‘সাংগ্রাই জলোৎসব’ যেন পাহাড়ে এক মিলন মেলা
বাংলাদেশ

‘সাংগ্রাই জলোৎসব’ যেন পাহাড়ে এক মিলন মেলা

নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে পাহাড় অনুষ্ঠিত হলো মারমা জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় উৎসব ‘সাংগ্রাই জলোৎসব’। মারমা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বুধবার শুরু হবে তাদের নতুন বছর। নতুন বছর শুরুর প্রাক্কালে পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্টকে বিদায় দিতে সাংগ্রাই জলোৎসবে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতেছেন পাহাড়ের মারমারা।

ঐতিহ্যবাহী ঘণ্টা বাজাতেই শুরু হয় সাংগ্রাইয়ের জলোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দুই দলে ভাগ হয়ে জলকেলিতে মেতে ওঠেন মারমা তরুণ-তরুণীরা। পাহাড়ে বৈসাবির অন্যতম আকর্ষণ এই জলকেলি। বলা হয়, পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে-মুছে অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম এই মৈত্রী পানিবর্ষণ। তাই এই উৎসবকে ঘিরে মঙ্গলবার প্রাণের মেলা বসে রাঙামাটির চিং হ্লা মারি স্টেডিয়ামে।

এবারও উৎসবের আয়োজক মারমা সংস্কৃতি সংস্থা। পাহাড়ের তিন জেলার নানা বয়সী হাজারো মানুষ একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে মেতেছিলেন বর্ণিল এই উৎসবে। উৎসব দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করেন বহু পর্যটক। ফলে উৎসব পরিণত হয় সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায়।

‘আমাদের সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়’ এই স্লোগানে জলোৎসবে মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, গেস্ট অব অনার ছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার।

এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন– সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য জ্বরতি তঞ্চঙ্গ্যা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ, রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোহেল আহমেদ, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এই উৎসব উপভোগ করতে বহু পর্যটকরা হাজির হন।

উৎসব অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীরা জানান, এই পানি খেলার মাধ্যমে পুরনো বছরের সব কষ্ট দুঃখ ধুয়ে-মুছে যাবে। আগামী নতুন বছর যাতে সবার ভালো কাটে এই প্রত্যাশা সবার।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘বৈসাবি উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটি শুধু সাংস্কৃতিক উৎসবই নয়, এর সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিও জড়িত। তাই এটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবও।

তিনি আরও বলেন, ‘জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন সব ভাষাভাষী ও সব ধর্মের লোক সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করবে। তারই সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।’ দেশের কল্যাণে সবাইকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের এই সম্প্রীতির বন্ধন ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী সবাই মিলেমিশে এই যে উৎসব পালন করি, সেটিই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, ‘পুরনো বছরের যে দীনতা, হীনতা, গ্লানি যাতে নতুন বছরে আমাদের স্পর্শ না করে, আমরা যাতে আবারও পাক-পবিত্র হয়ে উঠতে পারি, পরস্পরের প্রতি যাতে আমাদের আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায় সে লক্ষ্যে সাংগ্রাইয়ের জলোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।’

মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিবছর এই আয়োজন। সাংগ্রাই উৎসবের মাধ্যমে মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পারে।’

আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা  ‘মগ’ ঘণ্টা বাজিয়ে জলকেলি উদ্বোধন করেন। এরপর সবাই সব অবসাদ দূর করতে একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেন। জলকেলি অনুষ্ঠানের পর মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচ পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে আগত কয়েক হাজার মারমা নারী-পুরুষ একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে এ উৎসব পালন করেন।

 

Source link

Related posts

অবরোধে কক্সবাজারে পর্যটন ব্যবসায় ধস, ক্ষতি হাজার কোটি টাকা

News Desk

শিশু মুনতাহা হত্যার ঘটনায় মা-মেয়ে ও নাতনি আটক

News Desk

পড়াশোনার পাশাপাশি ডাকাতি

News Desk

Leave a Comment