১৬ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, অবহেলায় ঝরলো ৯ প্রাণ
বাংলাদেশ

১৬ বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, অবহেলায় ঝরলো ৯ প্রাণ

বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় বরগুনায় চাওড়া নদীর ওপর ব্রিজ ভেঙে একটি মাইক্রোবাস ও ইজিবাইক পানিতে ডুবে যায়। এতে একই পরিবারের সাত জনসহ প্রাণ হারান ৯ জন। বরগুনার আমতলী উপজেলার ৫ নম্বর চাওড়া ইউনিয়ন এবং ৪ নম্বর হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া হাট সেতুটির গত ১৬ বছরেও সংস্কার হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, কর্তৃপক্ষের অবহেলাতেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে দায় এড়িয়ে এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী বলছেন, ব্রিজটিতে ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড লাগানো ছিল, যাত্রীদের এর গুরুত্ব বোঝা উচিত ছিল। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হালকা যান চলাচলের জন্য ৮৫ মিটার দৈর্ঘ্যের হলদিয়া হাট সেতুটি নির্মাণের জন্য ২০০৮ সালের ৩১ অক্টোবর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সেতুটি নির্মাণের ৫ বছরের মধ্যেই এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছরে সেতুটির আর কোনও সংস্কার কাজ করা হয়নি। ঝুঁকি এড়াতে সেতুর পাশে গাছের সঙ্গে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লেখা একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সেতুটি নির্মাণের সময়েই অনিয়ম করা হয়েছে। নিম্নমানের মালামাল দিয়ে সেতুটি নির্মাণের ফলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও কোনও সংস্কার না করে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড দিয়ে দায়সারা কাজ করে কর্তৃপক্ষ। তাদের এ গাফিলতির কারণেই এ প্রাণহানি ঘটেছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণের মাত্র ১৫ থেকে ১৬ বছর সময় পার হলেও সেতুটি দেখে মনে হয় বহু পুরোনো। সেতুর কয়েকটি জায়গায় ভেঙে আছে দুই পাশের রেলিং। এ ছাড়া মরিচা ধরে সেতুর পিলারের অবস্থাও বেহাল।

হলদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণের সময় অনিয়ম করা হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেতুতে অনিয়ম না হলে এমন ঘটনা ঘটতো না। আমাদের এ ইউনিয়নে আরও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ সেতু আছে, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা দরকার। নইলে আবার ঘটে যেতে পারে এমন দুর্ঘটনা।’

হলদিয়া ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণের পর থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ছিল। নিম্নমানের মালামাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেতুটি। সে সময় স্থানীয়রা অনিয়মের অভিযোগ তুললেও তা আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। যার ফলে সেতু ভেঙে ৯ জনের প্রাণ গেলো। আমতলীর ইতিহাসে এটি একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা।’

খোকন মিয়া নামে স্থানীয় আরেক যুবক বলেন, সেতুটি নির্মাণের সময় কাজে অনেক অনিয়মের অভিযোগ দিয়েও লাভ হয়নি, কারণ তখন ঠিকাদার নিজেই এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। কর্তৃপক্ষ সেসময় বিষয়টি আমলে নিলে আজকের এমন দুর্ঘটনা হতো না। 

এসময় তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার দিন আমরা এই ঠিকাদারের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ মিছিলও করেছি। সেদিন এমপি মহোদয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন এর সুষ্ঠু তদন্ত করে সঠিক বিচার করবেন।

হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান মিন্টু মল্লিক বলেন, ‘ব্রিজ নির্মাণকালে ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মৃধা দায়সারা ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। ফলে নির্মাণের অল্পদিনের মধ্যেই ব্রিজের মাঝখানের বিম ভেঙে গেছে। ওই ভাঙ্গা ব্রিজ দিয়ে অন্তত অর্ধলাখ মানুষ চলাচল করতো। যদি এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে সংস্কারে কাজ করতো, তাহলে আজকের এমন দুর্ঘটনা ঘটতো না।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মৃধা বলেন, ‘আমি যথাযথভাবেই সেতু নির্মাণ করেছি। নির্মাণকাজে কোনও অনিয়ম করিনি।’

সেতুটি নির্মাণের ৫ বছরের মধ্যেই এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়

চাঞ্চল্যকর এ দুর্ঘটনার পর সেতুটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হওয়ার দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এলজিইডির আমতলী উপজেলা প্রকৌশলী  আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ‘আমতলীতে আমার যোগ দেওয়ার আগেই এই ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে যতটা জেনেছি ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ফুট ব্রিজ প্রকল্পের অধীনে এই ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে যানবাহন চলাচলে আমরা বিধিনিষেধ আরোপ করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর যাত্রী বোঝাই মাইক্রোবাস নিয়ে ব্রিজটিতে ওঠায় এর লোড সইতে না পেরে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের সাইনবোর্ডের গুরুত্ব বোঝা উচিত ছিল।’

উল্লেখ্য যে, আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের মাসুম বিল্লাহর মেয়ে হুমায়রা আক্তারের সঙ্গে গত শুক্রবার (২১ জুন) আমতলী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিম মাহমুদের ছেলে সাইদুন রহমান সোহাগের বিয়ে হয়। শনিবার (২২ জুন) দুপুরে বরের বাড়িতে বৌ-ভাত অনুষ্ঠান ছিল। কনের পক্ষের লোকজন মাইক্রোবাস ও একটি ইজিবাইকে বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সেদিন বেলা দেড়টার দিকে মাইক্রোবাস ও ইজিবাইকটি দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া-হলদিয়ার হাট এলাকায় চাওড়া নদীর ওপর সেতু পার হচ্ছিল। মাঝামাঝি আসতেই সেতুটি ভেঙে গেলে এতে মাইক্রোবাস ও ইজিবাইকটি নদীতে ডুবে যায়।

এ সময় ইজিবাইকে থাকা যাত্রীরা সাঁতরে কিনারে উঠতে পারলেও মাইক্রোবাসের যাত্রীরা নদীতে তলিয়ে যান। তাৎক্ষণিক স্থানীয় লোকজন ওই মাইক্রোবাসে থাকা লোকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। খবর পেয়ে আমতলী উপজেলা সদর থেকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের দুটি দল দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। পরে মাইক্রোবাসে থাকা কনেপক্ষের ৯ জন যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন:

বিয়েতে যাওয়ার পথে মাইক্রোবাস খালে, সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

Source link

Related posts

খুলনা করোনায় আরও ৫ জনের মৃত্যু

News Desk

একরাতেই ৪ সন্তানের মৃত্যু, শোকসাগরে পরিবার

News Desk

মুরাদ হত্যা মামলায় যুবক গ্রেপ্তার, ২ দিনের রিমান্ড

News Desk

Leave a Comment