সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে ‘নিষিদ্ধ দেশ’ তিব্বত, আর ‘নিষিদ্ধ নগরী’ তিব্বতের রাজধানী লাসার কথা পড়েনি এমন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা খুবই কম। কী আছে তিব্বতে? এ ব্যাপারে সবার মনে রয়েছে প্রশ্ন। কোনটি নিষিদ্ধ দেশ—প্রশ্ন করলে এক বাক্যে সবাই বলবে ‘তিব্বত’। কিন্তু এ নিষেধের পেছনের রহস্য অনেকেরই অজানা। কেন তিব্বতকে নিষিদ্ধ দেশ বলা হয়? কী এমন গাঢ় রহস্যের কুয়াশায় আবৃত তিব্বতের অবয়ব?

তিব্বত এর সৌন্দর্য্য
তিব্বত এর সৌন্দর্য্য ; ছবি : alokitobbaria

হিমালয়ের উত্তর অংশে শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে তিব্বত নামের রহস্যময় রাজ্যটি। তিব্বত হিমালয়ের উত্তরে অবস্থিত ছোট একটি দেশ। ১৯১২ সালে ত্রয়োদশ দালাই লামা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি স্ব-শাসিত অঞ্চল তিব্বত। মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত এ অঞ্চলটি তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। এ অঞ্চলটিকে চীনের অংশ বলা হলেও এখানকার বেশির ভাগ তিব্বতি এ অঞ্চলকে চীনের অংশ মানতে নারাজ। এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

১৯৫৯ সালে গণচীনের বিরুদ্ধে তিব্বতিরা স্বাধিকার আন্দোলন করলে, তা ব্যর্থ হয়। তখন দালাই লামার নেতৃত্বে অসংখ্য তিব্বতি ভারত সরকারের আশ্রয় নিয়ে হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে স্বাধীন তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অঞ্চলগুলো এতই উঁচু যে একে পৃথিবীর ছাদ বলা হয়। তিব্বতীয় মালভূমির গড় উচ্চতা ১৬,০০০ ফুট। বহির্বিশ্বের মানুষের প্রবেশাধিকার না থাকা, দুর্গম পরিবেশ, লামাদের কঠোরতা ইত্যাদি বিষয় তিব্বত সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল আরো বাড়িয়েছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ মালভূমি আর বরফ গলা নদী নিয়ে জাদুময়ী এক রহস্যরাজ্য তিব্বত। লাসার অদূরেই অবস্থিত গোবি মরুভূমি। এই মরুভূমির কষ্টকর পরিবেশ মানুষকে কাছে যেতে নিরুৎসাহী করে।

সেখানকার ভাষা মূলত আদর্শ তিব্বতি ভাষা। যদিও তিব্বত চায়নার অধীকৃত অংশ, তারপরও তিব্বতের নিজস্ব একটি পতাকা আছে। পতাকাটির নাম “স্নো লায়ন ফ্ল্যাগ” । ১৯৫১ সালের পর থেকে অফিশিয়ালি তিব্বতের এই পতাকাটি ব্যবহার করা যায় নি এবং ১৯৫৯ সালে চীন সরকার তা নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। যদিও পতাকাটি ভারতের ধর্মশালা্তে অবস্থিত কেন্দ্রীয় তিব্বত প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়।

তিব্বতের পতাকা
তিব্বতের পতাকা ; ছবি : wikipedia

তিব্বতে সরকারি ভাষা হিসেবে চীনা ভাষার প্রচলন থাকলেও তিব্বতিদের ভাষার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। তাই চীনের বেশ কিছু প্রদেশ এবং ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানে তিব্বতি ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। তিব্বতিদের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আচার হলো-মৃতদেহ সৎকার। তাদের মৃতদেহ কাউকে ছুঁতে দেওয়া হয় না। ঘরের কোনায় মৃতদেহটি বসিয়ে চাদর অথবা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। মৃতদেহের ঠিক পাশেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পাঁচটি প্রদীপ। তারপর পুরোহিত পোবো লামাকে ডাকা হয়। পোবো লামা একাই ঘরে ঢোকেন এবং ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দেন। এরপর পোবো মন্ত্র পড়ে শরীর থেকে আত্মাকে বের করার চেষ্টা করেন। প্রথমে মৃতদেহের মাথা থেকে তিন-চার গোছা চুল টেনে ওপরে তোলা হয়। তারপর পাথরের ছুরি দিয়ে মৃতদেহের কপালের খানিকটা কেটে প্রেতাত্মা বের করার রাস্তা করে দেওয়া হয়। মৃতদেহকে নিয়ে রাখা হয় একটি বড় পাথরের টুকরোর ওপর। একটি মন্ত্র পড়তে পড়তে মৃতদেহের শরীরে বেশ কয়েকটি দাগ কাটা হয়। দাগ কাটার পর একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে সেই দাগ ধরে ধরে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। তারপর পশুপাখি দিয়ে খাওয়ানো হয়।

সেখানে চাষযোগ্য ভূমি কম থাকার কারণে পশুর উপর জীবনধারণ করতে হয়। তিব্বাতিয়ান ইয়াক পশুটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত, যদিও আমাদের দেশের মানুষ খুব কমই প্রাণিটিকে চিনেবে। অবাককর ব্যাপারটা মনে হয়েছে কুকুর নিয়ে। ওখানকার একেকটা কুকুরের সাইজ অতিকায় দীর্ঘ।

তিব্বতের লোমশ কুকুর
তিব্বতের লোমশ কুকুর ; ছবি : jibontojibon

তিব্বতের চতুর্দিকে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পাহাড় ও গুহা। সেই পাহাড়ি গুহাগুলোতে বাস করে বৌদ্ধ পুরোহিত লামারা। তিব্বতের গুহাগুলো নিয়েও রহস্য আর জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তিব্বত বা লাসায় দীর্ঘদিন মানুষের প্রবেশাধিকার না থাকা, দুর্গম পরিবেশ, লামাদের কঠোরতা ও পর্যটক নিষিদ্ধের কারণে বাইরের পৃথিবীতে তিব্বত যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক অচেনা জগত। সম্রাট সগেন পো তিব্বতের রাজধানী লাসা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা। ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট একটি বিরাট জলাশয় ভরাট করে প্রাসাদ এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিব্বতের বিভিন্ন মন্দিরের ভেতরে সোনার তৈরি বড় বড় প্রদীপ মাখন দিয়ে জ্বালানো থাকে। ৪ হাজার ভরি ওজনের একটি প্রদীপও সেখানে রয়েছে।

চার হাজার ভরি ওজনের সোনার প্রদীপ
চার হাজার ভরি ওজনের সোনার প্রদীপ ; ছবি : alokitobbaria

তিব্বতের আরেকটা নাম আছে, “পৃথিবীর জলাধার”। জলাধার কেনই বা বলবে না? নিম্নোক্ত কারণে তিব্বতকে পৃথিবীর জলাধার বলা হয়-

১. ইয়াংজী এশিয়ার সবচেয়ে বড় নদী, পৃথিবীর ৩য় দীর্ঘতম নদী এবং এর দৈর্ঘ্য ৬৩০০ কি.মি.;

২. ইয়োলো নদী বা হলুদ নদী এশিয়ার ২য় বৃহত্তম নদী চায়নাতে আর পৃথিবীর মধ্যে ৬ষ্ঠ দীর্ঘতম নদী এবং এর দৈর্ঘ্য ৫৪৬৪ কি.মি.;

৩. ইন্দুস নদী তিব্বত থেকে চায়না, পাকিস্তান ও ভারতে প্রবাহিত হয়;

৪. মেকং নদী তিব্বত দিয়ে প্রবাহিত হয় চায়না, মায়ানমার, লাউস,থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে;

৫. গঙ্গা নদী ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়;

৬. শালুয়িন নদী, ইয়ারলু জাংকপো যা ব্রম্মপুত্র নদী, চায়না থেকে শুরু করে ভারতের অরুনাচল প্রদেশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে

প্রবাসী অনেক তিব্বতীয় এই অঞ্চলকে গণচীনের একটি অংশ হিসেবে মানতে সম্মত নন। ১৯৫৯ সালে গণচীনের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের স্বাধীকারের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়। তখন দলাই লামার নেতৃত্বে অসংখ্য তিব্বতি ভারত সরকারের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাস আরম্ভ করেন। সেখানেই ভূতপূর্ব স্বাধীন তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিব্বতের রাজধানীর নাম লাসা।

তিব্বত নগরী
তিব্বত নগরী ; ছবি : alokitobbaria

লাসা ইটালিয়ান শব্দ, যার অর্থ ‘ঈশ্বরের স্থান’। তিব্বতিদের জীবনে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাদের প্রধান ধর্মগুরু দালাইলামা। নামটি এখন সারাবিশ্বে পরিচিত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তিব্বতে ‘লামা’ নামে পরিচিত। ‘লামা’ শব্দের অর্থ ‘প্রধান’। আর ‘দালাইলামা’ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান সমুদ্রের সর্বপ্রধান’। সোনার চূড়া দেওয়া ‘পোতালা’ প্রাসাদে দালাইলামা বাস করেন। ১৩৯১ সালে প্রথম দালাইলামার আবির্ভাব ঘটে। ১৯১২ সালে ত্রয়োদশ দালাইলামা কর্তৃক গণচীনের একটি স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে তিব্বত প্রতিষ্ঠা পায়। এই অঞ্চলটি চীনের অধীন হলেও তিব্বতিরা তা মানে না। ১৯৫৯ সালে গণচীনের বিরুদ্ধে তিব্বতিরা স্বাধিকার আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়। তখন দালাইলামার নেতৃত্বে অসংখ্য তিব্বতি ভারত সরকারের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাস আরম্ভ করেন। সেখানেই ভূতপূর্ব স্বাধীন তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিব্বতের অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। তিব্বতি জনগোষ্ঠী মহাযান মতে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম চর্চা করে থাকে।

তিব্বতের লামা ও সাধারণ মানুষেরা প্রেতাত্মাকে খুবই ভয় পায়। অধিকাংশ তিব্বতির ধারণা, মানুষের মৃত্যুর পর দেহের ভেতর থেকে প্রেতাত্মারা মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওই প্রেতাত্মা লাশ সৎকার হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের ক্ষতি করার জন্য ঘুরে বেড়ায়। তারা কখনো মানুষের ওপর ভর করে, কখনো পশু-পাখি কিংবা কোনো গাছ অথবা পাথরের ওপরও ভর করে। প্রেতাত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ও প্রেতাত্মাদের খুশি রাখতে তিব্বতিরা পূজা করে থাকে।

বরফ ঘেষা তীব্বত যেন সমস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। আপনি একদিকে বরফ চূড়া দেখবেন অন্যদিকে দেখবেন নীরব কিংবা জাগ্রত ঝর্না বয়ে যাচ্ছে অদূরে। হয়তো হারিয়ে যাবেন সেখানকার নদী বহমান চলাচলে। তিব্বতের রাজধানী লাসায় তাপমাত্রা গড়ে ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে -১৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তাই সেখানে অভিযোজন না করতে পারলে বেঁচে থাকা একপ্রকার দুষ্কর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তিব্বতে ঘুরে আসতে হলে আপনাকে চীনের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার থেকে আগে ভিসা পেতে হবে। তিব্বত এর ভিসা সম্পর্কে বিস্তারিত আপনি চীনের হাইকমিশনার এর অফিশিয়াল সাইটে পাবেন।

তিব্বতে বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা আরো বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনপন্থী তিব্বত সরকার। পাশাপাশি তিব্বত ভ্রমণে কাগজপত্র নিয়ে যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সেটি কমানো হবেও বলে জানানো হয়েছে। তিব্বত সরকার বিদেশী পর্যটকদের প্রবেশের জন্য যে সময় লাগত তা কমাবে এবং অঞ্চলটির ৫০ শতাংশ বেশি অঞ্চল ভ্রমণ করার সুযোগ দিবে। প্রসঙ্গত, তিব্বত ভ্রমণের জন্য চীনের নাগরিক ছাড়া বিদেশী সকল নাগরিককেই বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। আর এজন্য কিছু অনুমোদিত ট্র্যাভেল কোম্পানির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। তবে কোন সাংবাদিক এবং কূটনৈতিক সদস্যকে সেখানে সহজে যেতে দেয়া হয় না।

তিব্বতিদের জীবন যাপন আর সামাজিক রীতিনীতি অনেকাংশেই ধর্ম নির্ভর। তাদের এই সকল ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতিনীতিও অনেকটা রহস্যময়। বিশেষ করে তিব্বতিদের দালাইলামা নির্বাচন পদ্ধতি একেবারেই অদ্ভুত রকমের। নতুন দালাইলামাকে নির্বাচন করা নয় বরং তার খোঁজ করা হয়। কারণ এটা বিশ্বাস করা হয় যে মৃত্যুর পর নতুন শরীর বাছাই করে তার মাধ্যমে তিনি পুনর্জন্ম লাভ করেন। এর মানে হচ্ছে নতুন দালাইলামা মৃত দালাইলামার পুনর্জন্ম লাভকৃত রূপ।

দালাইলামা
বর্তমান দালাইলামা ; ছবি : alokitobbaria

পুনর্জন্ম নেয়া দালাইলামার খোঁজ করার দায়িত্ব থাকে উচ্চ স্থানীয় লামাদের এবং তিব্বত সরকার এর। আর এই নতুন দালাইলামার খোঁজ করতে অনেক সময় বছরের পর বছর লেগে যায় এবং তা তিব্বতের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে। ১৪ তম দালাইলামার খোঁজ করতে চার (৪) বছর লেগে যায়।

কোন দালাইলামা মারা গেলে নতুন লামার খোঁজ করতে অন্যান্য লামারা কোন একটা স্বপ্ন বা দিব্যদৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেন। যখন মৃত লামার দাহ করা হয় তখন তারা এর ধোয়ার গতির দিকে লক্ষ্য রাখে কারণ ঐ দিকেই দালাইলামার পুনর্জন্ম হবে বলে ধরে নেয়া হয়। তারপর তারা তিব্বতের একটি পবিত্র হ্রদের ধারে ধ্যান এ বসে। তিব্বতিদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সেই হ্রদের দেবী প্রথম দালাইলামার নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে তিনি পুনর্জন্মের এই প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখবেন। ধ্যানের মধ্যেই প্রধান লামা তার দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে নতুন লামার অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেন আর এভাবে প্রাপ্ত দিক নির্দেশনা অনুযায়ী তারা একটি ছেলে শিশুর সন্ধান করেন যে মৃত লামার পুনর্জন্মকৃত রূপ।

দালাইলামা নির্বাচন
শিশুদেরকেই দালাইলামা হিসেবে নির্বাচন করা হয় ; ছবি : alokitobbaria

তিব্বতিদের মৃতদেহ সৎকার পদ্ধতি একটু ভয়ংকর ধরনের। বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী শরীর শুধু আত্মাকে ধারণ করার আধার মাত্র। তাই আত্মা শরীরকে ছেড়ে গেলে সেই শরীর সংরক্ষণের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। ফলে কেউ মারা গেলে তারা মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে শকুনকে খাইয়ে দেয়। কেউ মারা গেলে প্রথমে তারা মৃতদেহটি সাদা চাদরে ঢেকে কয়েকদিন যাবত ঘরের কোণে রেখে দেয় এবং এর চারপাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে। তারপর কোন সন্ন্যাসীকে ডেকে প্রার্থনা করান এবং মৃত ব্যক্তির কপালে ছুরি দিয়ে কেটে দেন যেন মৃত ব্যক্তির আত্মা মুক্তি লাভ করে। তারপর মৃত শরীরকে পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতিতে সৎকারের স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তা টুকরো টুকরো করে শকুনদের খাইয়ে দেয়া হয়।

নিষিদ্ধ তিব্বত – প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম
মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে পশুপাখিকে খাওয়ানো হচ্ছে ; ছবি : alokitobbaria

তিব্বতিদের বিশ্বাস যে শকুন হচ্ছে দেবদূতের প্রতিরূপ এবং তারা মৃত ব্যক্তির আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে যাবে আর সেখানেই আত্মা পুনর্জন্মের জন্য অপেক্ষা করবে। পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের এই সৎকার প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকতে উৎসাহিত করা হয় যেন তারা জীবনের ক্ষনস্থায়ীত্বতা উপলব্ধি করতে পারেন এবং মৃত্যুকে জীবনের একটি অংশ বলে মেনে নিতে পারেন। তিব্বতে হাজার হাজার বছর ধরে মৃতদেহ সৎকারের জন্য এই প্রথা চলে আসছে এবং তিব্বতের প্রায় ৮০ ভাগ বৌদ্ধ এই প্রথা অনুসরণ করেন।

নিষিদ্ধ তিব্বত – প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম
বৌদ্ধ মন্দির ; ছবি : alokitobbaria

তিব্বতের ভূপ্রকৃতি বা তিব্বতিদের রীতিনীতি রহস্যময় হলেও এগুলো সত্য এবং মানুষ এগুলো স্বচক্ষে দেখে তাদের কৌতূহল নিবারণ করতে পেরেছে। কিন্তু তিব্বতের এমন কয়েকটা রহস্য রয়েছে যার সমাধান এখনো কেউ করতে পারেনি। চলুন জেনে নিই সেগুলো সম্পর্কে-

১. ইয়েতি রহস্য : তিব্বতি ইয়েতি নামটির মানে হল কুৎসিত তুষার মানব। এই ইয়েতি হলো গরিলা বা শিম্পাঞ্জীর মত দেখতে একটি প্রাণী যার বাস হিমালয়ের তিব্বত ও নেপালের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। ইয়েতির সন্ধানে অনেক অভিযান চালানো হয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র এর বিশালাকৃতির পদচিহ্ন ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি।

২. শাম্ভালা বা শাংরি-লা রহস্য : শাম্ভালা বা শাংরি-লা মানে হচ্ছে পবিত্র স্থান। বৌদ্ধ পুরাণ অনুযায়ী এই স্থানই তন্ত্র মন্ত্র ও যাদুবিদ্যা শিক্ষার জন্মস্থান। এছাড়াও বৌদ্ধ পণ্ডিতরা এই স্থানকে কাল্পনিক স্বর্গ বলেও মনে করে। কিন্তু শাম্ভালার অস্তিত্ব রয়েছে কি নেই তা আজও রহস্য।

৩. লাল রঙের তুষার : হিমালয়ের পাদদেশ থেকে ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় প্রায়ই টুকটুকে লাল রঙের তুষার দেখা যায়। বরফের উপর জন্মানো এক ধরনের শ্যাওলার কারণে তুষারের রঙ লাল দেখা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটা যে মাইনাস ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কঠিন বরফের স্তরে এই উদ্ভিদ জীবন ধারণ করে কিভাবে।

তিব্বতের সামাজিক অবস্থার কথা বলতে গেলে বলতে হয় এমন এক সমাজের কথা, যা গড়ে উঠেছিল আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। তখন পীত নদীর উপত্যকায় চীনারা ‘জোয়ার’ (এক ধরনের শস্য) ফলাতে শুরু করে। অন্যদিকে আরেক দল রয়ে যায় যাযাবর। তাদের মধ্যে থেকেই তিব্বতি ও কর্মী সমাজের সূচনা হয়। তাদের খাবার-দাবারেও রয়েছে ভিন্নতা। শুনলে অবাক হতে হয় যে, ‘উকুন’ তিব্বতিদের অতি প্রিয় খাবার। ঐতিহ্যগতভাবে তিব্বতি সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যাযাবর বা রাখাল জীবনযাপন। ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়া পালন তাদের প্রধান জীবিকা। শুধু তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ এই যাযাবর রাখাল সম্প্রদায়। এরা কখনো চাষাবাদের কাজ করে না। মোট ভূমির ৬৯ শতাংশ এলাকা চারণ বা তৃণভূমি। চীনা ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে তিব্বতিরাও ভীষণ চা-প্রিয়। তাদের বিশেষ চায়ে মেশানো হয় মাখন ও লবণ। তবে তিব্বতিদের প্রধান খাবার হলো ‘চমবা’। গম ও যবকে ভেজে পিষে ‘চমবা’ তৈরি করা হয়।

তিব্বতিদের খাবার ; ছবি : alokitobbaria

যাই হোক, সময়ের সাথে সাথে তিব্বতিদের জীবন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং তিব্বতের রহস্যও অনেক উন্মোচিত হয়েছে। আধুনিক বিশ্ব দিন দিন আরও আধুনিক হলেও আজও তিব্বত বিশ্বে রহস্যময় এক জায়গা হিসেবেই খ্যাত।

সূত্র : উইকিপিডিয়া, জীবন্ত জীবন, এম নিউজ ২৪

Related posts

যেভাবে এলো ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ ব্রেকফাস্ট

News Desk

গল্পটা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের

News Desk

নিমতলী ট্রাজেডি: যে রাতে আগুনরূপী মৃত্যু নেমেছিল

News Desk

Leave a Comment