রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্কে পদ্মাপারের বিনোদনে ভাটা
বাংলাদেশ

রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্কে পদ্মাপারের বিনোদনে ভাটা

রাজশাহী নগরীর বিস্তীর্ণ পদ্মাপার সবসময় বিনোদন পিপাসুদের ভিড়ে থাকে সরগরম। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশকিছু স্পটে পা ফেলার জায়গা থাকে না। কিন্তু হঠাৎই সে চিরচেনা বিনোদনে ভাটা পড়েছে। নগরীর অন্যতম বিনোদন স্পট বড়কুটি পদ্মাগার্ডেন, পঞ্চবটি, টি-বাঁধ, আই-বাঁধ এলাকায় কমেছে বিনোদন পিপাসুদের ভিড়। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা তুলে ধরছেন, রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্ক।

তবে আতঙ্ক ছড়ালেও এ সাপের দংশনে মৃত্যুর হার খুব বেশি নয়। বরং সুস্থতার হার ৭৪ শতাংশ। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের কারণে এ সাপ নিয়ে ভীতি মানুষের মনে গেঁথে গেছে।

আই-বাঁধ হয়ে পঞ্চবটি পর্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য দিনের তুলনায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও (গতকাল শুক্রবার ও শনিবার) মানুষের আনাগোনা কম। যা দর্শনার্থী আছেন তাও আবার রাস্তার ধারেই। কেউ ভয়ে নিচে নামছে না। অথচ অন্যান্য সময় পদ্মায় জেগে ওঠা চরে না নামলে মানুষের ভ্রমণ তৃপ্তিই আসতো না!

পদ্মাপারের দোকানিদের ভাষ্য, অন্য সময়ের চেয়ে এখন কিছুটা কমই মানুষ আসছে। আর যারা আসছেন, তাদের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতেও থাকছে রাসেলস ভাইপার সাপ। আর মানুষ কম আসায় বেচাকেনাও কিছুটা কমে গেছে বলে জানাচ্ছেন তারা।

পদ্মায় জেগে ওঠা চরে হেঁটে হেঁটে বাদাম বিক্রি করেন সাইমুল হাসান। তিনি জানান, আগে পদ্মার জেগে ওঠা চরে অনেক তরুণ-তরুণী দেখা যেতো। যারা বালুর মধ্যে এসে বসে সময় কাটাতো। বিকাল ৩টা-৪টার দিকে এসে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত আড্ডা দিতো। কিন্তু হঠাৎ করেই সে আড্ডা কমে গেছে। সবাই মুক্তমঞ্চে বা কনক্রিটে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কেউ চরে নামছে না।

বন্ধুদের নিয়ে মুক্তমঞ্চ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন মুহীন হাসান। তিনি জানান, এখন সবখানেই রাসেলস ভাইপার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করলেই রাসেলস ভাইপার ইস্যু। একারণে কিছুটা ভীতি আছে। অন্যান্য দিন নিচে গিয়ে একটু আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আজ নামতে ইচ্ছে করছে না।

‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত পদ্মাপারে সমুদ্র পাড়ের আদলে সি-বিচ চেয়ার স্থাপন করা হয়েছে। দর্শনার্থী না আসায় সে চেয়ারও ফাঁকা পড়ে থাকছে। এসব চেয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রুবেল হাসান জানান, এখন ব্যবসা তেমন নাই। মানুষজন ভয়ে নিচে নামছে না। একারণে সারাদিনই চেয়ার ফাঁকা থাকছে। আগে সন্ধ্যার পরেও টি-বাঁধের চেয়ারে মানুষজন বসতো। কিন্তু এখন সেটাও ফাঁকা থাকছে। 

রাজশাহী বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, সাপ নিয়ে এখন একটা আতঙ্ক আছে। আর নদী পাড়ে রাসেলস ভাইপার থাকতে পারে এ ধারণা থেকেই হয়তো অনেকে সর্তক হচ্ছেন। তবে আমরা আতঙ্কিত না হয়ে মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্কে পদ্মাপারের বিনোদনে ভাটা এদিকে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে রামেক হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয় মোট ২১৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৬৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। সুস্থতার হার ৭৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনের ২০ তারিখ পর্যন্ত মোট ৬৩ জন সাপে কাটা রোগী রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫৪ জন। মারা গেছেন ৯ জন। সুস্থতার হার ৮৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে রাজশাহীতে রাসেলস ভাইপার কামড়ায় ৫০ জনকে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩৭ জন। সুস্থতার হার ৭৪ শতাংশ।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহীন চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, ৬০ থেকে সত্তরের দশকে রাজশাহী জেলার তানোর, গোদাগাড়ীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সাপের আধিক্য থাকলেও আশির দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর ২০১৩ সালে প্রথম রামেক হাসপাতালে এই সাপে কাটা রোগীর দেখা মেলে।

রামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহীন বলেন, রাসেলস ভাইপারের বিষ হেমোটক্সিন প্রকৃতির। কামড়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহের টিস্যুগুলো দ্রুত ধ্বংস হতে থাকে। কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। ক্ষতস্থানে পচন ধরে। প্রায় ৬০ ভাগ রোগী কিডনিতে সমস্যার কারণে মারা যায়। তবে যত দ্রুত সম্ভব এই সাপে কাটার পরপরই অ্যান্টিভেনম নিতে হবে। যদি আমাদের এই অঞ্চলে সাপের ভ্যাকসিন তৈরি হতো তাহলে শতভাগ কাজ করতো। মৃত্যুর হারও কমে আসতো।

রোগীদের বড় অংশ ধানের মাঠে দংশনের শিকার বলে জানান তিনি। তিনি জানান, চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ানো রোগী বাড়ছে। পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট। ২০২২ সালে রাজশাহী মেডিক্যালে চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ানো ৩১ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ভর্তি হয়েছিল ৫০ জন।’ তিনি আরও জানান, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী আসে।

রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্কে পদ্মাপারের বিনোদনে ভাটা বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির বিষয়ে আবু শাহীন বলেন, চট্টগ্রামে ভেনম রিসার্চ সেন্টার আছে। তারা সাপের বিষ সংগ্রহ করে অ্যান্টিবডি বানাচ্ছে। তবে এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশে যে অ্যান্টিভেনমগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা ভারত থেকে আমদানি করা। একটি কোম্পানি অ্যান্টিভেনম আমদানি করে দেশে নিয়ে এসে তা বিক্রি করছে। দেশের ফার্মাসিউটিক্যালগুলো যদি এগিয়ে আসে তাহলে দেশেই বানানো সম্ভব। আর দেশে বানালে এর কার্যকারিতা আরও বেশি হবে। সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুহারও কমে আসবে।   

সাপ ও সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ বোরহান বিশ্বাস রোমান জানান, রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সরাসরি বাচ্চা দেয়। অন্য সাপের মতো ডিম দেয় না। এই সাপ মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে একসঙ্গে ৬ থেকে ৯০টি বাচ্চা দিয়ে থাকে। গড়ে ২৫ থেকে ৩৫টি বাচ্চা জন্ম দেয়। গোখরাসহ অন্যান্য বিষধর সাপ থেকে এর আচরণ কিছুটা ভিন্ন। এরা অলস প্রকৃতির। রাসেলস ভাইপার বন্যার পানিতে এসে রাজশাহীর নদী কিংবা চরাঞ্চলে বসবাস করছে। বর্তমানে রাজশাহী এই সাপের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। গেলো কয়েক বছরে চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মানুষ এই সাপের কামড়ে মারা গেছে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে এই সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরি করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে আছে যে সকল এলাকায় বেশি বিষাক্ত সাপ তার অ্যান্টিভেনম তৈরি করার। এজন্য সদিচ্ছা থাকা দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি এগিয়ে আসে তাহলে আরও দ্রুত এই সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরি করা যাবে। 

রাসেলস ভাইপারের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও রাজশাহীর ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম নেই। শুধু তানোর ও চারঘাট উপজেলায় রয়েছে। ফলে এই সাপে কামড় দিলেই ছুটে আসতে হচ্ছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তবে এই জেলার জন্য ১৮০টি অ্যান্টি-স্নেক ভেনম বরাদ্দ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এগুলো খুব তাড়াতাড়ি এসে পৌঁছাবে। প্রতিটি উপজেলায় ২০টি করে দেওয়া হবে অ্যান্টিভেনম।

রাসেলস ভাইপার সাপ আতঙ্কে পদ্মাপারের বিনোদনে ভাটা রাজশাহী জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবু সাঈদ মো. ফারুক বলেন, আমাদের দুটি উপজেলায় অ্যান্টিভেনম আছে। বাকিগুলোতে দুই-একদিনের মধ্যে চলে আসবে। পাশাপাশি আমাদের রামেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম আছে। উপজেলাগুলোতেও এখন অ্যান্টিভেনম রাখা হচ্ছে, যেন সহজেই সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা দেওয়া যায়।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, আমাদের এখানে যে অ্যান্টিভেনম তা শুধু যে রাসেলস ভাইপারের দংশনের জন্যই ব্যবহার হয়, এমনটা নয়। বিষধর যে কোনও সাপের জন্যই এই অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়। হাসপাতালে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি ডোজ অ্যান্টিভেনম মজুত আছে। কিছুদিনের মধ্যে আরও অ্যান্টিভেনম চলে আসবে। প্রাথমিকভাবে সাপে কাটা রোগীদের দুই ঘণ্টার মধ্যে নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কবিরাজ কিংবা ওঝার দ্বারা চিকিৎসা করার কারণে মৃত্যুর হার বেশি। মানুষ সচেতন হলে মৃত্যু সংখ্যা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।

Source link

Related posts

চিরকুটে লিখা ছিল ‘কেউ দায়ী নয়’ 

News Desk

‘নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত হলে বিএনপি-জামায়াতকে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে’

News Desk

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অগ্রণী ব্যাংক লকডাউন

News Desk

Leave a Comment