free hit counter
বাংলাদেশ

সংকটে গমের মজুত কত, লাভবান কারা

ভারত থেকে রফতানি বন্ধের ঘোষণায় গম সংকট দেখা দিয়েছে। আর সাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দার দামে, এরইমধ্যে কেজিতে যথাক্রমে ১০ ও ছয় টাকা বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে গমের দামও লাফিয়ে-লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। তবে মিল মালিকরা বলছেন, দেশে যথেষ্ট মজুত থাকলেও আমদানিকারকরা সিন্ডিকেট করে গমের দাম বাড়িয়েছেন। আর পাইকারী ব্যবসায়ীদের দাবি, গম সংকটের কয়েক দিনে আমদানিকারক, বড় মিল মালিক ও ট্রেডার্স ব্যবসায়ীরা বিশাল অংকে লাভবান হয়েছেন। দেশের অন্যতম বড় নিতাইগঞ্জের পাইকারি বাজারে কী পরিমাণ গম মজুত রয়েছে— সেই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বড় বড় ফ্লাওয়ার মিল মালিক ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে অন্তত ১৫ থেকে ৩০ দিনের গম মজুত রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের পাইকারি বাজারে কয়েক দফা দাম বৃদ্ধিতে ৫০ কেজির বস্তার আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে ২০০-২৫০ টাকা। ভালোমানের ৫০ কেজির আটার বস্তা এখন ২২৫০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্নমানের আটা এখন ২১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মান ভেদে ময়দার বস্তা এখন ২৬০০ থেকে ৩০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এর বেশ প্রভাব পড়েছে। স্বাভাবিকভাবে আটার দাম কেজি প্রতি বেড়েছে ১০ টাকা এবং ময়দার দাম বেড়েছে ৬ টাকা।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সম্প্রতি ওই দেশ থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পরে গমের জন্য প্রতিবেশী ভারতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে দেশের ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি ভারত গম রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে সংকট তীব্র হয়। এর ফলে গমের দামও বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই সংকট কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হবে- এমন প্রশ্নের উত্তরও জানা নেই কারও। কবে নাগাদ বাজার স্বাভাবিক হবে, সেটাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

এই পরিস্থিতিতে মজুত করা পণ্য সিন্ডিকেট করে বিক্রির পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া সহ বাড়তি দামের বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ আটা ময়দা মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মেসার্স দিবা ফ্লাওয়ার মিলের স্বত্ত্বাধিকারী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন গমের দাম চড়া। ফলে যাদের কাছে মিল চালানোর মতো মাল আছে, তারা আর কিনছেন না। আমার মিলে দৈনিক ৩০০ টন গমের প্রয়োজন হয়। মাল এখনও শেষ হয়নি, একারণে কিনিনি।

তিনি আরও বলেন, এবারের মতো গমের এতো দাম কখনও বাড়েনি। এবার সর্বোচ্চ দাম বেড়েছে। দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেটকারীরা সবচেয়ে বেশি দায়ী। ইমপোর্টাররা এই সিন্ডিকেট করে থাকে। এমনও হয়েছে নিতাইগঞ্জের মাল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে গেছে। ওরা নিজেরা ছাড়া অন্য কাউকে ব্যবসা করতে দেয় না।

নিতাইগঞ্জের মেসার্স নিউ শীতল ফ্লাওয়ার মিলের স্বত্ত্বাধিকারী আমিনুর রহমান অপু বলেন, ‘এখানে প্রায় ৩০টা বড় মিল আছে, যাদের পুঁজি বড়। ভারতের গম রফতানি বন্ধের ঘোষণার পরে এরা মোটা অংকের টাকা লাভবান হয়েছেন। কারণ এরা এক থেকে দুই মাসের মাল মজুত রেখে অনেক লাভবান হয়েছেন। তবে এটা ওদের ব্যবসার স্বার্থে এই মজুত রাখতে হয়েছে। ভাগ্যক্রমে এই সময়ে গমের দাম বৃদ্ধির তারা ফলে বেশ লাভবান হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ছোট মিল হওয়ার ফলে দৈনিক ৪০ টন মাল প্রয়োজন হয়। তবে সংকটের ফলে এই অল্প পরিমাণ মাল (গম) পেতেও সমস্যা হচ্ছে। তারপরও বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মিল মালিক বলছেন, ইমপোর্টার ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত মালামাল মজুত করে রাখে। তিন মাস পরে গম মজুত করতে হলে মেডিসিন দিতে হবে। নতুবা পোকা ধরে যাবে। তবে যারা মাল মজুত করেছে তারা এবার বেশ লাভবান হয়েছে। কারণ রমজানে ১০৫০ টাকা গমের মণ (৪০ কেজি) ছিল। পরে দফায় দফায় দাম বেড়ে এখন ১৫৫০ থেকে ১৬০০ টাকা মণ হয়েছে। সে হিসাবে কেউ যদি ১০০ থেকে ২০০ টন গম মজুত করে থাকে। এতে কোটি কোটি টাকা লাভ গুণছে।

নিতাইগঞ্জ ব্যবসায়ী সূত্র বলছে, ইমপোর্টার (আমদানিকারকদের) কাছ থেকে ট্রেডার্স প্রতিষ্ঠানগুলো গম কেনে। পরে ট্রেডার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সেই গম মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করে। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৮৫টা ফ্লাওয়ার মিল রয়েছে।

মেসার্স জে এস অ্যান্ড ব্রাদার্স ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী মো. জামাল উদ্দিন মৃধা বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে এই সংকট তৈরি হয়েছে। পরে ভারত থেকে মাল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ১২ মে পর্যন্ত যেসব এলসি করা হয়েছিল তার পর থেকে বন্ধ রয়েছে। ভারত বাজার না খুললে সংকট সহসাই কাটবে না।

গম মজুত রেখে লাভবান হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে যে মাল (গম) আছে তা দিয়ে ১০-১২ দিন পর্যন্ত ব্যবসা করতে পারবো। ইমপোর্টাররা মাল না দিলে পরে মাল বিক্রি করতে পারবো না। আমি প্রতিদিন একশ থেকে পাঁচশ টন গম বিক্রি করে থাকি। আমরা মাল মজুত রাখি না। কেনার পরে বাজার দর কমে গেলে অনেক সময় গুদামে তুলি। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কিছু বড় পার্টি আছে, যারা দুই-চার হাজার টন মাল কেনে। তারা মাল মজুত রাখতে পারে। প্রায় এক মাস পর্যন্ত মাল মজুত রাখতে পারে। এছাড়া আমিদানিকারক ও বড় মিল মালিকরাও মাল মজুত রাখে। এমনও অনেক বড় বড় মিল মালিক আছে যাদের ২ থেকে ৫ হাজার টন মাল মজুত রাখার সক্ষমতা আছে। আর গম সংকটের সময়ে যারা মাল মজুত রেখেছে সেসব প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ লাভবান হয়েছে।

নিতাইগঞ্জ গম, চাল, আড়ৎদার মালিক সমিতির সভাপতি ও জসিম ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন মৃধা বলেন, এখানে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টন গম প্রয়োজন হয়। শুধু আমার কাছে যে পরিমাণ গম আছে, তা দিয়ে আগামী দুই তিন দিন পর্যন্ত ব্যবসা করতে পারবো। আমদানিকারকরা মাল না দিলে আমি ব্যবসা করতে পারবো না। আজকে ১৫২০ ও ১৫৩০ টাকা মন হিসেবে গম বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘মিল মালিকদের অন্তত ১৫ থেকে ৩০ দিনের মাল মজুত রাখতে হয়, নতুবা তারা মিল চালাতে পারবেন না। তবে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো একটু বেশি সময় ধরে গম মজুত রাখতে পারে। আর ট্রেডার্স ব্যবসায়ীরা মাল মজুত রাখার সুযোগ নেই। বাজার মন্দা হলে তারা সর্বোচ্চ ১৫-৩০ দিনের মাল মজুত রাখে। পরে সুবিধামতো দাম পেলে বিক্রি করে ফেলে। তবে ইমপোর্টাররা কম-বেশি মাল মজুত রাখে। মজুত থাকলেও তারা গম বাজারে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।’

Source link