free hit counter
বাংলাদেশ

স্বপ্ননগরের দিকে আগ্রাসী মধুমতির ‘চোখ’

মধুমতি নদীর ভাঙনে ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আশ্রয়ণ প্রকল্প ‘স্বপ্ননগর’। মুজিববর্ষে গড়ে তোলা ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় মধুমতি নদীর ভাঙনে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৩০০ ঘর হুমকির মুখে পড়েছে।

এই নদীর অব্যাহত ভাঙনে গত তিন বছরে স্থানীয় চারটি ইউনিয়নের ৬০০ পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানকার প্রায় এক হাজার পরিবার হুমকির মুখে রয়েছে। নদী তীর রক্ষায় পদক্ষেপ না নিলে এসব ঘর দ্রুতই নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন নদী পাড়ের বাসিন্দারা। তীর রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে তারা কয়েকবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি।

শুক্রবার (২০ মে) সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনে উপজেলার বাজড়া গ্রামের পুরোনো একটি মসজিদ বিলীন হয়ে গেছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে রয়েছে। গোপালপুর ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্রাম ছিল খোলাবাড়িয়া- এখন ওই পুরো গ্রাম মধুমতির গর্ভে চলে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, আলফাডাঙ্গার গোপালপুর ইউনিয়নের ছাতিয়াগাতি, দিগনগর, খোলাবাড়িয়া, কাতলাসুর ও পগনবেগ- এই পাঁচটি গ্রামে মধুমতি নদীর ভাঙনের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া আশপাশের বাজড়া, বাঁশতলা, দক্ষিণ চর নারানদিয়া, পশ্চিম চর নারাণদিয়া ও পাড়া গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী পাচুরিয়া, টগরবন্দ ও বানা ইউনিয়নেও চলছে নদীর আগ্রাসী ভাঙন। নদীর পাড় ভেঙে বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদসহ নানা স্থাপনা।

জানা গেছে, আলফাডাঙ্গার গোপালপুর ইউনিয়নের চরকাতলাসুর গ্রামে ৫৩ একর জমির ওপর নগরের সব সুবিধা নিয়ে ‘স্বপ্ননগর’ নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। যাদের জমি, ঘর নেই; এমন ২৮৬ পরিবারের ঠাঁই হয়েছে সেখানে। ঘর নির্মাণের পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে মসজিদ, মন্দির, বিদ্যালয়, হাট, খেলার মাঠ, ঈদগাহ, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিশুপার্ক, ইকোপার্ক ও সামাজিক বনায়ন। এ ছাড়া উপকারভোগীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এসব পরিবারকে জমিসহ ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর। দুই বছর না যেতেই এসব ঘরের বাসিন্দারা এখন নদী ভাঙনে ঘর হারানো আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।

সেখানে থাকা খালেদা আক্তার জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে তারা মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে একটু আশ্রয় পেয়েছিলেন। এখন এই আশ্রয় হারালে তাদের আবার পথে পথেই থাকতে হবে।

স্থানীয়দের মানববন্ধন

আরেক বাসিন্দা রাশেদ হোসেন বলেন, ‘অন্যের বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে থাকতাম। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঘর দিয়েছেন, সেই ঘরে শান্তিতে বসবাস করছি। কিন্তু নদী ভাঙনে যদি এই ঘর বিলীন হয়ে যায় তাহলে আবার আশ্রয়হীন হয়ে যাবো। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছেন, এই ঘর যাতে নদীতে ভেঙে না যায়- সে ব্যবস্থা নেবেন।’

ছাতিয়াগাতি গ্রামের মুকুল হোসেন বিশা মিয়া বলেন, ‘পৈতৃকসূত্রে তাদের প্রায় ৩০ একরের বেশি জমি ছিল মধুমতির তীরে। এখন প্রায় সবই শেষ, শুধু ভিটেটা বাদে। সেটিও ভাঙনের মুখে। বাপ-দাদার কবর ও মসজিদটাও নদীতে তলিয়ে যাবে- যদি ভাঙনরোধ করা না যায়।’
 
আলফাডাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মধুমতির এই ভাঙন নিয়ে বহুবার জেলার ও উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভায় বলা হয়েছে। নদী শাসন না করায় এখন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার জেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প স্বপ্ননগর হুমকির মুখে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য মনজুর হোসেন বুলবুল ও ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার একাধিকবার ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনও করে গেছেন। কিন্তু ভাঙনরোধে সমন্বিত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এভাবে ভাঙতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যে আরও প্রায় হাজারখানেক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যাবে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এটিই প্রত্যাশা।’

জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ‘বিষয়টি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভাতেও আলোচনা করা হয়েছে। ওই এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ অন্যান্য সম্পদের যাতে আর ক্ষতি না হয়- সেজন্য আবারও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ জানাবো।’

Source link