free hit counter
বাংলাদেশ

‘কখনও সনদ নেওয়ার কথা মাথায় আসেনি’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতীয় পূর্ববাংলার অনেক সৈনিক রেখেছিলেন বীরত্বপূর্ণ অবদান। তাদের কয়েকজন স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেছেন বাংলা ট্রিবিউন-এর কাছে। ধারাবাহিক আয়োজনের চতুর্থ ও শেষ পর্বে আজ রইলো নোয়াখালীর নূর মোহাম্মদের গল্প।

 

১৯২৭ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম নেওয়া নূর মোহাম্মদের বয়স এখন ৯৫। ১৯৪৭ সালের ৬ জুন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৩ সালের ৬ জুন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। পরে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য এলাকাবাসীকে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে রাজাকার বাহিনীর হাতে ধরা পরে জেল খাটেন তিনি।

ব্রিটিশ ল্যান্স করপোরাল নূর মোহাম্মদের গ্রামের বাড়ি জেলার কবিরহাট উপজেলার বাটইয়া ইউনিয়নের শ্রী নন্দী গ্রামে।

তিন ছেলে ও চার মেয়ে। তার হলেন– মো. সেলিম (৬৫), মো. ফয়েজ (৬২), নাসিমা আক্তার (৫০), নাহিমা আক্তার (৪৭), হাসিনা আক্তার (৪৫), রায়হানা আক্তার ও মো. শাখাওয়াত (৪১)। শাখাওয়াত ১৯ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। এরপর আর ফেরেননি। ছোট মেয়ে রায়হানা আক্তার প্রায় ১৫ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

নূর মোহাম্মদের নিজের ঘর বলতে কিছু নেই। থাকেন বেগমগঞ্জ উপজেলায় মেজো মেয়ে নাহিমা আক্তারের বাড়িতে।

ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে বর্তমানে ব্রিটিশ সরকার (রয়্যাল কমনওয়েলথ এক্স-সার্ভিসেস লিগ) কর্তৃক দুই-তিন মাস পরপর জেলা সশস্ত্র বাহিনী বোর্ড থেকে প্রায় ১৬ হাজার টাকা এবং নোয়াখালীর ডিএএসবি শাখা থেকে মাসে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা পেনশন পান তিনি। মাঝেমধ্যে পান চিকিৎসা ভাতা। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত তিনি।

সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প করতে গিয়ে তিনি জানান, ১৯৪৭ সালের ৬ জুন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। একই বছর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১৯৬৩ সালের ৬ জুন সৈনিকের চাকরি থেকে অবসর নেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সংগঠকের ভূমিকায় নামেন তিনি। এলাকায় স্থানীয়দের রণ-কৌশলের প্রশিক্ষণও দেন।

এ সময় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের আমিন বক্সের ছেলে হাসান রাজাকারের দেওয়া তথ্যে পাকিস্তানিরা তাকে ধরে নোয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দি করে। এরপর ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবসে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মুক্ত করে।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপচারিতায় নূর মোহাম্মদ বলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কাজ করে অবসর নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। জেলও খেটেছি। কিন্তু কখনও মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেওয়ার কথা মাথায় আসেনি। আবেদনও করিনি।

তিনি আরও বলেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের বাড়ি হবে না, তা কল্পনাও করিনি। নিজের থাকার একটা ঘর নেই। মেয়ের বাড়িতে দিন কাটছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এ ব্রিটিশ সৈনিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী কতজনকে কত কিছু করে দিয়েছেন। আমার ঘরের করার ব্যবস্থা করে দিলে নিজের ঘরে শেষ নিঃশ্বাস নিতে পারতাম।

এ সৈনিকের মেজো ছেলে মো. ফয়েজ বলেন, ‘আমাদের এত বড় পরিবারে ৮-১০ শতাংশের মতো জমি রয়েছে। একটি ভালো ঘর না থাকায় বাবাকে বোনের বাড়িতে রাখতে হয়েছে। ইচ্ছা থাকলেও নিজের সঙ্গে রাখতে পারছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিবারের কষ্ট দেখে পাশের মিয়া বাড়ির আমেরিকান প্রবাসী সাবের সাহেব তার বাড়ি দেখাশোনার জন্য দুই বছর আগে আমাকে সুপারভাইজারের চাকরি দেন। তা দিয়েই কোনও রকম চলছে।’

মেজো মেয়ে নাহিমা আক্তার বলেন, ‘আড়াই বছর ধরে বাবা আমার বাড়িতে। বাবার কষ্টের কথা ভেবেই আমার কাছে রেখেছি। আমিও চাই বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ হোক। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, বয়স বিবেচনা করে হলেও বাবাকে যেন একটি ঘর করে দেওয়া হয় এবং তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।’

কবিরহাট উপজেলার বাটইয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন শাহীন বলেন, ‘বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। এখন তার প্রতি খেয়াল রাখবো। তিনি যেন সরকারি সহযোগিতা পান, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’

জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’

 

 

আরও পড়ুন

‘বেঁচে থাকতেই স্বীকৃতি চাই’

‘ব্রিটিশ রানি আমার চিঠির উত্তর দিলেন’

ফল-পাতা খেয়ে লড়াই করেছেন দিনের পর দিন

 

Source link