free hit counter
বাংলাদেশ

ডিপোতে বিস্ফোরণের পর নড়েচড়ে বসেছে ৩ অধিদফতর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস ও পরিবেশ অধিদফতর। চট্টগ্রামে বেসরকারিভাবে পরিচালিত কনটেইনার ডিপো ও অফ-ডকগুলোতে কী ধরনের পণ্য আছে তার তালিকা চাওয়ার কথা ভাবছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

একইসঙ্গে আগামীতে কনটেইনার ডিপোতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন বন্দরের কর্মকর্তারা।

এদিকে, অনুমোদনহীন কোনও দাহ্য পদার্থ যাতে কনটেইনার ডিপোগুলোতে রাখা না হয় সে জন্য মালিকদের চিঠি দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। সেইসঙ্গে ডিপোগুলো পরিদর্শনের কথা জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুন) তিন সংস্থার কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার উপ-কমিশনার আলী রেজা হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বন্দর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা দাহ্য পদার্থ নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। বাকিগুলোর নিলাম কার্যক্রম চলমান আছে। কিছু পণ্য আছে ধ্বংসাত্মক। সেগুলো ধ্বংস করতে হবে। দ্রুতগতিতে এসব কার্যক্রম চালাচ্ছি আমরা। যেহেতু একটি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। যাতে এ ধরনের ঘটনা আর কোথাও না ঘটে, সে জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘কি কারণে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা তদন্তের বিষয়। তবে রাসায়নিক কিংবা দাহ্য পদার্থ সাধারণ পণ্যের সঙ্গে রাখা যাবে না। এখন তারা কীভাবে রাসায়নিক রেখেছিল তা দেখতে হবে। আগামীতে কনটেইনার ডিপোগুলোতে দুর্ঘটনা এড়াতে মালিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। ডিপোগুলোতে যেসব রফতানি পণ্য রাখার কথা এর বাইরে অন্য কোনও পণ্য রাখা যাবে না, এ কথা তাদের বলে দিয়েছি আমরা। বর্তমানে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে কী ধরনের পণ্য আছে, তার তালিকা চাওয়া হতে পারে।’

আলী রেজা হায়দার আরও বলেন, ‘দেশে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) বা অফ-ডক আছে ২২টি। এর মধ্যে সচল আছে ১৭টি। সেগুলোতে কী ধরনের পণ্য আছে তার তালিকা চাওয়ার পাশাপাশি পরিদর্শন করবো আমরা।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দুঃখজনক। আগামীতে কনটেইনার ডিপোগুলোতে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সতর্ক থাকার জন্য কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন ‘বিকডার’ কর্মকর্তাদের জানিয়েছি আমরা। আশা করছি, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তারা।’

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুফিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন বিএম ডিপোতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্ত চলছে। একটি তদন্ত কমিটিতে আমিও আছি। মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করেছে। সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তারাও নমুনা নিয়ে গেছেন পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার পর জানা যাবে এখানে কি ধরনের পণ্য ছিল। কেন এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডিপোর কনটেইনারগুলোতে কি রাখা হচ্ছে, তা মালিকপক্ষ আমাদের অবহিত না করলে জানা খুবই অসম্ভব। আমাদের এমনিতেই জনবল সংকট। একটি ডিপোতে হাজার হাজার কনটেইনার থাকে। একজন পরিদর্শকের পক্ষ এসব কনটেইনার খুলে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য আমরা কিছু কাজ করবো। অনুমোদনহীন কোনও দাহ্য পদার্থ যাতে ডিপোগুলোতে রাখা না হয় সে জন্য চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি ডিপোগুলোতে সব কনটেইনার খুলে দেখতে না পারলেও নিয়মিত পরিদর্শন করবে পরিবেশ অধিদফতর। কোনও কনটেইনার সন্দেহ হলে খুলে দেখা হবে।’

এদিকে, বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আমদানিকারকদের জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের চালান বন্দরে অবতরণের পর ৩০ দিনের মধ্যে এবং বিমানবন্দরে অবতরণের ২১ দিনের মধ্যে, অথবা উভয় ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত অতিরিক্ত সময়সীমার মধ্যে শুল্ক-কর পরিশোধ করে খালাস নিতে হবে।’

গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমদানিকারকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানিকৃত পণ্য খালাস নিচ্ছেন না। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের অধিক্ষেত্রাধীন চট্টগ্রাম বন্দর, সব অফ-ডক ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে আমদানিকৃত ও অখালাসকৃত কেমিক্যাল জাতীয় পণ্যসহ সব পণ্য চালান উপযুক্ত বিধান মোতাবেক দ্রুত খালাস নেওয়ার জন্য আমদানিকারকদের অনুরোধ করা হলো। অন্যথায়, উল্লি­খিত সময়ের মধ্যে অখালাসকৃত পণ্যের চালান আইন ও বিধি মোতাবেক নিলামে বিক্রি করা হবে।’

কনটেইনার ডিপোতে যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেসরকারি ডিপোগুলো দুই দশকের বেশি সময় ধরে শতাভাগ রফতানি পণ্য এবং ১৫ শতাংশ আমদানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে আসছে। শিপিং সেক্টরে এত বড় দুর্ঘটনা এটাই প্রথম। এটি নজিরবিহীন।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের দেখতে হবে কি কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে কোনও ধরনের নাশকতা ছিল নাকি অন্য কোনও কারণে ঘটেছে। তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আগে দুর্ঘটনার কারণ উঠে আসুক, পরে কোথায় কি সমস্যা আছে তখন আমরা সমাধান করবো। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে অনেকগুলো তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসবে। তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রুহুল আমিন সিকদার আরও বলেন, ‘বলা হচ্ছে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বিস্ফোরক নয়। এমনকি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কারণে যদি আগুন লাগে তাহলে আগুন এভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে না। অথচ আমরা দেখলাম, ১০০ ফুট দূর থেকে ভিডিও করা লোকটিও বিস্ফোরণে মারা গেছে। তাই আমরা চাই, তদন্তে উঠে আসুক, কেন এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশে ২২টি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) বা অফ-ডক’র মধ্যে চালু আছে ১৭টি। এগুলো প্রায় শতভাগ রফতানি পণ্য হ্যান্ডেল করে। এছাড়া চাল, গম, সরিষা, ছোলা, ডালের মতো খাদ্যপণ্যসহ ৩৮ ধরনের আমদানি পণ্যও ডেলিভারির জন্য নিয়ে আসা হয় এসব ডিপোতে। এসব ডিপোর কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৭৬ হাজার ২৫৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার। অপরদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার ১৮ টিইইউ কনটেইনার। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বন্দর এলাকার বাইরে থেকেই পণ্য খালাস ও ডেলিভারির মাধ্যমে ডিপোগুলো মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।

গত ৪ জুন রাতে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগে। পরে একটি কনটেইনার বিস্ফোরিত হলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে ফায়ার সার্ভিসের ৯ কর্মীসহ ৪৪ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকসহ দুই শতাধিক। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

Source link