free hit counter
বাংলাদেশ

১৩১ মৃত্যুর পরও ৫০০ পরিবারের বসতি

বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছরই পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকে। এরপরও বন্ধ হয়নি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পাহাড় ধসে যেখানে ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল; সেখানে গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক বসতি। 

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, শহরের ৩১টি পয়েন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বসতি স্থাপন বন্ধে সমন্বয়ের কথা বলছে সুশীল সমাজ। আর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন বন্ধে লোকবলের সংকটের কথা স্বীকার করে সবার সহযোগিতা চাইলেন জেলা প্রশাসক।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চার হাজার পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার লোকজন পাহাড়ের পাদদেশে বসতি গড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। পাহাড়ের এমন কোনও স্থান ফাঁকা নেই, যেখানে বসতি নেই। পাহাড়ের ঢালে, ওপরে-নিচে ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে ভবন। একই চিত্র শহরের শিমুলতলী, রূপনগর, সনাতন পাড়া, যুব উন্নয়ন ও রাঙাপানি এলাকায়। ভারী বর্ষণে এসব এলাকায় ঘটতে পারে পাহাড়ে ধসের ঘটনা। 

স্থানীয়দের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় আরও পাঁচ শতাধিক পরিবার বসতি স্থাপন করেছে। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছে পরিবারগুলো। অথচ রাঙামাটিতে ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে ১২০ ও ২০১৮ সালে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

কিন্তু মৃত্যুর কথা জেনেও একই স্থানে এসব বসতি গড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষজন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নাগরিক সুবিধা বেড়ে যাওয়ায় বসতি নির্মাণে আগ্রহ বেড়েছে তাদের। ঝুঁকি জেনেও বসতি ছাড়তে রাজি নন তারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড় ধসে প্রাণহানির পর সাময়িক দৌড়ঝাঁপ ও তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপের কথা জানায় জেলা প্রশাসন। পরে সংশ্লিষ্টরা সবকিছু ভুলে যান। এভাবে চলতে থাকলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি, পরিবেশ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে না। পাহাড় ধস ও প্রাণহানি রোধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

শহরের ৩১টি পয়েন্টকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে

শহরের সনাতন পাড়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দা মো. সেলিম মিয়া বলেন, ‘শুক্রবার রাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। আমার বাড়ির কিছু মাটি সরে গেছে। রাত থেকে প্রশাসনের লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করছেন। আরও বেশি বৃষ্টিপাত হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবো। এখন গিয়ে কি হবে? দেখি বৃষ্টিপাত থামে কিনা, না থামলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবো সবাই।’

শিমুলতলী এলাকায় পাহাড়ে বসবাসকারী মো. রবিউল হোসেন বলেন, ‘আমি এই এলাকার পাহাড়ে ২০১৯ সালে জায়গা কিনে বসতি গড়ে বসবাস করছি। এখানে আসার পর থেকে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেনি। এর আগে হয়েছিল। তবে বেশি বৃষ্টিপাত হলে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাই। এখানে সবাই পাহাড়ের জায়গা কিনে বসবাস করছেন। সবাই গরিব মানুষ। অন্যত্র থাকার জায়গা না থাকায় এখানে থাকি আমরা।’

রূপনগর এলাকায় পাহাড়ে বসবাসকারী মো. মোস্তফা মিয়া বলেন, ‘সরকার যদি রোহিঙ্গাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে আমাদের জন্য কেন ব্যবস্থা করছে না। এই এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হলে ঝুঁকিমুক্ত এলাকায় আমাদের নিয়ে যাক সরকার। আমরা এত অনিরাপদে থাকতে চাই না। যাওয়ার জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি।’

পাহাড়ের এমন কোনও স্থান ফাঁকা নেই, যেখানে বসতি নেই

যুব উন্নয়ন এলাকায় পাহাড়ে বসবাসকারী মো. মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘সারা বছর প্রশাসনের কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসে না। বর্ষা এবং বৃষ্টিপাত শুরু হলেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলে। বৃষ্টি শেষ হলেই প্রশাসনের লোকজনের কাজ শেষ। বছরের পর বছর ঝুঁকি নিয়ে আমাদের থাকতে হয়।’

এদিকে, টানা বর্ষণে ধসের আশঙ্কা থাকায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। এরপরও পাহাড়ের বাসিন্দারা বসতি ছাড়ছেন না। 

পাহাড়ের ঢালে, ওপরে-নিচে ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে ভবন

পাহাড়ে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে শনিবার বিকাল থেকে জেলা প্রশাসনের চারটি টিম কাজ শুরু করবে। প্রয়োজনে তাদেরকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের সরিয়ে নিতে নিকটস্থ এলাকায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অনেক চেষ্টা ও উদ্যোগ নিয়েও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন বন্ধ করা যাচ্ছে না। লোকবল সংকটের কারণে সবসময় অভিযান চালানো যায় না। এজন্য নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠছে।’

Source link