free hit counter
হাসন রাজা : ভোগবিলাসী জমিদার থেকে মরমী সাধনা
জীবনী

হাসন রাজা : ভোগবিলাসী জমিদার থেকে মরমী সাধনা

“লোকে বলে বলেরে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার
কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার
ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার”

এই গান শোনেনি, এমন মানুষের সংখ্যা অনেক কম। গানের রচয়িতা মরমী কবি এবং বাউল হাসন রাজা। দেশ, জাতি, ধর্ম এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষের একটি ধর্ম রয়েছে, যাকে মানবতা বলে। এই মানবতা সাধনার একটি রুপ হলো মরমী সাধনা। যে সাধনা হাসন রাজার গান এবং দর্শনে পাওয়া যায়। তিনি সর্বমানবিক ধর্মীয় চেতনার এক লোকায়ত ঐক্যসূত্র রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গানগুলো শুনলে মনের মাঝে আধ্যাত্মবোধের জন্ম হয়।এক সময়কার প্রতাপশালী অত্যাচারী জমিদার হাসন কীভাবে একজন দরদী জমিদার এবং মরমিয়া কবি ও বাউল সাধক হলেন, চলুন শুনে নেই সেই কাহিনী।

হাসন রাজা
ছবি : dhaka headlines

তিনি ছিলেন অসম্ভব ক্ষমতাবান এক সামন্ত প্রভু, অঞ্চলের রাজা। ধমনিতে তার জমিদারের নীল রক্ত, হাতে ভোগের উপচে পড়া পেয়ালা। এই তামসিক জীবন যাপনেও ভয়াবহ তৃষ্ণা নিয়ে জীবনকে তিনি পান করেছেন। তারপরেও তৃষ্ণা মেটে না। তাই উত্তরকালে সবকিছুকে উপেক্ষা করে অনাসক্ত জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে তিনি মজেছিলেন এক বিশেষ নেশায়- বাউল মরমীবাদের ভাব দর্শনে। ভোগে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে একরাশ না পাওয়া নিয়ে গেয়েছেন, বাউলা কে বানাইলরে, হাসন রাজারে?

অহিদুর রেজা (ছদ্মনাম)বা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী (২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ – ৬ ডিসেম্বর ১৯২২-৭ পৌষ ১২৬১ – ২২ অগ্রহায়ণ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) বাংলাদেশের একজন মরমী কবি এবং বাউল শিল্পী। তার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা। মরমী সাধনা বাংলাদেশে দর্শনচেতনার সাথে সঙ্গীতের এক অসামান্য সংযোগ ঘটিয়েছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে লালন শাহ্‌ এর প্রধান পথিকৃৎ। এর পাশাপাশি নাম করতে হয় ইবরাহীম তশ্না দুদ্দু শাহ্‌, পাঞ্জ শাহ্‌, পাগলা কানাই, রাধারমণ দত্ত, আরকুম শাহ্‌, শিতালং শাহ, জালাল খাঁ এবং আরো অনেকে। তবে দর্শনচেতনার নিরিখে লালনের পর যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নামটি আসে, তা হাসন রাজার।

বাল্যকাল

সিলেটে তখন আরবি-ফারসির চর্চা খুব প্রবল ছিল। সিলেটে ডেপুটি কমিশনার অফিসের নাজির আবদুল্লা বলে এক বিখ্যাত ফারসি ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শমতে, তাঁর নামকরণ করা হয় হাসন রাজা। বহু দলিল-দস্তাবেজে হাসন রাজা আরবি অক্ষরে নাম দস্তখত করেছেন হাসান রাজা। হাসন দেখতে সুদর্শন ছিলেন। মাজহারুদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, ‘বহু লোকের মধ্যে চোখে পড়ে তেমনি সৌম্যদর্শন ছিলেন। চারি হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘভূজ, ধারাল নাসিকা, জ্যোতির্ময় পিঙ্গলা চোখ এবং একমাথা কবিচুল পারসিক সুফিকবিদের একখানা চেহারা চোখের সম্মুখে ভাসত,তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত।

হাসন রাজা বাল্যকাল
ছবি : the daily star

অথচ হাসন রাজার পূর্বপুরুষ ছিল হিন্দু। আদি বসবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায়। অযোধ্যা থেকে তারা এসে পড়ে দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলার কাগদি গ্রামে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে হাসন রাজার দাদা বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব (বাবু রায় চৌধুরী) সিলেটে পাড়ি জমান এবং এখানেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বাবু রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর হাসনের পিতা পিতৃ ও মাতৃবংশীয় সকল সম্পদের মালিক হন। ১৮৬৯ সালে চল্লিশ দিনের ব্যবধানে হাসনের পিতা আলী রেজা ও বড় ভাই ওবায়দুর রেজা মারা যান। আর এই আকষ্মিকতায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে জমিদারিতে অভিষিক্ত হন হাসন।

যৌবনকাল

উত্তারিধাকার সূত্রে তিনি বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এবং সৌখিন। রমণী সম্ভোগে তিনি ছিলেন অক্লান্ত। তার এক গানে নিজেই উল্লেখ করেছেন-

“ “সর্বলোকে বলে হাসন রাজা লম্পটিয়া” ”

হাসন যৌবনে ছিলেন ভোগবিলাসী এবং সৌখিন। বিভিন্ন সময় তিনি অনেক নারীর সাথে মেলামেশা করেছেন। প্রতি বছর, বিশেষ করে বর্ষাকালে, নৃত্য-গীতের ব্যবস্থাসহ নৌকাবিহারে চলে যেতেন এবং বেশ কিছুকাল ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে দিতেন। পুকুরঘাটে স্নানরত গ্রামের মেয়েরা; ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনেই একজন বলে উঠল, ‘এই তাড়াতাড়ি পানিতে ডুব দে নতুবা জমিদারবাবু তুলে নিয়ে যাবে।’ এই কথা থেকেই বোঝা যায়, জমিদারবাবু বিশেষ সুবিধার না।

জমিদারবাবু পুকুরঘাটের পাশ দিয়ে আসার সময় গ্রামের আরেক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় এবং তার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের গলার মালা ছুড়ে দেন আর গেয়ে ওঠেন এই গানটি,

“ সোনা বন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইল, দেওয়ানা বানাইল মোরে ফাগল খরিল ”

এই ভোগবিলাসের মাঝেও হাসন প্রচুর গান রচনা করেছেন। বাইজী দিয়ে নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রসহ এসব গান গাওয়া হত। সেই গানের মাঝেও অন্তর্নিহিত রয়েছে নশ্বর জীবন, স্রষ্টা এবং নিজের কৃত কর্মের প্রতি অপরাধবোধের কথা। কে জানতো সেই অত্যাচারী, ভোগবিলাসী জমিদারই হবেন পরবর্তীকালের সবচেয়ে প্রজাদরদি এবং দরবেশ জমিদার!

হাছন রাজা পশু পাখি ভালোবাসতেন। ‘কুড়া’ ছিল তার প্রিয় পাখি। ঘোড়াও পুষতেন হাসন। তাঁর প্রিয় দুটি ঘোড়ার একটি হলো জং বাহাদুর, আরেকটি চান্দমুশকি। এরকম আরো ৭৭টি ঘোড়ার নাম পাওয়া গেছে। হাসন রাজার আর এক মজার শখ ছিল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জড়ো করে রুপোর টাকা ছড়িয়ে দেওয়া। বাচ্চারা যখন হুটোপুটি করে কুড়িয়ে নিত, তা দেখে তিনি খুব মজা পেতেন।

হাসন রাজার ব্যবহৃত পোশাক
ছবি : wikimedia

প্রথম যৌবনে নারী সম্ভোগে অক্লান্তি বোঝা যায় তারই রচনা থেকে- ‘হাসন রাজার অভিলাষ নারীর বাস শুঙ্গে/ পেয়ারা চেহারার নারী পাইলে ঘষে অঙ্গে অঙ্গে’! নারীর প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নারীর সংস্পর্শে আসার কথা জানা যায় অনেক লেখা থেকেই। হাছান দৌহিত্র অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ জানান, ‘কবির ৪ জন পত্নী ছাড়াও ১৬ জন উপ-পত্নী ছিল’। হাসন পরিবারের উত্তরসূরী সাদিয়া চৌধুরী পরাগ ‘প্রেম বাজারে হাছন রাজা’ প্রবন্ধে লেখেন, “জমিদার দেওয়ান হাছন রাজা যৌবনে বহু সুন্দরী নারীর শয্যাসঙ্গী হয়ে বহু সন্তান-সন্তানাদির জন্মদান করেছিলেন।” (প্রসঙ্গ হাছন রাজা আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত। বাংলা একাডেমি ঢাকা। ১৯৯৮ পৃষ্ঠা ১৪৮)

কখনো ‘সোনা বন্ধে আমারে দিওয়ানা বানাইছে’ এর অপরূপা দিলারাম, কখনো ‘নেশা লাগিল’ এর সুন্দরী বাইজি পিয়ারী, কখনো নাইওরী নৌকা এসবেই মেতে থাকতেন হাসন। এছাড়াও ছিল বিচিত্র কিছু শখ। ঘোড়া, পাখি এসব ভালবাসতেন তিনি। মোট ৭৭টি ঘোড়ার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল জং বাহাদুর ও চান্দমুশকি। এসব নিয়ে ঘোড়দৌড় বসাতেন মাঝেমধ্যেই। ছোট বাচ্চাদের জড়ো করে কখনো রূপোর মুদ্রা ছড়িয়ে, সেসব বাচ্চাদের কুড়িয়ে নেয়া দেখে আনন্দ পেতেন। বর্ষাকালে মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাটে যেতেন। মাঝে মাঝে সুনামগঞ্জ শহর ঘুরতেন দুইজন জোওয়ানের কাধে চড়ে!

এভাবে নিজের খেয়ালে ডুবে থাকা হাসন ধীরে ধীরে প্রজাদের থেকে দূরে সরে যেয়ে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী রাজা হিসেবে পরিচিত হতে লাগলেন। আনন্দবিহারে সময় কাটানোই যেন ছিল তার জীবনের একমাত্র বাসনা। পড়ে থাকতেন বাইজীবাড়ি আর শরাবে। প্রতি বছর বিশেষত বর্ষাকালে যেতেন নৌবিহারে, নাইওরি ওসব নৌকায় চলে যেতেন মাঝ হাওড়ে, সাথে থাকতো বাইজী, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্য গীতের ব্যবস্থা। অথচ সেসব গানের মধ্যেও থাকতো জগৎজীবনের অনিত্যতা, অনিশ্চয়তা।

মরমী জীবনদর্শন 

১৮৯৭ সালের ১২ই জুন আসাম এবং সিলেট এলাকায় ৮.৮ রিখটার স্কেলের এক ভয়াবহ ভুমিকম্পে মানুষসহ অনেক পশুপাখি প্রাণ হারায়। হাসনের নিজেরে কুড়ে ঘরটিও ভেঙ্গে যায়। পরে এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন তাঁর অনেক নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছে। খাদ্যের অভাবে হাসনের প্রাণপ্রিয় অনেক পশু পাখির মৃত্যু তাঁর মনে জীবন সম্পর্কে কঠিন বৈরাগ্যের সূচনা করে।

হাসন রাজার এই কালো অধ্যায়ের ইতি ঘটে বেশ অলৌকিক ভাবেই। লোক মুখে শোনা যায়- একদিন তিনি একটি আধ্যাত্নিক স্বপ্ন দেখলেন এবং এরপরই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করা শুরু করলেন। বৈরাগ্যের বেশ ধারণ করলেন। জীবনযাত্রায় আনলেন বিপুল পরিবর্তন। নিয়মিত প্রজাদের খোঁজ খবর রাখা থেকে শুরু করে এলাকায় বিদ্যালয়, মসজিদ এবং আখড়া স্থাপন করলেন। সেই সাথে চলতে লাগলো গান রচনা।

হাসন রাজা জাদুঘরের একাংশ
ছবি : wikimedia

ভুলত্রুটিগুলো শোধরাতে শুরু করলেন। জমকালো পোশাক পরা ছেড়ে দিলেন। শুধু বহির্জগৎ নয়, তাঁর অন্তর্জগতেও এল বিরাট পরিবর্তন। বিষয়-আশয়ের প্রতি তিনি নিরাসক্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর মনে এল একধরনের উদাসীনতা। একধরনের বৈরাগ্য। সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হয়ে উঠল তাঁর প্রতিদিনের কাজ। আর সব কাজের ওপর ছিল গান রচনা। তিনি আল্লাহর প্রেমে মগ্ন হলেন। তাঁর সব ধ্যানধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে লাগল। সেই গানে তিনি সুরারোপ করতেন এভাবে

লোকে বলে বলে রে,
ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার
কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার
ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার।

এভাবে প্রকাশ পেতে লাগল তাঁর বৈরাগ্যভাব। হাসন রাজা সম্পূর্ণ বদলে গেলেন। জীব হত্যা ছেড়ে দিলেন। কেবল মানবসেবা নয়, জীবসেবাতেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন। ডাকসাইটে রাজা এককালে ‘চণ্ড হাসন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি হলেন ‘নম্র হাসন’। তাঁর এক গানে আক্ষেপের হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে:
ও যৌবন ঘুমেরই স্বপন
সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন।

পরিণত বয়সে তিনি বিষয়-সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশ-জীবন যাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে হাসন এম ই হাইস্কুল, অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আখড়া স্থাপিত হয়।

সংগীতসাধনা 

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর রচিত ২০৬টি নিয়ে গানের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এই সংকলনটির নাম ছিল ‘হাসন উদাস’। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্‌’ সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তাঁর অনেক গান এখনো সিলেট-সুনামগঞ্জের লোকের মুখে মুখে আছে এবং বহু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পদ্যছন্দে রচিত হাসনের অপর গ্রন্থ ‘সৌখিন বাহার’-এর আলোচ্য বিষয ছিল- ‘স্ত্রীলোক, ঘোড়া ও কুড়া পাখির আকৃতি দেখে প্রকৃতি বিচার। এ পর্যন্ত পাওয়া গানের সংখ্যা ৫৫৩টি। অনেকে অনুমান করেন হাসন রাজার গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশী।

হাসন রাজার ব্যবহৃত একটি ঢোল
ছবি : wikimedia

মরমী গানের ছক-বাঁধা বিষয় ধারাকে অনুসরণ করেই হাছনের গান রচিত। ঈশ্বানুরক্তি, জগৎ জীবনের অনিত্যতা ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন-ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তিই তার গানে প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও নিজেকে দীনহীন বিবেচনা করেছেন, আবার তিনি যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে বাঁধা ঘুড়ি সে কথাও ব্যক্ত হয়েছেঃ

“গুড্ডি উড়াইল মোরে,মৌলার হাতের ডুরি।
হাছন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।।
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
জযেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।। ”

আরেকটি কবিতায় দেখা যায়, হাসন গৌতম বুদ্ধের মতোই বলেন-

“স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল”

জাগতিক দুই চোখ দিয়ে বাস্তব জগত দেখা যায়। তৃতীয় নয়ন বা মানশ্চক্ষ দিয়ে মানুষ জীবন জগত এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে পারে। যেমনটা দেখা যায় হাসনের আরেকটি কবিতায়-

“আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে।
আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।”

এদিকে নশ্বর জীবনের সীমাবদ্ব আয়ু শেষ হয়ে আসে- তবু ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না, হাছন রাজা তোর’। পার্থিব সম্পদ, আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভোগের মোহ হাছন রাজাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আবার নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারেনঃ

“যমের দূতে আসিয়া তোমার হাতে দিবে দড়ি।
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে যমেরও পুরিরে।।
সে সময় কোথায় রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রী।
কোথায় রইব রামপাশা কোথায় লক্ষণছিরি রে।।
করবায় নিরে হাছন রাজা রামপাশায় জমিদারী।
করবায় নিরে কাপনা নদীর তীরে ঘুরাঘুরি রে।।
(আর) যাইবায় নিরে হাছন রাজা রাজাগঞ্জ দিয়া।
করবায় নিরে হাছন রাজা দেশে দেশে বিয়া রে।।
ছাড় ছাড় হাছন রাজা এ ভবের আশা।
প্রাণ বন্ধের চরণ তলে কর গিয়া বাসা রে।।”

হাসন মুসলিম ছিলেন, কিন্তু তাঁর গানের পূর্বপুরুষের ধর্ম, হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রেমও লক্ষণীয়। যেমন –

“আমি যাইমুরে যাইমু, আল্লার সঙ্গে,
হাসন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে”

আবার পাশাপাশি তার কন্ঠে ধ্বনিত হয় –

“আমার হৃদয়েতে শ্রীহরি,
আমি কি তোর যমকে ভয় করি।
শত যমকে তেড়ে দিব, সহায় শিবশঙ্করী।”

হাছন রাজা মুখে মুখে গান রচনা করতেন, আর তার সহচরবৃন্দ কী নায়েব-গোমস্তা সে সব লিখে রাখতেন। তার স্বভাবকবিত্ব এসব গানে জন্ম নিত, পরিমার্জনের সুযোগ খুব একটা মিলতনা।

হাসন রাজার ব্যবহৃত একতারা;
ছবি : wikimedia

তাই কখনো কখনো তার গানে অসংলগ্নতা, গ্রাম্যতা, ছন্দপতন ও শব্দপ্রয়োগে অসতর্কতা লক্ষ করা যায়। অবশ্য এই ত্রুটি সত্ত্বেও হাছন রাজার গানে অনেক উজ্জ্বল পংক্তি, মনোহর উপমা-চিত্রকল্পের সাক্ষাৎ মেলে। তার কিছু গান, বিশেষ করে ‘লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার’, ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে’, ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না হাছন রাজা তোর’, ‘আমি যাইমুরে যাইমুরে আল্লার সঙ্গে’, ‘কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে’, ‘একদিন তোর হইব রে মরন রে হাসন রাজা’- সমাদৃত ও লোকপ্রিয় শুধু নয়, সঙ্গীত-সাহিত্যের মর্যাদাও লাভ করেছে।

হাসন দর্শন সম্পর্কে বিশ্বকবি

হাসন দর্শন সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৫ সালে Indian Philosophical Congress এ বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার এই গ্রাম্য কবির মাঝে এমন একটি গভীর তত্ত্ব খুঁজে পাই, ব্যক্তি স্বরূপের সাথে সম্মন্ধ সূত্রে বিশ্ব সত্য।” এছাড়াও ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে `হিবার্ট লেকচারে` রবীন্দ্রনাথ `The Religion of Man` নামে যে বক্তৃতা দেন তাতেও তিনি হাসন রাজার দর্শন ও সংগীতের উল্লেখ করেন।

“মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন
শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম
আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম
নাকে পয়দা করিয়াছে খুসবয় বদবয়।”

মিউজিয়াম অব রাজাস

সুনামগঞ্জের তেঘরিয়ার রয়েছে তার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি যা বর্তমানে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। হাসন রাজার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে গড়ে তোলা হয়েছে একটি জাদুঘর, যার নাম ‘মিউজিয়াম অব রাজাস’। এখানে দেশ বিদেশের দর্শনার্থীরা হাসন রাজা ও তার পরিবার সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে প্রতিদিন ভিড় করেন।

সিলেটের জিন্দাবাজারে হাসন রাজা জাদুঘর

এছাড়াও, সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ায় এলাকায় সুরমা নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। এ বাড়িটি একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কালোত্তীর্ণ এ সাধকের ব্যবহৃত কুর্তা, খড়ম, তরবারি, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই ও নিজের হাতের লেখা কবিতার ও গানের পাণ্ডুলিপি আজও বহু দর্শনার্থীদের আবেগাপ্লুত করে। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাঁর মায়ের কবরের পাশে কবর দেওয়া হয়। তার এই কবরখানা তিনি মৃত্যুর পূর্বেই নিজে প্রস্তুত করেছিলেন।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে