Image default
ইতিহাস

ট্রয় নগরী উপকথা নাকি ইতিহাস

দীর্ঘ দশ বছর ব্যাপি ট্রোজান ও গ্রিকদের মাঝে যেই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেটাই ট্রোজান ওয়ার বা ট্রয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। প্রায় ৩ হাজার বছর পুরোনো ইতিহাস হলেও এই যুদ্ধকে ঘিরে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। গ্রিক ও রোমান সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে এই যুদ্ধ। সর্বপ্রথম হোমার তার ইলিয়াড ও ওডিসিতে ট্রয় যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। পরবর্তীতে সফোক্লিস, ওভিড, হেরোডোটাস ট্রয় যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। আমরা মোটামুটি সবাই জানি যে, ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস স্পার্টার রাজা মেনেলাসের স্ত্রী হেলেনকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে ট্রয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। এই যুদ্ধ সম্পর্কে জানার আগে এই যুদ্ধের পূর্ব ইতিহাসটুকু জানা জরুরি।

ট্রয় নগরী

ট্রয় (গ্রিক: Τροία, ত্রোইয়া, অথবা Ίλιον, ইলিয়ন; লাতিন ভাষায়: Trōia, Īlium; হিত্তীয় ভাষায়: Wilusa বা Truwisa) একটি কিংবদন্তির শহর যাকে কেন্দ্র করে বিখ্যাত ট্রয়ের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই শহর এবং সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের বর্ণনা প্রাচীন গ্রিসের অনেক মহাকাব্যেই দেখা যায়। বিশেষত ইলিয়াড-এর নাম করা যেতে পারে। হোমার রচিত অমর দুই মহাকাব্যের একটি এই ইলিয়াড। ট্রয়ের নাগরিক এবং সংস্কৃতি বোঝাতে ট্রোজান শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ট্রয় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নাম। হোমারের ইলিয়াডে যে ট্রয়ের উল্লেখ রয়েছে সেটিকেই এখন ট্রয় নামে আখ্যায়িত করা হয়। এর অবস্থান আনাতোলিয়া অঞ্চলের হিসারলিক নামক স্থানে। ট্রয়ের তুর্কী নাম ত্রুভা। অর্থাৎ, আধুনিক হিসারলিক-ই সেই প্রাচীন ট্রয় নগরী। এর ভৌগোলিক অবস্থান তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কানাক্কাল প্রদেশের সমুদ্র সৈকতের নিকটে এবং আইডা পর্বতের নিচে দার্দানেলিসের দক্ষিণ পশ্চিমে।

ট্রয় নগরী
গ্রিক উপকথার ‘ট্রয় নগরী’; ছবি : goodfon.com

রোমান সম্রাট অগাস্টাসের রাজত্বকালে প্রাচীন ট্রয় নগরীর ধ্বংসস্তুপের উপর ইলিয়াম নামে নতুন একটি শহর নির্মিত হয়। কনস্টান্টিনোপল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইলিয়াম বিকশিত হয়েছে, কিন্তু বাইজান্টাইন রাজত্বের সময় ধীরে ধীরে এর পতন হতে থাকে। ১৮৬৫ সালে ফ্রানক কার্লভার্ট ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ সরবপ্রথম ট্রয় নগরীর সন্ধান পান।তিনি হিসার্লিকে এক কৃষকের কাছ থেকে এক খন্ড জমি কিনে খনন কাজ শুরু করেন। কিন্তু তা সমাপ্ত করতে পারেন নি। ১৮৭০ সালে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ হাইনরিশ শ্লিমান এই এলাকায় খনন কাজ শুরু করেন। এই খনন চলতে থাকায় এক সময় প্রমাণিত হয় যে, এখানে একের পর এক বেশ কয়েকটি শহর নির্মিত হয়েছিল। সম্ভবত এই শহরগুলোরই একটি হোমারের ট্রয় (ট্রয় ৭)। অবশ্য এ নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু এটা প্রায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, হিত্তীয় রচনায় উল্লেখিত উইলুসা শহরটি এখানেই অবস্থিত ছিল। অনেকে মনে করেন ইলিয়ন এই উইলুসা নামেরই গ্রিক সংস্করণ।

ট্রয়ের যুদ্ধ

প্রাচীন এশিয়া মাইনরে (বর্তমানে তুরস্কের আনাতোলিয়া রাজ্য) ছিল ট্রয় নামক এক নগরী। এই ঐতিহাসিক ট্রয় নগরীর রাজা ছিলেন প্রিয়াম এবং রাণীর নাম ছিলেন হেকবা। তাদের আদরের পুত্রের নাম ছিল প্যারিস। এই প্যারিসই ছিল মুলত ট্রয় যুদ্ধের পেছনে মুল হোতা। রাজপুত্র প্যারিস, গ্রিসের স্পার্টা রাজ্যের রাজা মেনেলাস এর স্ত্রী হেলেন এর প্রেমে পড়ে যান। তারপর তিনি হেলেনকে নিয়ে ট্রয়ে পালিয়ে আসেন। এর ফলে শুরু হয় স্পার্টা আর ট্রয়ের মধ্যকার সেই যুদ্ধ!

ট্রোজান যুদ্ধের একটি কাল্পনিক চিত্র; ছবি : travel-zone-greece.com

এই কাহিনি এতোটাই চমকপ্রদ এবং রোমাঞ্চকর যে, গ্রিক সাহিত্য এবং রোমান সাহিত্যের একটা উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে ট্রয়ের যুদ্ধ। আপনারা নিশ্চয়ই মহাকবি হোমারের নাম শুনেছে। তার দুটো মহাকাব্য ইলিয়াড এবং ওডিসির কারনে এই রোমান্টিক ট্র্যাজেডি অমর হয়ে আছে। এরপর আরও অনেক বিখ্যাত কবি ট্রয়ের যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। এদের মদ্ধে আছেন গ্রিক কবি হেরোডোটাস, সোফোক্লেস এবং রোমান কবি ভার্জিল আর ওভিড। তাদের এসব লেখার মধ্যমেই আমরা জানতে পারি হেলেন, প্যারিস, অ্যাকিলিস, হেক্টর, আগামেমনন, অডিসিয়াস এবং অ্যাজাক্সের মত ট্রয়ের যুদ্ধের সাথে জড়িত অন্যান্য চরিত্রগুলো সম্পর্কে কাহিনি।

প্যারিসের স্পার্টা যাত্রা এবং হেলেনের সাথে পলায়ন

সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণী ছিল হেলেন। কিন্তু হেলেন ছিল স্পার্টার রাজা মেনেলাসের স্ত্রী। বাণিজ্যিক কাজে প্যারিস তার ভাই হেক্টরের সাথে স্পার্টায় গমন করে। মেনেলাস ট্রোজান রাজকুমাদের সাদরে গ্রহণ করে। তাদের সম্মানে মেনেলাস এক জমকালো নৈশভোজের ব্যবস্থা করেন। মেনেলাস সবার সাথে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন।

হেলেন ও প্যারিস
দৃশ্যটিতে হেলেন ও প্যারিস চিত্রিত হয়েছে; ছবি : Greek Legends and Myths

সেখানে হেলেন কে দেখে প্যারিস মুগ্ধ হয়ে যায়৷ আফ্রোদিতির সাহায্যে ধীরে ধীরে প্যারিস হেলেনের মনে জায়গা করে নেয়। প্যারিসের প্রেমে বিমোহিতা হেলেন তার সাথে পালিয়ে যেতে রাজি হয় এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সবার অগোচরে স্পার্টা থেকে পালাতে সক্ষম হয়।

ট্রয় যুদ্ধের কারন

আগেই বলেছি ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস আর স্পার্টা রাজ্যের রানি হেলেনের মধ্যকার প্রেমের কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- প্রেম না হয় হয়েছে, কিন্তু কীভাবে প্যারিস হেলেনকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্ররোচনা পেল? রাজার প্রাসাদ থেকে একজন রাণীকে নিয়ে পালানো তো চাট্টিখানি কথা নয়! তাছাড়া এটা কোনো জোরপূর্বক অপহরণের ঘটনাও ছিল না। রানি নিজেই প্যারিসের হাত ধরে প্রাসাদ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কেন রানী এটা করতে গেলেন? আর কেনই বা লাগলো এই যুদ্ধ?

ট্রয় যুদ্ধের সঠিক কারন নিয়ে বিভিন্ন মত চালু রয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন, গ্রিক মিথোলজিতে বলা হয়েছে – পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। ফলে দেবতাদের প্রধান যিউস চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন জনসংখ্যা কমিয়ে আনতে। আর এজন্যই একটি যুদ্ধ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা তার মাথায় আসে। সেখান থেকেই ট্রয় যুদ্ধের সূত্রপাত।

ইতিহাস বিখ্যাত ট্রয়ের যুদ্ধ
ইতিহাস বিখ্যাত ট্রয়ের যুদ্ধ; ছবি : ancientgreecefacts.com

তবে, হোমারের লেখায় মূলত ফুটে উঠেছে – প্যারিস আর হেলেন এর ভালোবাসার কাহিনী। হেলেন প্যারিসকে এতোটাই ভালোবেসে ফেলেছিল যে স্বামী মেনেলাসকে আর স্পার্টার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যেতে বাঁধেনি তার। তাই তো সে ট্রয় নগরীর রাজপুত্রের সাথে পালিয়ে যায়। কিন্তু এমন শক্তিশালী এক রাজ্যের রাণী আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে যাবে, আর রাজা বসে বসে আঙুল চুষবে? তা তো হয় না! তাই মেনেলাস তার সমস্ত শক্তি নিয়ে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পরলেন। প্রায় দশ বছর স্থায়ী ছিল সেই যুদ্ধ। এর ফলস্বরূপ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী!

নিশ্চই আপনার মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে- কিভাবে হেলেন ও প্যারিসের মধ্যে ভালবাসা হয়েছিল, আর কিভাবে তারা পালিয়ে যাওয়ার সাহস পেল? এবার আসছি সেই ঘটনায়…

ট্রয় যুদ্ধের পেছনের ইতিহাস

ট্রয় যুদ্ধের ইতিহাস জানতে হলে মর্ত থেকে ফিরে যেতে হবে স্বর্গে। গ্রিক পুরানের কাহিনী অনুযায়ী একবার তিনজন গ্রিক দেবীর মধ্যে ঝগড়ার হয়েছিল। সেই দেবী তিনজন হলেন এথেনা, হেরা এবং আফ্রোদিতি। তাদের মধ্যে আবার ঝগড়া লাগিয়েছিলেন আরেক দেবী “এরিস”। তাই তো এরিসকে বলা হয়ে থাকে ঝগড়া-ফ্যাসাদ আর বিশৃঙ্খলার দেবী! এরিস একটা সোনালী আপেল দিয়েছিলেন এই তিন দেবীকে, (এই আপেলটিকে মিথোলজিতে “বিশৃঙ্খলার আপেল” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে)। আপেলটির গায়ে খোদাই করে লেখা ছিল – “শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর জন্য”। ফলে তিনজন দেবীর প্রত্যেকেই নিজেকে এই আপেলের দাবীদার বলতে লাগলেন। কারণ তারা তিনজনই নিজেকে “শ্রেষ্ঠ সুন্দরী” ভাবতেন। তাই সেরা সুন্দরী নির্বাচনের দায়িত্ব গেল দেবতাদের হাতে, কিন্তু কেউই তিন দেবীর রূপ বিচারের সাহস পেলেন না। শেষে বাধ্য হয়ে দেবতাদের রাজা যিউস “সেরা সুন্দরী” নির্বাচনের ভার দিলেন মর্তের একজন মানুষকে। এই মানুষটি হলে প্যারিস, ট্রয় নগরীর রাজপুত্র!

তিনজন দেবী থেকে বিচার করে প্যারিস আফ্রোদিতিকেই সবচেয়ে সুন্দরী বললেন। ফলে আফ্রোদিতি খুব খুশি হলেন। তিনি প্যারিসকে খুশী হয়ে এক বিশেষ বর দিলেন, এই বর ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর ভালোবাসা। আর সে সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মানবী ছিলেন হেলেন, যার রুপের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ ছিল। কিন্তু হেলেন তখন ছিলেন স্পার্টার রাজা মেনেলাসের স্ত্রী। অন্যের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আফ্রোদিতির দেওয়া বরের কারনে হেলেন তার মনপ্রাণ সঁপে দিলেন ট্রয়ের রাজপূত্র প্যারিসকে। দুজনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা হয়ে গেল। এক রাতের আধারে দুজনে হাত ধরে পালিয়ে চলে এলেন ট্রয় নগরে।

এদিকে রানি হেলেন পালিয়ে যাওয়ার পরে স্পার্টার রাজা মেনেলাসের বুকে জ্বলছিল ক্রোধের আগুন। মেনেলাস তার ভাই আগামেমননকে আহ্বান করলেন তার পক্ষে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। আগামেনন ছিলেন পার্শ্ববর্তী মাইসিন রাজ্যের রাজা। ভাইয়ের স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আগামেমনন তার বিশাল অ্যাশিয়ান্স দল নিয়ে রওনা দিলেন ট্রয়ের উদ্দেশ্যে। তারপর ট্রয় নগরের সম্মুখে শুরু হল এক ভয়ংকর যুদ্ধ। প্রায় দশ বছর ধরে চলল এই যুদ্ধ! আগামেমননের সৈন্যবাহিনী চারদিক দিয়ে ট্রয় নগরীকে ঘিরে রাখলো। এদিকে ট্রয়ের বাসিন্দারা কিছুতেই হেলেনকে ফেরত দিতে রাজি হল না। তারা শক্ত প্রতিরোধ ধরে রাখলো। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে মারা গেলেন অ্যাশিয়ান্স বীর অ্যাকিলিস, অ্যাজাক্স এবং ট্রোজান বীর প্যারিস ও তার ভাই হেক্টর। কিন্তু দুই পক্ষ ছিল শক্তিতে সমান ফলে যুদ্ধে কারো জয় বা পরাজয় হল না। এর পরই ঘটলো সেই ট্রোজান হর্স নামক বিশাল আকৃতির কাঠের ঘোড়ার ঘটনা।

ট্রয়ের যুদ্ধ এবং ট্রোজান হর্স

দশ বছরের চেষ্টার পরও যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পেরে গ্রিক যোদ্ধারা এক চাতুরির আশ্রয় নিল। এই চাতুরির নামই হচ্ছে ট্রোজান হর্স। তারা সবার অজান্তে কালো রঙের বিশাল আকৃতির এক ঘোড়া এনে ট্রয় নগরির সম্মুখে রেখে গেল। ট্রয়ের মানুষজন মনে করলো স্পারটানরা যুদ্ধে হার মেনে নিয়েছে আর তাদের জন্য উপহার হিসেবে এই ঘোড়া রেখে গেছে। তারা কিছু না বুঝে এই ঘোড়াটিকে ট্রয় নগরীর ভেতরে নিয়ে আসলো। আর এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভুল।

যুদ্ধে ব্যবহৃত কাঠের তৈরি ঘোড়া
যুদ্ধে ব্যবহৃত কাঠের তৈরি ঘোড়া; ছবি : dailymotion.com

মাঝরাতে যখন ট্রয়ের বাসিন্দারা ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন এই কাঠের ঘোড়া খুলে গেল। আর ভেতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এলো স্পারটান যোদ্ধারা। নগরে ঢুকার পর অ্যাশিয়ান্সরা সামনে যাকে পেলো, তাকেই জবাই করা শুরু করলো। শুধুমাত্র কয়েকজন শিশু আর মহিলা রক্ষা পেলো, যাদেরকে পরে দাসদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিলো। এভাবেই ধ্বংস হয়ে গেলো ঐতিহ্যবাহী ট্রয় নগরী।আর এভাবেই ছল চতুরতার মাধ্যমে গ্রিকরা জয় লাভ করে।

ট্রয় যুদ্ধের ঘটনা কি সত্য নাকি পুরোটাই কল্পনা?

প্রাচীনকালের গ্রিসের অধিবাসীরা বিশ্বাস করতেন- ট্রয়ের যুদ্ধ একটা ঐতিহাসিক সত্য কাহিনি। তাদের ধারণা অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিলো খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ বা ১২০০ সালে। তবে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে বেশিরভাগ মানুষই এই বিশ্বাস থেকে সরে এসেছেন। সে সময় অনেক গবেষক বলেছেন, ট্রয় নগরী বা ট্রয়ের যুদ্ধ – উভয় বিষয়ই নিছক গল্পগাঁথা। বাস্তবে এর কন অস্তিত্ব কখনও ছিল না!

বিখ্যাত ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ
বিখ্যাত ট্রয় নগরীর ধ্বংসাবশেষ; ছবি : ZB

কিন্তু ১৮৬৮ সালে হেইনরিখ শ্লিম্যান এবং ফ্র্যাঙ্ক ক্যাল্ভার্ট নামক দুজন প্রত্নতাত্ত্বিক এক অবিশ্বাস্য আবিস্কার করেন। তারা তুরস্কের হিসার্লিক অঞ্চলে এক প্রাচিন নগরীর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। ধ্বংসাবশেষ থেকে যা কিছু উদ্ধার করা গেছে, তার সাথে প্রাচীন ট্রয় নগরীর বর্ণনার অনেক মিল পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গবেষকরা সিদ্ধান্তে আসেন যে এটাই সেই গ্রিক পুরানে বর্ণিত ঐতিহাসিক ট্রয় নগরী। তাদের এই আবিস্কার পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এই ঘটনার পর থেকেই সবাই আবার নতুন করে ট্রয়ের যুদ্ধের কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

শেষ কথা

হোমারের বর্ণিত এই গল্পের সত্যতা বর্তমান পৃথিবী জানে না। কিন্তু ট্রোজান যুদ্ধ এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, ইতিহাস বা শ্রুতিকথা যা-ই হোক না কেন, তা আজ মিলে মিশে একাকার। পরবর্তীতে অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট, জুলিয়াস সিজারের মতো মহারথীরাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন এই ট্রোজান যুদ্ধ থেকে। অ্যালেক্সান্ডার যেমন নিজেকে মিলিয়েছেন গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের সঙ্গে, তেমনি জুলিয়াস সিজার নিজেকে তুলনা করেছেন ট্রোজান বীর এনিয়াসের সঙ্গে।

শ্লিম্যানের আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন গ্রিক মুখোশ
শ্লিম্যানের আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন গ্রিক মুখোশ; ছবি : alliance

ট্রোজান যুদ্ধের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এ যুদ্ধের মাধ্যমে মানব সভ্যতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। হোমারের ইলিয়াড এবং ওডেসির মাধ্যমে প্রথম গ্রিক সাহিত্য সৃষ্টি হয়। এ কারণে গ্রিক বর্ণমালার সূচনা হয় যা পরবর্তীতে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এ যুদ্ধ ধূর্ততা, বীরত্ব, দেশপ্রেম, ভালোবাসার মতো বিষয়কে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তোলে। ৩,০০০ বছর পূর্বের এ যুদ্ধ হতে পারে বাস্তবতা অথবা শুধুই একজন লেখকের সৃষ্ট এক গল্প। যেটাই হোক না কেন, আজ তা আর বিবেচ্য নয়। মানব সভ্যতার সঙ্গে মিশে আছে ট্রয়।

সূত্র: থ্রিলার মাস্টার , জীবন্ত জীবন

Related posts

ফয়েজ লেক গণহত্যা: চোখের সামনে বীভৎস নারকীয়তা!

News Desk

“আমার নয় ,এটা আপনার পুরস্কার!” বাঙালী শিক্ষকের প্রতি পাকিস্তানি নোবেল বিজয়ীর গুরুদক্ষিণা

News Desk

স্বাধীনতা যুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা যে ভাষণে

News Desk

Leave a Comment