free hit counter
বাংলাদেশ

দক্ষিণে সতর্ক ছিল পুলিশ, পূর্ব পাশে বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা

নড়াইলের লোহাগড়ায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার দিন শুক্রবার (১৫ জুলাই) বিকালে লোহাগড়া থানার দিঘলিয়া গ্রামের সাহাপাড়ার পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের ওপর পুলিশের কঠোর নজরদারি ছিল। কারণ, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া যুবকের বাড়ি ছিল ওই অংশে। এ অবস্থায় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা সাহাপাড়ার পূর্ব পাশে চলে যায়। সন্ধ্যার পরই বাড়িঘরে হামলা ও মন্দিরে ভাঙচুর চালায় তারা। সাহাপাড়ার পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে থাকা পুলিশ পূর্ব পাশে যাওয়ার আগেই চারটি মন্দিরসহ ১৭টি বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: ‘নড়াইলে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে’

সরেজমিন সাহাপাড়ার ১০টি পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ১০ পরিবারের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ঘটনার সূত্রপাত

পুলিশ ও সাহাপাড়ার বাসিন্দারা জানান, ১৫ জুলাই সকালে দিঘলিয়ার এক কলেজছাত্র ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকালে কতিপয় ব্যক্তি ওই যুবকের গ্রেফতার দাবিতে মানববন্ধন করে। 

প্রথমে দিঘলিয়া বাজারে হামলা

সন্ধ্যায় দিঘলিয়া বাজারে মিছিল বের করা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিছিল থেকে দিঘলিয়া বাজারের হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানে হামলা করা হয়। এ সময় নিত্য দুলাল সাহা, অনুপম সাহা, অশোক সাহা, সঞ্জিত সাহার মুদি দোকান এবং গোবিন্দ কুণ্ডু ও গৌতম কুণ্ডুর মিষ্টির দোকান ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এ অবস্থায় সাহাপাড়ার পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। এ পাশে পুলিশ দেখে সাহাপাড়ার পূর্ব পাশে চলে যায় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা।

প্রথম বাড়িতে হামলা

সাহাপাড়ার পূর্ব অংশে রাস্তার পাশেই ছিল মালা রানি সাহার বসতঘর। সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রথমে তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলার পর ঘরে ভাঙচুর চালিয়ে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ সময় মালা রানি সাহা ও পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে যান।

আরও পড়ুন: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নড়াইলের সেই কলেজছাত্র গ্রেফতার

মালা রানি সাহা বলেন, ‌‘হামলাকারীরা প্রথমে আমার ঘরে হামলা চালায়। আমার ঘর থেকে চার ভরি স্বর্ণালংকার ও চার হাজার টাকা নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। আলমারি ভাঙার চেষ্টা করেছিল। হামলার পর ১৮ জুলাই রাতে এসে একটি পক্ষ আমাকে হুমকি দিয়ে বলে গেছে, ঘরে কোনও হামলা বা লুটপাট হয়নি, এটি সবাইকে বলতে হবে। না হলে ক্ষতি হতে পারে।’

তরুণ সাহার বাড়িতে হামলা

মালা রানি সাহার বাড়িতে হামলার কিছুক্ষণ পরই প্রতিবেশী তরুণ সাহার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। তরুণ সাহা বলেন, ‘ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া যুবকের বাড়ি সাহাপাড়ার দক্ষিণ অংশে। তাই ঘটনার শুরু থেকে উত্তেজনা চলছিল দক্ষিণ অংশে। এ জন্য শুরুতেই পুলিশ দক্ষিণ অংশে সক্রিয় ছিল এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলে। ফলে শুরু থেকেই সাহাপাড়ার পূর্ব অংশ পুলিশি নজরদারির বাইরে ছিল। এ অবস্থায় পুলিশের নজর এড়িয়ে পূর্ব অংশে ঢুকে পড়ে হামলাকারীরা। তারা বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালায়।’ 

আরও পড়ুন: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার সেই কলেজছাত্র রিমান্ডে

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা আমার ঘরের টিন ও দুটি দরজা ভেঙে ফেলেছে। এরপর দিলীপ মাস্টারের বাড়ি ও পারিবারিক মন্দিরে হামলা চালায়। পরে গোবিন্দ সাহার বাড়িতে আগুন দেয়। রাত ৮টার দিকে ডা. স্বপনের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় এবং পারিবারিক মন্দিরের প্রতিমা ভেঙে ফেলে। খবর পেয়ে পুলিশ পূর্ব অংশে এলে দক্ষিণ অংশে গিয়ে আখড়াবাড়ি সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর চালায় তারা। একই সময়ে নবগঙ্গার তীরে শ্মশান মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।’

একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়

ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানান, সাহাপাড়ার চার পাশে মুসলিম পরিবারের বসবাস। গ্রামের ও বাইরের লোকজন হামলায় জড়িত ছিল। এটিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বলা হচ্ছে, তা কিন্তু সঠিক নয়। কারণ, সংঘাত হতে হলে দুই পক্ষের সক্রিয়তা প্রয়োজন। এ ঘটনা ছিল একতরফা। এটিকে হিন্দু নির্যাতন বলা সঠিক হবে। কারণ, এ ঘটনায় কেবল হিন্দুরাই নির্যাতিত হয়েছে। কোনও মুসলমানের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা হয়নি।

তারা আরও জানান, বছরের পর বছর মুসলিমদের সঙ্গে এই গ্রামে শান্তিতে বসবাস করে আসছেন তারা। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। ১৫ জুলাই বিকালে কতিপয় ব্যক্তি ওই যুবকের গ্রেফতার দাবিতে মানববন্ধন করে। এ নিয়ে গ্রামে উত্তেজনা শুরু হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে একদল যুবক আশপাশের ও বাইরের লোকজনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সন্ধ্যার পর হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর।

আরও পড়ুন: নড়াইলে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ৫

সরেজমিন সাহাপাড়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই দিন রাতে সাহাপাড়ার গোবিন্দ সাহা, চায়না রানি সাহা, বিপ্লব সাহার বাড়িঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। পরে গোবিন্দ সাহার বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সাড়ে ৮টার দিকে আখড়াবাড়ি সর্বজনীন পূজামণ্ডপে ভাঙচুর ও শ্মশানঘাট মন্দিরে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। 

জেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ

হামলার পরপরই লোহাগড়া থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে র‌্যাব-৬-এর একটি দল এবং পুলিশ সুপার প্রবীর রায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ পরিবারের তালিকা করেছে পুলিশ প্রশাসন। তালিকায় উল্লেখ করা তথ্যমতে, অনুপম সাহার দোকানের শাটার ভাঙা ও ওষুধ নষ্টসহ তিন লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি, গোবিন্দ সাহার ঘরে আগুন দেওয়ায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি, দিলীপ কুমার সাহার (দিলীপ মাস্টার) টিভি, ফ্রিজ, স্বর্ণালংকার ও রান্নাঘরসহ দুই লাখ টাকার ক্ষতি, শ্মশান কালিমাতা মন্দিরের গেট, টাইলস, টিউবওয়েল, কালিমাতার মূর্তি ভাঙা ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি, শচিদানন্দ রায়ের মন্দিরের গ্রিল ও প্রতিমা ভাঙা এবং দুটি গরু নিয়ে যাওয়ায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি, দিঘলিয়া রাধা গোবিন্দ মন্দিরের ৫০টি চেয়ার, সাউন্ড বক্স ও গেট নষ্ট হওয়ায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি, আখড়াবাড়ি সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের গেট, টিনের চাল ও প্রতিমা ভাঙচুরের কারণে এক লাখ টাকার ক্ষতি, গৌতম সাহার দোকানের শাটার ভাঙা ও মিষ্টি নষ্ট হওয়ায় ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি, গোবিন্দ কুণ্ডুর দোকানের শাটার ভাঙা ও মিষ্টি নষ্ট হওয়ায় ৪০ হাজার টাকার ক্ষতি, অশোক সাহার দোকানের শাটার ভাঙায় ২০ হাজার টাকার ক্ষতি, স্বপন কুমার সাহার বাড়ির মন্দিরের গ্রিল ও প্রতিমা ভাঙচুরের কারণে ২০ হাজার টাকার ক্ষতি, উত্তম ঘোষের দোকানের শাটার ভাঙায় ১৫ হাজার টাকার ক্ষতি, বিপ্লব কুমার সাহার পানির ট্যাংক, টিনের চাল ও বৈদ্যুতিক মিটারসহ ১৫ হাজার ক্ষতি, গৌরচন্দ্র সাহার ঘরের দরজাসহ কিছু মালামাল নিয়ে যাওয়ায় ১৫ হাজার টাকার ক্ষতি, নিত্য দুলাল সাহার দোকানের শাটার ভাঙায় ১৫ হাজার টাকার ক্ষতি, তরুণ সাহার ঘরের দরজা ও জিনিস নষ্ট হওয়ায় ১০ হাজার টাকার ক্ষতি, পদ্মারানি চক্রবর্তীর ঘরের বৈদ্যুতিক মিটার নষ্ট হওয়ায় তিন হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

যা বলছেন ক্ষতিগ্রস্তরা

গোবিন্দ সাহা বলেন, ‌‘সন্ধ্যার পরই হামলাকারীরা আমার ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার পরই স্থানীয় লোকজন এসে পানি দিয়ে আগুন নেভাতে শুরু করেন। কিন্তু আগুন নেভাতে নেভাতেই ঘরের সবকিছু পুড়ে যায়। ঘটনার দুদিন পর নতুন ঘর করে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন।’

আরও পড়ুন: নড়াইলে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার ৫ জন রিমান্ডে

একই এলাকার মলিনা রায় বলেন, ‘ঘটনার একদিন পর ১৬ জুলাই রাতে একদল ব্যক্তি এসে আমার গোয়াল থেকে দুটি গরু নিয়ে গেছে। এ কারণে পাড়ার হিন্দু পরিবারগুলো তাদের সম্পদ রক্ষায় উদ্বিগ্ন রয়েছে। তবে প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।’

সাহাপাড়ার পূর্ব অংশে রাস্তার পাশেই ছিল মালা রানি সাহার বসতঘর

আখড়াবাড়ি সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ সুমঙ্গল কুমার বলেন, ‌‘শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক মন্দিরে হামলা চালায়। আমরা তখন ঘরে লুকিয়ে ছিলাম। হামলাকারীরা চলে গেলে মন্দিরে গিয়ে দেখি বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে গেছে তারা। পাশাপাশি দিঘলিয়ার স্বপন ডাক্তারের বাড়ির মন্দির ভাঙচুর এবং দিঘলিয়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি চাই আমরা।’

প্রশাসনের বক্তব্য

লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজগর আলী বলেন, ‘এলাকার লোকজনকে প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে শান্ত থাকতে বলা হয়েছে। কেউ বিতর্কিত পোস্ট দিলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। হামলায় জড়িতরা গ্রেফতার হবে।’

আরও পড়ুন: ‘নড়াইলে হামলার পর ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে’

নড়াইলের পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। এ ঘটনায় ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া যুবককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচ জনের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে গ্রেফতার করা হবে।’

Source link