free hit counter
মাহেলা জয়াবর্ধনে : লংকান ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি
জীবনী

মাহেলা জয়াবর্ধনে : লংকান ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি

“গোস অফসাইড, সেভ ইউর লেগস, মাহে—এএএ—লা জয়াবর্ধনে, এ হাইক্লাস ইনিংস ফ্রম এ হাইক্লাস প্লেয়ার, এবসুলূটলি ব্রিলিয়ান্ট”

জহির খানের ১৩৮ কি.মি গতির ফুল পিচড বলটি এক্সট্রা কাভারের উপর দিয়ে উড়িয়ে দিলেন মাহেলা আর উল্লাসে ফেটে পরলো প্যাভিলিয়নে বসা সতীর্থরা, গ্যালারিতে থাকা তার স্ত্রী। এভাবেই বিশ্বকাপ ফাইনালে ৮৮ বলে ১০৩ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে দলকে টেনে তুলেছিলেন খাদের কিনার থেকে।

১৭ বছরের ক্যারিয়ারে শ্রীলঙ্কাকে বহু ম্যাচে একা সামলিয়েছেন এই কিংবদন্তী, দলের জন্য লড়েছেন ক্যারিয়ারের শেষ অবধি। আজ জানবো তার গল্প, এক বীর সেনানীর গল্প; একজন মাহেলা জয়াবর্ধনের গল্প।

দেনাগামাগে প্রবোথ মাহেলা ডি সিলভা জয়াবর্ধনে (জন্ম: ২৭ মে, ১৯৭৭) কলম্বোয় জন্মগ্রহণকারী সাবেক ও বিখ্যাত শ্রীলঙ্কার পেশাদার ক্রিকেট তারকা। তিনি শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি মূলতঃ মাহেলা জয়াবর্ধনে নামেই বিশ্ব ক্রিকেট অঙ্গনে অতি পরিচিত ক্রিকেটার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে তার বেশ সুনাম রয়েছে।

প্রাথমিক ক্যারিয়ার

১৯৭৭ সালের ২৭ মে কলম্বোয় জন্মগ্রহণ করেন মাহেলা জয়াবর্ধনে, পুরো নাম দেনাগামাগে প্রমথ মাহেলা ডি সিলভা জয়াবর্ধনে। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন মাহেলা, স্কুল ক্রিকেটে স্টাইলিশ ব্যাটিংয়ের জন্য খুব কম বয়সেই স্পটলাইট পেয়ে যান তিনি। নালন্দা কলেজের হয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে পেয়ে যান অধিনায়কত্ব। মূলত এ সময়েই মাহেলার মধ্যে নেতৃত্ব গুণের বিকাশ ঘটতে থাকে।

মাহেলা জয়াবর্ধন
ছবি : roar.media

১৯৯৫ সালে সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবের হয়ে ঘরোয়া লিগে অভিষেক ঘটে মাহেলা জয়াবর্ধনের। পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নমনীয় স্বভাবের মাহেলা কঠিন সব ক্রিকেটীয় শট এত অবলীলায় খেলতেন যে, মনে হতো ক্রিকেট খেলাটা বুঝি মাহেলার জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ। এ ব্যাপারে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কুমার সাঙ্গাকারা বলেন, “সেই স্কুলক্রিকেট থেকেই মাহেলাকে দেখে ভিতরে ভিতরে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হতাম, ব্যাটে-বলে টাইমিং করার ব্যাপারটা মাহেলা এতটা অনায়াসে করতো যে সেটা দেখে অবাক না হয়ে পারা যেত না। আমরা যেসব শট খেলতে নেটে কঠোর পরিশ্রম করতাম সেগুলো মাহেলা সেই বয়সে অহরহ করে দেখাতো।” ঈশ্বর প্রদত্ত এই প্রতিভার কারণে মাত্র ২০ বছর বয়সেই দলে অভিষেকের সম্ভাবনা জোরালো হয় মাহেলা জয়াবর্ধনের।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক

অবশেষে সব গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৭ সালের আগস্টে ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লংকানদের হয়ে অভিষেক ঘটে মাহেলা জয়াবর্ধনের। সেই ম্যাচে রীতিমতো রানের ফোয়ারা বইছিল। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ভারতের করা ৫৩৭ রানের জবাবে শ্রীলঙ্কা সংগ্রহ করে ৬ উইকেটে ৯৫২ রান যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। এই রানের পাহাড়ে মাহেলার অবদান ছিল ৬৬ রান, শেষপর্যন্ত রান উৎসবের ঐ ম্যাচ নিষ্প্রাণ ড্রয়ের মাধ্যমেই শেষ হয়। টেস্ট ক্রিকেটে নিজের জাত চেনান ১৯৯৯ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে, ২৪২ রানের এক ইনিংস খেলে।

ভারতের বিরুদ্ধে ২৪২ রানের ইনিংস খেলার ম্যাচে মাহেলা
ছবি : newsviews.media

পরের বছর ১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক ঘটে তার। শার্ট নং ২৭। ক্যারিয়ারের শুরুটা খুব ভাল ছিল না। প্রথম দশ ওয়ানডেতে মাত্র ১২২ রান সংগ্রহ করেছিল। এই সময়ে তার দলে টিকে থাকাই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে দাঁড়ায়, কারণ দলে সে সময় সনাথ জয়সুরিয়া, মারওয়ান আতাপাত্তু, অরবিন্দ ডি সিলভা, অর্জুন রানাতুঙ্গা ও রওশন মহানামার মতো লিজেন্ডরা ছিল।

মাহেলা জয়াবর্ধন
ছবি : newsviews.media

১৯৯৯ সালের শুরুটাও দারুণভাবে করেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। ২৩ জানুয়ারি অ্যাডিলেডে ইংলিশদের মুখোমুখি হয় শ্রীলঙ্কা। এই সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ, যে ম্যাচে মুরালিকে বারবার নো বলের দায়ে অভিযুক্ত করার প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো রানাতুঙ্গার শ্রীলঙ্কা। শেষপর্যন্ত ইংলিশরা সেদিন দাঁড় করায় ৩০২ রানের বিশাল এক সংগ্রহ। কিন্তু পাঁচ নম্বরে খেলতে নামা মাহেলা জয়াবর্ধনের ১১১ বলে ১২০ রানের অসাধারণ এক কাউন্টার অ্যাটাকিং ইনিংসে বিশাল এই সংগ্রহ শ্রীলঙ্কা টপকে যায় এক উইকেট হাতে রেখে, ম্যাচসেরার পুরস্কারটাও পান মাহেলা। এর পরের মাসেই কলম্বোর সিংহলিজ স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে টেস্টে ২৪২ রান করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো ডাবল সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে যান মাহেলা। ম্যাচ ড্র হলেও ম্যাচসেরার পুরস্কার ঠিকই পান তিনি। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা দারুণভাবেই হয়েছিলো তার।

অভিষেক বিশ্বকাপ

নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে প্রথম ম্যাচে সুযোগ না পেলেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে ঠিকই সুযোগ পান ২২ বছর বয়সী মাহেলা জয়াবর্ধনে। প্রোটিয়াদের দেওয়া ২০০ রানের সহজ টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে লঙ্কানরা অল আউট হয় মাত্র ১১০ রানেই! সেদিন সাত নম্বরে খেলতে নামা মাহেলা করেন ২২ রান, যা ছিল দলের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি তিনি। কেনিয়ার বিপক্ষে ৪৫ রানই ছিল তার সেই আসরে সর্বোচ্চ সংগ্রহ। নিজের দল শ্রীলঙ্কার জন্যও আসরটি ছিল ব্যর্থতায় মোড়া, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে এসে গ্রুপপর্বেই বিদায় নিতে হয় লংকানদের।

বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পরপরই অধিনায়কের পদ থেকে সরে যান অর্জুনা রানাতুঙ্গা, দলীয় অধিনায়ক হিসেবে লঙ্কান বোর্ড নিয়োগ দেয় সনাথ জয়াসুরিয়াকে আর ডেপুটি হিসেবে নিয়োগ পান মাহেলা জয়াবর্ধনে। মাত্র ২২ বছর বয়সী মাহেলাকে সহ অধিনায়ক করে বোর্ড একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে দেয় আর তা হলো ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কার নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বটা মাহেলার উপরেই বর্তাবে। তবে এত অল্প বয়সে সহ অধিনায়কত্বের চাপ এসে পড়ায় মাহেলার পারফর্মেন্স গ্রাফ কিছুটা নিচে নেমে যায়। নিয়মিত বিরতিতে বড় ইনিংসের দেখা পেলেও বড় ইনিংসগুলোর মাঝে ধারাবাহিক পারফর্ম না করায় ওয়ানডেতে মাহেলার গড় ৩০ এর আশেপাশেই ঘুরতে থাকে।

অধিনায়কের দায়িত্ব

ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকবার শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। বিভিন্ন সময়ে দলের প্রয়োজনে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েও আবার কাধে তুলে নিয়েছেন। ২০০৭ বিশ্বকাপে দলের কান্ডারী ছিলেন এই ডান হাতি ব্যাটসম্যান, এর আগে ২০০৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে মারভান আতাপাত্তুর অনুপস্থিতিতে ওয়ানডে ক্যাপ্টেন্সি পেয়েছিলেন।

প্রথম বার টেস্ট ক্যাপ্টেন হন ২০০৬ সালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সিরিজে। ২০০৯ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে পাকিস্তান সফরে মাহেলা টেস্ট সিরিজের নেতৃত্ব দেন। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর ভারত পাকিস্তান সফরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে ঐ সিরিজের আয়োজন করা হয়। প্রথম টেস্টটি ড্র হয়, তবে মাহেলা ডাবল সেঞ্চুরি করেন। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের পর তিনি অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। ঐ টেস্টে শ্রীলঙ্কা খুবই ভাল অবস্থানে ছিল। থিলান সামারাবীরা পরপর দুই টেস্টে দু’টি সেঞ্চুরি এবং তিলকরত্নে দিলশান সেঞ্চুরি করেছিলেন।

মাহেলা জয়াবর্ধনে  অধিনায়কের দায়িত্ব
ছবি : roar.media

গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত টেস্টটির তৃতীয় দিনের খেলায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে মাঝ পথে ১২ জন অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীদের হামলার শিকার হয় শ্রীলঙ্কা দলের বাসটি। জয়াবর্ধনেসহ ছয়জন শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছয়জন পুলিশ এবং দুইজন সাধারণ নাগরিকও এ আক্রমণে নিহত হন। এরপর ব্যাটিংয়ে মনোনিবেশ করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মাহেলা।

দুই বছর পরে ২০১১ বিশ্বকাপে আবার সহ-অধিনায়ক এর দায়িত্ব কাঁধে আসে, অধিনায়ক ছিলেন তার দীর্ঘদিনের সতীর্থ কুমার সাঙ্গাকারা। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজিত হবার পর সহ-অধিনায়কত্ব থেকে আবারও নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

মহাকাব্যিক ৬২৪ রানের জুটি

২০০৬ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে আসে দক্ষিণ আফ্রিকা, প্রথম টেস্টে কলম্বোর এসএসসিতে মুখোমুখি হয় দুই দল। প্রথম ইনিংসে প্রোটিয়ারা অল আউট মাত্র ১৬৯ রানে! তবে ডেল স্টেইনের জোড়া আঘাতে মাত্র ১৪ রানে শ্রীলঙ্কার দুই ওপেনার সাজঘরে ফিরলে মনে হচ্ছিলো যে এই অল্প পুঁজিতেই বুঝি ম্যাচ জমিয়ে তুলে প্রোটিয়ারা! তবে এরপর যা হলো, সেটা শুধু প্রোটিয়ারা কেনো, লঙ্কানরাও তাদের স্বপ্নে ভাবতে পেরেছিল কিনা সন্দেহ! ১৫৭ ওভার ব্যাটিং করে ৬২৪ রানের পাহাড়সম এক জুটি দাঁড় করান কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে! এই ৬২৪ রানের জুটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক টেস্টেই নয়, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট হিসেব করলেও যেকোনো জুটিতে সর্বোচ্চ!

মহাকাব্যিক ৬২৪ রানের জুটি
ছবি : newsviews.media

ক্রিকেট বলের একজন পারফেক্ট টাইমার, নিষ্কলুষ কৌশল এবং প্রচন্ড ধৈর্য্যের অধিকারী জয়াবর্ধনে ২০০৬ সালের জুলাইয়ের ২৭ তারিখ কলম্বোতে রচনা করেন এক স্মরণীয় মহাকাব্য। সামনের এবং পিছনের পায়ের উভয় পাশে শট খেলার ক্ষেত্রে সমান পারদর্শী মাহেলা এদিন ৫৭২ বল খেলে ৩৭৪ রানের এক ম্যারাথন ইনিংস খেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর মহাকাব্যিক এ ইনিংস খেলার জন্য তাকে ক্রীজে অবস্থান করতে হয় ৭৫২ মিনিট। ৪৩ চার ও ১ ছক্কায় সাজানো এই মহাকাব্য রচনার পথে তার সাথী ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা।

মাহেলা-সাঙ্গাকারা দুই মানিকজোড়

ক্রিকেটবিশ্ব জানে, তারা হরিহর আত্মা। তাদের ‘দ্বৈত বিকল্প’ খুঁজে পাওয়াও ভার! মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারার এই ‘দোস্তি’ শুধু শ্রীলংকান ক্রিকেট নয়, বিশ্বক্রিকেটকেও অনেক কিছু দিয়েছে।

‘কুমার-মাহেলা’ এমন একটি ভিত যা শ্রীলঙ্কাকে টি-টোয়েন্টিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব এনে দিয়েছে এবং ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের ফাইনালে পোছিয়েছে দুইবার। মাহেলা আর সাঙ্গার জুটিকে লংকান মানিকজোড় বললেও কম বলা হবে। এই একটি জুটিই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটকে টেনেছে প্রায় এক যুগ। হেডেন এবং ল্যাঙ্গার, গ্রিনিজ এবং হেইনেস, ওয়ার্ন এবং ম্যাকগ্রা শব্দটির মতো ‘কুমার ও মহেলা’ শব্দটিও প্রায়শই ব্যবহার করা হতো তাদের সময়ে।

‘কুমার ও মহেলা’ শব্দ দুটি একে অপরের সাথে প্রায় মিশে গেছে এবং এমন একটি সত্তায় পরিণত হয়েছে যা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট অনুরাগীদের সপ্ন দেখিয়েছে, সান্ত্বনা দিয়েছে আবার ব্যাট হাতে বিশ্ব শাসনও করেছে।

মাহেলা-সাঙ্গাকারা দুই মানিকজোড়
ছবি : newsviews.media

৫৫০ ম্যাচের পর কুমার মাহেলার জুটি ভাঙে। সিডনিতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটিই ছিল একসঙ্গে তাদের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সত্যি বলতে এই জুটির অবসরের পরপরই শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং অর্ডারের ভিত্তিও দেবে গেছে।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই দুই বন্ধুর নেতৃত্বে দুটি-দুটি চারটি বিশ্বকাপ থেকে ব্যার্থতা নিয়ে ফিরেছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল। তবে কি ক্রিকেটকে যারা দুহাত ভরে দিয়ে যায়, ক্রিকেট তাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়?

না, ২০১৪ টি-২০ বিশ্বকাপে এই দুই মহারথীর ব্যাটে ভর করেই শিরোপা জিতে শ্রীলঙ্কা। কথায় আছে না, “ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে।”

২০০৬ সালে মহেলা জয়াবর্ধনে আর কুমার সাঙ্গাকারা মিলে টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। কলম্বোতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৬২৪ রানের পার্টনারশিপ করে রেকর্ড বইতে নাম লেখান এই দুই মহারথী।

মাহেলা-সাঙ্গাকারা দুই মানিকজোড়
ছবি : roar.media

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৯৩ বার একসাথে ব্যাটিং করে মোট ১৩৩৬৮ রান করেছে এই জুটি। একত্রে ৩৬ টি শতক এবং ৬৫ টি অর্ধশত রানের জুটি গড়েছেন এই দুজন।

২০০৭ বিশ্বকাপ- অসাধারণ এক প্রত্যাবর্তন

এর আগের বিশ্বকাপে হতশ্রী পারফর্ম করায় ২০০৭ বিশ্বকাপে রান পাওয়ার ব্যাপারে আলাদা একটা মাহেলার উপরে ছিল, সেই চাপকে শক্তিতে পরিণত করে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন মাহেলা। ৬০.৮৯ গড়ে ৫৪৮ রান করে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন মাহেলা। তবে দুইটা ম্যাচের কথা আলাদা করে বলতেই হবে। প্রথমটি হচ্ছে সুপার এইট রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি, শ্রীলঙ্কার করা ২৩৫ রানের জবাবে জয়ের পথে বেশ ভালোভাবেই ছিল ইংলিশরা। শেষ বলে ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ৩ রান, ক্রিজে ইনফর্ম ব্যাটসম্যান রবি বোপারা আর বোলিং এ দিলহারা ফার্নান্দো। ফার্নান্দো শেষবল করতে যাবে এমন সময়ে হুট করে মাহেলা ফার্নান্দোকে থামিয়ে বলেন “বোপারা কিন্তু স্লো বলের আশায় আছে, তুমি ভুলেও স্লো বল করো না বরং ফাস্ট একটা বল করো।” ফার্নান্দো আসলেই তখন স্লো বল করার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু অধিনায়কের নির্দেশমতে সে কুইকার ডেলিভারিই করলো, আর স্লো বলের আশায় থাকা বোপারা দেরিতে ব্যাট চালানোয় হয়ে গেলেন বোল্ড! শুধুমাত্র মাহেলার ট্যাকটিকাল ব্রিলিয়ান্সের জন্য হারা ম্যাচ জিতে যায় লঙ্কানরা।

মাহেলা-২০০৭ বিশ্বকাপ
ছবি : espncricinfo.com

সুপার এইটে দ্বিতীয় হয়ে সেমিফাইনালে যায় শ্রীলঙ্কা যেখানে প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে আগে ব্যাটিং এ নেমে লঙ্কানদের শুরুটা মন্থর হলেও মাহেলার ১০৯ বলে ১১৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে ২৮৯ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায় শ্রীলঙ্কা যা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে ফাইনালে অজিদের সাথে আর পেরে উঠে নি মাহেলার দল, ৫৩ রানে হেরে রানার্স আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় লঙ্কানদের। সে বছর অনুষ্ঠেয় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সুপার এইটেই বিদায় নিতে হয় মাহেলার শ্রীলঙ্কাকে। অসাধারণ পারফর্ম করে ২০০৭ সালে উইজডেন বর্ষসেরা খেলোয়াড় হন মাহেলা। পরের বছর পাকিস্তানের মাঠে ফাইনালে ভারতকে ১০০ রানে হারিয়ে এশিয়া কাপের শিরোপা জিতে নেয় শ্রীলঙ্কা।

অধিনায়কের পদ থেকে সরে যাওয়া

অধিনায়ক হিসেবে মাহেলা বেশ ভালো সময় পার করছিলেন, কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই ২০০৯ সালের শুরুতেই মাহেলা ঘোষণা দেন যে তিনি আর অধিনায়ক হিসেবে থাকবেন না! তার এই সিদ্ধান্তে ভক্তরা তো বটেই বোর্ডও বেশ অবাক হয়ে যায়। অধিনায়কত্ব ছাড়ার পেছনে সেরকম কোনো শক্ত কারণ মাহেলা দিতে পারেননি। অনেকের মতেই, সেসময়ে শ্রীলঙ্কার সহ অধিনায়ক ও মাহেলার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কুমার সাঙ্গাকারাকে অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যেই মাহেলা এভাবে হুট করে অধিনায়কের পদ থেকে সরে যান। তবে অধিনায়কের পদ ছাড়লেও দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে মাহেলার প্রভাব মোটামুটি আগের মতোই রয়ে যায়, একারণে কিছুদিন পরেই মাহেলাকে সাঙ্গাকারার ডেপুটি করে দেয় লঙ্কান বোর্ড। সাঙ্গাকারার নেতৃত্বে ২০০৯ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অসাধারণ খেললেও ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে আবারো রানার আপ হয় শ্রীলঙ্কা।

বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০১১ আরেক ট্র্যাজেডি

৪ঠা এপ্রিল, ২০১১ পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে বিশ্বকাপ ফাইনালে মুম্বাইর ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতের মুখোমুখি হয় শ্রীলঙ্কা। টসে জিতে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নিলেন লঙ্কান অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা। কিন্তু শুরুতেই জহির খানের অসাধারণ বোলিং সাথে ভারতীয় ফিল্ডারদের অসাধারণ ফিল্ডিং এ শুরুতেই বেশ চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। মুম্বাইর ফ্ল্যাট পিচে যেখানে বড় সংগ্রহের দরকার ছিল সেখানে পাওয়ার প্লের দশ ওভারে লঙ্কানদের রানরেট ছিল ওভারপ্রতি ৩ রান! মাহেলা জয়াবর্ধনে যখন ক্রিজে আসেন তখন শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ওভারে ৫৬/২। তখন মাহেলার উপর একইসাথে দুইটা দায়িত্ব, রানের গতি বাড়ানো সাথে নিজের উইকেট বিলিয়ে না আসা। মাহেলা জয়াবর্ধনে দুইটা দায়িত্বই বেশ ভালোভাবে সামলালেন, অপরপ্রান্তের কোনো ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে সেভাবে সমর্থন না পেলেও মাহেলা একাই বুক চিতিয়ে লড়ে গেলেন, খেললেন মাত্র ৮১ বলে ১০৩ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস।

বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০১১ আরেক ট্র্যাজেডি
ছবি : roar.media

পরিস্থিতি আর পারিপার্শ্বিক চাপের কথা বিবেচনা করলে এই ইনিংসটাকে সহজেই বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সেরা তিন ইনিংসের তালিকায় রাখা যায়। মাহেলার এই অসাধারণ ইনিংসে ভর করেই সেদিন শ্রীলঙ্কা ২৭৪ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায়। অথচ সেদিন যদি আরেকজন ব্যাটসম্যান মাহেলাকে ঠিকভাবে সাপোর্ট দিতে পারতেন, তাহলে হয়তো সেদিন লংকানদের সংগ্রহ ৩০০ ছাড়িয়ে যেতো। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এর আগে কোনো দলেরই ২৫০+ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ছিল না। ফলে মনে হচ্ছিলো, ২৭৪ রানই বুঝি শ্রীলঙ্কার জয়ের জন্য যথেষ্ট হবে।

বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০১১ আরেক ট্র্যাজেডি
ছবি : pavilion.com.bd

কিন্তু মুম্বাইর ফ্ল্যাটপিচ রাতের শিশিরের প্রভাবে আরো বেশি ব্যাটিং বান্ধব হয়ে যায়, গৌতম গম্ভীর আর ধনীর অসাধারণ দুইটি ইনিংসে বৃথা যায় মাহেলার অসাধারণ সেই সেঞ্চুরি, ছয় উইকেটের জয়ে দ্বিতীয়বারের মতন বিশ্বজয় করে ভারত। আর বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরি করেও পরাজিত দলে থাকার দুঃসহ রেকর্ডের অধিকারী হয়ে যান মাহেলা জয়াবর্ধনে। এই পরাজয়ের পরে দল নির্বাচন নিয়ে সমালোচনার জের ধরে অধিনায়কের পদ থেকে সাঙ্গাকারা ও সহ অধিনায়ক হিসেবে মাহেলা পদত্যাগ করেন।

অবশেষে বিশ্বজয়

২০১৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক হিসেবে চান্দিমাল নিয়োগ পেলেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্লো ওভাররেটের জন্য চান্দিমাল এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডু অর ডাই ম্যাচে অধিনায়কের দায়িত্ব পান লাসিথ মালিঙ্গা যার আগে অধিনায়ক হিসেবে জাতীয় দলে কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না! এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শ্রীলঙ্কা অলআউট মাত্র ১১৯ রানে! তখন মনে হচ্ছিলো, মাহেলা-সাঙ্গার একটা বিশ্বকাপের স্বপ্ন বুঝি অধরাই রয়ে যাবে। কিন্তু নেতাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে আর্মব্যান্ডের যে কোনো দরকার হয় না সেটা আবারো প্রমাণ করেন মাহেলা, মালিঙ্গাকে একপাশে রেখে পুরোম্যাচে নেতৃত্ব দেন মাহেলা নিজেই। মাহেলার অসাধারণ নেতৃত্বেই মাত্র ১১৯ রানের পুঁজি সত্ত্বেও ৫৯ রানে জিতে সেমিফাইনালে চলে যায় শ্রীলঙ্কা। এরপর উইন্ডিজকে সেমিতে হারানোর পর ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় লঙ্কানরা আর সেখানে আবারো মাহেলার চমক! আগে থেকেই ভারতের ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা খুঁজে সেই অনুযায়ী ডেথ ওভারে বোলিং করার পরিকল্পনা সাজান মাহেলা আর এই ট্যাকটিসের কারণেই ভারতের ইনিংস মাত্র ১৩০ রানেই থেমে যায় যা ২.১ ওভার হাতে রেখেই শ্রীলঙ্কা টপকে গেলে অবশেষে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয় মাহেলার!

২০১৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে মাহেলা জয়াবর্ধনে
ছবি : pavilion.com.bd

বিচিত্র এই পৃথিবীতে ঘটনাগুলো যেন আরো বেশি বিচিত্র, অফিসিয়াল অধিনায়ক হিসেবে ট্যাকটিসের সমস্তটা দিয়েও যেখানে মাহেলা অধিনায়ক হিসেবে দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি, সেখানে পর্দার আড়ালে থেকে যেবার নেতৃত্ব দিলেন সেবারই দল জিতে গেলো বিশ্বকাপ! অবশ্য এটা নিয়ে মাহেলার কোনো অতৃপ্তি ছিল না, তৃপ্তি নিয়েই ওই ম্যাচের পর টি-টুয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মাহেলা। একইবছর পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজের শেষ টেস্ট খেলেন মাহেলা। আর ঘোষণা দেন ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে থেকেও অবসর নেওয়ার। টি-টুয়েন্টির মতো অবশ্য ওয়ানডের বিদায়টা সুখকর হয়নি, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে শ্রীলঙ্কা বিদায় নেয় আর মাহেলাও খেলে ফেলেন নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

২০১৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে মাহেলা জয়াবর্ধনে
ছবি : cricketcountry.com

স্লিপ ক্যাচের রাজা মাহেলা

স্লিপে জয়াবর্ধনের থেকে বিশ্বস্ত ফিল্ডার হয়তো আজ পর্যন্ত কোনো দলনেতা পায়নি। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়ই জয়াবর্ধনেকে মাঠের ৩০ মিটার বৃত্তের মাঝেই ফিল্ডিং করতে দেখা গেছে। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফিল্ডার। শ্রীলঙ্কার হয়ে টেস্টে মোট ২০৫ টি ক্যাচ রয়েছে তার যা নন-উইকেটকিপার হিসেবে ২য় সর্বোচ্চ।

তিনি স্লিপ ফিল্ডিংয়ের কলা পুরোপুরি আয়ত্ত করেছিলেন। গতি এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও ছিল তার প্রখর। তার সময়ে দলের সেরা ফিল্ডার ছিলেন তিনি। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তার মোট ক্যাচের সংখ্যা ৪১৩ টি।

স্লিপ ক্যাচের রাজা মাহেলা
ছবি : newsviews.media

মাঠে তার বিশ্বমানের ক্যাচ দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছেন বারবার, নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন দুর্দান্ত ফিল্ডার হিসাবে।

২০০৫ সালে ভ্রমণবিষয়ক পরামর্শক ক্রিস্টিনা মল্লিকা সিরিসেনা নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন মাহেলা। খেলাধূলার বাইরে হোপ ক্যান্সার প্রজেক্টের সাথে জড়িত তিনি। ছোট ভাই ধিলশালের স্মৃতিকে ধরে রাখতে হোপের প্রচারণায় অগ্রসর হয়েছেন। সতীর্থ খেলোয়াড়দের সহযোগিতায় মহরাগামা এলাকায় ৭৫০ শয্যার ক্যান্সার ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছেন যা দেশের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ক্যান্সার হাসপাতাল হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও ২০১২ সালে সি ফুড রেস্টুরেন্ট খুলেছেন কলম্বোতে।

নিঃস্বার্থ এক নেতা

ওয়ানডেতে ৩৩.৩৮ গড় কিংবা টেস্টে ৪৯.৮৫ গড় আসলেই মাহেলার প্রতিভার সাথে ঠিক মানানসই নয়, কিন্তু পরিসংখ্যানের এই তথ্যগুলো আসলে সব কথা প্রকাশ করে না। মাহেলা কখনোই নিজের মনের মতো পজিশনে ব্যাটিং করতে পারেননি, যখন যে পজিশনে দলের তাকে দরকার হয়েছে, তখন সে পজিশনেই তিনি ব্যাটিং করেছেন। একারণেই ওয়ানডেতে ওপেনার হিসেবে মাহেলার গড় সবচেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও তিনি ওপেনার হিসেবে খেলেছেন মাত্র ৩৪ ইনিংস! কারণ মাহেলা ওপেনিংয়ে চলে গেলে শ্রীলঙ্কার মিডল অর্ডার আর তাল রাখতে পারতো না। দলে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার কথা আসলে সবার আগে জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন এই মাহেলাই, শ্রীলঙ্কার বর্তমান অধিনায়ক দিনেশ চান্দিমাল যখন দলে তরুণ হিসেবে আসেন, তখন মাহেলা নিজের চার নম্বর পজিশন চান্দিমালের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন, নিজে নেমে গিয়েছিলেন পাঁচ নাম্বার পজিশনে। ২০১২ সালে অধিনায়কের দায়িত্বে ফিরেছিলেন শুধুমাত্র দলকে খাদের কিনারা থেকে ফেরানোর জন্যে, দল একটা গোছানো অবস্থায় আসার সাথে সাথেই আবারো অধিনায়কের পদ থেকে সরে যান মাহেলা জয়াবর্ধনে।

নিঃস্বার্থ এক নেতা মাহেলা
ছবি : roar.media

অধিনায়কের আর্মব্যান্ড থাকুক কিংবা নাই থাকুক, ২০০৬ সালের পর থেকে প্রায় পুরোটা সময়ে দলের ট্যাকটিকাল ব্যাপারগুলো নিজে দায়িত্ব নিয়ে সামলাতেন মাহেলা। যার কারণে নিজের ব্যাটিংয়ের দিকে পূর্ণ মনোযোগ খুব কমই দিতে পেরেছেন মাহেলা। তাই শুধুমাত্র গড় দিয়ে শ্রীলঙ্কা দলের প্রতি একজন মাহেলার অবদান বোঝানো সম্ভব নয়, একজন নেতা হিসেবে মাহেলা প্রায় দশ বছর যেভাবে দলকে আগলে রেখেছিলেন, সেটা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। মাহেলা অবসরে যাওয়ার পর একজন যোগ্য নেতার অভাবে শ্রীলঙ্কার ছন্নছাড়া অবস্থা দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায় এই দলটার জন্য মাহেলার উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাঙ্গাকারার ব্যাটিং গড় মাহেলার চেয়ে যতোই ভালো থাকুক, একজন সাঙ্গাকারার চেয়ে একজন মাহেলার শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে অবদানটা বেশিই হবে। অনেকের মতে, ট্যাকটিকাল স্কিলে অর্জুনা রানাতুঙ্গার চেয়েও সেরা ছিলেন মাহেলা জয়াবর্ধনে! তাই শুধুমাত্র স্টাইলিশ ব্যাটিংয়ের জন্য নয়, শ্রীলঙ্কার জনগণ মাহেলা জয়াবর্ধনেকে মনে রাখবে একজন নেতা হিসেবেও, যিনি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তার দলকে।

টেস্টে যত কীর্তি

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১২৩ (কলম্বো, ২০০৬)

“এটি আমার মধ্যে অন্যতম সেরা টেস্ট ইনিংস। আমি আমার মাথার কিছু চুল এবং কয়েকটা নখ হারিয়েছি।”

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮০ (গল, ২০১২)
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬৭ (গল, ১৯৯৮)
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৩৭ (গল, ২০০৪)
ভারতের বিপক্ষে ২৭৫ (আহমেদাবাদ, ২০০৯)

বিদায়বেলা

এই মহারথী ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলেন ২০১৪ তে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়বর্ধনে তার ১৯ তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেন। এরপর খুব শীঘ্রই তিনি ওয়ানডে থেকেও অবসর নেন।

দ.আফ্রিকার কাছে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নেয় শ্রীলঙ্কা। ওই ম্যাচের মধ্য দিয়েই জমকালো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা টানেন মাহেলা জয়াবর্ধনে।

নিঃস্বার্থ এক নেতা মাহেলা
ছবি : newsviews.media

জয়াবর্ধনের ব্যাটিংশৈলী বারবার অবাক করেছে ক্রিকেটবিশ্বকে, চোখের তৃপ্তি দিয়েছে কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তকে। সেই চোখ জুড়ানো ড্রাইভ এবং চতুর ফ্লিক। সর্বদা নিজের আশ্চর্য দক্ষতার সাথে বোলারদের উপর চড়াও হয়েছেন এবং দর্শকদের মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাকে ‘বছরের সেরা আন্তর্জাতিক অধিনায়ক’ ঘোষণা করে।

ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও লক্ষ কোটি ক্রিকেট প্রেমীর হৃদয়ে চিরকাল থাকবেন এই মাস্টারক্লাস ব্যাটসম্যান। এভাবেই ক্রিকেটের মাঝে বেঁচে থাকুক মাহেলা জয়াবর্ধনে, বেঁচে থাকুক শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট নিয়ে দেখে যাওয়া তার স্বপ্ন।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, ক্রিকবাজ, ঢাকা ট্রিবিউন, স্পোর্টজ উইকি