষ পর্যায়ে তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা দেন। উপস্থিত সবাই সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য মেনে নিলেন।

১০ এপ্রিল। বিমানে আমাদের আগরতলা রওনা হওয়ার কথা। তাজউদ্দীন ভাই, মনসুর ভাই, শেখ মনি, তোফায়েল আহমেদ ও আমি লর্ড সিনহা রোড থেকে সোজা বিমানবন্দরে যাই। আমরা বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামি। সেখান থেকে জিপে করে শিলিগুড়ি যাই। শহর থেকে অনেক ভেতরে সীমান্তের খুব কাছাকাছি একটি বাংলোতে উঠলাম। গোলক মজুমদার এখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানান। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এখানে কোনো একটি জঙ্গল থেকে গোপন বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা প্রচারিত হবে।

মনসুর ভাইয়ের জ্বর এসে গেছে। তিনি শুয়ে আছেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি মত দিলেন, তাজউদ্দীন ভাই প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি কোনো আপত্তি করবেন না। এরপর মনসুর ভাই বা কামারুজ্জামান ভাই প্রধানমন্ত্রীর পদের ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন তোলেননি।

পাঁচজন নেতার মধ্যে তিনজনের সঙ্গে আলাপের পর আমার খুব বিশ্বাস হয়েছিল যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাজউদ্দীন ভাইয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে কোনো আপত্তি করবেন না। তা ছাড়া তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এখন বাকি রইল খন্দকার মোশতাক আহমদ। শুধু তিনি আপত্তি করতে পারেন। তবু চারজন এক থাকলে মোশতাক ভাইকেও রাজি করানো যাবে।

এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন ভাইয়ের প্রথম বক্তৃতা প্রচার করার পালা। তাজউদ্দীন ভাই প্রচারের জন্য অনুমতি দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করা বক্তৃতার ক্যাসেট গোলক মজুমদারের কাছে দেওয়া হলো।

১০ এপ্রিল। রেডিও অন করে রেখে খেতে বসেছি। খাবার টেবিলে তাজউদ্দীন ভাই ও শেখ মনি আছেন। রাত তখন সাড়ে নয়টা। সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এল। প্রথমে আমার কণ্ঠ ভেসে এল। ঘোষণায় আমি বলেছিলাম, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ বক্তৃতা দেবেন।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা প্রচারিত হলো। সারা বিশ্ব শুনল স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেতার বক্তৃতা। আমাদের সংগ্রামের কথা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল।

ইতিমধ্যে আগরতলায় অনেক নেতা এসে পৌঁছেছেন। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা হলো। আগের রাতে খন্দকার মোশতাক এসেছেন। ড. টি হোসেন ঢাকা থেকে তাঁকে নিয়ে এসেছেন। এম আর সিদ্দিকী কয়েক দিন আগে আগরতলায় এসেছেন। চট্টগ্রাম থেকে জহুর আহমদ চৌধুরী এবং সিলেট থেকে আবদুস সামাদও এসে গেছেন। তা ছাড়া সেখানে তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুব আলী চাষী ছিলেন।

রাতে খাওয়ার পর নেতারা বৈঠকে বসেন। খন্দকার (মোশতাক) খুবই মনঃক্ষুণ্ন। টি হোসেনের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, মোশতাক সাহেব প্রধানমন্ত্রী পদের প্রত্যাশী। শেষ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক মন্ত্রিসভায় থাকতে রাজি হলেন। তবে একটা শর্ত হলো, তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে হবে। উপস্থিত সবাই একবাক্যে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন।

সবাই জহুর ভাইকে মোনাজাত করতে অনুরোধ করলেন। তিনি কয়েক দিন আগে পবিত্র হজব্রত পালন করে এসেছেন। তাঁর মাথায় তখনো মক্কা শরিফের টুপি। তিনি আধা ঘণ্টা ধরে আবেগপ্রবণভাবে মোনাজাত পরিচালনা করেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অনেকের চোখে পানি এসে গেল। এই মোনাজাতের মাধ্যমে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিলাম।

স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলায় অনুষ্ঠিত বৈঠককে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক বলা যেতে পারে। তাজউদ্দীন ভাই ও আমার প্রচেষ্টায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, বৈঠকে সব কটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

১৩ এপ্রিল ছোট বিমানে কলকাতায় ফিরে গেলাম। মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা প্রথমে চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। মন্ত্রিসভার শপথের জন্য নির্বাচিত স্থানের নাম আমি, তাজউদ্দীন ভাই, গোলক মজুমদার এবং বিএসএফের চট্টোপাধ্যায় জানতাম।

অনুষ্ঠানের কর্মসূচি নির্ধারণ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার খসড়া রচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিশ্বের কাছে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতির আবেদন জানাতে হবে। ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী প্রথম যে ভাষণ দেন, তার কপি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় করা হয়েছিল। ইংরেজি কপি বিদেশি সাংবাদিকদের দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কাজ হলো, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া রচনার পর তাজউদ্দীন ভাইকে দেখালাম। তিনি পছন্দ করলেন।

১৭ এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এই স্থানের নাম ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী।

ছবি: prothomalo.com

১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী। এই ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যা যা করণীয় তা করবে বাংলাদেশ সরকার সেই ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই ঘোষণাপত্র কার্যত মুজিবনগর সরকার কর্তৃক অলিখিত সংবিধান ছিল।

”ওই আমবাগানটা খুব ঘন আমবাগান। অনেক পুরনো আমগাছ – গাছে গাছ লেগে ছাতার মতো হয়ে থাকে। দিনের আলো ঝিলমিল করছিল, আনন্দঘন উৎসবের মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন এটাকে সমর্থন দিচ্ছে, আর রূপকথার মতো অনুষ্ঠানটা শেষ হলো।”

”অজপাড়াগায়ের একটি পল্লী – যে আমবাগানে কখনো কিছু হতো না – সেখানে একটা দেশের সরকারের প্রথম শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। আমারা সবাই যখন চলে গেলাম, তখন যেন রূপকথার রাজকন্যাকে সোনার কাঠি দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হলো।”

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সরকার গঠন হবে তা অকল্পনীয় ছিল পাকিস্তানিদের কাছে। কিন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশ। গঠন করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকার। এই অস্থায়ী সরকার গঠনের মধ্য দিয়েই পরিকল্পিত কায়দায় মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত ও সমন্বয় সাধন করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করেছিল মুজিব নগর সরকার।

আমীর-উল ইসলাম: প্রথিতযশা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
(সূত্র: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আমীর-উল ইসলাম, কাগজ প্রকাশনা, ১৯৯১)
তথ্যসূত্র: আত্মকথা (১৯৭১)- নির্মলেন্দু গুণ; আমার ছেলেবেলা ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ- সিমিন হোসেন রিমি; মূলধারা ৭১- মঈদুল হাসান; বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১- হোসেন তওফিক ইমাম; লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে- রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম; একাত্তরের রণাঙ্গন- শামসুল হুদা চৌধুরী।