free hit counter
বাংলাদেশ

পাকিস্তানে নতুন সরকার ও ভূ-রাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হলো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিদায়। তাঁকে দেশটির পার্লামেন্ট অনাস্থা ভোটে অপসারণ করেছে। মেয়াদ থাকতে একজন প্রধানমন্ত্রী সরে যাওয়া পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য নতুন কিছু না। গত সাত দশকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো প্রধানমন্ত্রীই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .কিন্তু পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জেতানো ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরানের রাজনৈতিক উত্থান যেমন আলোচিত ছিল, তেমনি তাঁর অপসারণও আলোচিত হয়েছে। ইমরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র কারণে তাঁকে অপসারিত হতে হয়েছে। বিশ্বরাজনীতির বিশ্লেষকরাও বলছেন, ইমরানের অপসারণের সঙ্গে ভূ-রাজনীতির সংযোগ রয়েছে। এমন আলোচনা রয়েছে যে ভুল ও বিপজ্জনক পররাষ্ট্রনীতিই ইমরানের জন্য কাল হয়েছে।
ইমরানের পররাষ্ট্রনীতি : ইমরান খান জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন যুক্তরাজ্যে, পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ডে। ব্যক্তিগত জীবনচর্চায় তিনি যতটা পশ্চিমা ঘেঁষা ও উদার, রাজনৈতিক জীবনে তিনি ততটাই কট্টরপন্থী। তাঁকে দেখে পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথা মনে পড়ে যায়। যিনি নিজে ব্যক্তিগত জীবনে সেক্যুলার থাকলেও ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদের’ আবেগকে তাঁর রাজনীতির পুঁজি করেছিলেন। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার পর নানা চমক দেখাতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তিনি বিশ্বনেতা হওয়ার খায়েশ দেখেছিলেন। মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের একটা গুরুত্ব ছিল শুরু থেকেই। তবে এই গুরুত্ব সৌদি আরবের সঙ্গে সংহতি রেখেই। কিন্তু সৌদিবিরোধী যে নতুন অক্ষ মালয়েশিয়া-কাতার-তুরস্ক-ইরান গড়ে তুলতে চেয়েছিল, তাতে ইমরানের যোগসাজশ ছিল, যা পুরনো বন্ধু সৌদি আরবকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সচরাচর হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করার পর যে কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানকে ফোন দেন, তার মধ্যে পাকিস্তানও ছিল। কিন্তু জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইমরানের দপ্তরে কোনো ফোন যায়নি। এমনকি মার্কিন উদ্যোগের জলবায়ু সম্মেলনেও পাকিস্তানে কোনো আমন্ত্রণপত্র পৌঁছেনি। এ নিয়ে ইমরান মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, তিনি কূটনীতিকে ব্যক্তিগত ইগোতে নিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অপ্রত্যাশিত’ আচরণ পেয়ে তিনি আরো বেশি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অক্ষগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছেন। এমনকি গত বছরের মার্কিন উদ্যোগের ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ নিমন্ত্রণ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করে ইমরানের সরকার। তাঁর এই একগুঁয়ে পররাষ্ট্রনীতি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিনই তাঁর মস্কো সফরের মধ্য দিয়ে। তিনি বিমানবন্দরে নেমে ‘দুর্দান্ত সময়ে মস্কো সফর’ বলে যে উল্লাস করেছেন তার ভিডিও নানা মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

পশ্চিমের সঙ্গে ইমরানের নানা কারণেই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল তালেবান ইস্যুতে ইমরানের অবস্থান। ইমরান খান তালেবানের কম সমালোচক ছিলেন। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে উল্লসিত ছিলেন। বিচক্ষণ ইমরান চাইলে তাঁর মস্কো সফর বাতিল করে পশ্চিমাদের কাছে হিরো হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি হোয়াইট হাউসকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে পুতিন তাদের এত মাথা ব্যথার কারণ, সে পুতিনের পাশেই তাদের ফোন না পাওয়া ব্যক্তিটা বসে আছে। ইমরানের মস্কো সফর খুব একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সফর বা সফল সফর ছিল না। ইমরানের দপ্তর বলেছিল, তিনি গ্যাস লাইনসংক্রান্ত আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। মস্কোর সঙ্গে ইসলামাবাদের চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত মিত্র নয়াদিল্লি ‘রাশিয়া-ইউক্রেন’ ইস্যু বেশ চতুরতার সঙ্গে ব্যবহার করেছে। অনেকটা লাঠি না ভাঙা সাপও মরার মতো অবস্থা। কিন্তু ইমরান লাঠিও ভাঙলেন, সাপও মরল না। ফলে ইমরানের এই মস্কো সফর কিছুটা ব্যক্তিগত ইগো বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ থেকে ছিল বলেই একটা চিত্র ভেসে ওঠে।

অন্যদিকে ইমরান নিজে নাম উল্লেখ করে বলেছেন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু তাঁর অপসারণের ‘ষড়যন্ত্র’ করছেন। যদিও বা ডোনাল্ড লু এসংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। তবে যতই বলা হোক, বাইডেন প্রশাসন এই মুহূর্তে ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত আছে, পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান নিয়ে তারা সচেতন নয়, বিষয়টা তা নয়। ইন্দো-প্যাসেফিক কৌশলে পাকিস্তান না থাকলেও মধ্য এশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান ইস্যুতে এখনো পাকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ দরকার হোয়াইট হাউসের। ইমরানকে সরাতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, পিপিপিসহ ১০ বিরোধী দল এক হয়ে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। গত বছর এই ধরনের অনাস্থা প্রস্তাবে ইমরান খান টিকে গেলেও এবার বিদায় নিতে হলো। ধারণা করা হচ্ছে, বিরোধীদের এই অবিশ্বাস্য ঐক্যের পেছনে পশ্চিমা শক্তি ও দেশটির সেনাবাহিনীর পরোক্ষ সমর্থন ছিল।

সেনাবাহিনী ইস্যু : পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব অসামান্য। এ ছাড়া দেশটির পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রচারিত। দেশটির সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ পেয়ে আসছে। এ ছাড়া বহু সেনা কর্মকর্তার সম্পদ রয়েছে পশ্চিমা দেশে। ফলে দেশটির সেনাবাহিনীকে মার্কিনপন্থী হিসেবে ভাবা হয়। বর্তমান ইস্যুতেও সেনাবাহিনীর পরোক্ষ হাত রয়েছে বলেই ইঙ্গিত বিশ্লেষকদের। দীর্ঘদিন ধরে নানা ইস্যুতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান সরকারের বিরোধ চলে আসছিল। পাঞ্জাবে এক অনভিজ্ঞ রাজনীতিককে মুখ্যমন্ত্রী করা এবং সর্বশেষ আইএসআই প্রধান পদে ইমরানের পছন্দের ফায়াজ নামে একজনকে নিয়োগ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ফায়াজকে নিয়োগের মাধ্যমে ইমরান সেনাবাহিনীতেও নিজের একটা বলয় তৈরি করতে চাচ্ছিলেন, যাঁরা তাঁকে আবার ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করবে; যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইস্যুতে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষতার ভঙ্গি করছিল। শেষ মুহূর্তে ইমরানের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ প্রমাণ করে কার হাতে ক্ষমতা যাবে তা নিয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিল।

নতুন সরকার : নতুন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই শাহবাজ শরিফ। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে নওয়াজ শরিফ শুধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই অপসারিত হননি, হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি দলের পদ ছাড়তেও বাধ্য হন। তাঁকেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে টানাপড়েনের কারণে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। এখন নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটা সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর সহোদর নওয়াজ শরিফের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে লাহোর উড়ে গিয়েছিলেন মোদি। পাঞ্জাবের নেতা হিসেবে চীনাদের সঙ্গেও তাঁর বোঝাপড়া ভালো। শরিফ পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও সুসম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইস্যুতে শরিফদের দল মুসলিম লীগের অবস্থানও গঠনমূলক। ফলে শাহবাজ যুগে নতুন পররাষ্ট্রনীতির দিকে যেতে পারে পাকিস্তান।

তবে শাহবাজের সমালোচকরা বলছেন, শাহবাজ হবেন ‘আমেরিকার পুতুল’ প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানে আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। সিভিল সোসাইটি, অধিকারকর্মী ও মিডিয়াজগতে পশ্চিমা প্রভাব রয়েছে। তবে নতুন সরকার নতুন যে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে বলেই প্রতীয়মান। এরই মধ্যে জানা গেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি বৈঠক করতে যাচ্ছেন, সেখানে উঠে আসবে পাকিস্তান ইস্যু। নতুন সরকার ইমরানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনতে পারে, যেটা নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধেও হয়েছিল। ইমরানের রাজনৈতিক উত্থান দমানোর চেষ্টা করা হবে। কিন্তু ইমরানের দল পিটিআই সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাচ্ছে। ফলে তাঁর রাজনীতি শেষ সেটাও বলা যায় না। কিন্তু তাঁর সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানের নতুন সরকারের সামনেও। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, ভঙ্গুর অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব বড় সংকট হয়ে আছে পাকিস্তানে। নতুন সরকার কতটুকু কী করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।