free hit counter
বাংলাদেশ

ঈদের দিনেও কাঁদছেন হাদিসুরের মা

‘বাজান ঈদ করমু ক্যামনে? মোগো সব ঈদ তো শ্যাষ হইয়া গেছে। মোর বাপজানেরে ছাড়া মোরা কিসের আনন্দ করমু? বাপজানে মোরে এবার কইছিল ঈদের আগে নতুন বাড়ি বানাইবো। এ বছর নতুন বাড়িতেই ঈদ করবো। মোর বাজানের কোনও স্বপ্নই পূরণ হইলো না। ও আল্লাহ তুমি অরে ক্যা লইয়া গেলা?’ রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে ইউক্রেনের অলিভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় নিহত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান আরিফের মা রাশিদা বেগম এভাবেই প্রকাশ করছিলেন ছেলে হারানোর তীব্র যন্ত্রণার কথা। কথা বলতে বলতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।

ঘরের বারান্দায় বসে কাঁদছিলেন মা রাশিদা বেগম। পাশেই বসা বাবা আবদুর রাজ্জাক। সবাই চেষ্টা করেও থামাতে পারছেন রাশিদা বেগমের কান্না। দুই মাস আগে মারা যান হাদিস। তবুও শোকের মাতম কমেনি বরং পূর্বের ঈদের আনন্দের সুখস্মৃতি বেদনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। হাদিসকে ছাড়া পরিবারটিতে আনন্দ উৎসব যেন কল্পনা করা যেত না। এখন তাকে ছাড়া হারিয়ে গেছে সব আনন্দ।  

যখন ঘরে ঘরে ঈদ আনন্দের জোয়ার বইছে তখন বরগুনার বেতাগী উপজেলার কদমতলী গ্রামে হাদিসুরের বাড়িতে বইছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে এখনও শোকে স্তব্ধ গোটা বাড়ি। হাদিসুর নেই এটা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না স্বজনরা। এক অজানা অমাবশ্যার কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা বাড়ি।

হাদিসুরের জন্য আক্ষেপ করে রাশিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বাজানে কত স্বপ্ন বুকে লইয়া চইলা গেছে মোগো ফাঁকি দিয়া। এ বছর এই ঘর ভাইঙ্গা নতুন ঘর উঠাইবে। সেই সঙ্গে বাজানে মোর ঘরে নতুন মেহমান নিয়া আসার কথা কইছিল। কইছিল, এবার আইয়াই বিয়া করমু।’

সবশেষ বছর চারেক আগে বাড়িতে ঈদ করেছিলেন হাদিসুর রহমান। তখন একবার মাকে হাসির ছলে বলেছিলেন, ‘এ বছর মনে হয় তোমার সঙ্গে আমার শেষ ঈদ। এরপর থেকে তো আর তোমাদের সঙ্গে ঈদ করতে পারবো না। থাকতে হবে সাগরে সাগরে। কখন আসতে পারি তার কোনও ঠিক-ঠিকানা থাকবে না।’ এই কথা মনে উঠতেই চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘এভাবেই যে একেবারে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে মোরা কেউ বুঝিনি।’

হাদিসুরের বাবা আবদুর রাজ্জাক মাস্টার বলেন, ‘আমি স্থানীয় একটি বেসরকারি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতাম। সেখান থেকে অবসরের পর হাদিসুরই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। ঈদ বলেন আর কোরবানি বলেন, সবকিছু ছিল হাদিসকে ঘিরে। আজ হাদিস নেই । আমার আদরের ধন নেই, সেই ঘরে ঈদ করমু ক্যামনে?’

শোকার্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদে আরিফ বাড়ি এসে আমাদের জন্য কেনাকাটা করে। না আসতে পারলে ভাইগো দিয়া আমাদের জন্য নতুন পোশাক কেনায়। এ বছর বাজানে চাইছিল বাড়িতে আইবে, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করবে। কিন্তু আল্লাহ ওর ইচ্ছাটা পূরণ করলো না। এবার ঈদে আমাকে আর কেউ কাপড় কিনে দেবে না। কেউ আর দোয়া চাইবে না। আমাদের ঈদ আনন্দ হাদিসের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে।’

হাদিসুরের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স জানান, ‘প্রতি বছর ঈদ আসলে পরিবারের সবাইকে পছন্দের পোশাক কিনে দিতেন ভাইয়া। এবার ঈদে বাড়িতে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তার। এবার ঈদে সবাই আছে, নেই শুধু মোর ভাই। মোরা মোর ভাইকে ছাড়া ক্যামনে ঈদ করমু। বাবা-মায়ের পরে প্রতিটি ঈদের স্মৃতিতে ভাইয়া জড়িয়ে রয়েছে।’

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে। তিনি ওই এলাকার নাদেরিয়া মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক ও গৃহিণী রাশিদা বেগমের ছেলে। ২০০৮ সালে বেতাগী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন হাদিসুর। এরপর ভর্তি হন বেতাগী সরকারি কলেজে। আর্থিক টানাপোড়েনে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় ২০১০ সালে জিপি ৪.৯৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমিতে। ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুরের একটি জাহাজে নৌ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হাদিসুর। ২০১৮ সালে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে যোগ দেন তিনি।

রাশিয়া ইউক্রেন আগ্রাসনের মধ্যে ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে আটকে পড়ে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি বাংলার সমৃদ্ধি। ২ মার্চ জাহাজে রকেট হামলায় নিহত হন হাদিসুর রহমান। এরপর বন্দরের আশপাশ এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের সহায়তায় ৩ মার্চ জাহাজে থাকা ২৮ নাবিককে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সরকারের প্রচেষ্টায় ৯ মার্চ আটকে পড়া ২৮ নাবিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। জাহাজটির ২৯ জন নাবিক ও প্রকৌশলীর মধ্যে ২৮ জন জীবিত দেশে ফিরলেও হাদিসুরকে ফিরতে হয়েছে নিথর দেহে।

নিহত হাদিসুর রহমান আরিফের গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, বড় এক বোন ও ছোট দুই ভাইসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। প্রিয় স্বজনকে হারিয়ে এবার বিবর্ণ আর আনন্দবিহীন ঈদ পালন করবেন তারা।

Source link