free hit counter
ইতিহাস

রুটির বিনিময়ে কেনা গোলামের বিদ্রোহ

ওবায়দুর রহমান

১৮৪৯ সালের ১৮ আগস্টের নানকার কৃষক বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা। শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে কৃষক প্রজা তথা জনসাধারণের অধিকার আদায়ের অন্যতম সফল লড়াই-সংগ্রাম এটি। এই বিদ্রোহ সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের নিম্নবিত্ত, অবহেলিত মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে উপরতলার মানুষদের ভিত নড়বড়ে করে দেয়। জমিদার মিরাশদার তালুকদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে সাধারণ প্রজার চেয়েও নিম্নশ্রেণীভূক্ত নানকার প্রজাদের বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহের উত্থান। তৎকালীন জমিদার শ্রেণীর লোকজন এই ঘটনায় রীতিমতো বিস্মিত হন। তারা ভাবতেও পারেনি যে তাদের ভিটায় বা জমিতে বাস করে তাদের হুকুমের চাকর হয়ে তাদের খেয়ে এই নিম্নবিত্ত নানকাররা এমন দুঃসাহস দেখাতে পারে। ওই সময়ের নানকার বিদ্রোহ সমস্ত জায়গায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো।

‘নানকার’ দুটি শব্দের সমন্বিত। ‘নান’ ফারসি শব্দ যার অর্থ ‘রুটি’; ‘কার’ শব্দের অর্থ ‘কাজ’। বাস্তবিক অর্থে রুটির বিনিময়ে কেনা গোলাম। নানকার বলতে এমন বিষয় বুঝায় যা কেবলমাত্র ভোগ করার জন্য অন্যকে দেওয়া হয়, কিন্তু মালিকানা দেওয়া হয় না। আবার কেউ কেউ ‘নাই কর যার’ অর্থেও ব্যাখ্যা করেছেন। সেই সময় ভূ-স্বামীরা কিছু প্রজাকে তাদের বেঁচে থাকার বিনিময়ে থাকার জন্য ও ভোগ করার জন্য জমি দিতো। জমিদাররা যে কোনও সময় ওই জমি বা বাড়ি থেকে ভোগকারীকে উচ্ছেদ করতে পারে। নানকার প্রজারা কেবলমাত্র সামান্য খাদ্য ও জমিদারের জমি বা বাড়ি ভোগের বিনিময়ে চাকর হয়ে থাকবে। নানকার প্রজাদের নিজস্ব বলতে কিছুই ছিলনা। মালিকের ফাইফরমাশ খাটা, যে কোনো হুকুম তামিল করাই ছিল তাদের কর্তব্য। ছেলেমেয়ে, বৌ-ঝিদেরও পুরুষানুক্রমে এই শৃঙ্খলে বাঁধা থাকতে হতো। কিরান, নমশূদ্র, পাটনি, মালি, ঢুলি, ক্ষৌরকার প্রভৃতি পেশাভিত্তিক শ্রেণীর লোকজন ছিলেন নানকার প্রজাভুক্ত। সিলেট অঞ্চলের জমিদার বা মিরাশদার বা তালুকদার শ্রেণির ভূ-স্বামীরা নানকার প্রজা রাখতেন। এই রেওয়াজকে বেগার প্রথা বা চাকরান প্রথাও বলা হতো।

নানকার প্রথা একটি বর্বর শ্রম শোষণের প্রথা যা মধ্যযুগের দাস প্রথার মতো। সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ অঞ্চলে এই প্রথাটি প্রচলিত ছিলো। এই অঞ্চলের ভূ-স্বামীদের মিরাশদার এবং বড় মিরাশদারদের জমিদার বলা হতো। এসব ভূস্বামীরা তাদের নিকটবর্তী স্থানে কিছু প্রজার বসবাসের ব্যবস্থা করতো, যারা ছিলো নানকার প্রজা। তাদেরকে সার্বক্ষণিক এই সকল জমিদার বা মিরাশদাররা গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত রাখতো। বিনা মজুরিতে তারা বেগার খাটত। চুন থেকে পান খসলেই তাদের উপর চলতো অমানবিক ও অমানুষিক নির্যাতন। এমনকি গভীর রাতেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নানকারদেরকে সাড়া দিতে হতো ভূ-স্বামীদের ডাকে, না দিলে নেমে আসতো বর্বর নির্যাতন। নানকার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের তথ্যমতে, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ ভাগ ছিলো নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেট জেলায় চালু ছিল। ১৯২২-১৯২৩ সালে সামন্তবাদী এই প্রথার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানার সুখাউড় গ্রামে জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে প্রজারা রুখে দাঁড়িয়েছিলো। জৈনকা রমণীকে জমিদারের পছন্দ হওয়ায় তাকে ডেকে পাঠালে সে যায়নি। পরে জমিদার তার লাঠিয়াল বাহিনীকে নিয়ে গেলে সেই নারী তাকে অপমান করে। এতে জমিদার ক্ষুব্ধ হলে প্রজারা জমিদারের খপ্পর থেকে ওই রমণীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ব্রজবাসীর সন্ধান পরে পাওয়া যায়নি। তাকে হয়তো জমিদাররা মেরে ফেলে।

এরপর ১৯৩১-৩২ সালে কুলাউড়া, ১৯৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দে সুনামগঞ্জের দিরাই থানার রফিনগর, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, সিলেটের রনকেলি, ভাদেশ্বর, বাহাদুরপুরসহ অন্যান্য স্থানে সংগঠিত অসংগঠিত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯৪৫ সালে বিয়ানীবাজারের লাউতা এলাকায় সংগঠিত বিদ্রোহের সূচনা হয়। জোয়াদ আলী, আব্দুস সোবহান, হামিদ আলী প্রমুখ এতে নেতৃত্ব দেন। ওই সময় আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিলো বসতভিটার উপর স্বত্বলাভের।

রুটির বিনিময়ে কেনা গোলামের বিদ্রোহ

১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, লাউতা, বাহাদুরপুর, সানেশ্বর, নন্দিরপুল, রনিকাইল, ফুলবাড়ী, ভাদেশ্বর, দক্ষিণভাগ, বালাগঞ্জের বোয়ালজুর, ফেঞ্চুগঞ্জের মৌরাপুর, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ইত্যাদি থানায় সংগঠিতভাবে নানকার আন্দোলন গড়ে উঠে। আর এই ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলো বিয়ানীবাজার উপজেলা, তারাই প্রথম এই সামন্তবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানকার কৃষকরা বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করে।

কথিত রয়েছে লাউতা বাহাদুরপুর অঞ্চলের জমিদাররা ছিলো খুবই অত্যাচারী। তাদের অত্যাচারের মাত্রা ছিলো ভয়াবহ। ঐসব জমিদারদের অত্যাচারে নানকার প্রজা, কৃষক সবাই ছিল অতিষ্ঠ। প্রচলিত রয়েছে, বাহাদুরপুর জমিদার বাড়ির সামনের রাস্তায় কেউ জুতা পায়ে হাঁটতে পারতো না, খুলে হাঁটতে হতো, একই সাথে কেউ ছাতা টাঙ্গিয়ে ও ঘোড়ায়ও চড়তে পারতো না। যদি কেউ এর ব্যতিক্রম করতো তবে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হতো। কেউ এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা ঘরের দরজা বন্ধ করেও কোন কিছু বলতে পারতো না। ঐ সময়ে নানকার প্রজা ও কৃষকদেরকে কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট দল গোপনে গোপনে সংগঠিত করে।

১৯৪৭ সালের আগেই অজয় ভট্টাচার্য নিজেকে কৃষকসহ সকল নির্যাতিত জনগণকে সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন এবং এজন্য তাকে একাধিকবার গ্রেফতার হতে হয় ব্রিটিশ-ভারতের নিরাপত্তা আইনে। দেশ ভাগের আগে ও পরে দুই ভাগে সংগঠিত হয় রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহ যার অন্যতম রূপকার হলেন কমরেড অজয় ভট্টাচার্য। এসময় তার সঙ্গে আরও কাজ করেন শিশির ভট্টাচার্য, ললিতপাল, জোয়াদ উল্ল্যা, আব্দুস সোবহান ও শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্যসহ আরও কয়েকজন। এই সকল নেতৃত্বে নানকার কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে। নানকার প্রজা ও কৃষকরা নেতাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বন্ধ করে দেয় খাজনা ও জমিদারদের বাজার করা পর্যন্ত এবং অনেক জায়গায় জমিদারের লোকজনকে ধাওয়া করার ঘটনাও ঘটে। এতে জমিদাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে নানকার প্রজা ও কৃষকদের দমন করার আবেদন করে এবং তাদের প্ররোচনায় পাকিস্তান সরকার এই বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।

রুটির বিনিময়ে কেনা গোলামের বিদ্রোহ

১৯২২ সালে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সূর্য উঠার আগেই তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ, ইপিআর ও জমিদারদের নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী হামলা চালায় শানেশ্বর গ্রামের নানকারদের ওপর। শানেশ্বর ও উলুউরী গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে বাহিনীর মুখোমুখি হয়। জন্ম নেয় এক নির্মম ইতিহাস। উক্ত নানকাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন।

সমগ্র আন্দোলনকে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন হিসেবে প্রচারণা চালায়। রক্তে রঞ্জিত হয় শানেশ্বরের মাটি আর সুনাই নদীর জল। রণক্ষেত্রেই নিহত হন ব্রজনাথ দাস (৫০), কুটু মণি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৫০) ও রজনী দাস (৫০)। আহত অমূল্য কুমার দাস (১৭) পরবর্তী সময়ে বন্দি অবস্থায় শহীদ হন। সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নানকার আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী অন্তঃসত্ত্বা অর্পণা পাল চৌধুরীর ঘটনাস্থলেই গর্ভপাত ঘটে। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ছয় কৃষক তাদের বুকের তাজা রক্তে পূর্বসূরিদের ঋণ শোধ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে সরকার জমিদারি প্রথা বাতিল করে এবং নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

এই করুণ ঘটনাকে নিয়ে গণসংগীত শিল্পী ও কবি হেমাঙ্গ বিশ্বাস গান রচনা করেছিলেন:

‘সুনাই গাঙ তোমার কেনে উতলা পানি/ সানেশ্বরের কারবালায় কারা জান দিল-কুরবানি/ কও বন্ধু কও একবার শুনি…।’

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, উদীচী, গৌরীপুর শাখা সংসদ

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

Source link