Image default
বাংলাদেশ

হাসপাতালে সিন্ডিকেট, জিম্মি রোগীরা

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ভর্তি রোগী হাঁটতে অক্ষম হলে দরকার হয় হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচার। কিন্তু সিন্ডিকেটের হাতে টাকা না দিলে তা যেন সোনার হরিণ। এ ছাড়া নাকে নল বা ক্যাথিডার পরানো, অক্সিজেন নল লাগানো, বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও রয়েছে সিন্ডিকেট। আবার চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে রোগী বাড়ি ফিরতে দরকার ছাড়পত্র। সেটাও দখলে নিয়েছে সরকারি হাসপাতালে গড়ে ওঠা অবৈধ এই চক্র।

দীর্ঘদিন ধরে এসব সিন্ডিকেটকে টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে জানিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছেন খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী ও তাদের স্বজনরা।

অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সিন্ডিকেট নজরদারিতে নেওয়া হবে। গত সাত মাস হাসপাতালের উপপরিচালকের পদ শূন্য। তাই এত কিছু নজরদারি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখন থেকে এসব বিষয়েও নজর দেওয়া হবে।

এমনিতেই ৫০০ শয্যার খুমেক হাসপাতালে তিন গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়। ফলে ওয়ার্ড বা হাসপাতালের বারান্দা বা চলাচলের পথ সবখানেই রোগীতে সয়লাব। এ অবস্থায় রোগীর চাপে রোগীরাই পড়ছে দুর্ভোগে। কিন্তু হাসপাতালের যত সিন্ডিকেট রোগীর দুর্ভোগকে বাড়িয়ে তোলে দ্বিগুণ।

অভিযোগ আছে, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা সিন্ডিকেট। হাসপাতালে পরীক্ষার বিভিন্ন স্যাম্পল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা রয়েছে চরম পর্যায়ে। চিকিৎসকরা বিভিন্ন প্যাথলজির প্রতিনিধির মোবাইল নম্বর লিখে দিয়ে থাকেন। ভর্তি রোগী ছাড়পত্র হাতে পেতে ১০০ টাকা হারে দিতে হয়। ভর্তি হওয়ার পর রোগীর বিভিন্ন সেবা প্রদানের (হুইলচেয়ার, স্ট্রেচারে করে ওয়ার্ডে নেওয়া, রোগীর নাকে নল পরানো, রোগীকে অক্সিজেন সাপোর্ট পাইপ সেট করা, রোগীকে পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিতে আনা-নেওয়া করা ইত্যাদি) ক্ষেত্রে অর্থ আদায় করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

আরও জানা গেছে, অসুস্থ রোগীকে নাকে নল পরানো লাগলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হয়। অক্সিজেন পাইপ সেট করতে হলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাগে। ক্যাথিডার পরাতে হলে দিতে হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। প্রতিটি ওয়ার্ডেই একটি করে হুইলচেয়ার আর স্ট্রেচার চলন্ত বেঞ্চ থাকে। এগুলো পেতে হলে গুনতে হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

এমন অভিযোগ করে হাসপাতালের ভর্তি রোগীর স্ত্রী ঝর্ণা বেগম বলেন, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালের প্যাথলজিতে পরীক্ষার জন্য নিতে হলে হুইলচেয়ার দরকার হয়। তা নিতে গেলে সময় হিসাব করে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা দিতে হয়। ভর্তির সময়ও অসুস্থ রোগীকে ৪ তলার ওয়ার্ড পর্যন্ত নিতে আয়াকে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। ৫০ টাকা দিলে তিনি তা ছুড়ে ফেলে দেন।

অপর এক রোগীর ভাই আজমল হুদা বলেন, এখানে বাইরের বিভিন্ন নামী প্যাথলজির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। ডাক্তাররা পরীক্ষা লেখার সময় ওই প্রতিনিধির মোবাইল নম্বর লিখে দেন। তাকে কল করলে রোগীর স্যাম্পল নিয়ে যান। আবার মেডিক্যাল প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ এখন হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অবস্থান করেন। ডাক্তার নিয়মিত রাউন্ড শেষে কোন রোগীর জন্য কোন ওষুধ লিখলেন, তা ওই প্রতিনিধিরা জানতে ব্যাকুল হয়ে থাকেন। কাগজ কেড়ে নেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকসহ লোকবল সংকট রয়েছে। এ কারণে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ রোগীরা। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা পাচ্ছে না তাদের চাহিদামতো সেবা। আর চলাচলের পথে হাসপাতালে রোগী অবস্থান নেওয়ায় রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। রোগীর চাপ বেশি থাকায় হাসপাতালের প্যাথলজিতে প্রতিদিনের রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো সম্ভব হয় না। ফলে পরীক্ষা করা না হলে ওই রোগীর কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে জটিলতা দেখা দেয়।

হাসপাতালে ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে, ব্লাড ব্যাংকের সামনের বারান্দা; দুই, তিন ও চার তলায় লিফটের সামনেও শুয়ে আছে অসংখ্য রোগী। ফাঁকা নেই কোনও মেঝে-বারান্দাও। হাসপাতালের বিছানা না থাকায় কাঁথা কিংবা মাদুরের ওপর শুয়ে আছে রোগীরা। মাঝখানের এক-দেড় ফুট খালি জায়গা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোগীর স্বজন ও হাসপাতালের লোকজন।

ভর্তি রোগী বাগেরহাটের মঈন ইসলাম বলেন, জ্বর দেখা দিলে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ওই হাসপাতাল থেকে খুলনায় পাঠানো হয়। শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি হই। তবে সিট পাইনি। অনেক ঘুরে মেঝেতে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়েই মাদুর বিছিয়ে ও মশারি টাঙিয়ে অবস্থান নিয়েছি। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখছেন। প্যারাসিটামল দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, গত ১৫ জুলাই এ হাসপাতালে ১ হাজার ৫৫৬ জন রোগী ভর্তি হয়। আর ১৬ জুলাই এখানে ভর্তি হয় ১ হাজার ৬৫৫ রোগী।

ডা. সুহাস রঞ্জন বলেন, হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এত রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যাসংখ্যার অতিরিক্ত হাজারেরও বেশি রোগী রয়েছে মেঝেতে। তাদের শয্যা দিতে না পারাটা অমানবিক। কিন্তু কিছুই করার নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের চিকিৎসাসেবা ভালো। বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় অসচ্ছল রোগীরা এখানে ভর্তি হচ্ছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরাও এ হাসপাতালে আসছে। তাই সাধারণ অসুখ হলে আশপাশের সরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ৫০০ শয্যার জন্য চিকিৎসকের পদ ৩০০টি, কিন্তু এর মধ্যে ৯২টি পদ শূন্য। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল কাঠামো এখনও ২৫০ শয্যার হিসেবে রয়েছে। সেখানেও ২২৬টি পদের মধ্যে ১৪৪টি শূন্য। এ ছাড়া নার্সের ৯টি পদ শূন্য।

তবে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান বলেন, এই হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট নেই। ৫০০ বেডের জন্য চিকিৎসক রয়েছে। সংকট আছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর। রোগীকে চলাচলের পথে অবস্থান নিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। ফলে এত রোগীর কারণে রোগীদেরই কষ্ট পেতে হচ্ছে। আর ছাড়পত্রের সময় টাকা নেওয়া অযৌক্তিক। অন্যান্য সিন্ডিকেট নজরদারিতে নেওয়া হবে। গত সাত মাস হাসপাতালের উপপরিচালকের পদ শূন্য। তাই তার একার পক্ষে এত কিছু নজরদারি করা হয়ে ওঠেনি। এখন থেকে তিনি এ বিষয়েও নজর দেবেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। চিকিৎসকরা রোগী দেখে ওষুধ দিয়ে যান। মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় নার্সদের। তারা সচেষ্ট থেকে সেবা দিচ্ছেন।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও বিএমএ খুলনার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মেহেদি নেওয়াজ বলেন, খুমেক ৫০০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকার কথা, সেখানে রোগী আছে ১ হাজার ৫৫৬। তা ছাড়া আউটডোরে প্রতিদিন প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এত পরিমাণ রোগীকে ৫০০ বেডের জনবল দিয়েই সেবা দিতে হচ্ছে। সে কারণেই রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা বঞ্চিত হন। তবে স্বল্প চিকিৎসক দিয়েও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

Source link

Related posts

বাজারে এসেছে সাতক্ষীরার ‘হিমসাগর’

News Desk

ছেলে বীরকে নিয়ে নায়িকা বুবলীর স্ট্যাটাস ভাইরাল

News Desk

নোয়াখালী ২৪ ঘণ্টায় করোনায় দুজনের মৃত্যু, শনাক্ত ১৯৭

News Desk

Leave a Comment