free hit counter
আন্তর্জাতিক

ইয়েমেন সংকট : সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধ

মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের অন্যতম গরীব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ আমরা জানবো বর্তমান সময়ের সব চেয়ে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, ইয়েমেন সৌদি আরব যুদ্ধ নিয়ে । সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে ।

আরব বিশ্বের ক্ষমতার পালাবদল হয় আরব বসন্তের মধ্যে দিয়ে। ইয়েমেন সংকটের সূচনা শুরু হয় আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে ।আরব বসন্তের ঢেউ আছড়ে পড়ে ইয়েমেনে। ওই ধাক্কায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বপরায়ণ নেতা আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। ২০১১ সালে তিনি তাঁর সহযোগী মানসুর হাদির কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে মানসুর হাদির সামনে আসে সংকটের বিশাল পাহাড় । দেশজুড়ে খাদ্যের অভাব, দুর্নীতি, বেকারত্ব আল কায়েদার হামলা,দক্ষিণে বিছিন্নতাবাতী জঙ্গিরা মাথা চারা দিয়ে উঠছিলো। এদের মধ্যে সবচেয়ে বোরো হুমকি ছিলো ইয়েমেনের জাইদি শিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ।যারা হুতি বিদ্রোহী নাম অধিক পরিচিতো ।

সেনাবাহিনীতে তখনো বিপুলসংখ্যায় সালেহর অনুসারী। নতুন প্রেসিডেন্টের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হুতি বিদ্রোহীরা সাদা প্রদেশ এবং এর আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ।পরের মাসে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর এডেন থেকে পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট হাদি। নতুন ত্রিধাবিভক্ত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে বহু সুন্নিসহ সাধারণ ইয়েমেনি হুতিদের সমর্থন দেয়।

হুতি আর নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহের প্রতি অনুগত। এরপর তারা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের পেছনে ইরান সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে এমন বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আবদ রাব্বু মনসুর হাদি।

কিন্তু মানসুর হাদিকে ইয়েমেনে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে সৌদি আরব আর অন্য আটটি সুন্নি দেশ একজোট হয়ে ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এই জোটকে গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক শক্তি দিয়ে সাহায্য শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ফ্রান্স। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এতো গুলো বাইরের দেশের যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ হল।
দেশটির ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান । ওই সময় সৌদি জোটের মূল লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে আবার সানায় প্রতিষ্ঠিত করা। অপর দিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক সাহায্য নিয়ে হাজির হয় ইরান, এডেন বন্দরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় হুতিদের পাশে দাঁড়ায় রাশিয়াও। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে—রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, আর উলুখাগড়ার প্রাণ যাচ্ছে!

দরিদ্র দেশ ইয়েমেনের সংকট নিয়ে এত হেভিওয়েট রাষ্ট্রের আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ হলো—এডেন। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝখানে দেশটির অবস্থান। এই নৌপথ দিয়েই বিশ্বের সিংহভাগ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। তাই ইয়েমেন যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে তেলসম্পদের ওপর খবরদারি করাও সহজ হবে। ঠিক এই কৌশলগত কারণেই ইয়েমেন সবার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ ইয়ামেন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত । বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বিপর্জয় ইরাক বা সিরিয়াই নয়,তৈরী হয়েছে ইয়েমেনে । এই সংঘাতের বলি হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ ।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি মানুষ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের ৬৫ শতাংশের মৃত্যুর কারণ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ফেলা বোমা। আর বাকিদের মৃত্যুর কারণ হুতি বিদ্রোহীরা।

হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনে সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৬৭ হাজারের বেশি। অন্যদিকে ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশের বা ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের প্রয়োজন মানবিক সহায়তা।

সেভ দ্য চিলড্রেনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইয়েমেনে প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ সব শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। দেশটির প্রায় ২ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের সুবিধা পাচ্ছে না।

এ সব কারণে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনে ভয়ংকর রূপে ছড়িয়ে পড়েছিল কলেরা রোগ। ওই সময় কলেরায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যান্য দেশের দেওয়া অবরোধের কারণে দেশটিতে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট এতটাই তীব্র যে, আবর্জনাবাহী গাড়ি চালানোর মতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।

ইউনিসেফের মতে, শিক্ষকদের বেতন দুই বছর ধরে বন্ধ থাকায় অচিরেই অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে ইয়েমেনের প্রায় ৩৭ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ। যুদ্ধের কারণে এমনিতেই দেশটিতে প্রায় ২০ লাখ শিশু-কিশোর নিয়মিত পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে। আবার দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৮ লাখ শিশু ভুগছে মারাত্মক পুষ্টিহীনতায়।

ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দরিদ্র দেশ। ইউএনডিপির দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান গৃহযুদ্ধ যদি ২০২২ সাল পর্যন্ত চলে, তবে ইয়েমেন পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশে পরিণত হবে। তখন দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭৯ শতাংশ চলে যাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে। অন্যদিকে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, লৈঙ্গিক সমতার দিক থেকে ইয়েমেনে নারীদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

চলমান যুদ্ধে ঘরছাড়া হয়েছে ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষ। সংঘাতে ঘর ছেড়েছে দেশটির ৩৩ লাখেরও বেশি মানুষ।

এক কথায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে মানুষের জীবনের দামই সবচেয়ে সস্তা। এর চেয়ে ঢের দামি বুলেট-বোমা!

গৃহযুদ্ধের শুরুতে আলী আবদুল্লাহ সালেহ-এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল হুতিরা। কিন্তু ২০১৭ সালের নভেম্বরে সেই সন্ধি ভেঙে যায়।

সানার সবচেয়ে বড় মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে এই দুই পক্ষের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। ওই মসজিদ দখলে নিয়েই হুতি বিদ্রোহীরা ঘোষণা দেয় যে, সালেহকে হত্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনার পরই সরকার সমর্থিত বা হাদির পক্ষের শক্তিগুলোর সম্পর্কে ভাঙন দেখা দেয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রথমে হাদির বাহিনীর সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে তুললেও, পরে তা নষ্ট হয়ে যায়। ইদানীং উপকূলবর্তী এডেনের দখল বুঝে নিয়েছে এসটিসি।

আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনাদের সঙ্গে এই এসটিসির সখ্য রয়েছে। ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ফেলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দখল করে নিয়েছে এডেন শহর। ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে যাওয়ায় সৌদি আরব কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারেও সামরিক জোটের মধ্যে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব নেয়ার পর ইয়েমেনে চলমান যু্দ্ধে মিত্রদের সমর্থন দেয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

মাঝখান থেকে চিঁড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। তাদের আর কত দিন ওই দুর্ভোগ পোহাতে হবে, কে জানে। উলুখাগড়াদের নিয়ে ভাবার মতো সময় যে রাজাদের নেই!