Image default
বাংলাদেশ

গরমে অতিষ্ঠ রাজশাহীর মানুষ, বাড়ছে ডায়রিয়া

রাজশাহীতে চৈত্রের প্রথমে শুরু হওয়া মাঝারি তাপপ্রবাহ বৈশাখের পঞ্চম দিন পর্যন্ত বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রত্যাশিত বৃষ্টির দেখা মেলেনি। তীব্র গরমে হাসপাতালে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগী। 

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, চলতি মাসে এ পর্যন্ত মাত্র শূন্য দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে গত ৩ এপ্রিল। এর আগে সর্বশেষ ৪ ফেব্রুয়ারি ৩০ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। মার্চে কোনও বৃষ্টি হয়নি।

কয়েকদিনের আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৫ এপ্রিল রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার (১৬ এপ্রিল) মৌসুমের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। রবিবার (১৭ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর ৩টায় সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে মৃদু তাপদাহ, ৩৮ থেকে ৪০ পর্যন্ত মাঝারি তাপদাহ, ৪০ থেকে ৪২ পর্যন্ত তীব্র তাপদাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রা উঠলে অতি তীব্র তাপদাহ বলা হয়। রাজশাহীতে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘রাজশাহী এমনিতেই উষ্ণতম জেলা। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবার এখানে তীব্র গরম থাকে। তবে এ বছর বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা বেশি। বৃষ্টি ছাড়া এই মুহূর্তে তাপমাত্রা কমার তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই।’

তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে গত এক দশক ধরে বৃষ্টিপাতেও ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অসময়ে বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা ও পানির জন্য হাহাকার বরেন্দ্র অঞ্চলের নিত্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটাকে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ‘মৌসুমভিত্তিক জলবায়ুর যে স্ট্রাকচার, তা এখন আর ঠিক নেই। এখন অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। গরম বাড়ছে। আগে বৈশাখের প্রথম দিনেই ঝড়বৃষ্টি দেখা যেতো। কিন্তু বিগত এক দশক ধরে এই নিয়ম আর দেখা যায় না। এদিকে খাদ্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বরেন্দ্র অঞ্চলে অধিক পরিমাণ ধান চাষ হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে রাজশাহীতে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গড়ে দুই হাজার ৫০০ মিলিমিটার। সেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে এক হাজার ২০০ মিলিমিটার বা কোনও কোনও এলাকায় তারও কম বৃষ্টিপাত হয়। এ কারণে চাষাবাদের প্রয়োজনে যে পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে, সেই অনুযায়ী পানি বর্ষা মৌসুমে ভূগর্ভে প্রবেশ করছে না। এতে পানির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি জলবায়ুর এই বিরূপ আচরণের কারণে মানুষ, পশুপাখি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে বরেন্দ্র অঞ্চলে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে।’

তীব্র গরমে দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ

এদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ডায়রিয়ায় একজন মারা গেছেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রোগীর মৃত্যু হয়।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ডায়রিয়া ইউনিটে ১৫৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শিশু বিভাগে ৯৮ জন ও মেডিসিন বিভাগে ৫৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৭ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ভর্তি হয়েছেন ৬২ জন। তার মধ্যে শিশু বিভাগে ১৯ জন, মেডিসিন বিভাগে ৪৩ জন।

রাজশাহীতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। চৈত্রের খরতাপে মানুষের অসচেতন জীবনযাপন এই প্রকোপ আরও বাড়িয়েছে। প্রতিদিনিই রামেক হাসপাতালে ৪০ জনের বেশি ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হচ্ছেন। যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা।

রামেক হাসপাতালের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নেওয়া এক রোগীর স্বজন আশরাফ আলী জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে তার মাকে এই ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়েছেন। রোগীর চাপ প্রচুর। দিনে একবার করে ডাক্তার দেখে যাচ্ছেন। ওষুধের সরবরাহ থাকলেও চিকিৎসার পরিবেশটা খুবই খারাপ। একটু পরপর ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে দুর্গন্ধ ভেসে আসছে।

শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আরেক রোগীর স্বজন নাইমুল হাসান বলেন, ‘শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। অধিকাংশই ডায়রিয়া রোগী। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্ম্পকে বলেও লাভ নেই। দিনে একবার ডাক্তারের দেখা মেলে। প্রয়োজন হলে বারবার নার্সদের ডাকতে হয়। তারাও তেমন গুরুত্ব দেন না।’

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, ‘গরমে ডায়রিয়া রোগীর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ওষুধসহ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। বাথরুম একটা ঠিক করতে না করতেই আরেকটা নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালের জনবলের অনেক সংকট। এক হাজার ২০০ বেডের হাসপাতালে যে জনবল দরকার তার থেকে অনেক কম জনবল আছে। অথচ চিকিৎসা দিতে হচ্ছে তিন হাজারের বেশি রোগীকে।’

তিনি আরও জানান, ‘এত সংকটের মধ্যেও বর্তমানে অস্থায়ী ভিত্তিতে কিছু লোক নিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। তবে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।’

Source link

Related posts

‘সব ধান ডুইবা গেলো, কেউ আইয়া খোঁজ নিলো না’

News Desk

বাংলাদেশ যে ছয়টি এলাকায় ফাইভ-জি সুবিধা পাওয়া যাবে

News Desk

সরকারি হাসপাতালের খাবার স্যালাইন ডাস্টবিনে

News Desk

Leave a Comment