free hit counter
বাংলাদেশ

সিন্ডিকেট ভেঙে গাউসিয়া কমিটির হাতে লাখের বেশি চামড়া

সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনার কারণে গত কয়েক বছর দাম পাননি কোরবানি দাতারা। এ কারণে অনেকে চামড়া ফেলে দেন, নষ্ট হয় অনেক চামড়া। তবে এবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে যতাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে মানবিক সংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। কোরবানিদাতারা এই সংগঠনটিতে চামড়া দান করেছেন। পরবর্তীতে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা নগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে প্রায় এক লাখের বেশি চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। এতে কমদামে চামড়া সংগ্রহ করতে পারেনি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। বরং সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচশ’ টাকায় তাদের চামড়া সংগ্রহ করতে হয়েছে।   

স্থানীয়রা বলছেন, গত তিন বছর চট্টগ্রামে হাজারো পিস চামড়া নষ্ট হলেও এবার তা হয়নি। পাশাপাশি নগরী ও জেলায় চামড়া নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট প্রথাও ভেঙে গেছে। গত তিন বছর চট্টগ্রামে কারসাজির কারণে যেমন চামড়া নষ্ট হয়েছিল, তেমনি প্রতি পিস চামড়া বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে। এভাবে পানির দামে চামড়া বিক্রি না করে অনেক কোরবানিদাতা যত্রতত্র চামড়া ফেলে দিয়েছেন।  তবে এবার বিপুল সংখ্যক পশুর চামড়া গাউসিয়া কমিটির হাতে চলে যাওয়া চামড়া কেনার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি আড়তদাররা। এ কারণে আড়াইশ’ টাকার নিচে চামড়া কিনতে পারেনি আড়তদাররা। বড় চামড়া সাড়ে পাঁচশ’ দরেও তারা কিনেছেন। 

সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর মুরাদপুর বিবিরহাট এলাকায় অবস্থিত জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিলা মাদ্রাসা মাঠে চামড়া সংরক্ষণ করছে গাউসিয়া কমিটি। সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকরা লবণ দিয়ে ও চামড়ায় থেকে লেগে থাকা মাংস তুলে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। এসব স্বেচ্ছাসেবীদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। এছড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষও রয়েছেন।  

সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব ও মানবিক সেবা টিমের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ নগরী ও জেলায় মিলে এক লাখ পিসের বেশি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে। এসব চামড়া জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিলা মাদ্রাসা মাঠসহ নগরী এবং উত্তর ও দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন মাদ্রাসার মাঠে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এরমধ্যে জামেয়া মাদ্রাসা মাঠে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ৪০ হাজার চামড়া, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাদ্রাসার মাঠে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ২০-২২ হাজার চামড়া। নগরীর হালিশর এলাকায় অবস্থিত মাদ্রাসার মাঠে সংরক্ষণ হচ্ছে ৭-৮ হজার চামড়া। উত্তর জেলার অধীনে বিভিন্ন মাদ্রাসার মাঠে সংরক্ষণ করা হচ্ছে আরও ৩০ হাজারের বেশি চামড়া। সব মিলিয়ে এক লাখের বেশি চামড়া সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নগরীকে ৪৭টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে ৩০০টি বুথ বসিয়ে চামড়া সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গাউসিয়া কমিটির কর্মীরা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অন্তত ৮ থেকে ৯ হাজার কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। অনেক কোরবানিদাতা নিজেরাই জামেয়ার মাঠে চামড়া দিয়ে গেছেন। চামড়া সংগ্রহের জন্য রাখা ছিল শতাধিক পিকআপ। চামড়া সংরক্ষণের জন্য আগাম তিন লাখ কেজি লবণও মজুত ছিল।

মোছাহেব উদ্দিন জানান, চামড়া বিক্রির টাকা বিভিন্ন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে এরকম গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার জন্য ব্যয় করা হয়। জামেয়া মাদ্রাসার অধীনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত দুইশটি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। এসব মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের ব্যয় এ ফান্ড থেকেই মেটানো হয়।  

এদিকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে চট্টগ্রামের এক মাত্র ট্যানারি রিফ লেদার। এ ট্যানারি এবার ১২ হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে বলে জানিয়েছেন ট্যানারির পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মার্কেটিং) মুখলেসুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চামড়া নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করতেই মূলত আমরা এবার কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবার মোট এক লাখ পিস চামড়া কেনার টার্গেট রয়েছে। ক’দিন পর এসব চামড়া আড়তদারদের কাছ থেকে কেনা হবে। তবে এবার কোথাও চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে আমরা শুনিনি।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের সমিতির আওতাভুক্ত ১১২ জন সদস্য আছেন। যারা চট্টগ্রামে চামড়া কিনেন। এবার এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেড় লাখ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন চামড়া কেনা হয়েছে আড়াইশ’ টাকায়। সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচশ’ টাকায় আমরা চামড়া কিনেছি।

এদিকে বেশি দামে পাড়া মহল্লা থেকে চামড়া কিনে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছেন। অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বেশি দামে চামড়া বিক্রির আশায় কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে দুইশ’থেকে চারশ’ টাকায় চামড়া কেনা হয়। তবে আড়তদাররা আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ টাকায় চামড়া কিনতে চাইছে। তার ওপর গাড়ি ভাড়া করে এসব চামড়া আড়তদারদের গুদামে পৌঁছে দিতে হয়েছে। 

 চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও কাউন্সিলর মোবারক আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার চট্টগ্রামে চামড়া নষ্ট হয়নি। বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে আমরা কোনও চামড়া পাইনি। কোরবানির দিনই আমরা শতভাগ বর্জ্য অপসারনে সক্ষম হয়েছি। তবে নগরীতে কসাই সংকটের কারণে বিকাল ৪টা কিংবা সন্ধ্যায়ও অনেকে কোরবানি দিয়েছেন। এ কারণে রাতেও বর্জ্য অপসারণ করতে হয়। আজ যারা কোরবানি দিচ্ছেন সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। আমাদের কন্ট্রোল রুম খোলা আছে। ফোন পেলেই আমরা বর্জ্য অপসারণে ছুটে যাচ্ছি।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চট্টগ্রামে এবার আট লাখ ২১ হাজার পশু কোরবানি হওয়ার কথা। এরমধ্যে গরু পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৮০৩টি, মহিষ ৬৬ হাজার ২৩৭টি, ছাগল ও ভেড়া এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৬২টি। 

Source link