free hit counter
বাংলাদেশ

স্বপ্ন দেখাচ্ছে ভেনামি চিংড়ি

চিংড়ি শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে ভেনামি চিংড়ি। গলদা বাগদার চরম সংকটের সময় ভেনামি দেখাচ্ছে আশার আলো।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, রফতানির স্বার্থে বিএফএফইএ’র সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান এমইউ সি ফুডস লি. যশোর ২০-২১ অর্থবছরে বিএফআরআইয়ের লোনা পানি কেন্দ্র পাইকগাছায় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম পাইলট প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের নির্বাচিত পুকুরে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ ভেনামির পোনা অবমুক্ত এবং ওই বছরের ১ জুলাই আহরণ (হারভেস্ট) করে। সেখানে প্রতি হেক্টরে উৎপাদিত হয় ৮ হাজার ৬২০ কেজি। মৎস্য অধিদফতরের তথ্যমতে যা খুবই সন্তোষজনক। এরপর সর্বশেষ চলতি বছরের ৫ আগস্ট ওই চিংড়ি আহরণ করা হয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিএফআরআই মহাপরিচালক আরও জানান, বর্তমানে চিংড়ির বিশ্ববাজার প্রায় ৭২ শতাংশ ভেনামির দখলে। বাকি ২৮ শতাংশ নিয়ে অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করতে হয়। বাংলাদেশে ভেনামির বাণিজ্যিক চাষ শুরু না হলেও কেবল পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে। বাগদা ও গলদার উৎপাদন খরচ ভেনামির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কম মূল্যের ভেনামির সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এ ছাড়া লোকসান দিয়ে ভেনামি চিংড়ির মূল্যেই রফতানি করতে হয় বাগদা ও গলদা।

পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের ইনচার্জ ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. লতিফুল ইসলাম জানান, দেশি প্রজাতির বাগদা ও গলদার উৎপাদন ক্রমশ নিম্নমুখী হওয়ায় রফতানির পরিমাণও নিম্নমুখী। চিংড়ি রফতানি শিল্পের প্রধান সমস্যা হলো কাঁচামালের স্বল্পতা। বর্তমান সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন একরপ্রতি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কেজি। আর ভেনামির উৎপাদন একরপ্রতি সর্বনিম্ন ৫ হাজার কেজি।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল জানান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদফতরের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং চাষ প্রবর্তনে দ্বিতীয়বারের মতো খুলনার পাইকগাছার লোনা পানি গবেষণা কেন্দ্রের ছয়টি পুকুরে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়েছে ভেনামি চিংড়ি। প্রকল্পের ধারাবাহিক সফলতা ফুটে উঠেছে ভেনামি চিংড়ি আহরণে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, ‘খুলনার পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্র বিএফআরআইয়ের ছয়টি পুকুরে (৬.৯ একর বা ২.৪ হেক্টর আয়তন) গড়ে তোলা হয়েছে পাইলট প্রকল্প। যেখানে পিএল মজুত থেকে এক বছর পর্যন্ত প্রকল্পের স্থায়ীকাল ধরা হয়েছে।’

বিএফএফইএ’র হুমায়ূন কবির বলেন, ‘বিশ্বে প্রতি মুহূর্তে ভেনামির উৎপাদন, চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু এশিয়াতে ২০১৯ সালে ভেনামি উৎপাদিত হয় ৩১ লাখ ১২ হাজার ১৭০ কেজি। যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শূন্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের চিংড়ি উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাতকৃত রফতানিকারক কারখানার সংখ্যা বেশি। ফলে এ খাতের কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতার ১২-১৫%-এর বেশি কখনও ব্যবহার করতে পারেনি। কারখানাগুলোর কাঁচামালের সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে দেশীয় বাগদার পাশাপাশি অধিক উৎপাদনশীল ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই।’

মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক খন্দকার মাহাবুবুল হক জানান, ‘রফতানিকারকদের দাবির মুখে সরকারের মৎস্য অধিদফতর সর্বপ্রথম থাইল্যান্ড থেকে ভেনামি প্রজাতির চিংড়ির পোনা আমদানি করে খুলনা অঞ্চলের আটটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমতি দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, এমইউসি ফুডস, ফাহিম সি ফুডস, গ্রোটেক অ্যাকোয়াকালচার লিমিটেড, রেডিয়েন্ট শ্রিম্প কালচার, আইয়ান শ্রিম্প কালচার, ইএফজি অ্যাকোয়া ফার্মিং, জেবিএস ফুড প্রডাক্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও প্রান্তি অ্যাকোয়া কালচার লিমিটেড। এ ছাড়াও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে সাতক্ষীরার দেবহাটার আলহেরা মৎস্য প্রকল্প, খুলনার রূপসার ফ্রেশ ফুডস লিমিটেড, জেমিনি সি ফুডস লিমিটেড এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের নলতা আহসানিয়া ফিশ লিমিটেড। অবকাঠামো সংস্কার হলে দ্রুত তাদেরও ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এ ছাড়াও কক্সবাজারের আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চ ফলনশীল ভেনামি জাতের চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষের অনুমতি দেওয়া হয় কক্সবাজারের অ্যাগ্রি বিজনেস এবং সাতক্ষীরার এনজিও সুশীলনকে। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের অ্যাগ্রি বিজনেস ব্যর্থ হলেও সুশীলনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্ব নেয় যশোর বিসিক শিল্পনগরীর এমইউ সি ফুডস। ওই বছরের ৩১ মার্চ থাইল্যান্ড থেকে তারা ভেনামি চিংড়ির আট লাখ রেণু আমদানি করে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনস্থ লোনা পানি কেন্দ্রের চারটি পুকুরে অবমুক্ত করে এর পাইলট প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। শুরুটা আলোর মুখ দেখায় ২০-২১ অর্থবছরের ১০ মে রাতে একই পদ্ধতিতে তারা আরও ১২ লাখ পোনা আমদানি করে পরীক্ষামূলক প্রকল্প অব্যাহত রাখে।

চলতি ২১-২২ অর্থবছরে চিংড়ির বেড়ে ওঠা এবং রোগবালাই অনুসন্ধানে নমুনা পরীক্ষায় মনে করা হয়, ভেনামির রোগ প্রতিরোধ এবং জীবনধারণ ক্ষমতা বাগদার তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোনা ছাড়ার পর থেকে সাত সপ্তাহ পর্যন্ত চিংড়িতে রোগবালাই সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ বিপজ্জনক সময় অতিক্রমকালে পুকুরের পরিবেশ, ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগবালাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিদর্শন এবং চিংড়ির ফিজিক্যাল গ্রোথ পরিমাপে নমুনা পরীক্ষা করে একটি বিষেশজ্ঞ টিম। তাদের মতে, ভেনামির পোনা ছাড়ার পরের ৬৮ দিনে গ্রোথ ও ফার্টিলিটি রেট খুবই আশাব্যঞ্জক। প্রতিটির ওজন ৮ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। গড় ওজন পাওয়া গেছে ৮.৭৫ গ্রাম। ভেনামি চিংড়ির উৎপাদনকাল ১২০ দিন। প্রথম ৬০ দিনে এদের যে গ্রোথ হয়, পরবর্তী ৬০ দিনে তার তিনগুণেরও বেশি হয়। সে হিসেবে চিংড়ি আহরণকালে প্রতিটির গড় ওজন পাওয়া যায় প্রায় ২৫ গ্রাম।

ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, কাঁচামাল হিসেবে চিংড়ির অভাবে মাছ কোম্পানিগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। দেশে উৎপাদিত চিংড়িতে যে কয়টি কোম্পানি চালু আছে সেগুলোর সক্ষমতা ও ধারণ ক্ষমতার মাত্রার ১৮-২০ শতাংশ চাহিদা মিটছে। ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচও বেশি হচ্ছে। তবে ভেনামি চাষে আশার কথা হলো, প্রতি হেক্টরে যেখানে বাগদার উৎপাদন পাওয়া যায়, ৩০০০ থেকে ৪০০০ কেজি, সেখানে একই পদ্ধতিতে ভেনামির হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১০ হাজার কেজি থেকে ২০ হাজার কেজি পর্যন্ত সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রতি স্কয়ার মিটারে যেখানে বাগদার ১৫-২৫টির বেশি পোনা অবমুক্ত করা যায় না, সেখানে ভেনামি প্রতি স্কয়ার মিটারে ৪০-১৫০টি পর্যন্ত অবমুক্ত করা যায়। তবে দেশেই ভেনামির এসপিএফ পোনা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলেও জানায় সূত্রগুলো।

চিংড়ি শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নানা সংকটে ক্রমশ উৎপাদন হ্রাস পাওয়া দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতার মুখে সুবিধা করতে পারছে না। পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক বাজার চলে যাচ্ছে ভেনামি উৎপাদনকারী চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দখলে। অবস্থার উত্তরণে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে ভেনামি চাষের বিকল্প নেই।

Source link