free hit counter
ইতিহাস

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান – রেসকোর্স থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বর্তমানে ঢাকার ফুসফুস নামে পরিচিতি। এটি বর্তমানে বিশাল পার্ক হলেও এর রয়েছে গৌরবের অতীত। ৪০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রমনা এলাকার বিরাট একটি অংসজুড়ে রয়েছে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান। পুর্বে এটি রমনা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিলো। মুঘল আমলে শুরু হওয়া রমনা, কিভাবে রেসকোর্স ময়দান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে জড়িত হয়ে পড়লো, আজ আমরা সেই গল্পই সেই শুনবো।

তখন দিল্লির সিংহাসনে সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি বাংলার সুবেদার নিয়োগ করেন ইসলাম খানকে। তিনি ঢাকা শহরে রমনাকে ঘিরে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেন। তখন এর নাম ছিলো বাগ-এ-বাদশাহী। এর আওতাধীন ছিলো পশ্চিমে আজিমপুর, নিউমার্কেট এবং ধানমন্ডি । পুর্বে পুরানা পল্টন, রাজারবাগ এবং সেগুনবাগিচা। দক্ষিণে চানখার পুল এবং উত্তরে পরিবাগ এবং ইস্কাটন।

এই বিশাল এলাকা জুড়ে দুইটি আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। একটি মহল্লা চিশতিয়া এবং অপরটি মহল্লা সুজাতপুর। মহল্লা চিশতিয়ার নাম ছিলো সুবেদার ইসলাম খানের ভাইয়ের নাম অনুসারে এবং সুজাতপুরের নাম ছিলো ইসলাম খানের সেনাপতির নাম অনুসারে। সে সময় এখানে অনেক সুন্দর বাড়ি, পুকুর, মসজিদ, মন্দির এবং বাগান গড়ে ওঠ্রে। তবে মুঘল শাসনের পতন হলে ধীরে ধীরে রমনার জৌলুস কমতে কমতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালে তা একদমই বিবর্ণ হয়ে পরে। বাড়ি- মসজিদ- মন্দির সব ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে বড় বড় ঘাসে ঢেকে যায়।

এরপর ১৮২৫ সালে রমনা আবার পুর্বের রুপ ফিরে পেতে শুরু করে। ঢাকার কালেকটর মিস্টার ডোয়েস এই এলাকার উন্নতির জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। সে বছর রমনা কালি মন্দির বাদে বাকি সব বিল্ডিং ভেংগে ফেলা হয়। বড় বড় ঘাস এবং জঙ্গল সাফ করা করে এলাকাটি পরিষ্কার করা হয়। নতুন করে সাজানো এলাকার নাম দেওয়া হয় রমনা গ্রিন। কাটাতার দিয়ে নির্ধারিত হয় পুরা এলাকার সীমানা ।

এর ভিতরে রেস কোর্স প্রতিষ্ঠা করা হয় ইংরেজ এবং ঢাকাবাসিদের বিনোদনের জন্য। খুব অল্পদিনেই ঘোড় দৌড় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঢাকার নবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দ্রুতই রমনা রেসকোর্সের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তারা ১৮৫১ সালে কাটাবনে ঘোড়ার আস্তাবল গড়ে তোলেন। সে বছরে রমনাতে ঢাকার প্রথম চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাবরা রেসকোর্সকে কেন্দ্র করে অপুর্ব সুন্দর এক বাগান তৈরি করেন। যার নাম রাখা হয় শাহবাগ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে আসাম এবং পুর্ব বাংলার গর্ভনর হাউস তৈরি করা রমনার রেসকোর্সের পাশে। লর্ড কার্জন এটি তৈরি করেন যা বর্তমানে পুরাতন হাইকোর্ট বিল্ডিং নামে পরিচিত।

গর্ভনর হাউস পরে হাইকোর্টে পরিণত হলে বর্তমানে মিন্টো রোডে বিচারকদের জন্য সুন্দর কিছু বাড়ী তৈরি করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত – পাকিস্তান বিভক্তির পরেও রমনা ঢাকার গুরুত্বপুর্ণ এলাকা বিবেচিত হতো। সে সময় শাহবাগ থেকে ইডেন বিল্ডিং পর্যন্ত রাস্তা তৈরি হয়। এটি পুরো এলাকাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। ছোট এলাকাটি রমনা পার্ক নামে এবং বড় এলাকাটি রমনা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিতি পায়। তখন ঢাকা ছিলো শান্ত এলাকা।

মোটর গাড়ি, বাস এসব খুব একটা দেখা যেতো না। ঘোড়া গাড়িই ছিলো মুল যানবাহন। তখন রমনা ঢাকা থেকে খানিকটা বিছিন্নই ছিলো। এই এলাকায় তেমন লোকের বসবাস ছিলো না। শুধুমাত্র রবিবার পুরো রমনা জমজমাট হতো ঘোড়দৌড়ের উত্তেজনায়। বেশিরভাগ লোক ঘোড়দৌড় দেখতে আসতেন। কেউ কেউ বাজি ধরতেন। তখন ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করতো ঢাকা জিমখানা ক্লাব, যা বর্তমানে ঢাকা ক্লাব নামে পরিচিত। তবে ধীরে ধীরে রমনা রেসকোর্স ময়দান রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপুর্ণ হতে শুরু করে।

১৯৪৮ সালে এখানে প্রথম এবং শেষবারের মতো কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ’র গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর শেখ মুজিবর রহমানসহ অন্যান্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হয় এই ঐতিহাসিক ময়দানে। শেখ মুজিবকে সে সমাবেশে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। প্রথম কোনও গণ জমায়েতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোজন হয় রমণাতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষন দিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে।

১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজি বহু ইতিহাসে স্বাক্ষী রমানার ময়দানে বসেই আত্মসমর্পন দলিলে সই করেন। স্বাধীনতা লাভের পরে বঙ্গবন্ধু রমনা রেসকোর্সে ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করে ময়দানের নাম পরিবর্তন করেন। তিনি বাংলার রাজনীতিক নেতা সোহরাওয়ার্দীর নাম অনুসারে এর নাম রাখেন সোহরাওয়ার্দি উদ্যান। এখন এটি এই নামেই বিখ্যাত।

বর্তমানে রমনা রেসকোর্স ময়দান তার অতীতের জৌলুস হারিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে তার নাম সবসময় চিরস্মরণীয় হয়েই থাকবে।