free hit counter
ইতিহাস

শূন্যের ইতিহাস: শূন্য যেভাবে “০” হলো

মানুষ যখন সংখ্যা বা অঙ্ক শেখা শুরু করে, তখন নিশ্চয় ভেবে দেখেনা, এগুলো আসলে কোথা থেকে এলো? আসলে ১,২.৩…এ রকম প্রতিটি অঙ্কের পেছনে একেকটি ঘটনা আছে। ‘শূন্য’ও তেমনি একটি অঙ্ক। ‘শূন্য‘ কীভাবে শূন্য হলো, তা জানানোর প্রয়াস থাকবে এ লেখায়।

শূন্যের ইতিহাস

শুরুতে ‘শূন্যে’র ব্যবহার ছিল ভিন্ন। এখনকার মতো শূন্য গণিতের অবিচ্ছেদ্য অংশ তখনো ছিল না। সাধারণত: কোনো সংখ্যা নেই, এমন সব জায়গায় শূন্যের ব্যবহার হতো। কিন্তু এখন গণিতে শূন্যের ব্যবহার অসীম। সংখ্যা এবং অঙ্কে এর ব্যবহার এখন প্রচলিত। ইংরেজীতে শূন্যকে “nought”, “zero”, “nil” or the “naught” ও বলা হয়। ইংরেজী ‘জিরো’ শব্দটির মূল উৎপত্তি আবরি ‘সাফিরা’ থেকে। এরপর ইটালিয়ান ‘জেফিরো’, তারপর ভেনেশীয় ‘জিরো’ এবং শেষে ফ্রেঞ্জ ‘জি’রো’ থেকে ইংরেজী ‘জিরো’ শব্দের আবির্ভাব। সাফিরা শব্দটির উৎপত্তি আবার ‘সিফর’ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে ‘কিছুনা’। ১৫৯৮ সালে ইংরেজীতে সর্বপ্রথম ‘জিরো’ অঙ্কটি ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃতে একে ‘শূন্য’ বলা হয়।

শূন্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যাগুলো ছিল দশ ভিত্তিক। তাদের সংখ্যাগুলো স্থানভিত্তিক না হয়ে চিত্রভিত্তিক ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৭৪০ সালের দিকে মিশরিয়রা আয়কর ও হিসাবরক্ষণের জন্য শূন্যের ব্যবহার করত। তাদের চিত্রলিপিতে একটি প্রতীক ছিল যাকে “নেফর” বলা হতো, যার অর্থ হল ‘সুন্দর’। এই প্রতীকটি তাঁরা শূন্য এবং দশকের ভিত্তি হিসেবে ব্যাবহার করত। প্রাচীন মিশরীয় পিরামিড ও অন্যান্য স্থাপনায় এ ধরনের সংখ্যার ব্যবহার পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে ব্যবিলনীয় গণিতবিদরা ছয়ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থার প্রবর্তন ও উন্নয়ন করে। ‘শূন্য’ সংখ্যাটির অভাব তারা ছয়ভিত্তিক সংখ্যার মধ্যে একটি খালি ঘর রেখে পূরণ করত। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দের দিকে দুটি যতিচিহ্ন প্রতীক এই ফাঁকা যায়গা দখল করে নেয়। প্রাচীন মেসোপটেমীয় শহর সুমের থেকে প্রাপ্ত একত্ব শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন লেখক বেল বেন আপ্লু তার লেখায় দু’টি যতিচিহ্ন প্রতীক ব্যবহারের বদলে একই ‘হুক’ দিয়ে শূন্যকে প্রকাশ করেছেন।

ব্যাবিলনীয় শূন্যটি প্রকৃতপক্ষে ‘শূন্য’ হিসেবে ‘গণ্য’ করা সমীচীন হবে না। কারণ, এই প্রতীকটিকে স্বাধীনভাবে লেখা সম্ভব ছিল না কিংবা এটি কোনো সংখ্যার পিছনে বসে কোনো দুই অংক বিশিষ্ট অর্থবোধক সংখ্যা প্রকাশ করত না। শূন্যকে কোনো সংকেত বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার না করে সরাসরি সংখ্যা হিসেবে সফলভাবে ব্যবহারের অবিমিশ্র কৃতিত্ব প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদদের। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীর দিকে ভারতে বাস্তব সংখ্যা দ্বারা হিসাব নিকাশ করার সময় শ্যূন্য ব্যবহৃত হত। এমনকি শ্যূন্যকে ব্যবহার করে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগও করা হত।

শূন্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
শূন্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

শূন্য কে আবিষ্কার করেন?

শূন্য আবিষ্কারের আগে ম্যাথমেটিকোসের সংখ্যা গণনা এবং অনেক গাণিতিক প্রশ্ন সমাধানে অসুবিধা ছিল। যদি দেখা যায়, শূন্যের আবিষ্কার গণিতের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লবের মতো। যদি শূন্য আবিষ্কার না করা হত তবে গণিত আজকের তুলনায় অনেকগুণ বেশি কঠিন হত। আজ, আমরা যেভাবে “০ “ব্যবহার করছি এবং আমাদের যে শূন্যের সঠিক সংজ্ঞা রয়েছে, এর পিছনে অনেক গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। তবে জিরো জে আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব ভারতীয় পণ্ডিত ‘ব্রহ্মগুপ্ত‘ এর কাছে। কারণ তিনি শুরুতে নীতিগুলি সহ শূন্যের পরিচয় দিয়েছিলেন।

ভারতের মহান গণিতবিদ ও জ্যোতিষী ব্রহ্মগুপ্তের আগে আর্যভট্ট শূন্য ব্যবহার করেছিলেন, তাই বহু লোক আর্যভট্টকেও শূন্যের জনক বলে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু তত্ত্ব না দেওয়ার কারণে তাকে শূন্যের প্রধান উদ্ভাবক হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। শূন্য আবিষ্কার সম্পর্কে প্রথম থেকেই ভিন্নতা ছিল। কারণ গণনাটি অনেক দিন আগে করা হচ্ছে তবে শূন্য ছাড়া এটি অসম্ভব বলে মনে হয়। তবে এটি এমনটি নয়, এর আগেও, মানুষ কোনও নীতি ছাড়াই বিভিন্ন উপায়ে শূন্য ব্যবহার করত এবং এর কোনও চিহ্নও ছিল না। ব্রহ্মগুপ্ত এটি প্রতীক এবং নীতিগুলির সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন এবং এটি গণিতবিদ এবং জ্যোতিষী আর্যভট্ট ব্যবহার করেছিলেন।

শূন্য কে আবিষ্কার করেন?

 

শূন্য কখন এবং কোথায় আবিষ্কার হয়েছিল?

শূন্যের আবিষ্কারের অনেক আগেই অনেক প্রতীক স্থানধারক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে শূন্যের আবিষ্কার কবে হয়েছিল তা ঠিক বলা যায় না, তবে 62২৮ খ্রিস্টাব্দে মহান ভারতীয় গণিতবিদ ‘ব্রহ্মগুপ্ত’ প্রতীক ও নীতি দিয়ে শূন্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

শূন্যের মান কত ?

অঙ্ক শাস্ত্রে শূন্যের মান নেই। তবে কোনো সংখ্যার পরে অর্থাৎ ডানদিকে শূন্য বসলে তার মান বৃদ্ধি পায় তেমনি কোনো সংখ্যার আগে শূন্য বসলে তার মান অপরিবর্তিত থাকে। উদাহরণ দিয়ে দেখানো যাক। ধরা যাক ১৮৯ সংখ্যাটির পরে আমরা দুটি শূন্য বসালাম। এখন সংখ্যাটি হল ১৮৯০০ তার মানে অঙ্ক শাস্ত্র হিসাবে আগের সংখ্যাটির থেকে পরের সংখ্যাটি ১০০ গুণ বেশি। কিন্তু ১৮৯ এর আগে চারটি শূন্য দিলেও তা ১৮৯ থাকবে। ১৮৯ লেখাও যা ০০০১৮৯ লেখাও তাই। শূন্য আবার ধনাত্মক বা ঋণাত্মক নয়। এটি কে সাহায্যকারী সংখ্যা বলা হয়। এর নিজের কোনো মান নেই তবে অন্য সংখ্যার মান শূন্যের ওপর নির্ভরশীল।

শূন্যের মান কত ?

শূন্যের ইতিহাস

শূন্যের আবিষ্কারটি বুঝতে শূন্যের ইতিহাসটি বোঝা খুব জরুরি। আজকের শূন্যের নীতি এবং এর ব্যবহারগুলি বেশ আধুনিক। তবে প্রাথমিকভাবে লোকেরা এটিকে ব্যবহার করে না। যদি দেখা যায় তবে এটি স্থানধারক হিসাবে উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং পরে এটির ব্যবহার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ব্রহ্মগুপ্ত শূন্য আবিষ্কারের আগেও শূন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। হ্যাঁ, এটি অনেক প্রাচীন মন্দিরের প্রত্নতত্ত্ব এবং গ্রন্থগুলিতে দেখা গেছে। এটি যে বলা যায় না যে ০ টি কখন আবিষ্কার হয়েছিল এবং কখন এটি ব্যবহৃত হয়েছিল, তবে এটি নিশ্চিত যে এটি ভারতের উপহার।
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া কঠিন ছিল, তাই আমরা বহু শতাব্দী আগের কথা বলছি। তারপরে যোগাযোগের কোনও উপায় ছিল না। অর্থাত্ বিশ্বের এক কোণে বসবাসকারী ব্যক্তি এমনকি জানে না যে বিশ্বের অন্য কোনায় বাস করে এমন কোনও লোক রয়েছে।

সমস্ত মানুষ তাদের নিজস্ব জীবনযাপন করছিল এবং তাদের নিজস্ব গতিতে বিকাশ করছে। এটা পরিষ্কার যে প্রতিটি সভ্যতায় গণনা করা হচ্ছিল তবে সংখ্যার প্রতীকগুলি আলাদা ছিল। শুরুতে শূন্য ছিল মাত্র একটি স্থানধারক। তবে পরে এটি গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে যে শূন্য ধারণাটি অনেক পুরান তবে এটি 5 ম শতাব্দী পর্যন্ত ভারতে সম্পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছিল। গণনা ব্যবস্থা প্রবর্তনকারী প্রথম ব্যক্তিরা ছিলেন সুমেরীয়। ব্যাবিলনীয় সভ্যতা তাদের কাছ থেকে গণনা পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। যখন এই গণনা সিস্টেমটি প্রতীকগুলির উপর ভিত্তি করে ছিল।

এটি ৪ থেকে ৫ হাজার বছর আগে উদ্ভাবিত হয়েছিল। ব্যাবিলনীয় সভ্যতা স্থানধারক হিসাবে কিছু প্রতীক ব্যবহার করেছিল। এই স্থানধারকটি ১০ ​​এবং ১০০ এবং ২০২৫ এর মতো সম্পূর্ণ সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্যাবিলনীয় সভ্যতার পরে মায়ানো ০ টি স্থানধারক হিসাবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তিনি এটি প্যানেল সিস্টেম তৈরিতে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। তবে তিনি কখনই গণনায় ০ ব্যবহার করেন নি। এর পরে, ভারতের নামটি এসেছে যেখানে থেকে আজ ০ আকারে এসেছিল। অনেক লোক বিশ্বাস করেন যে ০ ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে ভারতে এসেছিল, তবে বেশিরভাগ মানুষ মেনে নিয়েছেন যে ০ ভারত সম্পূর্ণরূপে বিকাশ করতে পারেনি এবং এখান থেকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

শূন্যকে ভারতে জিরো বলা হত, এটি সংস্কৃত শব্দ। শূন্য ধারণা এবং এর সংজ্ঞাটি সর্বপ্রথম ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত ৬২২ খ্রিস্টাব্দে দিয়েছিলেন। এর পরে ভারতে এটি বিকাশ অব্যাহত রেখেছে। পরে অষ্টম শতাব্দীতে শূন্য আরবো জি সভ্যতায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে এটি আজ ‘০’ রূপ পেয়েছে। অবশেষে এটি দ্বাদশ শতাব্দীর চারপাশে ইউরোপে পৌঁছেছিল এবং ইউরোপীয় গণনার উন্নতি হয়েছিল। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে শূন্য আবিষ্কারে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে। লিওনার্দো ফিবোনাচি নামক এক ইতালীয় শিক্ষার্থী আফ্রিকায় যান উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। এখন যেমন আমাদের দেশের কিংবা প্রাচ্যের শিক্ষার্থীরা পশ্চিমে যায় উচ্চশিক্ষা লাভ করতে, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ঘটনা ছিল উল্টো। বরং পশ্চিমের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আরব, মিশর, ইরাক, সিরিয়ায় যেত উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। তরুণ ফিবোনাচি মুসলিম গণিতজ্ঞদের কাছ থেকে গণিত শিক্ষা লাভ করে দেশে ফিরে যান। কালক্রমে তিনি নিজেও একজন গণিতবিদ হয়ে উঠেন। তিনিই প্রথম আরবি গণিত এবং শূন্যকে ইউরোপীয়দের সামনে তুলে ধরেন। এভাবে ভারতের ‘শূনিয়া’ আরবের ‘সিফর’ হয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে ‘জিরো’তে পরিণত হলো।

শূন্যে আবিষ্কারের গল্প

শূন্যের আবিষ্কার ঠিক কবে, কোথায় হয়েছিল তা নিয়ে নানা মুনীর নানা মত। তবে বহুল স্বীকৃত মত হল শূন্য আবিষ্কার হয়েছে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে। এবং আবিষ্কারক হলেন আর্যভট্ট। শূন্য আবিষ্কারের ফলে গণিত শাস্ত্র অনেক সহজ হল। দশমিক পদ্ধতিতে অঙ্ক সহজ হল। পাটীগণিত পদ্ধতিতে নির্ভুল সমাধান করা যেতে লাগল, এখন কেউ কেউ ভাববেন শূন্য সংখ্যাটি আবিষ্কারের আগে কি অঙ্ক শাস্ত্র ছিল না ? অঙ্ক শাস্ত্র শূন্য আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই ছিল। গণিত শব্দটি এসেছে গণনা থেকে। আগে বিভিন্ন সভ্যতায় ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যামালা ছিল। মেসোপটেমিয়া সভ্যতাতে ১ থেকে ৬০ অব্দি সংখ্যাগুলিকে বিভিন্ন অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হত।

শূন্য আবিষ্কারে আর্যভট্টের অবদান

প্রচুর লোক বিশ্বাস করেন যে শ্রবণের উদ্ভাবন হয়েছিল ভারতের জনপ্রিয় গণিতবিদ এবং জ্যোতিষী আর্যভট্ট দ্বারা। এটি অনেকাংশে সত্যও কারণ আর্যভট্টই প্রথম ব্যক্তি যিনি শূন্য ধারণাটি দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট বিশ্বাস করেছিলেন যে এমন একটি সংখ্যা থাকা উচিত যা দশ-অঙ্কের প্রতীক হিসাবে দশটি এবং একক অঙ্ক হিসাবে শূন্যকে (কোনও মূল্য ছাড়াই) উপস্থাপন করতে পারে।অর্থাৎ, আর্যভট্ট শূন্য ধারণাটি দিয়েছিলেন এবং তারপরে ষষ্ঠ শতাব্দীতে ০ নীতিটি দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট ব্রহ্মগুপ্ত ছাড়াও চুন্নির আবিষ্কারের কৃতিত্ব অন্য এক ভারতীয় গণিতবিদ, যার নাম ছিল শ্রীধরাচার্য। শ্রীধরচার্য ৮ ম শতাব্দীতে ভারতে শূন্যের ক্রিয়াকলাপ আবিষ্কার করেছিলেন এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যা করেছিলেন।

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ আর্যভট্ট

ব্রহ্মগুপ্তের শূন্যর ব্যবহার

এদিকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেক্সান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করলেন তখন তার সৈন্যসামন্তের মাধ্যমে ভারতীয়রা ব্যবিলনীয়দের গণনা শাস্ত্রের কথা জানতে পারে। ব্যবিলনীয়রা যে শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে গ্রহণ না করলেও সংখ্যাব্যবস্থায় ‘স্থানরক্ষক’ হিসেবে গ্রহণ করেছে তা এদের কাছ থেকেই জানতে পারে। এবার ভারতীয়রা আর শূন্যকে নিগৃহীত হতে দিলেন না। শূন্যকে তারা তাদের ১০ ভিত্তিক সংখ্যা মালায় স্থান দিলেন। আনুমানিক ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মগুপ্ত নামক এক গণিতবিদ সর্বপ্রথম শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি শূন্য হিসেবে সংখ্যার নিচে ডট চিহ্ন ব্যবহার করতেন।

ব্রহ্মগুপ্তের শূন্যর ব্যবহার

মিশরীয় সভ্যতায় শূণ্য

এদিকে সমসাময়িক নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতা তখন অনেক এগিয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান, চান্দ্রবর্ষ, সৌরবর্ষ ভিত্তিক ক্যালেন্ডার তৈরি করে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার দিকে। তাছাড়া নীলনদ তীরের নদী গর্ভে হারিয়ে যাওয়া জমি-জমার হিসাব রাখতে তারাই প্রথম জ্যামিতির প্রবর্তন করে। যদিও তা শুধুমাত্র কাজ চলে এমন প্রাথমিক জ্যামিতি। ধীরে ধীরে তারা ঘনবস্তুর ঘনত্ব পরিমাপ করতে শিখে এবং দেড় হাজার বছর ধরে নির্মাণ করা পিরামিডের ঘনত্ব পরিমাপ করতে শেখে ।

মিশরীয় সভ্যতায় শূণ্য

পরবর্তীতে গ্রিক পন্ডিত ইউক্লিড কিছু স্বতঃসিদ্ধ নীতি বা মৌলিক নিয়মের উপর ভিত্তি করে গণিতের আরেক শাখা জ্যামিতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যাকে আমরা ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ বলে জানি। এতসব জ্ঞানচর্চার মাঝে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কখনো কখনো শূন্য বেচারা সামনে চলে আসতো। কিন্তু মিশরীয়রা সযত্নে তাকে হঠিয়ে দিতো এবং কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতো। কারণ শূন্য ব্যাটা হলো শয়তানের সহচর, ঈশ্বরের পরিপন্থী, ঈশ্বরকে অস্বীকার করে এই পাপিষ্ঠ। তাই শূন্যকে যে করেই হোক ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতো তারা।

পিথাগোরাসের বদ্ধমূল ধারণা

গ্রিক পন্ডিত পিথাগোরাস তো শূন্য এবং অমূলদ কথা শুনলেই কঠিন শাস্তি দিতেন তার গোপন সংঘের শিষ্যদের। তার মতে, শূন্য হলো শয়তানের দোসর আর অমূলদ সংখ্যা হলো বিশ্বপ্রকৃতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। কারণ গণিতবিদ পিথাগোরাস একজন সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন। বলা চলে, গণিতই তাকে সঙ্গীতের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। পিথাগোরাসের শূন্যভীতি তো সভ্যতাক্রমিক কিন্তু অমূলদ সংখ্যার প্রতি বিতৃষ্ণার কারণ হলো তিনি খেয়াল করেছেন যে তারের বাদ্যযন্ত্রগুলোতে যখনই মূলদ সংখ্যার অনুপাতে টোকা দেওয়া হয় তখনই সুরেলা আওয়াজ বের হয়। কিন্তু যখনই তা অমূলদ হয়ে যায় তখনই সেখান থেকে বেসুরো আওয়াজ বের হতে থাকে। এ থেকে পিথাগোরাস একটি বড় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, বিশ্ব সংসারে সব কিছুতেই রয়েছে মূলদ সংখ্যারা, অমূলদ সংখ্যা মানেই বেসুর, বিশৃঙ্খলা। আর তাই স্রষ্টা অমূলদ সংখ্যা পছন্দ করেন না এটাই ছিল মহামতী পিথাগোরাসের বদ্ধমূল ধারণা।

পিথাগোরাসের বদ্ধমূল ধারণা

বাকশলি পান্ডুলিপিতে শূন্য

ভারতীয় উপমহাদেশে পশ্চিমের নিগৃহীত শূন্য ও অসীম বেশ যত্নে ও মায়ায় বড় হচ্ছিল তখন। কারণ ভারতীয়দের কাছে শূন্য মা ব্রহ্মার প্রতীক (৩)। শূন্য ও অসীম ব্রহ্মারই দুই রুপ। ৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ঋগ্বেদে প্রথম শূন্যের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। সংস্কৃতে একে ‘শূনিয়া’ বা খালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তাছাড়া বৌদ্ধ ধর্মেও মনকে খালি করে অর্থাৎ জাগতিক সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ধ্যানে মনোনিবেশ করার কথা পাওয়া যায়। ভারতের গোয়ালিয়রের এক মন্দিরের শিলালিপিতেও শূন্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাছাড়া খ্রিস্টীয় তিন থেকে চার শতকের মাঝে লেখা বাকশালি পান্ডুলিপিতেও শূন্যের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। বুঝতেই পারছেন এখানে শূন্যের কতটা কদর ছিল।

পরবর্তীতে লিওনার্দো ফিবোনাচি নামক এক ইতালীয় শিক্ষার্থী আফ্রিকায় যান উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। এখন যেমন আমাদের দেশের কিংবা প্রাচ্যের শিক্ষার্থীরা পশ্চিমে যায় উচ্চশিক্ষা লাভ করতে, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ঘটনা ছিল উল্টো। বরং পশ্চিমের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আরব, মিশর, ইরাক, সিরিয়ায় যেত উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। তরুণ ফিবোনাচি মুসলিম গণিতজ্ঞদের কাছ থেকে গণিত শিক্ষা লাভ করে দেশে ফিরে যান। কালক্রমে তিনি নিজেও একজন গণিতবিদ হয়ে উঠেন। তিনিই প্রথম আরবি গণিত এবং শূন্যকে ইউরোপীয়দের সামনে তুলে ধরেন। এভাবে ভারতের ‘শূনিয়া’ আরবের ‘সিফর’ হয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে ‘জিরো’তে পরিণত হলো।