free hit counter
দুই চাকার বাইসাইকেলের ইতিকথা
ইতিহাস

দুই চাকার বাইসাইকেলের ইতিকথা

সাত সকালে কিংবা বিকালে শুনশান রাস্তায়, কোথাও ঘুরতে সাইকেলের জুড়ি নেই। সাইকেলপ্রেমীরা তাই যখনই সুযোগ পায় সাইকেল চালায়। ছোট বেলায় সাইকেল চালাতে গিয়ে কয়বার পড়েছিলেন, মনে আছে কী? আমার মত অনেকেরই নানা স্মৃতি এই সাইকেলের সাথে জুড়ে রয়েছে। বাইসাইকেল বর্তমানে সহজ, জালানিমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিনা খরচে দ্রুত পথচলা ও শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সাইকেলের কোন বিকল্প  নেই। বিশেষ করে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা মত বড় বড় মেগা সিটি গুলোতে ও সাইকেলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকার চেয়ে অল্প সময়ে সাইকেলে গন্তব্যস্থলে পোঁছানোর  কারণে সাইকেল এখন কর্পোরেট লোকদের ও পছন্দ। কিন্তু কখনোই কি ভেবেছেন, এই সাইকেল কিভাবে এলো? কাদের অবদান আছে সাইকেলকে  আজকের পর্যায়ে আনতে।  বিশেষ করে দুই চাকার উপর ভর করে শারীরিক ভারসাম্য ঠিক রেখে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা, কিভাবে এলো ধারণটা? আজকে লিখবো সাইকেলের সেই অজানা ইতিহাস নিয়ে।

সাইকেলের পরিচিতি

ইংরেজি শব্দ বাই সাইকেলের বাংলা অর্থ হল দিচক্রযান । ১৮৪৭ সালে সর্বপ্রথম ফরাসী একটি প্রকাশনায় শব্দটি ব্যবহার করে। দুই চাকার একটি অজ্ঞাত বাহন কে পরিচয় করিয়ে দিতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মূলত পা দ্বারা চালিত দুই চাকার বাহনকেই বাই সাইকেল বলা হয়, যেখানে মেশিনের কোন ব্যবহার নেই। তবে বর্তমানে কিছু সাইকেলে মেশিনের ব্যবহার দেখা যায়।

সাইকেলের পরিচিতি
ছবি: internet

বাইসাইকেলকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, কোনো সন্দেহ নেই, এতে ব্যবহূত প্রযুক্তি আজকের বিবেচনায় যথেষ্ট সরল। কিন্তু এ সরল যন্ত্রটি তৈরি হতেই মানবসভ্যতাকে বহু শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাইসাইকেল তৈরির ইতিহাস মাত্র ২০০ বছরের। এ ইতিহাসও আবার বেশ বিভ্রান্তিকর—যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাই বলছে এ কথা। তার পরও দুই চাকার এ পঙ্খীরাজের উদ্ভবের একটি চেনাজানা ইতিহাস আছে। বাইসাইকেলের ইতিহাস জটিল নয়, তবে মজার। আজ আমরা সমান আকারের দুটি চাকার যে বাইসাইকেল দেখি, সেটা শুরুতে এমন ছিল না।

বাইসাইকেল শুরু হয়েছিল প্যাডেল ছাড়াই, মানুষ পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে দুই চাকা দিয়ে পথ চলত। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি—মানুষ সাইকেলের মতো দুই চাকার একটি যানে বসা, প্যাডেলের বদলে নিজের পা দিয়ে মাটিতে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। জার্মানির বন কর্মকর্তা ও উদ্ভাবক কার্ল ভন ডারিস তৈরি করেছিলন এই যান। তিনি জার্মান ভাষায় এর নাম দেন Laufmaschine, ইংরেজিতে যার অর্থ রানিং মেশিন। বিদ্রূপ করে এই যানকে ডাকা হতো ড্যান্ডি হর্স নামে। ডারিস যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন ১৮১৭ সালে। তিনি পরের বছর ফ্রান্সে এর পেটেন্ট নিয়ে নেন। প্যাডেল না থাকার পাশাপাশি এর কোনো ব্রেকও ছিল না। যানটি চালানো যেমন কঠিন ছিল, তেমনি বিপজ্জনকও। যানটি খুব অল্প সময়ের জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এজন্য ১৮১৯ সালের গ্রীষ্মে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ড্যান্ডি হর্স তৈরি করেছিল। ব্রেক না থাকায় এ যানগুলো পথচারীদের আঘাত করছিল। ফলে অনেক দেশেই নগর কর্তৃপক্ষ ড্যান্ডি হর্সকে রাস্তায় নিষিদ্ধ করে দেয়।

স্বীকৃত ইতিহাস
ছবি: onedio.com

স্বীকৃত ইতিহাস

সাইকেল তৈরির স্বীকৃত ইতিহাস হল, ফ্রান্সের পিয়ের মিশো এবং যুক্তরাষ্ট্রের পিয়ের লালেমেন্ট- এই দু’জন প্রথম প্যাডেল চালিত সাইকেল আবিষ্কার করেন। তবে দু’জনের কে আসল উদ্ভাবক তা কিন্তু আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। যদিও ১৮৬৬ সালের ২০ নভেম্বর পিয়ের লালেমেন্ট সাইকেল উদ্ভাবনের জন্য তাঁর দেশে স্বীকৃতি লাভ করেন। আর সেই হিসেবেই সম্প্রতি দুই চাকার এই যানটির সার্ধশত জন্মবার্ষিকী। অন্যদিকে ১৮৭০ সালের পরে ব্রিটেনে আরো দ্রুত, সুন্দর এবং উঁচু সাইকেল তৈরি করেন জেমনস স্টার্লি ও উইলিয়াম হিলম্যান। তবে সেগুলোর মান তেমন উন্নত না হওয়ায়, সে সময় কিছু গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে। যে কারণে পরে আর এগুলোকে রাস্তায় চলতে দেখা হয়নি। তবে ১৮৮৮ সালে সাইকেলে নিডাররাড ও ডানলপ কোম্পানির চাকা লাগানোর ফলে দুই চাকার বাহনের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে।

অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে সাইকেল অলিম্পিক প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে মোট ৮৮জন প্রতিযোগী। সাইকেল অলিম্পিক প্রথম অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাটলান্টার কাছে, জর্জিয়া আন্তর্জাতিক হর্স পার্কে। তবে ১৯০৩ সালের ০১ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত প্রথমারের মতো ফ্রান্সে ট্যুর দ্য ফ্রঁস শুরু হয়। আর ছয় রাউন্ডের এই প্রতিযোগিতায় মোট ২৪২৮ কিলোমিটার সাইকেল চলান প্রতিযোগীরা। ট্যুর দ্য ফ্রঁস-এর প্রথম বিজয়ী হন ফরাসি চালক মরিস গাঁরা।

স্রেলেফা
ছবি: amazonaws.com

স্রেলেফা

প্রখ্যাত সাইক্লিস্ট এবং লেখক ডেভিড ফিল্ডার তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, কাছাকাছি বাইসাইকেলের মতো দেখতে এমন বাহন প্রথম তৈরি করেন ফ্রান্সের শ্যাঁতে মি ডি সিভ্রস, ১৭৯০ সালে। এটা কাঠের ফ্রেমের সাথে একই মাপের কাঠের চাকা আটকানো এমন একটা বাহন ছিল যার কোন হ্যান্ডেল কিংবা প্যাডেল ছিল না। ফরাসী ভাষায় স্রেলেফা নামের এই বাহনে বসে চালককে পা দিয়ে ঠেলা দিতে হতো। তারপর কিছুটা গতিপ্রাপ্ত হলে পা তুলে ভারসাম্য রক্ষা করে বসে থাকতে হতো, অনেকটা গ্লাইডারের মতো। স্রেলেফাকে প্রথম অ্যানিমাল ফ্রি বাহনও বলা হয়

কার্ল ভন ডেভিসের সাইকেল ড্রেসিয়ান

কার্ল ভন ডেভিসের সাইকেল ড্রেসিয়ান

জিওভান্নি ফন্টানার বাহন তৈরির ৪০০ বছর পর ১৮১৭ সালে জার্মানীর কার্ল ভন ডেভিস স্রেলেফার একটি উন্নত সংস্করন তৈরি করেন যেটার সামনের চাকার সাথে স্টিয়ারিং মেকানিজম বা হ্যান্ডেল লাগানো ছিল। ডেভিস নিজের নামের সাথে মিল রেখে এর নাম রেখেছিল ড্রেসিয়ান। লোকে অবশ্য মজা করে একে ‘শখের ঘোড়া’ বলেও ডাকতো। কার্ল ভন ডেভিস ১৮১৮ সালে প্যারিসে তার বাইসাইকেলটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে সবার সামনে উন্মুক্ত করেন। তবে এর ডিজাইনের সীমাবদ্ধতার কারনে সমান, সোজা এবং চওড়া রাস্তা ছাড়া এটা চালানো কঠিন ছিল। ড্রেসিয়ানকে অনেকে ড্যান্ডি হর্স বলতো।

কোয়াড্রাসাইকেল
ছবি: history.com

কোয়াড্রাসাইকেল

টেকনিক্যালি দুই চাকার বাইসাইকেলের ইতিহাসের অংশ না হলেও ১৮২০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে আবিষ্কার হওয়া মানবচালিত বাহন গুলোর কথা না বললেই নয়। কার্ল ভন ডেভিসের বাইসাইকেলের মতো ব্যালান্স করার ব্যাপারটা না থাকলেও তিন চাকা (ট্রাইসাইকেল) অথবা চার চাকা (কোয়াড্রাসাইকেল) বিশিষ্ট এই বাহন গুলোতে প্যাডেল, চেইন, গিয়ার ইত্যাদির ব্যবহার ছিল। এই বাহন গুলো অতিরিক্ত ওজন, উচ্চতাম ঘর্ষণজনিত সমস্যার কারনে অতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি প্রথম দিকে।

তবে ১৮৫০ সালে ইংল্যান্ডের উইলার্ড সয়্যার সফল ভাবে ৪ চাকা বিশিষ্ট কোয়াড্রাসাইকেল তৈরি করেন। যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে রপ্তানী হয়। (সূত্রঃ বাইসাইকেল: দি হিস্টরি; ডেভিড ভি হার্লি)

কার্কপ্যাট্রিক ম্যাকমিলানের সাইকেল
ছবি: wp.com

কার্কপ্যাট্রিক ম্যাকমিলানের সাইকেল

অনেক ইতিহাসবিদের মতে আবার প্যাডেল চালিত বাইসাইকেল আবিষ্কার করেন কার্কপ্যাট্রিক ম্যাকমিলান (১৮১২-১৮৭৮)। তিনি ছিলেন একজন স্কটিশ কামার। ১৮৩৯ সালের দিকে তিনি খেয়াল করেন যে লোকে বাইসাইকেল চালাচ্ছে পা দিয়ে ঠেলে। ম্যাকমিলান ভাবতে লাগলেন পায়ের বিকল্প অন্য কি করা যায়!

পরবর্তীতে নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একাধিক গবেষণা করার পর প্রথম প্যাডেল সমৃদ্ধ বাইসাইকেল তৈরি করেন। এই বাইসাইকেল পা দিয়ে ঠেলে চালানো সাইকেলের চেয়ে অনেক আরামদায়ক ছিল। গবেষণালব্ধ জ্ঞান আর কামারের যন্ত্রপাতি কাজে লাগিয়ে ম্যাকমিলান এমন এক বাইসাইকেল আবিষ্কার করেন যা বাইসাইকেলের অগ্রযাত্রায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। ম্যাকমিলানের বাইসাইকেলের ফ্রেম কাঠের হলেও এর কাঠের চাকার ভেতরে লোহার রিম ছিল। সামনের চাকার ডায়ামিটার ছিল ৩০ ইঞ্চি, যার সাথে ছোট একটা হ্যান্ডেল ছিল। আর পেছনের ৪০ ইঞ্চি চাকার সাথে লাগানো ছিল প্যাডেল। বাইসাইকেলটি সেই সময় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কার্কপ্যাট্রিক ম্যাকমিলান নিজে ৬৮ মাইল বাইসাইকেল চালিয়ে যখন তার ভাইয়ের বাড়িতে গেলেন তখন এই বাইসাইকেলটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিভিন্ন কোম্পানীর এই বাইসাইকেলের কপি তৈরি করে বাজারে বিক্রি শুরু করে।

ড্যালজেলের সাইকেল

ড্যালজেলের সাইকেল

১৮৪৫ সালে গ্যাভিন ড্যালজেল নামের একজন ব্যবসায়ী ম্যাকমিলানের বাইসাইকেলের মতো একটি কপি তৈরি করেন। যদিও ড্যালজেল কখনোই নিজেকে আবিষ্কারক হিসাবে দাবী করেননি। গ্লাসগো মিউজিয়াম অফ ট্রান্সপোর্টে ড্যালজেলের সাইকেলের একটি রেপ্লিকা আছে।

হাই হুইলার বাইসাইকেল

ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস স্টেয়ারলি ১৮৬৬ সালে হাই হুইলার সাইকেল আবিষ্কার করেন। তবে অতিরিক্ত উচ্চতার কারনে এই হাই হুইলার তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। হাই হুইলার বাইসাইকেল তৈরির মাধ্যমেও প্রথম উপলব্ধি হয় যে চাকার ব্যাস বৃদ্ধির সাথে সাথে বাইসাইকেলের গতিও বৃদ্ধি পায়। একই বছর আমেরিকায় পিয়েরে লেলমেন্ট নামের এক ব্যাক্তি প্রথম বাইসাইকেলের প্যাটেন্ট করান।

১৮৬৮ সালে ক্লিমেট এডার রাবারের চাকার বাইসাইকেলের প্যাটেন্ট করান। ১৮৬৯ সালে ইংল্যান্ডের ট্রিডল বাইসাইকেল কোম্পানী প্যাডেল চালিত বাইসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। ১৮৭৬ সালে ইংরেজ আবিষ্কারক ব্রোয়েট এবং হ্যারিসন বাইসাইকেলের ব্রেকের প্যাটেন্ট করান। (সূত্রঃ বাইসাইকেল: দি হিস্টরি; ডেভিড ভি হার্লি)

রোভার সেফটি বাইসাইকেল
ছবি: pinimg.com

রোভার সেফটি বাইসাইকেল

১৮৭৯ সালে হেনরি জে লসন পেছনের চাকার সাথে চেইন যুক্ত বাইসাইকেলের প্যাটেন্ট করান। তবে আধুনিক সাইকেলের যে রূপটি আমরা দেখে অভ্যস্ত তা আবিষ্কার করেন জন কেম্প স্টেয়ারলি।

১৮৮৫ সালে আবিষ্কৃত স্টেয়ারলির এই বাইসাইকেলের ছিল সামনে পেছনে সমান দুটি চাকা, নীচু সিট আর শক্ত লোহার চেইন। এই বাইসাইকেলকে রোভার সেফটি বাইকও বলা হতো। লোহার রিমের উপর রাবারের চাকা ব্যবহারের ফলে এই বাইসাইকেল চালাতে কম শক্তির প্রয়োজন হতো। এছাড়াও এসময় উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়নের সাথে বাইসাইকেলের দামও কমতে শুরু করে। (সূত্রঃ ইভেলো ডট কম)

মোটামোটি বলা যায় উপরের ঘটনাগুলোর আবর্তে বাইসাইকেলের সোনালী যুগের শুরু হয়। সাধারণ মানুষ অবসর সময়ে বিনোদনের পাশাপাশি বাস্তবিক অর্থেও যানবাহন হিসাবে বাইসাইকেল চালানো শুরু করে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরণের বাইসাইকেল পাওয়া যায়। ব্যবহারের ধরণ অনুযায়ী সাইকেলকে নানা ভাগে ভাগও করা যায়। এই সাইকেল গুলোতে ১ থেকে ৩৩টি গিয়ার থাকতে পারে। হাইড্রোলিক ব্রেক, শক অ্যাবজরভার, লাগেজ ক্যারিয়ারের মতো অনেক আধুনিক সুবিধা যুক্ত হয়েছে বাইসাইকেলে। কোন কোন বাইসাইকেল ফোল্ড বা ভাঁজ করে বক্সে-ব্যাগে করেও বহন করা যায়। একসময় যে সাইকেলকে নারী স্বাধীণতার প্রতীক মনে করা হতো তা এখন সার্বজনিন ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সারাবিশ্বে যে পরিমাণ গাড়ি আছে সাইকেল আছে তার দ্বিগুণ! প্রতিবছর সারাবিশ্বে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বাইসাইকেল উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সাইকেল তৈরি হচ্ছে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটেনিয়াম, কার্বন ফাইবার কিংবা কখনো কখনো বাঁশের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে। বিশ্ব জুড়ে সাইক্লিংকে উৎসাহিত করা হচ্ছে একটি সবুজ পৃথিবীর জন্য।

বাইসাইকেলের কাঠামো
ছবি: prothomalo.com

বাইসাইকেলের কাঠামো

কাঠামো বাইসাইকেলের প্রধান অংশ। অধিকাংশ সাইকেলের কাঠামো ধাতব পাত দিয়ে তৈরি। পাতগুলোতে বিভিন্ন রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়, যেন মরিচা না পড়ে। শিশুদের সাইকেলের কাঠামো সাধারণত কিছুটা ভারী ও শক্ত হয়, আবার রেসিং প্রতিযোগীতার সাইকেলগুলো হয় শক্ত কিন্তু হালকা, যেন বাতাসের বাধা কম অতিক্রম করতে হয়। কাঠামোর মাঝখানে থাকে আসন। অনেক সাইকেলেই এ আসনটি উপরে উঠানো বা নিচে নামানো যায়। আসনের পেছনেই থাকে ছোট পণ্যবাহী জায়গা বা ক্যারিয়ার (Carrier)। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি অনেক সময় এখানে মানুষও বহন করা হয়।

ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ

বাইসাইকেলের হাতল থাকে। এটি দিক ঠিক রাখা ও পরিবর্তনে সাহায্য করে। পুরো সাইকেলের ভারসাম্যও এটির সাহায্যেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ব্রেকের শুরুটা হাতল থেকেই হয়ে থাকে। এ কারণে প্রয়োজনের সময় চালক সহজেই ব্রেকে চাপ দিয়ে সাইকেলের গতি পরিবর্তন করতে পারে।

যেভাবে চলে বাইসাইকেল
ছবি: bbci.co.uk

যেভাবে চলে বাইসাইকেল

পেডাল ও চেইনের সাহায্যে আধুনিক সাইকেল চালানো হয়। পেডাল ও পেছনের চাকার কেন্দ্রে গিয়ার থাকে। এই গিয়ার আবার স্প্রোকেট নামেও পরিচিত। ফলে পেডাল ও পেছনের চাকার মধ্যে সংযোগ সাধিত হয়। পেডাল ঘোরালে পেছনের চাকাটি সামনের দিকে বল প্রয়োগ করে। ফলে সামনের চাকাও ঘুরতে শুরু করে এবং সাইকেল সামনের দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ পেছনের চাকাই সাইকেলের মূল চালক। এ কারণে জোরে পেডাল ঘোরানো অবস্থায় হঠাৎ করে সামনের চাকায় ব্রেক চাপলে সাইকেল দুর্ঘটনা হতে পারে।

সাইকেলের চাকা

শুরুর দিকে সাইকেলের চাকা ছিল লোহার পাত দিয়ে তৈরি। উঁচু-নিচু জায়গায় সাইকেল চালালে কয়েকদিনের মধ্যেই চাকাগুলো বেঁকে যেত। গরুর গাড়ি বাঁকা চাকা দিয়ে চালানো সম্ভব হলেও বাঁকা চাকার সাইকেলে ভারসাম্য রাখা সম্ভব নয়। ১৮৮৭ সালে স্কটিশ প্রকৌশলী জন বয়েড ডানলপ (John Boyd Dunlop) রবারের চাকা উদ্ভাবন করেন। রবারের চাকা বাতাস-ভর্তি করে ফুলিয়ে ব্যবহার করা হয়। রবারের চাকা উদ্ভাবনের পর বাইসাইকেল খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।গিয়ার সাইকেল

প্রতিযোগিতা জন্য তৈরি করা সাইকেলগুলোতে একাধিক গিয়ার থাকে। এগুলো গিয়ার সাইকেল নামে পরিচিত। এর সাহায্যে অল্প শক্তিতে পেডাল ঘুরিয়েই সাইকেলকে অনেক বেশি গতিতে চালানো যায়। কোনো কোনো সাইকেলে ২৭ টি পর্যন্ত গিয়ার থাকে। গিয়ার সাইকেলগুলোতে বেল বা ঘণ্টির পাশেই আরেকটি ছোট চাকতি থাকে। এটির সাহায্যে গিয়ার পরিবর্তন করা হয়।

পাহাড়ি সাইকেল

পাহাড়ি সাইকেল

কম পরিশ্রমে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য যেমন গিয়ার সাইকেল ব্যবহার করা হয়, তেমনি পাহাড়ে ওঠার জন্য বিশেষ ধরনের সাইকেল আছে। তবে রেসিং সাইকেল এবং পাহাড়ি সাইকেলের গঠনে কিছুটা পার্থক্য আছে। শক্তি হলো গতিও টর্ক-এর গুণফল। যখন দ্রুত চলতে হয়, তখন শক্তির প্রায় পুরো অংশটাই গতিতে চলে যায়। পাহাড়ে ওঠার সময় গতির পরিমাণ কমে যায় তখন শক্তির বড় অংশ টর্কে বা উপরে ওঠার জন্য ব্যয় হয়। পাহাড়ের জন্য ব্যবহৃত সাইকেল তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু অনেক বেশি শক্ত মজবুত হয়। এতে ঝাঁকুনি প্রতিরোধক (Shock Absorber) ব্যবস্থা থাকে এটি স্প্রিং দিয়ে তৈরি, যা অমসৃণ জায়গায় চলার কাজটা সহজ করে দেয়।

বাইসাইকেল সম্পর্কিত মজার তথ্য

-চীনে সাইকেলের সংখ্যা ১০০ কোটির ও বেশি। অথচ ১৮ শতকের পরে সেখানে সাইকেল আনা হয়েছিল !

-প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি সাইকেল তৈরি হয় বিশ্বে!

-২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে জায়গা করে নিয়েছিল বিএমএক্স সাইকেল!

-এক চাকায় সাইকেল চালানোর পদ্ধতিকে হুইলি বলা হয়ে থাকে!

-স্বশক্তিচালিত যানবাহনের মধ্যে সাইক্লিং হচ্ছে সবচেয়ে কর্মশক্তিসাশ্রয়ী বাহন!

-নেদারল্যান্ডসের প্রতি আটজনের মধ্যে সাতজনই সাইকেলের মালিক। আর এদের অধিকাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি!

-তিন চাকার সাইকেলকে বলে ট্রাইক!

-দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের এক ভবনের একটি বাতির ঝাড়ের পুরোটা বানানো হয়েছে সাইকেলের কাঠামো দিয়ে!

-সাইকেল নিয়ে ইংরেজিতে সবচেয়ে বিখ্যাত গানটির নাম ডেইজি বেল। এ গানের শেষ লাইন, এ বাইসাইকেল বিল্ট ফর টু!

-গাড়ি চালানোর চেয়ে সাইকেল চালাতে মানুষের শারীরিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বেশি প্রয়োজন হয়!

-ফ্রান্সের বিখ্যাত এক সাইকেল রেসে হলুদ রঙের বিশেষ এক জার্সি পড়েন দলনেতা। এ জার্সিকে বলে মেইলল্ট জুন!

-দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে ২০১৩ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় ৩৬তম কেপ আর্গাস পিক অ্যান্ড পে সাইকেল টুর!

-সাইকেলের দুই চাকা মাটির ওপরে শূন্যে উড়ে চলার বিশেষ পদ্ধতিকে বলে বানি হপ!

-বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সাইকেল চালাতে পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, “জীবন হচ্ছে সাইকেল চালানোর মতো। এতে ভারসাম্য রাখতে চাইলে সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।”

-চীনে ছোট-বড় সবার সাধারণ বাহন সাইকেল। তাই একসময় চীনকে বলা হতো সাইকেলের দেশ!

-এক্সিডেন্ট হলে আরোহীর যেন ক্ষতি না হয় সেজন্য সাইকেলের পেছনে এয়ারব্যাগ বসেছে!

-প্রতি পূর্নিমায় দক্ষিণ আফ্রিকার সাইক্লিষ্টরা কেপটাউনের রাস্তায় দল বেঁধে সাইকেল চালায়। এ অনুষ্ঠানের নাম মুনলাইট মাস!

-এক চাকাওয়ালা এবং লম্বা গলাওয়ালা সাইকেলের নাম জিরাফ ইউনিসাইকেল।

-বিশেষ ধরনের বাইসাইকেল রিকামবেন্ট বাইক। ২০০ মিটারে এর রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৩৩.২৮৮ কিলোমিটার!

-কিছু ইতিহাসের বইয়ে দেখা যায়, ঘোড়ার গাড়িনির্মাতা ফরাসি দুই পিতা-পুত্র পিয়ের ও আর্নস্ট মাইকক্স প্রথম সাইকেল আবিষ্কার করেন ১৮৬০ সালে।

-২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাইক্লিস্ট একত্রে জড়ো হওয়ার রেকর্ড গড়েছে তাইওয়ান। সেদিন ৭২,৯১৯ জন সাইক্লিস্ট একত্র হয়েছিল!

-হেনজ স্টুক গত ৫০ বছরে শুধু বাইসাইকেল চেপে পাড়ি দিয়েছেন ছয় লাখ কিলোমিটার। বিশ্বে এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড!

-দামি কিছু সাইকেলে টাইটেনিয়াম ধাতু ব্যবহার করা হয়। মানুষের কোমরের কৃত্রিম জয়েন্টেও এ ধাতু ব্যবহার করা হয়!

ইতিহাসের পাতায়
ছবি: internet

ইতিহাসের পাতায়

বাইসাইকেল বহু মানুষের সম্মিলিত উদ্ভাবন। প্রথম বাইসাইকেল তৈরি করেন জার্মান প্রকৌশলী ব্যারন কার্ল ফন ড্রেইজ (Baron Karl von Drais)। তার নির্মিত সাইকেলটি ছিল কাঠের। পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে এটি চালাতে হতো। পেডালচালিত সাইকেল প্রথম উদ্ভাবন করেন ফ্রান্সের পিয়ের মিশু (Pierre Michaux) এবং পিয়ের লামেন্ট (Pierre Lallement)। তবে সেখানে পেডাল সামনের চাকার সাথে লাগানো ছিল। পেছনের চাকাচালিত বাইসাইকেল প্রথম উদ্ভাবন করেন স্কটিশ প্রকৌশলী টমাস ম্যাককল (Thomas McCall)।

উপকারিতা

অল্প খরচ বা বিনা খরচে দ্রুত পথ চলা বা মালামাল পরিবহনের জন্য সাইকেল বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া সাইকেলে নাই কোন দূষণ, নাই বাড়তি জায়গার চাহিদা। শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সাইকেলের নেই কোনো বিকল্প। তাছাড়া ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে সাইকেলের কোনো জুড়ি নেই। নিয়মিত সাইকেল চালালে আছে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন উপকারিতা। পৃথিবীর অনেক দেশে সাইকেলের জনপ্রিয়তা অনেক বেশী। বিশেষ করে চীনে। আমাদের দেশে দিল্লির মত শহরে (যেখানে বায়ু দূষণের পরিমাণ বেশি)  ও সাইকেলের ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

 

সূত্র: উইকিপিডিয়া , আলোকিত বোয়ালখালী , জীবন্ত জীবন