free hit counter
আন্তর্জাতিক

ডি-৮ এ ‘সুযোগ’ হাতছাড়া!

ফাইল ফটো

আসছেন না ইরান-পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশ, তুরস্ক, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, ইরান, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘ডি-৮’ জোট থেকে যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল তার কোনোটিই পর্যাপ্ত পরিমাণে আসেনি। এমনকি সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তারা যোগ না দেয়ায় তা জৌলুস হারিয়েছে। অথচ ২৫ বছর আগে গঠন হওয়া ওই জোট থেকে বাংলাদেশ অনেকভাবে লাভবান হতে পারত। নানা কারণে কার্যত সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ রকম পরিস্থিতিতে আজ বুধবার অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক জোট ডি-৮ এ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শুরু হচ্ছে। একই সঙ্গে এর ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও উদযাপন করা হবে। ২০তম ওই সম্মেলনের ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন ডি-৮ এর বর্তমান সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে ডি-৮ মন্ত্রিপরিষদের ২০তম অধিবেশনের উদ্বোধন করবেন তিনি। এর আগে গত দুদিন ডি-৮ কমিশনের বৈঠক হয়েছে ঢাকায়। কিন্তু এতে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যোগ দিচ্ছেন না। তবে শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টোকে ভার্চুয়ালি যুক্ত করে সম্মেলনের গরিমা বাড়াতে চাইছে ঢাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ডি-৮ এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান উন্নত করা, বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানো, নতুন সুযোগ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এসব নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা হলে, এই জোটে থেকে বাংলাদেশ জ্বালানির ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি চলমান অনেক ইস্যুর সমাধান করতে পারত। কিন্তু এই আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া ছাড়া অন্য ৫টি দেশ খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। ওই ৫টি দেশের মধ্যে পাকিস্তান খাদের কিনারে, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরান থেকে তেল কেনা যাচ্ছে না, তুরস্কের ভেতরের অবস্থা ততটা শক্তিশালী নয়। এর ফলে এই দেশগুলোর মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ছাড়া কার্যকরী কোনো কিছুই হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেছেন, সৌদি আরব না থাকায় মুসলিম বিশ্বের এই আটটি দেশ একসঙ্গে থাকার কারণে বহু কাজ করতে পারত। কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ এত বেশি থাকার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে না। এমনকি জোটের ২৫ বছর পূর্তি হলেও যে সম্মেলন ঢাকায় হচ্ছে- সেখানে সব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাই উপস্থিত থাকছেন না। ফলে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডাকা সম্মেলনের ঘোষণা বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ডি-৮ সম্মেলনে জ¦ালানি নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ জোর দেবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, যখন ডি-৮ শুরু হয় তখন মাত্র ১৪ বিলিয়ন ডলার ট্রেড ছিল আটটি দেশের মধ্যে। এখন তা বেড়ে গিয়ে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মোমেন বলেন, বর্তমানে আলোচিত ইস্যু এনার্জি সেক্টর। সব সম্মেলনে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

স্বাভাবিকভাবেই এখানেও জ¦ালানি নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা হবে। এ খাতে কীভাবে উপকৃত হওয়া যায়, সেই চেষ্টা করা হবে। সম্মেলনে কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও জোর দেয়া হবে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ও প্রাধান্য পাবে। এছাড়া ক্লাইমেট রেজুলেশন্স, ট্যুরিজম সেক্টর নিয়ে আলোচনা করব আমরা। এবারের ডি-৮ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বছরটা ডি-৮ এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনটির ২৫তম বর্ষপূর্তি এবার।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক শমসের মবিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, ২৫ বছর পূর্তি হলেও এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল এখনো আসেনি। অথচ চলমান ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই জোটের মাধ্যমে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বড় সাফল্য পাওয়া যেত। এই ৮টি রাষ্ট্রের মতভিন্নতা থাকায় সুযোগগুলো কাজে লাগানো যায়। তারমতে, এই জোটে থাকার ফলে দেশগুলোর মধ্যে মতবিনিময়, আলোচনা ও একে-অন্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে- এটাই প্রাপ্তি। জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, ডি-৮ এর মাধ্যমে অনেক কিছুই করা সম্ভব ছিল। কিন্তু কিছু করা যায়নি।

তিনি বলেন, গত ২৫ বছরে খুব বেশি কিছু করা হয়নি। এই না করার পেছনে অসংখ্য কারণও আছে। পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘কমন ইস্যু’ থাকতে পারত। এই কমন ইস্যুকে কেন্দ্র করে কাজ করা যেত। তবে এবারের সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া রাজি হলে তাদের কাছ থেকে জ¦ালানি আনা যেতে পারে। এর ফলে আমাদের অনেক সাশ্রয় হবে। আরেক পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, এই জোটের কোনো ‘আউটকাম’ দেখতে পাচ্ছি না।

এদিকে উন্নয়নশীল আট মুসলিম রাষ্ট্রের জোট ডি-৮ এর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা সফর করার কথা ছিল ইরান, পাকিস্তানসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের। গত রবিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বর্ণাঢ্য ওই আয়োজনের কথা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেন এমন অতিথিদের একটি তালিকা গণমাধ্যমে সরবরাহ করেন তিনি। প্রশ্নোত্তর পর্বে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির-আবদুল্লাহিয়ান এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিনা রব্বানী খার ঢাকা সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু না, কূটনৈতিক সূত্র বলছে, শেষ মুহূর্তে ‘পলিটিক্যাল কোভিড’ অনেক কিছুতেই পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে অবশ্য এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ডি-৮ সম্মেলন প্রস্তুতির আর কোনো আপডেট শেয়ার করা হয়নি।

দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র বলছে, লন্ডনে অবস্থানরত পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিনা রব্বানী খার ব্রিটেনের বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বাংলাদেশের ভিসা সংগ্রহ করেন। ঢাকাগামী বিমানের টিকেট এবং বাংলাদেশে তাকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু সোমবার রাতে ইস্তাম্বুলস্থ ডি-৮ সেক্রেটারিয়েটের মাধ্যমে বাংলাদেশ জানতে পারে হিনা তার ঢাকা সফর বাতিল করেছেন। প্রায় কাছাকাছি সময়েই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেন আমির-আবদুল্লাহিয়ানের ঢাকা সফর বাতিল হওয়ার তথ্য পায় ঢাকা। সেগুনবাগিচা থেকে বলা হয়, তেহরানস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন অবশ্য আগেই এমন আভাস দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ইসলামাবাদস্থ বাংলাদেশ মিশন হিনার সফর বিষয়ে ছিল পুরোপুরি অন্ধকারে!

উল্লেখ্য, দুদিন ধরে রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ডি-৮ কমিশনের বৈঠক চলছে। আজ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। হাইব্রিড ফরমেটে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রী পর্যায়ের ওই সম্মেলন বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনীতে মিসরের একজন সহকারী মন্ত্রী, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল, নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সশরীরে উপস্থিত থেকে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বদলে মন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন বলে আশা করছে ঢাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মুসলিমপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রাধমিক ধারণাটি তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নেকমেটিন এরবাকান দ্বারা উত্থাপিত হয়েছিল। তিনি এটির ধারণা দেন ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘উন্নয়নে সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে। সভায় ডি-৮ এর সীমানা নির্ধারণ করা হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত উন্নয়নশীল মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে নিয়ে। সেমিনারে বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এই সম্মেলনটি ছিল ডি-৮ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আনুষ্ঠানিকভাবে ডি-৮ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের শেষে জারি করা ইস্তাম্বুল ঘোষণার মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ‘সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তি, বিরোধিতার পরিবর্তে সংলাপ, শোষণের পরিবর্তে সহযোগিতা, দ্বিমুখিতার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, বৈষম্যের পরিবর্তে সমতা ও নিপীড়নের বদলে গণতন্ত্রের মতো বিষয়কে স্লোগান হিসেবে ধরা হলেও এসব বিষয়ে ডি-৮ এর কার্যকর ভূমিকা নেই।

এসআর

Source link