free hit counter
বাংলাদেশ

বহাল তবিয়তে প্রধান শিক্ষক, এখনও বিদ্যালয়ের মাঠে বসে পশুর হাট

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দসহ প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। একইসঙ্গে ইজারাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বিদ্যালয় মাঠে পশুর হাট বসানোর সত্যতাও মিলেছিল। এরপরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বহাল তবিয়তে আছেন প্রধান শিক্ষক। এখনও বিদ্যালয়ের মাঠে বসে পশুর হাট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালে প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি রায়ের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পায় উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। পরে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ২০০৪ সালের ৫ নম্বর আইন (দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন পাঠান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। ২০২০ সালে পাঠানো ওই প্রতিবেদন দুই বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। 

এদিকে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়ের আগে ছুটি দিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত পশুর হাট চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা জানান, সপ্তাহে দুই দিন বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট বসানো হয়। এর মধ্যে শুক্রবার বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও মঙ্গলবার হাটের কারণে আগেভাগেই ছুটি দেওয়া হয়। এদিন চারটি ক্লাস হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। পরে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হয়; যাতে অভিভাবকদের মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ইজারাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মাঠে হাট বসাতে দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাটের কারণে সামনে বর্ষা মৌসুমে মাঠের অবস্থা আরও খারাপ হবে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, করোনাকালীন প্রায় দুই বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাঠে পশুর হাটের কারণে প্রতি সপ্তাহে একদিন করে তাদের ক্লাস নেওয়া হয় না। ফলে তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত। মাঠে গরু-ছাগলের গোবর-মূত্রের গন্ধে বিদ্যালয়ে ক্লাস করা কষ্টসাধ্য।

কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, প্রতি মঙ্গলবার হাটের কারণে বিদ্যালয় আগেভাগে ছুটি দেওয়া হয়। ওই দিন ক্লাস ঠিকমতো হয় না। তারা মাঠে পশুর হাট চায় না। এতে লেখাপড়ার সঙ্গে খেলার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট বসানোর বিষয়ে জানতে ইজারাদার মাসুদ রানাকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। 

ইজারাদারের অংশীদার ও দুর্গাপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আবেদ আলী সরদার বলেন, ‘মাঠে ৪০ শতক সরকারি জায়গা আছে। সেজন্য মাঠে হাট বসানো হয়।’

তবে প্রধান শিক্ষক উৎপল কান্তি রায়ের দাবি, তিনি একরকম কোণঠাসা হয়ে মাঠে হাট বসানোর অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চেয়ে লিখিত আবেদন করেও কোনও সুফল পাচ্ছেন না। ইজারাদারের কাছে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘মাঠে পশুর হাট বসানোর বিষয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেন। হাট চালান উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।’

ইউএনও বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট করতে চাইলে প্রধান শিক্ষক অনুমতি দিতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমি প্রতিকার চেয়েও পাচ্ছি না। যে ইউএনও আসেন তিনি বলেন, বিষয়টি দেখছি। কিন্তু কোনও সমাধান হয় না।’

পশুর হাটের কারণে প্রতি সপ্তাহে একদিন করে বিদ্যালয়ে ক্লাস হয় না

তবে শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাঠ বসানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রধান শিক্ষক সেই নির্দেশনা অমান্য করেছেন।

জেলা শিক্ষা অফিসার শামসুল আলম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের সম্মতি ছাড়া কেউ বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসাতে পারেন না। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইজারাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাঠে পশুর হাট বসানোর অভিযোগ রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে অধিদফতরকে প্রতিবেদন দিয়েছি। সেটি কেন ঝুলে আছে জানি না।’

জানতে চাইলে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল কুমার বলেন, ‘হাটটি আগে থেকেই এভাবে চলে আসছে। আমাকে কেউ এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বিঘ্নিত করে হাট বসানোর সুযোগ নেই। আমি খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

প্রধান শিক্ষককে কোণঠাসা করার অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘এটি খুব দুঃখজনক কথাবার্তা। এটি একেবারেই ঠিক নয়। প্রশাসন কাউকে কোণঠাসা করবে কেন? প্রশাসন সবাইকে সহায়তার জন্য কাজ করে।’

Source link