free hit counter
বাংলাদেশ

‘চা মহলে’ প্রতিদিন বিক্রি হয় ৩৫০ লিটার চা 

গাজীপুরের শ্রীপুর রেল স্টেশনে দক্ষিণপাশের উন্মুক্ত জায়গা গরুর দুধের চায়ের জন্য বেশ পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়রা এই এলাকার নাম দিয়েছে ‘চা মহল’। প্রতিদিন গরুর দুধের কমপক্ষে সাড়ে তিনশ’ লিটার চা বিক্রি হয় এখানে। ১৩ জন চা বিক্রেতাদের মধ্যে কেউ পাঁচশ’, আবার কেউ আটশ’ কাপ বা তার চেয়ে বেশি কাপ চা বিক্রি করেন। আর এখানকার দুধ চায়ের স্বাদ নিতে দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ভিড় জমান প্রতিদিনি। 

চা মহলের বিভিন্ন দোকানের বড় বড় পাতিলে সারাদিন দুধ গরম হতে থাকে। অন্যদিকে চা বিক্রিও চলে সমান তালে। এখানকার গরুর দুধের চা না খেলে অনেকের দিন কাটতে চায় না। আবার চা মহলে আড্ডা না দিলে অনেকের বাড়ির খাবারও হজম হয় না, এমন কথাই বলেছেন কেউ কেউ। বড় পাতিলে ঘন মাখনের মতো দুধের স্বরও (স্থানীয় ভাষায় মালাই) বিক্রি হয়।

চা পানকারী ও বিক্রেতারা জানিয়েছেন ব্যক্তিগত আড্ডা, অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংলাপ, ব্যাক্তিগত বা কখনো পারিবারিক বিরোধের নিষ্পত্তিও হয় এ চা মহলে।

যেভাবে গড়ে উঠলো চা মহল
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীপুর রেলগেটের দক্ষিণপাশে উন্মুক্ত জায়গায় রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলে আসছে সুদীর্ঘকাল আগে থেকে। এসব কাজের পরিবেশনার সুবিধার্থে উন্মুক্ত জায়গায় শ্রীপুর পৌরসভা থেকে মুক্তমঞ্চ করা হয়েছে এক যুগের বেশি সময় আগে। সে সময় এ জায়গায় প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ধানের হাট বসতো। অন্যান্য দিন মৌসুমি ফল বিক্রি হতো। তবে এখন এসব পণ্য রেল লাইন ঘেঁষে অল্প জায়গার মধ্যে বেচাকেনা হয়। আর এলাকার কৃষকেরা প্রায় দেড় যুগ আগে বাণিজ্যিকভাবে গাভী লালন-পালন শুরু করেন। সে সময়েই গরুর দুধের চা বিক্রির বহুল প্রচলন শুরু হয়।

 নিয়মিত চা পান করা শ্রীপুর পৌরসভার লোহাগাছ গ্রামের সরাফত আলী বলেন, গরুর দুধের চায়ের কারণেই শ্রীপুরের রেল গেইট ‘চা মহল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বড় পাতিলে সারাদিন দুধ গরমের পর বিকালের চায়ের স্বাদ ভিন্ন হয়। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চা বিক্রি চলে। এলাকার লোকজন কেউ কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ, সমস্যা বা সমাধানের কোনও আলোচনার জন্য পরস্পরকে চা মহলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে চা বিক্রি শুরু হলেও বিকাল ৩টার পর থেকে শত শত তরুণ, যুবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে জড়ো হন, আড্ডা দেন। চা-চামচ আর কাপের টুংটাং শব্দে রাজনৈতিক, সমসাময়িক নানা টপিকের আলোচনায় জমে ওঠে এসব আড্ডা।

এদিকে চা মহল ঘুরে দেখা গেছে, রেল স্টেশনের খোলা ময়দানে ১৩টি চা স্টল রয়েছে। দুই পাশে দুটি সারিবদ্ধ সামিয়ানার নিচে চা স্টলের পাশাপাশি ভাজা পোড়া মুখরোচক খাবারের তিনটি, ফলের ছয়টি ও পিঠার একটি অস্থায়ী দোকান রয়েছে। চা স্টল ও দোকানগুলোর সামিয়ানা বাঁশের খুঁটিতে টিনের চাল রশি দিয়ে বেঁধে নির্মাণ করা হয়েছে। ছোট ছোট বেঞ্চে বসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন চা পান করছেন। 


যা বলছেন চা মহলের আড্ডার মানুষেরা 

শ্রীপুরের আনসার রোড এলাকার মেঘনা ডেনিম কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) রায়হান আকন্দ সুজন বলেন, এখানের চায়ের দোকানের পরিবেশ খুবই পরিচ্ছন্ন। তাই, অফিসে কাজ করে দিন শেষে এখান দিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে প্রতিদিনই চা পান করা হয়। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের নিয়েও চা মহলে আড্ডায় বসে পড়ি।  

চা মহলে নিয়মিত চা পান করেন মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সেলিম মোল্লা। তিনি বলেন, শ্রীপুর বাজারের গরুর দুধের চা বিক্রির ঐতিহ্য আছে। গোপাল সোম, শচীন্দ্র পাল, ঊষা মাস্টারের মিষ্টির দোকানসহ কয়েকটি হোটেলে গরুর দুধের চা বিক্রি হতো। তবে রেলগেট এলাকায় গত প্রায় ১৫ বছর আগে থেকে একত্রে বেশ কয়েকটি চায়ের দোকানে গরুর দুধের চা বিক্রি শুরু হয়। এ এলাকায় একত্রে অনেকগুলো চায়ের দোকান আর কোথাও নেই। এখানে একটি স্টলে গামলা ভর্তি করে একত্রে ৩০-৩৫ লিটার দুধ গরম করে চা বিক্রি করা হয়। আমাদের এলাকায় কারও পরিবারে কোনও মেহমান এলে গরুর দুধের চায়ের ঐতিহ্য ব্যাখ্যা করে চা স্টলে চা পান করানো অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অবশ্য করোনার কারণে গত দু’বছর চা মহলের আড্ডায় কিছুটা ভাটা পড়েছিল।

বিক্রেতারা যা বলছেন 
জাহাঙ্গীর আলম আট বছরের বেশি সময় ধরে চা মহলে চা বিক্রি করেন। তিনি বলেন, প্রথমদিকে দুধ ছাড়া প্রতি কাপ চা তিন টাকা করে বিক্রি করতাম। ওই সময় কৌটা বা পাস্তুরিত তরল দুধ দিয়ে দুধ চা বিক্রি করতাম। প্রতি কাপ চায়ের মূল্য ছিল পাঁচ টাকা। ব্যবসা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই গরুর দুধ সহজলভ্য হয়ে ওঠে। এরপর গরুর দুধ দিয়ে চা বিক্রি শুরু করি। আমার মতো অনেকেই গরুর দুধের চা বিক্রি শুরু করেন। গরুর দুধ দিয়ে চা তৈরি করায় অনেকেরই চা পানের অভ্যেস গড়ে ওঠে। নিয়মিত এখানকার স্টলে এসে চা পান করেন এমন ভোক্তার সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন। সময়ের পরিক্রমায় গো খাদ্যের দাম বাড়াসহ নানা কারণে দুধের মূল্য বাড়তে থাকে। বছর তিনেক আগে থেকে প্রতি কাপ দুধ চা ১০টাকায় বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন দুধের সরও (স্থানীয় ভাষায় মালাই) বিক্রি হয়। তিনি দাবি করেন, প্রতিদিন প্রায় ২৫ লিটার দুধের চা তিনি বিক্রি করেন।  

পারভেজ ও এনামুল দুই ভাই একটি চা স্টল পরিচালনা করেন। এনামুল বলেন, বড় পাতিলে প্রতিদিন সকাল থেকে সারাদিন ৩৫ লিটার দুধ গরম করে চা বিক্রি করি। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৮ গ্লাস দুধের সর বা মালাই বিক্রি করছি। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের বসবাস শ্রীপুরে। এ কারণে নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন এখানে চা পান করতে আসেন। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূর থেকে এখানে চা পান করতে আসেন, এমন কাস্টমারও আছেন প্রচুর।

 কত কাপ চা বিক্রি হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, চা বিক্রির সঠিক হিসাবে রাখা হয় না। তবে গড়ে প্রতি দোকানে পাঁচশ’ থেকে আটশ’ কাপ চা বিক্রি হয় বলে জানান তিনি। 

আরেকটি চা স্টলের মালিক সেলিম মিয়া বলেন, চা বিক্রির জন্য প্রতিদিন ২৮ কেজি দুধ লাগে। আগে ৫০ টাকা কেজি দুধ কিনতাম। এখন ৬০ টাকা লিটার দুধ কিনতে হয়। মুক্তমঞ্চে কোনও সভা সামাবেশের আয়োজন হলে একদিন আগেই সব চা স্টলের মালিকেরা তাদের ছামিয়ানা সরিয়ে নিয়ে যান। বড় কর্মসুচি হলে দু’দিন আগেই সরিয়ে নেন। ওই দিনগুলোতে চা বিক্রির জায়গা না থাকায় চা স্টল সাজানো হয় না। চা পানের জন্য ময়মনসিংহ, জামালপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী ট্রেন যাত্রীদের একটি অংশের কাছেও শ্রীপুরের ‘চা মহল’র গরুর দুধের চায়ের বেশ কদর রয়েছে।

Source link