free hit counter
জীবনী

চিত্তরঞ্জন দাশ:উদার জাতীয়তাবাদের দিশারি

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন দাস এক অবিস্বরণীয় নাম। চিত্তরঞ্জন দাশ সি.আর দাশ নামেই সমধিক পরিচিত এবং জনসাধারণ্যে ‘দেশবন্ধু’ বলে আখ্যায়িত, সম্মানিত।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতা এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতা ভুবন মোহন দাশ কলকাতা হাইকোর্টের সলিসিটার ছিলেন।

প্রথম জীবনে সি আর দাস ভবানীপুরের (কলকাতা) লন্ডন মিশনারি সোসাইটির ইনস্টিটিউশনে শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯০ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইংল্যান্ডে গিয়ে ইনার টেম্পলে যোগদান করেন এবং ১৮৯৪ সালে ব্যারিস্টার হন। ঐ একই বছর তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন। ১৯০৮ সালে অরবিন্দ ঘোষের বিচার সি.আর দাশকে পেশাগত মঞ্চের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসে। তিনি এমন চমৎকারভাবে কেসটির পক্ষসমর্থন করেন যে অরবিন্দকে শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তিনি ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার (১৯১০-১১) বিবাদি পক্ষের কৌশলী ছিলেন। সি আর দাস দীউয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনে দক্ষ ছিলেন।

কর্মজীবন:

১৮৯৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন। ১৯০৮ সালে অরবিন্দ ঘোষের বিচার তাকে পেশাগত মঞ্চের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসে। তিনি এত সুনিপুণ দক্ষতায় মামলাটিতে বিবাদী পক্ষ সমর্থন করেন যে অরবিন্দকে শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস দেয়া হয়। তিনি ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯১০-১১) বিবাদী পক্ষের কৌশলী ছিলেন। তিনি দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় আইনেই দক্ষ ছিলেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ :

বিশ শতকের প্রথম দিকে সি.আর দাশ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এস.এন ব্যানার্জী, বি.সি পাল ও অরবিন্দ ঘোষের সহকর্মী হিসেবে তিনি বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)-কে বাংলায় বিপ্লবী কর্মকান্ড বিস্তৃত করতে সদ্ব্যবহার করেন। ১৯১৭ সালে ভবানীপুরে অনুষ্ঠিত বাংলার প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে এম. কে গান্ধীর আহবানে সাড়া দিয়ে আইনজীবীর পেশা পরিত্যাগ করেন এবং ১৯২১ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা সফর বর্জনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। সরকার তাঁকে অনেকবার কারাগারে অন্তরীণ করে। গান্ধী যখন অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন তখন সি.আর দাশ তার তীব্র সমালোচনা করেন এবং বিষয়টিকে গুরুতর ভুল বলে নিন্দা করেন। তাঁর মতে, গান্ধীর এ কাজ রাজনৈতিক কর্মীদের মনোবল বহুল পরিমাণে কমিয়ে দেয়। ঐ চরম সংকটপূর্ণ সময়ে তিনি পরিষদে প্রবেশ কর্মসূচি অর্থাৎ পরিষদের অভ্যন্তরে অবস্থান নিয়ে অসহযোগ চালিয়ে যাবার সূত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন। কংগ্রেসের আইন পরিষদ বর্জনের নীতিকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করতেন যে, সরকারকে অবিচল, অবিচ্ছিন্ন ও দৃঢ়ভাবে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আইন পরিষদে প্রবেশাধিকার অর্জন করা অবশ্যই প্রয়োজন। ১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসে গয়ায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে পরিষদে প্রবেশ সংক্রান্ত তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর তিনি কংগ্রেসের সভাপতির পদে ইস্তফা দেন এবং পন্ডিত মতিলাল নেহরু, হাকিম আজমল খান, আলী ভ্রাতৃদ্বয় ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে স্বরাজ্য দলের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় বিধান পরিষদের নির্বাচনে স্বরাজ দল উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করে।

দেশবন্ধুর অভিমত ছিল যে, বঙ্গীয় আইন পরিষদ এ বলিষ্ঠ গ্রুপ সৃষ্টিকারী মুসলিম সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা ব্যতিরেকে স্বরাজবাদীদের বাধাদানের নীতি সফল হবে না। বস্ত্তত, দৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাসসহ তিনি ছিলেন রাজনৈতিক বাস্তববাদী এবং প্রচন্ড বিরোধিতার মুখেও তিনি নিজ অবস্থান থেকে কখনও বিচ্যুত হতেন না। তিনি নিজে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জ্বলন্ত অগ্রদূত ছিলেন বলে বাংলার সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে স্মরণীয়ভাবে সাফল্যলাভ করেছেন। বেঙ্গল প্যাক্ট নামে সাধারণভাবে পরিচিত এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি বাংলার মুসলমানদের আস্থাভাজন হয়ে তাদেরকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন। ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত স্বরাজ্য পরিষদ দলের এক সভায় চুক্তিটির শর্তাবলি গৃহীত হয়। দুঃখের বিষয় যে, বাংলায় কংগ্রেসের অনেক নেতা চুক্তিটির বিরোধিতা করে।

এস.এন ব্যানার্জী, বি.সি পাল ও অন্যান্যদের নেতৃত্বে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুরা এটির বিপক্ষে অনমনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের ভয় ছিল যে, চুক্তিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রভাব দুর্বল করে ফেলবে। তারা সি.আর দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, তিনি হিন্দুদের অধিকার বিসর্জন দিয়েছেন। এমনকি অনেক মধ্যপন্থি হিন্দু নেতা মনে করেন যে, সি.আর দাশ মুসলমানদের আস্থা অর্জন করার চেষ্টায় অনেকটা ছাড় দিয়েছেন। বাংলার মুসলমানগণ সর্বান্তঃকরণে চুক্তিটিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কোকনদ সেশনে চুক্তিটি বাতিল করা হলে তাদের মোহমুক্তি ঘটে। তাদের মতে, কোকনদ কংগ্রেস যে মস্ত ভুল করে সেটি ছিল কংগ্রেস আন্দোলনের ইতিহাসে জঘন্যতম ও এ ভুল হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ক্ষেত্রে এবং কংগ্রেসের মুখ্য উদ্দেশ্যের প্রতি চরম আঘাত হেনেছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যে অবস্থান নিয়েছিল, সি.আর দাশ তার সমালোচনা করে ঘোষণা করেন: ‘তোমরা সভার সিদ্ধান্তসমূহ থেকে বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেলতে পার, কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বাংলাকে বাদ দিতে পারবে না…এ রকম শিষ্টাচারহীন রীতিতে বাংলাকে মুছে ফেলা যাবে না। যারা চিৎকার করে বলে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’ তাদের যুক্তি আমি বুঝতে পারি না… বাংলা কি অস্পৃশ্য? এ রকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার বাংলার অধিকারকে কি তোমরা অস্বীকার করবে? যদি তোমরা তাই কর, বাংলা তার নিজের ব্যবস্থা নিজেই গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা অভিমত ব্যক্ত করার ব্যাপারে বাংলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করতে পার না’। যদিও ভারতীয় কংগ্রেস কর্তৃক মেনে নিতে অস্বীকার করা হয়েছে, তবু ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলন কর্তৃক তিনি চুক্তিটির শর্তাবলি অনুসমর্থন করিয়ে নিতে সক্ষম হন।

১৯২৪ সালে [[কলকাতা কর্পোরেশন]|কলকাতা কর্পোরেশন]]-এর নির্বাচনে স্বরাজবাদী বিজয় অর্জন করে এবং সি.আর দাশ প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তী মেয়াদের জন্যও তিনি পুনঃনির্বাচিত হন। ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালে যথাক্রমে লাহোর ও কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত শ্রমিক ইউনিয়নের কংগ্রেসে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৩ সালে তিনি স্বরাজ্য দলের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিকী দ্য ফরওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মুখপত্র মিউনিসিপ্যাল গেজেটও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জাত-বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি নারী মুক্তি সমর্থন করতেন এবং নারী-শিক্ষা ও বিধবাদের পুনর্বিবাহকে উৎসাহিত করতেন। তিনি যে অসবর্ণ বিবাহের পক্ষে ছিলেন তার প্রমাণ মিলে তাঁর নিজ কন্যাদের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারে বিবাহ দানের ঘটনায়।

উদার জাতীয়তাবাদের দিশারি:

১৯১৭ সালের এপ্রিলে কলকাতার ভবানীপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক অধিবেশনে সভাপতি রূপে চিত্তরঞ্জনের সরাসরি রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ। সে বছর ‘মডার্ন রিভিউ’-তে রবীন্দ্রনাথের নেশন-বিরোধী বক্তৃতার বয়ান পড়ে চিত্তরঞ্জন প্রথম দিকে বিচলিত হয়েছিলেন। পরে তিনি কবির নেশন-চিন্তার মর্ম উপলব্ধি করে খানিকটা গ্রহণ করেছিলেন। চিত্তরঞ্জন স্বীকার করেন যে ‘‘জাতীয়তাবাদকে চরমে নিয়ে গেলে যে বাড়াবাড়ি ঘটে, তারই পরিণাম’’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু তিনি এও মনে করতেন যে ভবিষ্যতে বিশ্বমানবতার এমন একটা যুগ আসবে যখন ‘‘বিশ্বমণ্ডলের জন্য রাজারাজড়াদের মতই নেশন ও জাতীয়তারও আর কোনও প্রয়োজন থাকবে না।’’ আজকের দিনে জাতীয়তাবাদ শব্দটাকে যখন উত্তরোত্তর লঘু আর সারহীন করে ফেলা হচ্ছে, তখন তাঁদের এই সব ভাবনা মনে করার গুরুত্ব বিরাট।

১৯২০ সালে উচ্চ আদালতে রাজকীয় টাকার অঙ্কের প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে মহাত্মা গাঁধীর অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশবন্ধু। ১৯২১ সালে ঘটে একটা ঘটনা, বাংলার পরবর্তী ইতিহাসে যার গুরুত্ব অনেক। আইসিএস ত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র বসু কলকাতায় দেশবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁর অসামান্য উদারতায় মুগ্ধ হয়ে সুভাষচন্দ্র ‘‘এক জন নেতাকে খুঁজে পেলেন’’ এবং ‘‘এঁরই পদানুসারী হবেন’’ বলে সংকল্প করলেন। দেশবন্ধুর সহধর্মিণী ও সুভাষচন্দ্রের মাতৃসমা বাসন্তী দেবীর গ্রেফতারের ফলে অসহযোগ আন্দোলনে নতুন জোয়ার এল। ১৯২১-এর ১০ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন ও সুভাষচন্দ্র একই সঙ্গে কারারুদ্ধ হলেন।

মহাত্মা গাঁধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করার পর দেশবন্ধু স্বরাজ দল গঠন করলেন। ১৯২৩ সালের বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট স্বরাজীরা খুব ভাল ফল করল। দেশবন্ধু দু’বার মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ইংরেজদের মদতে গড়া ‘ডায়ার্কি’ প্রথার সাম্রাজ্যবাদী দ্বিচারিতা প্রকাশ্যে আনলেন। ১৯২৪ সালে স্বরাজ দল কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়ী হল। দেশবন্ধু কলকাতার মেয়র পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ডেপুটি মেয়র হিসেবে তিনি বেছে নিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। শরৎচন্দ্র বসু অল্ডারম্যান হলেন, আর সুভাষচন্দ্রকে দেশবন্ধু চিফ এগজ়িকিউটিভ অফিসার নিয়োগ করলেন।

এই সময় হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সুষম ক্ষমতা বণ্টনের লক্ষ্যে দেশবন্ধু একটি ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর নেতার সেই চুক্তি কার্যকর করতে শুরু করলেন। বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতি ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত দেশবন্ধু ও সুভাষচন্দ্র স্থাপন করলেন। ইংরেজ সরকার সুভাষচন্দ্রকে বন্দি করে মান্দালয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল। ক্ষিপ্ত চিত্তরঞ্জন দাশ বললেন: ‘‘দেশকে ভালবাসা যদি অপরাধ হয়, তা হলে আমিও অপরাধী। সুভাষচন্দ্র বসু যদি অপরাধী হন, তবে আমিও অপরাধী।’’

১৯২৫-এর ১৬ জুন দার্জিলিঙে হঠাৎ মৃত্যু হল চিত্তরঞ্জন দাশের। মান্দালয় জেলে এই ভয়ানক দুঃসংবাদ পেয়ে ‘‘শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন’’ সুভাষচন্দ্র। কিন্তু শোকের মুহূর্তেও তিনি লিখলেন ‘‘কখনও কোনও দিন তাঁর জীবনী লেখা হবেই’’ এবং সেই জন্য সমস্ত দলিল সংগ্রহ করে রাখা দরকার। দুঃখের বিষয়, নেতাজির ক্ষেত্রে যে ভাবে কাগজপত্র ও ছবি সংগৃহীত হয়েছিল, দেশবন্ধুর ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। অবশ্য, কিছু কাগজপত্রের সন্ধান মিলেছে, বাসন্তী দেবীকে লেখা সুভাষচন্দ্রের চিঠিপত্র দিয়েই নেতাজি রিসার্চ বুরোর যাত্রা শুরু পঞ্চাশের দশকে।

নেতাজি নিজে দেশবন্ধুর উপর একটি দীর্ঘ মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন মান্দালয় জেলে ১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে। তিনি লিখেছিলেন: ‘‘ভারতের হিন্দু জননায়কদের মধ্যে দেশবন্ধুর মতো ইসলামের এত বড় বন্ধু আর কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি হিন্দুধর্মকে এত ভালবাসতেন যে তার জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত ছিলেন অথচ তাঁর মনের মধ্যে গোঁড়ামি আদৌ ছিল না।’’ চিত্তরঞ্জনের পথ ধরেই ভারতবর্ষের ধর্মীয় বিভিন্নতার বিষয়ে এই উদার মহানুভবতার আদর্শকে সুভাষচন্দ্র তাঁর নিজের রাজনীতিতে প্রতিফলিত করতে চাইলেন। নেতাজি শ্রদ্ধাভরে লিখলেন: ‘‘চিত্তরঞ্জনের জাতীয়তাবাদ পূর্ণতা লাভ করত আন্তর্জাতিক সংযোগের মধ্যে। কিন্তু সেই বিশ্বপ্রেমের জন্য নিজের দেশের প্রতি প্রেম তিনি বিসর্জন দেননি। আবার তার সঙ্গে এও ঠিক যে এই স্বজাতিপ্রেম তাঁর মধ্যে কোনও সঙ্কীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতাও তৈরি করেনি।’’ দেশবন্ধুর এই অপূর্ণ স্বপ্ন এবং আশার মধ্যেই তাঁর ‘‘সর্ববৃহৎ উত্তরাধিকার’’ খুঁজে পেলেন নেতাজি।

বাংলা আজ কোন পথে হাঁটতে চলেছে, বাংলাকেই তা ঠিক করতে হবে। হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ও সাম্যের ভিত্তিতে দেশবন্ধু ও নেতাজি একটি উদার দেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের পথ আলোকিত করেছিলেন। বাংলার দুই রাজনৈতিক পথপ্রদর্শকের সেই ঐতিহ্য কিন্তু সমস্ত সঙ্কীর্ণতাকে পরাস্ত করবার ক্ষমতা রাখে।

কতখানি রবীন্দ্র বিদ্বেষী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস …

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে বাঙালি যেভাবে মনে রেখেছে কবি, গল্পকার কিংবা প্রাবন্ধিক চিত্তরঞ্জন দাশকে বাংলা সাহিত্য সেভাবে জায়গা দেয় নি । রাজনীতিক চিত্তরঞ্জনের দেশবন্ধু পরিচয়টি পরবর্তীকালে অন্য সব পরিচয়কে ছাড়িয়ে গেলেও, চিত্তরঞ্জনের রাজনৈতিক জীবন ছিল মাত্র ছ’সাত বছরের। কিশোর বয়স থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। প্রেসিডেন্সি কলেজ জীবনে, বিলেতে, এমনকি দেশে ফেরার পর সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁর মন থাকত সাহিত্যচর্চায়। নির্মাল্য, মানসী প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হত।চিত্তরঞ্জন দাশের কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় নব্যভারত পত্রিকার ফাল্গুন ১২৯৫ সংখ্যায়। কবিতার নাম ‘বন্দী’। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মালঞ্চ’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ সালে, প্রকাশক ছিলেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি।

একটা সময় চিত্তরঞ্জন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির খামখেয়ালি ক্লাবের সভ্য ছিলেন। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, প্রমথ চৌধুরী, প্রমুখের সঙ্গে কেবল পরিচয় নয় তাদের সঙ্গে তিনি সাহিত্যপাঠ ও সংগীতচর্চায় অংশ নিতেন। চিত্তরঞ্জন যখন দ্বিতীয়বার বিলেত যান তখন চিত্তরঞ্জনের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ, ইয়েটস ও রদেনস্টাইনকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেদিন রবীন্দ্রনাথ ‘সোনার তরী’ কাব্য থেকে কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে চিত্তরঞ্জন দাশও তাঁর সাগর-সঙ্গীত-এর পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তবু বাংলা সাহিত্যে চিত্তরঞ্জন দাশের অবদান প্রসঙ্গে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে মূলত চিত্তরঞ্জন দাস সম্পাদিত পত্রিকা নারায়ণ-এর লেখকসুচিতে রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে চিত্তরঞ্জন দাসের রবীন্দ্র বিরোধিতা প্রসঙ্গের অবতারণায়।

চিত্তরঞ্জনকে রবীন্দ্র বিরোধী ভাবার যথেষ্ট কারণ অবশ্য ছিল। তখনকার প্রায় সব বিশিষ্ট লেখক নারায়ণ পত্রিকায় লিখতেন। নারায়ণ পত্রিকা লেখককে পারিশ্রমিকও দিত। লেখকদের তালিকায় ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, বিপিনচন্দ্র পাল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জলধর সেন প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট পরিচিত নাম হওয়া স্বত্বেও রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখাই নারায়ণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। বরং নারায়ণ একসময় রবীন্দ্র-বিরোধিতার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।নারায়ণের রবীন্দ্রবিরোধিতার পেছনে যে চিত্তরঞ্জন দাশের সায় ছিল তা বলাই বাহুল্য। পত্রিকার প্রায় প্রতি সংখ্যাতেই রবীন্দ্র-সমালোচনামূলক এক বা একাধিক রচনা প্রকাশিত হত।

রবীন্দ্রসাহিত্যের বিষয়ে বিপিনচন্দ্র পাল ওই সময় বাস্তবতার অভাব আছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। বিপিন পালের অভিযোগে পুরোপুরি সায় না দিলেও রবীন্দ্রসাহিত্য মূল্যায়নে চিত্তরঞ্জনের বক্তব্য ছিল বিপিন পালের মতোই। অথচ মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্যকেই চিত্তরঞ্জন খাঁটি বাংলা সাহিত্য বলে মনে করতেন। তার এই বক্তব্যের নমুনা মেলে তাঁর ‘বাঙ্গলার গীতিকবিতা’, ‘কবিতার কথা’, ‘রূপান্তরের কথা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে। চিত্তরঞ্জন বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি ও অন্যান্য যে কোনও কিছুতে পাশ্চাত্য প্রভাবকে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। যে কারণে তিনি পাশ্চাত্যের প্রভাব এড়িয়ে চলার কথা বলতেন। তিনি এ কথাও বলতেন, ব্রিটিশ এ দেশে আসার আগে পর্যন্ত বাঙালি জীবনের সবকিছুই ছিল ভালো। ব্রিটিশ শাসনের ফলেই এ দেশের সবকিছুতে পচন ধরে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, বিকৃতি দেখা দেয় এবং তা শেকড়বিচ্ছিন্ন ও বাস্তবসম্পর্কশূন্য হয়ে পড়ে।

কেবল জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই নয়, ধর্মচিন্তা, শিল্পনীতি-সহ আরও নানা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের মতের অমিল ছিল খুব স্পষ্ট। শিক্ষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আদান প্রদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে চিত্তরঞ্জন ‘আমাদের শিক্ষা-দীক্ষার কথা’য় লিখলেন: ‘বাঙ্গলার মাটিতে, বাঙ্গলার ভাষায় যে শিক্ষা সহজে দেওয়া যায় এবং যে শিক্ষা বাঙ্গালী তাহার স্বভাবগুণে সহজেই আয়ত্ত করে সেই শিক্ষাই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট’।চিত্তরঞ্জন পারিবারিক সূত্রে ব্রাক্ষ্ম হওয়া স্বত্বেও নিজের মেয়ের বিয়েতে হিন্দুরীতি পালন করায় ব্রাহ্মসমাজের নেতারা সে-বিবাহ অনুষ্ঠান বর্জন ও চিত্তরঞ্জনকে একঘরে করার চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু সেসব উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

চিত্তরঞ্জনও তাঁর বিরুদ্ধে রবীন্দ্রবিদ্বেষের অভিযোগ অস্বীকার করেন বলেছিলেনঃ ‘কথাটা ঠিক হল না, আমি রবিবিদ্বেষী একেবারেই নই, অলৌকিক প্রতিভা আমি কখনও অস্বীকার করি না, তবে তাঁর সব লেখাই যে ভাল লাগে তা বলতে পারি না’। তার মানে রবীন্দ্র-প্রতিভা নিয়ে চিত্তরঞ্জন দাসের কোনো প্রশ্ন ছিল না। দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য ছিল, তাই চিত্তরঞ্জন হয়ত নিজের অজান্তে রবীন্দ্রবিরোধী অবস্থান নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাতেও নারায়ণ পত্রিকায় রবীন্দ্রবিরোধী লেখা ছাপা হওয়ার পরও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের সৌহার্দ্য কিংবা সৌজন্যটায় কোনও ঘাটতি ছিল না। অন্তত দেশব্রতী চিত্তরঞ্জনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা কত গভীর ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুতে লেখা ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ।/মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’।

মৃত্যু:

১৯২৫ সালের ১৬ই জুন চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করেন। উদার মতবাদ ও দেশের প্রতি দরদের কারণে তিনি হিন্দু মুসলমান সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জন করেন এবং তার এই উদার মতবাদের জন্য জনগণ তাকে দেশবন্ধু খেতাবে ভূষিত করেন।

তার মৃত্যুর খবরে শোকার্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্বন্ধে বলেনঃ

এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ।
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।।

তথ্যসূত্র :

১. https://bangla.asianetnews.com/
২. https://bn.wikipedia.org/
৩. http://bn.banglapedia.org/
৪. https://www.anandabazar.com/