free hit counter
বাংলাদেশ

পাহাড়ি ঝরনায় মৃত্যু বাড়ছে কেন?

প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি পাহাড়ি ঝরনা। ঈদের ছুটি কিংবা বিশেষ দিনে পাহাড়ে ঘুরতে গেলে অনেকে ঝরনার পানিতে গোসল করেন। উপভোগ করেন পাহাড়ের সৌন্দর্য। কিন্তু এখনও পাহাড়ে গড়ে ওঠেনি পর্যটকবান্ধব পরিবেশ। ফলে ঝরনার পানিতে গোসলে নেমে অসচেতনতার কারণে ঘটছে প্রাণহানি।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় রয়েছে খৈয়াছড়া ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, সহস্রধারা ঝরনা, মহামায়া ঝরনা, বাওয়াছড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, হরিণাকুণ্ড ঝরনা ও সোনাইছড়ি ঝরনা। এসব ঝরনার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হন প্রকৃতিপ্রেমীরা। বর্ষাকালে ঝরনাগুলো পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে। তবে ঝরনাগুলোতে পর্যটকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ঘটছে প্রাণহানি। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এটি অনেকের জানা নেই। ঝরনা দেখতে গিয়ে গত কয়েক বছরে ১২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক।

চলতি বছরের ১৯ জুন নাপিত্তাছড়া ঝরনায় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামের স্নাতকের শিক্ষার্থী মাসুদ আহমেদ তানভীর, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র তৌফিক আহমেদ তারেক ও চট্টগ্রাম ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ইশতিয়াকুর রহমান প্রান্তের মৃত্যু হয়।

এর আগে ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল খৈয়াছড়া ঝরনার ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে মো. আশরাফ হোসেন (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৮ জুন একই ঝরনার ওপর থেকে পড়ে আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ১২ জুলাই বোয়ালিয়া ঝরনায় ১৫ ছাত্রছাত্রী অসতর্কতার কারণে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করেন। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকের পানিতে ডুবে মারা যান শাহাদাত হোসেন (২২)। ২৬ জুলাই ছবি তুলতে গিয়ে খৈয়াছড়া ঝরনায় আবু আলী আল হোসাইন (৩০) নামে এক প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে আসা মেহেদী হাসান (২২) নামে এক প্রকৌশল ছাত্রের মৃত্যু হয়। ২৯ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন নামে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে আসা ফয়েজ আহমদ নামে এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে মারা যান। ওই দিন আহত হয়েছেন আরও চার জন।

২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট নাপিত্তাছড়া ঝরনার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২৪ আগস্ট রূপসী ঝরনার ওপর থেকে পড়ে মারা যান সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। ১৫ জুলাই খৈয়াছড়া ঝরনার পঞ্চম স্তরে ওঠার পর পা পিছলে পড়ে দুই পর্যটক আহত হন।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর নাপিত্তাছড়া ঝরনায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুনের (২২) মৃত্যু হয়। ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝরনা দেখতে এসে আটকা পড়েন ১৫ পর্যটক। চার ঘণ্টা পর তাদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া বিভিন্ন সময় ঝরনার ওপর থেকে পড়ে আহত হয়েছেন শতাধিক পর্যটক।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল খৈয়াছড়া ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, সহস্রধারা ঝরনা, বাওয়াছড়া ঝরনা ও রূপসী ঝরনা লিজ দেয় চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। ২৭ লাখ ৮১ হাজার টাকায় এসব ঝরনার লিজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএসআর ইন্টারন্যাশনাল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত দুই মাস ধরে ঝরনা ও লেকের মুখে টিকিট কাউন্টার বসিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২০ টাকা। কিন্তু নিরাপত্তা এবং ট্রাভেল গাইডের ব্যবস্থা রাখেনি তারা। ফলে ঝরনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন পর্যটকরা। সেইসঙ্গে ঘটছে প্রাণহানি।

ঝরনাগুলোতে পর্যটকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ঘটছে প্রাণহানি

ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও পর্যটকরা জানিয়েছেন, ঝরনায় যাওয়ার পথগুলো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকায় দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। ঝরনা এলাকায় পর্যটকদের জন্য নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ট্রাভেল গাইড, বিশ্রামাগার ও শৌচাগার। কোনও ধরনের ব্যবস্থা না রেখে ঝরনা ইজারা দেওয়া অযৌক্তিক। ঝরনায় যাওয়ার পথ ভালো না হওয়ায় পর্যটকরা দুর্ঘটনায় পড়েন। অনেক ঝরনায় গভীর কূপ থাকায় পর্যটকরা গোসলে নেমে ডুবে মারা যান। এসব সমস্যা সমাধান করা দরকার।

ঝরনায় মারা যাওয়া ইশতিয়াকুর রহমানের বাবা জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘পাহাড়ি ঝরনায় পর্যটকদের জন্য কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কোনও ধরনের নিরাপত্তা নেই। বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে দেওয়া হচ্ছে কেন? এত প্রাণহানির পরও দায়িত্বশীলরা উদাসীন।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএসআর ইন্টারন্যাশনালের মালিক আনিসুর রহমান বলেন, ‘ঝরনা এলাকায় সরকারিভাবে নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা নেই। তবে আমরা ঝরনার প্রবেশমুখে চূড়ায় না উঠতে নির্দেশনামূলক প্ল্যাকার্ড লাগিয়েছি। এরপরও অনেকে না জেনে চূড়ায় উঠে দুর্ঘটনার শিকার হন।’

পর্যটকদের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনও ট্রাভেল গাইড রাখা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাখা হয়নি। এটি প্রশাসনের দেখার কথা।’

বাড়ৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. সরওয়ার উদ্দিন বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়েছি। বিভিন্ন ঝরনা এলাকায় ট্রাভেল গাইড নিয়োগ দেওয়া হবে। পর্যটকরা যদি ঝরনা এলাকায় যাওয়ার সময় গাইডদের সঙ্গে নিয়ে যান, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যাবে। সেইসঙ্গে ঝরনায় নামার পথ বন্ধ করে দিতে হবে। পর্যটকরা যদি ঝরনায় না নামেন তাহলে দুর্ঘটনা কমবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে যাতে কোনও পর্যটক পাহাড়ের ওপরে না উঠেন, সেটি প্রশাসনকে তদারকি করতে হবে।’

মীরসরাই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ইমাম হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘ঝরনাগুলোতে প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন। ট্রাভেল গাইড দিতে হবে। কোন স্থানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে, কোন স্থান নিরাপদ তা পর্যটকদের জানাতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনারোধ করা সম্ভব হবে। মূলত দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেকে ঝরনার ওপরে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান। এটি মৃত্যুর আরেকটি কারণ। এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।’

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঝরনার ইজারা পেয়েছে তাদের অবশ্যই ট্রাভেল গাইড নিয়োগ করতে হবে। এটি তাদের বলা হয়েছে।’

মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য এসব ঝরনা এবং লেক জেলা প্রশাসনের অধীনে দিতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এসব ঝরনা এবং লেকের ইজারা বাতিলের জন্য বন বিভাগকে চিঠি দেবো। পাশাপাশি এসব এলাকা পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। যতদিন পর্যটন উপযোগী না হবে ততদিন পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে।’

Source link