free hit counter
বাংলাদেশ

সড়কে মা-বাবাকে হারিয়ে অথই সাগরে ৩ শিশুসন্তান

‘জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মা-বাবা ও বোনকে হারিয়েছে। ভাগ্যে জোটেনি মায়ের দুধ। আমরা দাদা-দাদি দুজনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। এখন কীভাবে অসহায় নবজাতক ও তার ভাইবোনকে লালন-পালন করবো, এ নিয়ে চিন্তায় ঘুম আসে না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করে কথাগুলো বললেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জন্ম নেওয়া শিশুটির দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু। 

 

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অনেক আনন্দ করে ২০১০ সালে পাশের গ্রামের রত্না বেগমের সঙ্গে ছেলে জাহাঙ্গীরের বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের দুই বছরের মাথায় জন্ম নেয় প্রথম সন্তান জান্নাতুল ফেরদৌসী। এর তিন বছর পর ছেলে এবাদত জন্ম নেয়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেয় তৃতীয় সন্তান সানজিদা। শ্রমিকের কাজ করে পুরো সংসারটা অনেক কষ্ট করে জাহাঙ্গীর চালিয়েছে। অভাব-অনটন আর টানাটানির সংসারের মধ্যে তিন সন্তানের জন্মের পর পুত্রবধূ রত্না আবারও অন্তঃসত্ত্বা হয়। সেদিন আলট্রাসনোগ্রাম করার জন্য আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্নাকে নিয়ে ক্লিনিকে যায় জাহাঙ্গীর। সঙ্গে ছিল তাদের আড়াই বছরের শিশুসন্তান সানজিদা। এই যাওয়াই শেষ যাওয়া হলো। বাড়িতে ফিরলো তিন জন লাশ হয়ে। আর দুর্ঘটনাস্থলে সড়কেই জন্ম নিলো মায়ের গর্ভ থেকে ফুটফুটে মেয়েশিশুটি।’ 

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দাদা-দাদি দুজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। নিজেরাই ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। নবজাতক শিশু, তার ভাইবোনকে কীভাবে আমরা বড় করে তুলবো? জন্মের পর মা মারা যাওয়ায় আমার দুর্ভাগা নাতনি মায়ের দুধ পান করতে পারেনি। জন্মের সময় বড় ধরনের চোট এবং মায়ের দুধ পান করতে না পারায় শারীরিক অসুস্থতা কাটছে না তার। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।’ 

 

নবজাতকের দাদি সুফিয়া আক্তার বলেন, ‘অনাথ শিশুটির আপন বলতে এখন বেঁচে আছি আমরা দুজন (দাদা-দাদি) এবং তার বড় বোন জান্নাত ও ভাই ইবাদত। মা-বাবাকে হারিয়ে তিন শিশু এখন অথই সাগরে ভাসছে। অভাব-অনটনের সংসারে তিন শিশুকে এখন লালন-পালন করা সম্ভব হবে না। তাদের লালন-পালনের ব্যয়ভার বহনে সরকার এবং বিভিন্ন মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় কিছুটা আসার আলো দেখতে পাচ্ছি।’

 

 

‘নবজাতককে দত্তক দেওয়া হবে না’ জানিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিশুটি লালন-পালনের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। অনেক মানুষ সহায়তার  প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকার এবং মানুষের সহযোগিতা নিয়ে কষ্ট হলেও নবজাতককে আমরাই লালন-পালন করবো।

 

নবজাতক শিশুটির ভাইবোন কেমন আছে জানতে চাইলে দাদা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তারা এখন আমাদের কাছেই আছে। তাদের দেখাশোনার জন্য অনেকে সহায়তা দিচ্ছে। তাদের খাবার-দাবার ও যাবতীয় চাওয়া পূরণ করা হচ্ছে। আদর-যত্ন দিয়ে বাবা-মায়ের কথা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছি আমরা। জান্নাতুল ফেরদৌসী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো। এবাদত স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ইতোমধ্যে তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ত্রিশালের রাইমনি গ্রামের ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম শিফন শনিবার দুপুরে স্থানীয় আনোয়ারা কিন্ডারগার্টেনে জান্নাতুল ফেরদৌসীকে চতুর্থ শ্রেণিতে এবং এবাদততে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েছেন। তাদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন ব্যবসায়ী শিপন।’ 

 

 

এ বিষয়ে শরিফুল ইসলাম শিপন বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলম আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের কাজ করেছেন। বিপদে-আপদে সবসময় পাশে ছিলাম। আজ জাহাঙ্গীর নেই, এজন্য তার সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছি।’

 

প্রতিবেশীরা জানান, জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। তার আয় দিয়ে চলতো বাবা-মা এবং স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ। 

 

জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিবেশী খায়রুল ইসলাম বলেন, জাহাঙ্গীর কর্মঠ ছিলেন। তার আয়ে সংসার চলতো। সন্তানদের খুবই ভালোবাসতেন। হাজার কষ্ট হলেও সন্তানদের চাওয়া পূরণ করতেন। আজ জাহাঙ্গীর নেই। তাই এলাকার মানুষ তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। অনেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

 

 

প্রতিবেশী কমলা বেগম বলেন, জাহাঙ্গীর তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রত্না বাড়িতে হাঁস-মুরগি লালন পালন করতো। বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি চাষ করে সংসারের অভাব মেটাতো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে রত্নার ভালো সম্পর্ক ছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় তিন জন নিহত হওয়ায় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেছে।

 

এদিকে, নবজাতক শিশু ও তার ভাইবোনকে লালন-পালনের খরচ জোগাতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সোনালি ব্যাংকে যৌথ একটি হিসাব খোলা হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত ওই যৌথ হিসাবে এক লাখ ২৯ হাজার টাকা সহায়তা জমা পড়েছে।

 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নবজাতকের বোন জান্নাতুল ও ভাই এবাদত কিছুতেই বাবা-মার কথা ভুলতে পারছে না। তারা প্রায়ই মা-বাবার কবরের পাশে কান্নাকাটি করে।

 

 

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‌‘নবজাতক শিশুটির জন্ডিস ভালো হয়েছে। তবে এখনও কিছুটা শ্বাসকষ্ট রয়েছে। শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’ 

 

হাইকোর্টে রিট

 

ট্রাকের চাপায় গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা শিশুটির জীবনযাপনের সারা জীবনের খরচ রাষ্ট্র করবে, এমন নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। ওই ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসাইন এ রিট করেন।

 

এরপর শিশুটির জন্য আপাতত পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তাকে দেখাশোনার জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ সংক্রান্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১৯ জুলাই বিচারপতি খিজির হায়াত ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসাইন।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা শিশুটির দেখভাল করছেন

 

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে ট্রাস্টি বোর্ডকে এ পাঁচ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ওই কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে।

 

 

এর আগে ১৬ জুলাই আল্ট্রাসনোগ্রাম করার জন্য ত্রিশালের পৌর এলাকায় যান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম (২৬)। সঙ্গে ছিলেন স্বামী ও মেয়ে। ওই দিন দুপুরে ত্রিশালের পৌর এলাকার দড়িরামপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পার হওয়ার সময় ময়মনসিংহগামী মালবাহী একটি ট্রাক তাদের চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন জন।

 

নিহতরা হলেন— ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৩৫), তার স্ত্রী রত্না বেগম (২৬) ও আড়াই বছরের মেয়ে জান্নাত আরা। ট্রাকের চাপায় রত্নার গর্ভে থাকা সন্তান বের হয়ে আসে। মর্মান্তিকভাবে জন্ম নেওয়া শিশুটির অবস্থাও আশঙ্কাজনক ছিল। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে শিশুটি সুস্থ আছে।

 

Source link